fbpx

অন্ধস্কুলে ঘণ্টা বাজবে কখন

[গল্পটা পড়ার সময় মনে পড়তে পারে সুবিনয় মুস্তফীকে — একসঙ্গে বেড়াল ও বেড়ালের মুখে ধরা ইঁদুর হাসানোর আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল যে ভূয়োদর্শী যুবার। জীবনানন্দ সন্দীপনের প্রিয় কবিদের একজন। ‘সুবিনয় মুস্তফী’ কবিতাটা সন্দীপনকে ইন্সপায়ার করতে পারে গল্পটা লিখতে। এমনটা, অন্তত, অসম্ভব না।

গল্পে ইঁদুর আর বেড়াল (জীবজন্তু) থাকলেও বা ফর্মে মিল থাকলেও গল্পটা ফেবল না। প্যারাবলও না যেহেতু স্পষ্টত কোনো ইউনিভার্সাল ট্রুথ উচ্চারণের ভঙ্গি নাই গল্পে।

তো, কাফকায়েস্ক এই গল্পটার বিষয়বস্তু কী?

এমন হইতে পারে যে গল্পটা একঘেয়েমি/বোরডম ও জীবনের সিসিফাসময় অর্থহীনতা নিয়া। (অবশ্য এইটা একটামাত্র ব্যাখ্যা। ভিন্নভাবে নিশ্চয়ই পড়া যায় গল্পটা। ফিকশনের মজাই এইখানে। ওপেনএন্ডেডনেস থাকায় বিচিত্রভাবে পাঠ করা সম্ভব।)

সন্দীপন ‘গল্পটা নেহাতই শিশুপাঠ্য ‘ বললেও তার পরিহাসপ্রিয়তা কারও অজানা নয়। একঘেয়েমি আর যাই হোক শিশুদের মধ্যে থাকে না। শিশুদের না বরং একঘেয়েমিতে প্রাপ্তবয়স্কদেরই মনোপলি।

এই গল্প শহীদুল জহিরের ‘ইন্দুর বিলাই খেলা’ গল্পের স্মরণ করাইতে পারে: ‘খেলার শেষ নাই, খেলোয়ারের শেষ আছে; খেলোয়ার খেলা ছেড়ে যায়, কিন্তু খেইল জারি থাকে’।

আপাত শিশুতোষ এই অনুগল্পটা সরস এক টুকরা ডিস্টোপিয়া; এই দুনিয়ারই একরকম রিফ্লেকশন —ছায়াবাস্তব। — মাদারটোস্ট ]

 

আমার গল্প একটাই। আর সেটা নিয়েই আমি সব গল্প লিখি, যদিও সেই মূল গল্পটি নেহাতই শিশুপাঠ্য। ~ সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

 

এক যে ছিল ইঁদুর। আর এক ছিল হুলো। ইয়া লম্বা তার ফুলো লোমের ল্যাজ। হুলো তখন দিবানিদ্রা দিচ্ছে; নিদ্রিত তার ফুটপাত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিশাল লোমবহুল ল্যাজও, যখন দুপুরবেলা ইঁদুর গিয়ে তাকে জাগায়।

বেড়াল: কী ব্যাপার?

ইঁদুর: তুমি আমাকে খাও।

বেড়াল (চোখ বুজে): আজ আমি যথেষ্ট খেয়েছি।

ইঁদুর: কিন্তু আমি তোমার কাছে এসেছি।

বেড়াল: বললাম তো আমার খিদে নেই।

ইঁদুর: কিন্তু আমাকে খাওয়া তোমার কাজ। বা, কর্তব্য।

বেড়াল: তুমি পরে আসো।

ইঁদুর: বেশ, না হয় পরে খাবে। এখন, অন্তত মেরে রাখো।

বেড়াল (বিরক্তমুখে): আচ্ছা। তুমি মুণ্ডটা আমার মুখের মধ্যে রাখো। আমি একসময় খেয়ে নেব’খন।

ইঁদুর তাই করল। বেড়াল হাঁ করে ফের ঘুমিয়ে পড়ে।

ইঁদুর অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করে।

তারপর একসময় আর পারে না। বেড়ালের নাকে ল্যাজ ঢুকিয়ে তাকে জাগাতে বাধ্য হয়।

বেড়াল: কী হল?

ইঁদুর: কই। কখন খাবে?

বেড়াল: আঃ! দেখছ না, আমি ল্যাজটা ফুটপাতে বিছিয়ে রেখেছি। কেউ মাড়াবে, তবে না খ্যাঁক করে তোমাকে দেব এক কামড়!

ইঁদুর: কত লোক তো রাস্তা দিয়ে গেল। কেউ তো মাড়াল না!

বেড়াল: দেখা যাক না। কেউ মাড়ায় কিনা!

ইঁদুর ( বেড়ালের মুখের মধ্যে বসে চিঁ-চিঁ করে): সব্বাই ল্যাজটা ডিঙিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক।

বেড়াল: আরে, অত অধৈর্য হও কেন? কেউ মাড়ায় কিনা দেখাই যাক না। নইলে, ইস্কুলের ঘণ্টা তো বাজল বলে।

ইঁদুর: ইস্কুল?

বেড়াল: আ-হ্যাঁ, ইস্কুল। ওই যে দূরে মস্ত বাউণ্ডারিওয়ালা বাড়িটা দেখছ, ওটাই ব্লাইণ্ড ইস্কুল। সাড়ে চারটেয় স্কুলের ঘণ্টা পড়বে। হুড়মুড় করে বেরিয়ে পড়বে অন্ধ ছেলেমেয়েরা। ওদের কেউ না কেউ ঠিক মাড়িয়ে দেবে’খন। তুমি ততক্ষণ ধৈর্য ধর।

এত বলে বেড়াল ফের হাঁ করে ঘুমিয়ে পড়ল।

 

শারদীয় দর্পণ, ১৯৯০

No Comments Yet

Comments are closed

error: