fbpx

অন দ্য ফেনমেনন অফ বুলশিট জবস। ডেভিড গ্রেবার

জন মেইনার্ড কেইন্স ১৯৩০ সালে প্রযুক্তির এমন উৎকর্ষের ব্যাপারে ভবিষ্যতবাণী  করেছিলেন যে শতাব্দীর শেষ দিকে ব্রিটেন বা আমেরিকার মতো দেশগুলোতে শ্রমদান সাপ্তাহিক ১৫ ঘন্টার অবস্থায় উন্নীত হবে। তিনি সঠিক ছিলেন বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।  প্রযুক্তির  বিবেচনায়  আমরা সমর্থ।

তবুও এটা ঘটে নাই। এই অবস্থায় পৌছাতে এমন চাকরি সৃষ্টির দরকার ছিল যা কার্যকরতার দিকে দিয়ে অর্থহীন।  জনগণের বিশাল একটা অংশ, বিশেষত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়, সম্পূর্ণ চাকরিজীবন ব্যাহত করে এমন কাজকর্ম করে যা তারা নিজেরাই আজাইরা বলে  গোপনে বিশ্বাস করে। এই পরিস্থিতি উদ্ভুত যে নৈতিক ও আত্মিক ক্ষতিসাধন হয়, সেটা ভয়াবহ। আমাদের সামষ্টিক প্রাণজুড়ে এ এক বিশাল ক্ষত। অথচ কার্যত এ নিয়ে কেউ কথা বলছে না।

এমনকি ষাটের দশকেও কেইন্স প্রতিশ্রুত যেই ইউটোপিয়ার আগমন প্রত্যাশিত ছিল সেটা আর কখনোই বাস্তবায়িত হলো না কেন?  প্রচলিত মত হলো, ভোগবাদের ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি বুঝতে পারেন নাই। প্রদত্ত অল্প কর্মঘন্টা ও বেশি ভোগসামাগ্রীর মধ্যে সামষ্টিকভাবে আমরা দ্বিতীয়টাই বেছে নিয়েছি।  এটা বেশ সুন্দর নীতিধর্ম তুলে ধরে, কিন্তু মুহূর্তের বিবেচনাতেই বোঝা যায় এটা সত্যি হতে পারে না। হ্যা, প্রচুর বৈচিত্র্যময় চাকরির সৃষ্টি দেখেছি বিশ শতক থেকে, কিন্তু তাদের  কয়েকটা মাত্র শুশি, আইফোন ও ফ্যান্সি স্নিকারের  উৎপাদন ও বন্টনের সাথে জড়িত।

‘স্ট্রাইক!’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত লেখাটির আদি ইলাস্ট্রেশন

তাহলে এই চাকরিগুলো কী আসলে? যুক্তরাষ্ট্রের ১৯১০ ও ২০১০ সালের চাকরির তুলনামূলক একটা সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এই বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দেয় ( এবং লক্ষ্য করেছি যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রেও যা মোটামুটি প্রযোজ্য)।

গত শতাব্দীর শেষদিকে,  গৃহকর্ম, শিল্পকারখানা ও খামারে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যাটা নাটকীয়ভাবে কমেছে। একই সঙ্গে,  ‘পেশাদার, ব্যবস্থাপনাসম্পর্কিত, করণিক, বিক্রয় ও সেবাখাতে কর্মীর সংখ্যা বেড়ে তিনগুন হয়েছে।  অন্য কথায় উৎপাদনশীল চাকরি, ধারণানুযায়ী, কমে এসেছে ( এমনকি আপনি বিশ্বজুড়ে শিল্পকারখানায় শ্রমিকের সংখ্যাটা, যেমন ভারত ও চীনের দুর্বিষহ অবস্থার শ্রমিকদের  কথাও বিবেচনায় নেন, শ্রমিকের সংখ্যার হারটা বিশ্বের জনসংখ্যার অত বড় অংশ না যতটা হওয়ার কথা ছিল)

কর্মঘন্টা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেলে  বিশ্বের মুক্ত জনগন তাদের নিজের কাজ, আনন্দ ও আইডিয়াগুলো ও ভিশন  বাস্তবায়নের সুযোগ পেত। আমরা দেখেছি ‘সেবা’ খাত ও প্রশাসন খাতের ব্যাপক স্ফীতি এবং সম্পূর্ণ নতুন ইন্ডাস্ট্রি যেমন অর্থসেবা ও টেলিমার্কেটিং-এর সৃষ্টি কিংবা কর্পোরেট আইন, বিদ্যায়তনিক (একাডেমিক) ও স্বাস্থ্য প্রশাসন, মানবসম্পদ (হিউম্যান রিসোর্স) ও জনসম্পর্ক (পাবলিক রিলেশান্স)- এর মতো সেক্টরের অভূতপূর্ব বিস্তৃতি।

এই ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে যেই সমস্ত লোক প্রশাসনিক, কারিগরি কিংবা নিরাপত্তা সহায়তার মতো কাজে শ্রম দেয়, সংখ্যাটা তাদেরকেও প্রতিফলিত করে না। সহায়ক (এ্যানসিলারি) ইন্ডাস্ট্রির দল (ডগ-ওয়াশার, অলনাইট পিৎজা ডেলিভারিম্যান) টিকেই আছে কেবল হয়তো এই কারণেই যে প্রত্যেকে খুব বেশি সময় সময় অন্য কাজে ব্যয় করছে।

এইগুলাকে আমি ‘বুলশিট জব’ বলতে প্রস্তাব করি।

ব্যাপারটা এমন যেন, কেউ অর্থহীন চাকরি সৃষ্টি করে যাচ্ছে শুধু মাত্র আমাদেরকে কাজে ব্যস্ত রাখতেই। এইখানেই রহস্য লুকিয়ে। পুঁজিবাদে ধরাই হয় এটা কখনো ঘটবে না (চলবে চাহিদা ও যোগানের, প্রতিযোগিতামূলক বাজারের সাপেক্ষে – অনুবাদক)।  সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোর মতো পুরনো অকার্যকরী রাষ্ট্রে, যেখানে চাকরিকে বিবেচনা করা হতো অধিকার ও পবিত্র কর্তব্য, সিস্টেম যত দরকার তত চাকরি/পদ সৃষ্টি করতো ( যেকারণে সোভিয়েত ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোতে একটা মাংসের প্যাকেট বেচতে তিনজন কেরানি লাগত।) অথচ, এই একই ধরনের ঝামেলাই বাজার অর্থনীতিকে মেটাতে হচ্ছে।

অর্থনীতির তত্ত্বানুযায়ী, অন্তত, মুনাফা-লোভী কোনো ফার্ম সর্বশেষ যা করার কথা ভাবতে পারে তাহলো,  অপ্রয়োজনে কর্মীদের নিয়োগ করা। তবু যেভাবেই হোক, এটাই ঘটছে।

কর্পোরেশনগুলো যেখানে, প্রকৃতপক্ষে যারা সবকিছু বানাচ্ছে, পরিবহন, মেরামত ও দেখাশোনা করছে, সেই শ্রেণির লোকদেরই ছাটাই, কর্মবিরতিতে পাঠাচ্ছে নির্বিকারভাবে, বেতনভুক্ত নথি-ঠেলাদের সংখ্যাটা আকারে বেড়েই চলেছে, প্রচুর সংখ্যক চাকরিজীবী, সোভিয়েতের চাকুরিজীবীদের মতো সাপ্তাহিক ৪০-৫০ ঘন্টা কাগুজে কর্ম করে নয় বরং কার্যকরভাবে কেইন্সের প্রেডিকশন মতোই সাপ্তাহিক ১৫ ঘন্টা কাজ করে যাচ্ছে, যেহেতু বাকি সময় তারা ব্যয় করছেন,  মোটিভেশনাল (প্রেষণামূলক) সেমিনার সংগঠিত করা আর অংশগ্রহণ করায়, ফেইসবুক প্রোফাইল হালনাগাদ করা কিংবা টিভি সিরিজ ডাউনলোড করায়।

উত্তরটা অর্থনৈতিক না, নৈতিক ও রাজনৈতিক। শাসক শ্রেণি বুঝে গেছে যে,  সুখী ও উৎপাদনশীল কোনো জনগোষ্ঠী যাদের হাতে অবসর সময় থাকে, খুবই বিপজ্জনক জিনিস (ভাবেন, কী ঘটতে পারে? ষাটের দশকে কিছুমাত্রায় এই জিনিস শুরু হয়েছিল*)। অন্যদিকে, কাজ যে একটা নৈতিক ব্যাপার এই বোধ এবং যে নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্রে নিজেকে শ্রম ও নিষ্ঠার সাথে সমর্পিত করে নাই সে কোনো কিছুর যোগ্য না, এইরকম বোধ খুবই সঙ্গতিপূর্ণ।

ব্রিটিশ একাডেমিকগুলোতে প্রশাসনিক কাজের আপাত অন্তহীন বৃদ্ধি দেখে আমি দোজখের সম্ভাব্য একটা চেহারা কল্পনা করতে পেরেছিলাম। দোজখ হলো সেইসব ব্যক্তির একটা সমাবেশ যারা তাদের প্রভূত পরিমাণ সময় ব্যয় করছে এমন কাজে যা তারা করতেও চায় না, ভালোমতো পারেও না। তারা বলে, তাদেরকে নিয়োগ করা হয়েছে কারণ আসবাবপত্র নির্মানে তারা অসাধারণ এবং অবাক হয়ে আবিষ্কার করে অধিকাংশ সময় তাদের ব্যয় হচ্ছে মাছ ভেজে।  এমনকি এই কাজটাও খুব বেশি দরকার নাই করার, অন্তত, ভাজা মাছের চাহিদাও অল্প। অধিকন্তু, বিরক্তির সাথে তারা এমন ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল যে, তাদের কর্মীদের কেউ কেউ আসবাবপত্র বানাতেই বেশি সময় ব্যয় করছে এবং তারা মাছ-ভাজার দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করছে না। কর্মশালায় তাদের সামনে রয়েছে আধা-ভাজা ভাঁজা মাছের স্তূপ।

আমার মতে, আমাদের অর্থনীতির নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির এইটা একটা নির্ভুল বর্ণনা।

জানি, এইরকম আর্গুমেন্ট তাৎক্ষণিকভাবে কিরকম বিরোধিতার সম্মুখীন হতে পারেঃ  কোন জবটা ‘দরকারী’ সেইটা বলার আপনি কে? দরকারী জিনিসটাই বা কী? আপনি একজন নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক , এইটার ‘দরকার’ই বা কী? (প্রকৃতপক্ষে, অগণন ট্যাবলয়েড পাঠক, আমার চাকরিকে বেহুদা সামাজিক ব্যয়ের নমুনা হিসেবেই ধরে নেবে)। একদিক দিয়ে এটা নিশ্চয়ই সত্যি। সামাজিক মুল্যবোধের নিরপেক্ষ (অবজেক্টিভ) কোনো মাপকাঠি নাই।

আমি তাদেরকে কিছু বলার ধৃষ্টতা দেখাবো না, যারা নিজেদের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসী যে তারা পৃথিবীতে অর্থপূর্ণ অবদান রাখছেন, কিন্তু বাস্তবে তা নন। কিন্তু যারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, যে তাদের জব অর্থহীন, তাদের ব্যাপারে কী বলবেন?   কিছুদিন আগে আমার স্কুলের এক বন্ধুর সংস্পর্শে আসি  ১২ বছর বয়স থেকে যার সাথে সাক্ষাৎ ছিল। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, ইতিমধ্যে সে প্রথমত একজন কবি এবং ইন্ডি রক ব্যান্ডের প্রধান ব্যক্তি।  তার কিছু গান রেডিয়োতে শুনেছি যদিও সামান্যতম ধারনা ছিল না যে একে আমি চিনতাম। অবশ্যই সে অসাধারণ, ইনোভেটিভ এবং তার সৃষ্টিকর্ম নিঃসন্দেহে বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষের জীবনকে উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ করেছে  তবু, কয়েকটা অ্যালবামের ব্যর্থ চেষ্টার পর, সে চুক্তি হারাল, সদ্যজাত কন্যাসন্তান ও ঋণের কারণে, শেষপর্যন্ত, তার ভাষায়, ‘অসংখ্য দিশাহীন লোকের মতো, ডিফল্ট চয়েস হিসেবে, আইনের স্কুল বেছে নিতে বাধ্য হই’।

এখন সে নিউইয়র্কের নামী এক প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন। স্বীকার করা ব্যক্তিদের মধ্যে সে প্রথম  যারা বিশ্বাস করে, তাদের চাকরি পুরাই অর্থহীন, পৃথিবীতে যার কোনো দরকার নাই, এবং তার নিজের মত হলো, এই চাকরির অস্তিত্বই থাকা উচিৎ না।

অনেক প্রশ্ন এখানে তোলা যায়। এই যে আমাদের সমাজ মেধাবী কবি-সংগীতশিল্পীদের চাহিদা খুবই অল্প উৎপাদন করে, অথচ কর্পোরেট আইন বিশেষজ্ঞের আপাত অসীম চাহিদা তৈরি করে,  এর অর্থ কী?  ( উত্তরঃ যদি ১% লোক ডিসপোজাবল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে, যাকে আমরা ‘বাজার’ বলি, – নিয়ন্ত্রণ কর্তারা যাকে দরকারী বা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে ‘বাজার’-এ তারই  প্রতিফলন ঘটে,  অন্য কারও নয়।)  অধিকন্তু, এটা আরও দেখায় যে এই চাকরিগুলোর অধিকাংশ লোক এ বিষয়ে সচেতন।  প্রকৃতপক্ষে আমি এমন একজন কর্পোরেট আইনজীবীকেও দেখি নাই যে যারা তাদের চাকরিকে বুলশিট মনে করে না। উপরে উল্লিখিত সমস্ত ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বেতনভুক পেশাদারীর এমন বিশাল শ্রেণি আছে, যাদেরকে পার্টিতে দেখা হলে যদি আপনি স্বীকার করে বসেন যে আপনি এমন কিছু করেন যাকে ইন্টারেস্টিং বলে বিবেচনা করা যায় ( উদাহরণস্বরূপ, একজন নৃবিজ্ঞানী), তারা এমনকি তাদের কাজকর্মের ধরণ নিয়ে আলাপেও যেতে চাইবে না। তাদেরকে পানীয় দিন, তাদের চাকরির অর্থহীনতা ও অসারতা নিয়ে লম্বা বক্তৃতা আরম্ভ করবে।

এ এক গভীরতর  মানসিক সহিংসতা। কেমন করে কোনো ব্যক্তির পক্ষে শ্রমের মর্যাদার কথা বলা সম্ভব যেখানে গোপনে সে  বিশ্বাস করে তার চাকরিটার দরকার নাই? ক্ষোভ ও অসন্তষ্টির বোধ  বোধ না তৈরি করে থাকে কীভাবে? তবু আমাদের সমাজের এমনই অদ্ভুত প্রতিভা যে শাসকেরা একটা রাস্তা ঠিকই বের করেছে, মাছ-ভাজায় দায়িত্বরত লোকগুলোর মতো, যা নিশ্চিত করে ক্রোধটা তাদের প্রতি লালন করা হয়, যারা প্রকৃতপক্ষে কাজের কাজ করছে।

যেমন, আমাদের সমাজের সাধারণ নিয়ম হলো,  নিশ্চিতভাবে যাদের কাজকর্ম অন্য লোকজনের উপকারে আসে, তাদেরকেই সবচে কম পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। আবারও, নিরপেক্ষ মানদন্ড খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু সহজ একটা উপায় হতে পারে এই প্রশ্ন করা যে, এই কম পারিশ্রমিক পাওয়া শ্রেণিটা উধাও হয়ে গেলে কী ঘটবে?  মনে করেন, সেবিকা, আবর্জনা সংগ্রাহক, অথবা মেকানিক, ধরেই নেওয়া হচ্ছে তারা ধোয়ায় মিলিয়ে গেল। ফলাফল হবে তাৎক্ষণিক বিপর্যয়।  শিক্ষক বা খালাসি ছাড়া পৃথিবী বেশ ঝামেলাতেই পড়বে, এমনকি একজন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখক বা সংগীতজ্ঞ ছাড়াও দুনিয়া কিছুটা হলেও অস্বস্তির জায়গা হয়ে পড়বে। এটা সম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়, সমস্ত লবিস্ট, প্রাইভেট ইকুয়িটি সিইও, পিআর গবেষক, এ্যাকচুয়ারিস, টেলিমার্কেটারস, নাজির কিংবা লিগাল উপদেষ্টারা উধাও হয়ে গেলে মানবতার কতটা ক্ষতি হবে। (অনেকের সন্দেহ বরং ব্যাপক উন্নতিই হবে)। তবু, হাতে গোনা কয়েকটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে, নিয়মটা আশ্চর্যরকম নির্ভুল।

Related image
প্রবন্ধটা থেকে উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন অনেক এক্টিভিস্ট তাদের এক্টিভিজমে। ছবিটা লন্ডনের একটা টিউবে সাঁটা পোস্টারের

আরও পার্ভার্স ব্যাপার হলো, এরকম একটা বোধের লালন করা যে, এইরকমই হওয়া উচিৎ। ডানপন্থী পপুলিজমের গোপন শক্তির একটা জায়গা এটা। ব্যাপারটা বোঝা যায় যখন ট্যাবলয়েডগুলা টিউব-ওয়ার্কারদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ছড়ায় এই বলে যে, এঁরা ‘চুক্তি নিয়ে গণ্ডগোলের’ সময় লন্ডনকে অচল করে দিচ্ছে। টিউব-ওয়ার্কাররা লন্ডনকে অচল করে দিতে পারে স্বয়ং এই ঘটনাই প্রমাণ করে তাদের কাজ আসলেই দরকারী, অথচ অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এই ব্যাপারটাই মানুষকে বিরক্ত করে। যুক্তরাষ্ট্রে এইটা আরও পরিষ্কার যেখানে, অনুমিতভাবে উচ্চ পারিশ্রমিক ও সুযোগসুবিধার ধুয়ো তুলে, স্কুলশিক্ষক বা  অটো ড্রাইভারদের দিকে এই ক্রোধকে চালনা করতে রিপাবলিকানরা লক্ষনীয়ভাবে সফল, (এবং বিশেষ ইঙ্গিতপূর্ণ, স্কুল প্রশাসক কিংবা অটো ইন্ডাসট্রির প্রশাসকদের বিরুদ্ধে কিন্তু নয়, যারা প্রকৃতপক্ষে সমস্যার মূল। ) এ যেন ঠারে ঠারে তাদের বলা হচ্ছে, ‘ কিন্তু আপনাকে তো বাচ্চাদের পড়াইতে হবে! অথবা গাড়ি নির্মান করতে হবে।  চাকরি করা লাগবে আপনার!  তার উপর আবার মিডলক্লাস  পেনশন আর হেলথকেয়ার প্রত্যাশার করার সাহস করেন ক্যামনে?’

কাউকে কর্মবিশ্বের একটা নক্সা যদি  করতে হতো,   ফাইনান্স ক্যাপিটালের ক্ষমতার সাথে যার খাপে খাপ হয়, এটা বোঝা কঠিন, যে এর চেয়ে ভালো জব তাদের পক্ষে বানানো কীভাবে সম্ভব হতো? আসল উৎপাদনশীল কর্মীদের প্রতিনিয়ত নিংড়ানো ও শোষন করা হয়। বাকিদের দুইভাবে বিভক্ত করা হয়েছেঃ একভাগে সন্ত্রস্থ স্তরের – বিশ্বজুড়ে অভিশপ্ত – কর্মহীন আর আরেক ভাগে  আদতে কিছু না করেই বেতন পায়,  নির্ধারিত বিভিন্ন পদে আসীন যারা নিজেদেরকে শনাক্ত করে শাসকশ্রেণির মতাদর্শ ও কান্ডজ্ঞানের সাথে  (ম্যানেজার, প্রশাসক ইত্যাদি) – ও বিশেষত অর্থনৈতিক অবতারদের সাথে এবং একই সাথে তীব্র ক্ষোভ পোষন করে তাদের প্রতি যাদের কাজের পরিষ্কার ও অবশ্যস্বীকার্য সামাজিক মূল্য আছে। সুস্পষ্টভাবে, এই ব্যবস্থার নকশা কখনোই সচেতনভাবে করা হয় নাই। প্রায় এক শতাব্দীর ট্রায়াল এন্ড এররের ভেতর দিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সত্ত্বেও   আমরা যে দৈনিক ৩-৪ ঘন্টার কাজ করছি না, এটাই তার একমাত্র ব্যাখ্যা।

* ষাটের দশকে বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বিট জেনারেশনের মত মুভমেন্টের দিকে ইশারা দিচ্ছেন গ্রেবার।

 

[লেখক পরিচিতিঃ

ডেভিড গ্রেবার লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকস (এলএসই)-এর নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক। জন্ম এ্যামেরিকায়। বর্তমান বিশ্বের উল্লেখযোগ্য এনার্কিস্ট চিন্তক ও একটিভিস্টদের একজন। নিওলিবারেল মার্কেট আইডিওলজির একজন ক্রিটিক হিসাবে তার পরিচিতি আছে।  জাস্টিস মুভমেন্ট, ডিরেক্ট এ্যাকশন আন্দোলন, অকুপাই ওয়ালস্ট্রিটসহ বিভিন্ন আন্দোলনে তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিলো। ‘আমরাই ৯৯%’ শ্লোগানের প্রণেতা হিসেবেও তাকে অনেকে চিহ্নিত করেন যদিও  গ্রেবার একে যৌথ অবদান বলতেই স্বচ্ছন্দ্যবোধ করেন। গ্রেবারের অর্থনীতি ও নৃবিজ্ঞানের বই, ‘ডেটঃ ফার্স্ট ৫০০০ ইয়ার্স’  পশ্চিমের চিন্তা জগতে হৈচৈ ফেলে দেয়। এছাড়া ফ্র্যাগমেন্টস অফ এ্যান এনার্কিস্ট এন্থ্রোপলজি, রেভোলুশন ইন রিভার্স  তার ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য বই।

 

লেখাটার বিষয়ে প্রাসঙ্গিক তথ্যঃ

‘অন দ্য ফেনমেনন অফ বুলশিট জবসঃ এ ওয়ার্ক র‍্যান্ট’ নামে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট একটা অখ্যাত র‍্যাডিকেল ম্যাগাজিন ‘স্ট্রাইক!’-এ প্রকাশের পরপরই লেখাটা ভাইরাল হয়। ইনফ্যাক্ট রিপিটেডলি লাখো ভিজিটরের চাপে ম্যাগাজিনের ওয়েবসাইট ক্রাশ করে, অজস্র পত্রপত্রিকা, ব্লগ লেখাটা রিপ্রিন্ট করে, লেখাটার প্রতিক্রিয়া ছাপায়। প্রকাশের ২ সপ্তার মধ্যে এশিয়া ও ইয়োরোপের প্রধান ভাষাগুলিতে অনূদিত হয়। লণ্ডনের রাস্তায়, দেয়ালে একটিভিস্টরা লেখাটা থেকে উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন।

এইবছর কয়েকদিন আগে প্রকাশিত হয়েছে তার সর্বশেষ বই ‘বুলশিট জবসঃ এ থিয়োরি’, বইটার জন্ম মূলত এই লেখাটা থেকেই।]

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ফেইসবুক কমেন্ট
Avatar
কে এম রাকিব

Share a little biographical information to fill out your profile. This may be shown publicly.

No Comments Yet

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: