fbpx

অপু ট্রিলজি রিস্টোরেশন

১৯৯২ সালের ৬৪ তম অস্কারে সম্মানসূচক একাডেমি অ্যাওয়ার্ড দেবার সময় খুবই সম্মানের সঙ্গে সত্যজিত রায়ের নাম বলা হল। বিষয়টা উপস্থাপন করলেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্ন। ভিডিও ক্লিপে দেখা গেল কলকাতার হাসপাতালে বয়সের কাছে পরাজিত এক সত্যজিত কে। একাডেমি কর্তৃপক্ষ আর আমেরিকান ফিল্ম ইন্সটিটিউট তখন আরেকটি সিদ্ধান্ত নিল। প্রায় অকেজো হয়ে পড়া সত্যজিত রায়ের সকল সিনেমা সংরক্ষণ করতে হবে। বিশেষভাবে উচ্চারিত হল ‘অপু ট্রিলজি’-র কথা। সেই সিদ্ধান্তের পালে হাওয়া দিলেন মার্টিন স্করসেজি, স্টিভেন স্পিলবার্গ, ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার মত সিনেমা জগতে প্রভাবশালী সত্যজিত ভক্তরা।

সত্যজিত রায়কে সম্মানসূচক একাডেমি অ্যাওয়ার্ড উপস্থাপনায় অড্রে হেপবার্ন।

১৯৫৫ সালের ৩রা মে নিউ ইয়র্কের Museum of Modern Art এ মিউজিয়ামের কিউরেটর মনরো হুইলারের তত্বাবধানে প্রিমিয়ার হয়েছিল সাবটাইটেল ছাড়া ‘পথের পাঁচালী’-র। সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেবার ২৩ বছর পর এবং নিউ ইয়র্ক প্রিমিয়ারের ঠিক ৬০ বছর পর (৪ঠা মে, ২০১৫) ওই Museum of Modern Art এ-ই আবার দেখানো হল ‘পথের পাঁচালী’। সঙ্গে ট্রিলজির বাকি দুই সিনেমা (অপরাজিত, অপুর সংসার)। কিন্তু এবার শুধু সাবটাইটেলসহ নয়, 4K রিজ্যুলেশনের অনবদ্য আর অভূতপূর্ব এক ‘অপু ট্রিলজি’।

সিনেমা তিনটির মাহাত্ম্য নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়ে গেছে। কিন্তু এই এতগুলো বছর ‘অপু ট্রিলজি’ কি সব ঘটনার সাক্ষী হয়ে আজকের এই রূপ পেল সেই ঘটনাপ্রবাহ নিয়েই এই নিবন্ধ।

লন্ডনের ল্যাবরেটরিতে বিস্ফোরন:

লস অ্যাঞ্জেলেস এ থাকা ট্রিলজির নেগেটিভ রিলগুলো রিস্টোরেশনের জন্য পাঠানো হল লন্ডনের ‘দ্য হেন্ডারসন ফিল্ম ল্যাব’ এ। কিন্তু অপুর ট্র্যাজেডির চেয়েও ভয়াবহ ট্র্যাজেডি জুটল নেগেটিভের কপালে। রাসায়নিক বিস্ফোরণে পুড়ে নষ্ট হয়ে গেল প্রত্যেকটা নেগেটিভের বাক্স। নেগেটিভগুলোর অবস্থা এমনিতেই ছিল বেহাল, তার উপর বিস্ফোরণে পুড়ে গিয়ে পড়ে রইল কেবল দগ্ধ ফিতার কিছু স্তুপ।

‘দ্য হেন্ডারসন ফিল্ম ল্যাব’, লন্ডন, ইংল্যান্ড।

পিটার বেকার-এর বিশ্বাস ও ব্যর্থতা:

সবাই যখন নেগেটিভের করুণ পরিণতি দেখে হাল ছেড়ে দিল, ক্রাইটেরিওন কালেকশন এর সিইও (বর্তমানে প্রেসিডেন্ট) পিটার বেকার উঁচু গলায় ঘোষণা দিলেন, ‘সম্ভব’। পরে এক ডকুমেন্টারিতে তিনি এই বিষয়ে বলেছিলেন, “Sometimes not throwing something away is the most heroic thing you can do.” সত্যজিত এর একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত হিসেবে তিনি সংরক্ষণের চিন্তা বাদ দিলেন না। তার ভাবনায়, “এই রিলগুলো ঐসব অভিনেতা অভিনেত্রীদের সামনে রেখে প্রবাহিত হয়েছিল, এবং স্বয়ং সত্যজিত রায় এগুলো নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এগুলো সংরক্ষণ করতেই হত”।

পুড়ে যাওয়া নেগেটিভ।

 

কিন্তু কারা পারত এই পুড়ে যাওয়া নেগেটিভ নতুন করে ফ্রেম বাই ফ্রেম পুনরুদ্ধার করতে ? ফুজি কিংবা কোডাক এর মত বিশ্বসেরা কোম্পানিগুলোও হাল ধরার সাহস পেলনা। পিটার বেকারের বিশ্বাস উন্নত প্রযুক্তির অভাবে আলোর মুখ দেখল না। নেগেটিভগুলো ফেরত আনা হল লস অ্যাঞ্জেলেস এ। সেখানে ক্রাইটেরিওন কালেকশনের শেলফে নেগেটিভগুলো পড়ে রইল আরো ২০ বছর।

 

নতুন উদ্যম:

নতুন প্রযুক্তি আর সফটওয়্যারের উদ্ভাবনের সাথে সাথে আশার আলো উঁকি দিতে লাগল ক্রাইটেরিওন এর টেকনিক্যাল ডিরেক্টর লি ক্লাইন এর মনে। অন্য আরেকটি প্রজেক্টের কাজ করতে গিয়ে নামিয়ে আনেন অপু টিলজির নেগেটিভগুলো।

 

২০ বছর পর নামিয়ে আনা নেগেটিভ।

সেখানে ছিল পথের পাঁচালী’র ৯ টি রিল, অপরাজিত’র ১৩ টি রিল আর অপুর সংসারের মাত্র দুইটি রিল। তার টেকনিশিয়ান দের দিয়ে সেইসব দগ্ধ রিল কম্পিউটারে স্ক্যান করালেন। ভঙ্গুর আর পোড়া সেইসব রিলের Sectional Scan করার পর আবছা কিছু ছবি পাওয়া গেল। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল ক্রাইটেরিওনের অফিসে। সেই সময়টার কথা লি ক্লাইন এক সাক্ষাতকারে এভাবে বর্ণনা করেন,

 

“We decided scan a section to see what the image quality was like, and when we did that, lo and behold, there was actually an image in there, one that was pretty good. We all got very excited, because it seemed like negatives that had been burned in a fire could be brought back to life and used for something.”

 

নেগেটিভের ইতালি ভ্রমণ:

ক্রাইটেরিওন কালেকশন সিনেমা রিস্টোরেশনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশের ল্যাবরেটরির সহায়তা নেয়। এসব ল্যাবরেটরির মধ্যে অন্যতম কার্যকরী এবং আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ইতালির বলঈনা (Bologna) তে অবস্থিত লি’ইমাজিন রিত্রোভাতা (L’Immagine Ritrovata) কে ‘অপু ট্রিলজি’-র রিস্টোরেশনের কাজটা অফার করা হল। তারা নেগেটিভের পুড়ে যাবার ব্যাপারটা জানত। রিত্রোভাতা-র অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানরা একটা ঝুঁকি নিতে রাজি হলেন। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে নেগেটিভগুলো চলে এল ইতালির বলঈনা-তে।

 

লি’ইমাজিন রিত্রোভাতা, বলঈনা, ইতালি।

 

কিন্তু এটি কোন টিপিক্যাল রিস্টোরেশন প্রক্রিয়া ছিল না। অন্যান্য সিনেমার ক্ষেত্রে অরিজিনাল নেগেটিভগুলো স্ক্যান করে ফ্রেম বাই ফ্রেম রিস্টোর করা হয়। ‘অপু ট্রিলজি’র ক্ষেত্রে পুড়ে গিয়ে গায়ে গায়ে লেগে থাকা রিলগুলো আলাদা করে ছাড়িয়ে আনার জন্য প্রথমে রিহাইড্রেট করা হল। এরপর পুরো নেগেটিভের ক্ষতিগ্রস্থ পার্ফোরেশনগুলো (ফিল্মের দুইদিকের ছিদ্রসমূহ) একটা একটা করে কেটে ফেলে দিয়ে স্ক্যানারের ‘পিন রেজিস্টার্ড গেইট’ এর মধ্যে দিয়ে চালানোর জন্য নতুন পার্ফোরেশন লাগানো হল। কাজগুলো করা হল হাতে হাতে, ফ্রেম বাই ফ্রেম, পার্ফোরেশন বাই পার্ফোরেশন। সত্যজিত রায় যেভাবে সম্পাদনা করিয়েছিলেন, অর্থাৎ যেসব জায়গায় ফিল্মগুলো কেটে জোড়া লাগিয়েছিলেন, ঠিক সেইভাবে নতুন করে আবার জোড়া লাগানো হল। এইভাবে দিনের পর দিন ল্যাবরেটরির ‘প্রায় অন্ধকার’ পরিবেশে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ডিজিটাল রিস্টোরেশনের জন্য প্রস্তুত করা হল নেগেটিভগুলোকে।

 

পার্ফোরেশন বাই পার্ফোরেশন পুনঃসংস্থাপন।

 

ডিজিটাল রিস্টোরেশন:

ডিজিটাল রিস্টোরেশনের মূল কাজ শুরু হল এই পর্যায় থেকে। ইতোমধ্যে লেজার স্ক্যানিং এর জন্য নেগেটিভগুলো প্রস্তুত হয়ে গেছে। দগ্ধ হওয়া নেগেটিভগুলো তখনও ছিল অস্থিতিশীল, দাগ আর ময়লাযুক্ত। চলমান অবস্থায় সেগুলো খুবই এবড়ো-খেবড়ো ভাবে ছুটত। সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্ক্যান করা ফ্রেমের প্রতিটি পিক্সেল খুটিয়ে পরীক্ষা করে, নতুন করে একটি একটি করে ফ্রেম রিস্টোর করা হতে লাগল। অডিও রিস্টোর করা হল ফিল্টারিং আর ‘অপু ট্রিলজি’র অন্যান্য উৎস থেকে উঠিয়ে এনে মিক্সিং এর মাধ্যমে। পিটার বেকার নিয়মিত কাজের তদারক করছিলেন। তার ভাষায়,

‘’The most important piece of restoration equipment is never the computer, it’s never the software we’re using. It’s the person who’s running the software, and it’s that person’s experience.’’

 

ফ্রেম বাই ফ্রেম ডিজিটাল রিস্টোরেশন

মূল নেগেটিভ এবং রিস্টোরেশনের পরে একই ফ্রেমের কোয়ালিটির পার্থক্য

 

নতুন এক অভিজ্ঞতা:

ক্রাইটেরিওন আর রিত্রোভাতা এই দুই প্রতিষ্ঠানই সংকল্পবদ্ধ ছিল এমন একটা প্রিন্ট বের করে আনার জন্য, যা কি না বদলে দেবে ‘অপু ট্রিলজি’ দেখার অভিজ্ঞতা। সিনেমা তিনটি রিলিজের সময় যেমন কোয়ালিটি ছিল, সেই তুলনায় আরো বেশি ঝকঝকে এবং আরো বেশি সুন্দর ‘ভিজ্যুয়াল এক্সপেরিয়েন্স’ দেবার উদ্দেশ্য নিয়েই রিস্টোরেশনের কাজ সম্পন্ন করল তারা। রিত্রোভাতার টেকনিশিয়ান লিন্ডার এর ভাষায়,

“Ray is known for his narratives, and is a very humanist filmmaker. But I think he is underappreciated as a visual storyteller. We’ve preserved these films at their full visual quality. The full impact of the images, not just the stories.”

 

রিস্টোরেশনের পর দর্শক পেয়েছে ‘অপু ট্রিলজি’র নতুন অভিজ্ঞতা।

 

কতগুলো মানুষের বিশ্বাস, উদ্যম আর দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এই ‘অপু ট্রিলজি’র 4K রিস্টোরেশন। নিউ ইয়র্কের Museum of Modern Art গ্যালারিতে বসে চলচ্চিত্র পরিচালক, সাংবাদিক এবং ক্রিটিকরা 4K রিজ্যুলেশনের ‘অপু ট্রিলজি’ নতুন করে দেখে বিস্ময় এবং মুগ্ধতা প্রকাশ করলেন। একই সাথে সাধারণ দর্শকেরা পেল 4K, ব্লুরে কিংবা ডিভিডি তে ‘অপু ট্রিলজি’ দেখার এক সুন্দর সুযোগ।

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: