fbpx

ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’: পর্ব ৩

কুবলাই খান খেয়াল করলেন যে, মার্কো পোলোর শহরগুলা একটা আরেকটার মতই, যেন এক শহর থেকে আরেক শহরে যাইতে জার্নি লাগে না, খালি উপাদানের পরিবর্তন লাগে। এখন, মার্কো পোলো যেসব শহরের বর্ণনা খানসাবরে দিছেন, তার প্রত্যেকটা থেকে মহাত্মা খানের দিল নিজেনিজেই সফর শুরু করলো, এবং সেই শহরের প্রত্যেকটা পার্ট খুইলা খুইলা তিনি এইটারে আরেকভাবে বানাইলেন, এর উপাদানগুলারে বদলায়ে দিয়া, স্থানচ্যুত কইরা, উল্টায়া দিয়া।

 

এদিকে মার্কো তার সফরের কাহিনী আবার বলা শুরু করলেন, বাট সম্রাট আর কিছু শুনতেছিলেন না।

 

কুবলাই মার্কোরে থামাইয়া বললেন: ‘এখন থেকে আমিই শহরগুলার বর্ণনা দেব আর তুমি খালি কইবা যে, শহরগুলা আছে কিনা আর আমি যেইভাবে কল্পনা করছি সেইভাবেই আছে কিনা। আধাচান্দের মতন এক উপসাগরের তীরে, সিরোকৌ ঝড়ের মুখে খোলা, এক সিঁড়ির শহরের ব্যাপারে তোমারে জিগেশ কইরা আমি শুরু করতেছি। এখন আমি এই শহরের কিছু আজিব জিনিশের লিস্ট দিতেছি: একটা কাচের পুকুর, দুর্গের মতন উঁচা কইরা বানানো, যেন পাবলিক সোয়ালো মাছের সাঁতার আর ওড়াউড়ি দেইখা তাদের কাছ থেকে জাইনা নিতে পারে ভবিষ্যতের কথা;  বাতাসের ভিতরে পাতা আর ছাল-বাকল দিয়া বীণা বাজানো একটা পাম গাছ; ঘোড়ার খুরের নালির মতন মার্বেল পাথর দিয়া বানানো টেবিলে ঘেরা একটা চত্বর, সেইখানে মার্বেল পাথরের টেবিলক্লথ, আর তার উপরে মার্বেল পাথরেরই খাবার-পানি।’

 

‘মহাত্মা, আপনের মন বিক্ষিপ্ত ছিল। এইটা হুবহু সেই শহরটাই, আপনে আমারে থামায়ে দেওয়ার সময় যেটার কথা আমি বলতেছিলাম।’

 

‘তুমি চেনো এই শহর? এইটা কই? নাম কী?’

 

‘এইটার কোন নাম নাই, নির্দিষ্ট টেরিটরিও নাই। এই শহরের কথা আপনারে বলার কারণটা আমি রিপিট করতেছি: কল্পনার শহরের সংখ্যা থিকা আমাদের অবশ্যই বাদ দেওয়া লাগবে সেই শহরগুলারে যেগুলার উপাদান কোনরকম যোগাযোগসূত্র, অন্দরের নিয়মকানুন, কোন পরিপ্রেক্ষিত বা কথোপকথন ছাড়াই গইড়া উঠছে। শহরগুলার ব্যাপার আসলে স্বপ্নের মতনই: কাল্পনিক যেকোন কিছুই স্বপ্নে দেখা যাইতে পারে, কিন্তু এমনকি সবচাইতে অপ্রত্যাশিত স্বপ্নটাও একটা রহস্য, যার ভিতরে লুকায়ে থাকে কোন খায়েশ, বা তার উলটা, কোন ভয়। স্বপ্নের মতনই, শহরও, খায়েশ আর ভয় দিয়া বানানো, যদিও তাগো কথাবার্তার সূত্রগুলা গোপন, তাগো নিয়মকানুন যুক্তিহীন, তাগো পরিপ্রেক্ষিতগুলা ধূর্ত, আর প্রত্যেক জিনিশের ভিতরই লুকায়ে থাকে অন্য আরেকটা কিছু।’

 

‘আমার কোন খাহেশ নাই, ভয়ও নাই’, খানসাব ঘোষণা দিলেন, ‘আর আমার স্বপ্নগুলা হয়তো আমার নিজের চিন্তা অথবা দৈব দিয়া বানানো।’

 

‘শহরগুলার বিশ্বাসও সেইরকম, তারা মন কিংবা দৈবের তৈরি কাজ, কিন্তু এই দুইটার কোনটাই সেইসব শহরের দেয়াল ধইরা রাখার পক্ষে যথেষ্ট না, একটা শহরের সাতটা বা সত্তুরটা আজিব জিনিশ আপনারে আনন্দ দেয় না, বরং আপনে আনন্দ পান আপনের কোন কোশ্চেনের জবাবে তার দেওয়া উত্তরে।’

 

‘অথবা আপনে আনন্দ পান সেই প্রশ্নে, যা এই শহর আপনারে করে, আর স্ফিংসের মুখ দিয়া থিবিসের (প্রাচীন গ্রিসের একটা শহর) মতন, যেই প্রশ্নের জবাব দিতে আপনেরে বাধ্য করে।’

~

 

 

শহর ও সাধ-৫

~

 

সেইখান থেকে, ছয় দিন সাত রাত চলার পরে, আপনে আইসা পড়বেন চাঁদের আলোয় ফকফকা ন্যাংটা শাদা শহর ‘যোবেইদে’-তে, যে শহরের রাস্তাগুলা সুতার জটের মতন একটা আরেকটার ভিতরে প্যাঁচগোছ লাগানো। লোকজন এই শহরের আবাদির গল্প কয় এইভাবেঃ ভিন্ন ভিন্ন জাতির কিছু লোক একবার একইরকম স্বপ্ন দেখলো। তারা দেখলো, রাতের অন্ধকারে এক নারী অচেনা এক শহরের রাস্তায় দৌঁড়াইতেছে; তার পেছন দিকটা দেখা যাইতেছে কেবল, লম্বা চুল, খালি গা। স্বপ্নে তারা সকলেই তার পিছনে দৌঁড়াইতে শুরু করল। বিভিন্ন মোড় ঘুইরা বাঁক নেওয়ার সময় একজন একজন কইরা তারে হারায়ে ফেলল। এই স্বপ্ন দেখার পরে তারা সবাই সেই শহর খুঁজতে বের হইল; সেই শহর তারা আর খুঁইজা পাইলো না, কিন্তু তাদের নিজেদের ভিতরে দেখা সাক্ষাত হয়া গেল, তারা স্বপনে পাওয়া সেই শহরের মতন একটা শহর বানানোর ডিসিশন নিলো। রাস্তার নকশা করার কালে সকলেই যার যার (ঐ মহিলারে) ধাওয়া করার রাস্তা ফলো করলো; যে যেই জায়গায় পলাইতে থাকা ওই মহিলার রাস্তার নিশানা হারায়ে ফেলছিল, সে সেইখানে স্বপ্নে দেখা নকশার চাইতে আলাদা কইরা জায়গা আর দেয়ালগুলিরে সাজাইলো, যাতে ওই মহিলা দ্বিতীয়বার আর পলাইতে না পারে।

 

এই হইলো ‘যোবেইদে’ শহর, কোন এক রাইতে আবার সেই স্বপ্নের দৃশ্যটা দেখার অপেক্ষায় তারা এইখানে থাইকা গেলো। ঘুমাইয়া বা জাইগা, তারা কেউই আর কখনোই ওই মহিলারে দেখে নাই। শহরের রাস্তাগুলা ছিল ওই রাস্তাগুলাতেই প্রতিদিন তারা কাজে যাইতো, কিন্তু স্বপ্নের সেই পিছু ধাওয়া করার লগে সেগুলার আর কোন সম্পর্কই তখন নাই। ফলে, সেই দৌড়ের কথা আর কারো মনে থাকলো না।

 

তারপর অন্যান্য জায়গা থিকা আরো বহু লোক সেই একইরকম স্বপ্ন দেইখা এইখানে আসলো, এই ‘যোবেইদে’ শহরে তারা তাগো স্বপ্নে দেখা রাস্তার কিছু কিছু অংশ চিনতে পারলো; তারা ওই পিছু ধাওয়া করা মহিলার পলায়া যাওয়া রাস্তার লগে আরো বেশি মিল রাখার জন্যে তোরণঢাকা রাস্তা আর সিঁড়িগুলার পজিশন বদলায়ে দিল, যাতে সে যেইখানে গিয়া উধাও হয়া গেছে ওইখানে পলানোর আর কোন রাস্তাই না থাকে।

 

এই শহরে প্রথম যে আসে, সে বুঝতেই পারে না, কিসের টানে এইসব লোক আসছিলো ‘যোবেইদে’তে, এই বিচ্ছিরি শহরে, এই ফাঁদে!

~

 

 

নগর ও নিশানি-৪

~

দূরদেশে একজন মুসাফি্রের ভাষার যেইসব চেঞ্জ ফেস করা লাগে, সেইসবের কোনটাই ‘হাইপেশিয়া’র পরিস্থিতির মত না, কারণ, পরিবর্তন এইখানে শব্দের হিশাবে না, বস্তুর হিশাবে। আমি ‘হাইপেশিয়া’য় ঢুকলাম এক সকালে; নীল লেগুনগুলায় ম্যাগনোলিয়া বাগানের ছায়া পইড়া আছে, আমি হাঁটতেছিলাম ঝোঁপঝাড়ের ভিতর দিয়া, নির্ঘাত ওইখানে সুন্দর সুন্দর যুবতী মাইয়াগো গোসল করার দৃশ্য আবিষ্কার করতাম, বাট, দেখলাম যে, পানির তলে কাঁকাড়াগুলা আত্মহত্যাকারীগো চোখ কামড়াইতেছে, তাগো গলায় পাথর ঝুলানো, চুলগুলা সামুদ্রিক শ্যাওলায় সবুজ।

 

লাগলো যে, আমার লগে চিটিং হইছে ব্যাপারটা, আমি সুলতানের কাছে বিচার চাব ঠিক করলাম। আমি সবচাইতে উঁচা গম্বুজওয়ালা প্রাসাদটার পরফিরি পাথরের সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠলাম, ঝরনাওয়ালা ছয়টা টাইলসকরা উঠান পার হইলাম। মাঝখানের হলঘরটা লোহার গরাদ দিয়া আটকানো ছিলোঃ দেখলাম, পায়ে কালা শিকল পরা কয়েদিরা পাতালে খুইলা দেওয়া একটা খনি থিকা ব্যাসাল্ট পাথর টাইনা তুলতেছে।

 

আমি খালি দার্শনিকদেরই প্রশ্ন করতে পারতাম। লাইব্রেরিতে গিয়া ঢুকলাম; চামড়ার বাঁধাইয়ের তলে প্রায় ভাইঙা পড়তে থাকা শেলফগুলার ভিতরে আমি হারায়ে গেলাম, বিলুপ্ত বর্ণমালাগুলার বর্ণানুক্রম অনুসরণ কইরা গেলাম খালি, হলঘর, সিঁড়ি আর সেতুগুলার এইমাথা ওইমাথা চইষা ফেললাম। সবচাইতে দূরের প্যাপিরাসের ঘরটাতে, মেঘের মত ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলীর ভিতরে মাদুরে শোয়া, ঠোঁটে আফিমের পাইপ লাগানো এক কিশোরের হতবাক চোখ নজরে আসলো।

 

‘দরবেশ বাবা কই?’

 

পাইপটানা কিশোর জানলার দিকে দেখায়া দিলো। এইটা ছিলো নাইনপিন, দোলনা, লাটিম ইত্যাদি শিশুদের খেলনায় ভরা একটা বাগান।দার্শনিক লনে বইসা ছিলেন। উনি বইলা উঠলেনঃ ‘চিহ্ন দিয়াই ভাষার তৈয়ারি, কিন্তু যেই ভাষাটা তুমি ভাবতেছ যে জানো, ওইটা এমন না।’ বুঝলাম যে, যে জিনিশগুলা আমি খুঁজতাম সেইগুলার খবর আগে যেসব ইমেজের মাধ্যমে পাইতাম, ওইগুলা থেকে আমার মুক্ত হওয়া লাগবে, আর তখনই আমি ‘হাইপেশিয়া’র ভাষা বুঝতে পারব।

 

এখন আমার শোনার থাকলো খালি ঘোড়ার হ্রেষা ডাক, চাবুকের শপশপ আওয়াজ, আর আমারে ঘিরা ধরলো এক কামুক কম্পনঃ ‘হাইপেশিয়া’য় আস্তাবলে আর ঘোড়দৌড়ের রিঙয়ে আপনার যাইতেই হবে, ঘোড়ার জিনে পা-রাখা সুন্দরীগো দেখতে, তাগো থোড়া বে-আব্রু,

হাঁটুর নীচে বর্ম পরা, আর যখনই কোন বিদেশি জুয়ান তাদের দিকে আগায়ে যায়, তারা তারে ছুঁইড়া ফ্যালে খড়ের গাঁদা বা কাঠের গুঁড়ার স্তুপে আর তাগো শক্ত খাড়া নিপল চাইপা ধরে তার বুকে।

 

তারপর যখন আমার আত্মা গান ছাড়া আর অন্য কোন প্রেরণা বা পুষ্টি চায় না, আমি জানি তখন, এইটা খুঁজতে হবে গোরস্তানেঃ সংগীতশিল্পীরা লুকায়ে আছে সমাধিগুলায়; কবর থিকা কবরে কাঁপা কাঁপা সুরে বাজে বাঁশি, বীণার তার একটা আরেকটারে দেয় উত্তর।

 

এইটা সত্যই, ‘হাইপেশিয়া’তেও এমন দিন আসবে যখন আমার একমাত্র ইচ্ছা থাকবে এই শহর ছাইড়া চইলা যাওয়া। আমি জানি, সেইদিন আমি পোতাশ্রয়ের রাস্তায় অবশ্যই যাব না, বরং দুর্গের সবচাইতে উঁচা চূড়াটায় উইঠা সেইখান দিয়া কোন জাহাজ যাওয়ার অপেক্ষায় বইসা থাকব। কিন্তু এইখান দিয়া কোন জাহাজ কি যাবে? ভাষামাত্রই প্রতারণা।

~

রোগা শহর-৩

~

 

নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায়, কোন ভেলকিবাজির বলে বা খামখেয়ালির কারণেই ‘আর্মিলা’রে এমন লাগতেছে কিনা, জানি না আমি। আসল ঘটনা হইলো, এই শহরের না আছে দেয়াল, না আছে কোন সিলিং, না কোন ফ্লোর: এই শহরে এমন কিছুই নাই যার জন্য এইটারে একটা শহর মনে হইতে পারে, খালি আছে ঘরবাড়ির জায়গায় খাড়া হয়া উইঠা যাওয়া আর ফ্লোরের জায়গায় আড়াআড়ি বিছায়ে থাকা পানির পাইপ: এক দঙ্গল পাইপ, যেগুলা শেষ হইছে ট্যাপ, শাওয়ার, পানির নল আর ফোয়ারায়। মরার পরেও ডাল থেকে ঝুলতে থাকা ফলের মত একটা বেসিনের শাদা রঙ, কিংবা একটা বাথটাব অথবা অন্য কোন চীনামাটির সিরামিক আকাশের গায়ে লাইগা আছে। আপনের মনে হইতে পারে যে, পাইপ মেরামতকারীরা রাজমিস্ত্রি আসার আগেই তাদের কাজ শেষ কইরা চইলা গেছে; অথবা তাদের অবিনশ্বর হাইড্রলিক সিস্টেম কোন দুর্ঘটনা, ভূমিকম্প অথবা উইপোকার ক্ষয় থিকা বাঁইচা গেছে।

 

বসতি স্থাপনের আগে বা পরে পরিত্যক্ত আর্মিলারে জনশূন্য বলা যাবে না। যেকোন সময়, পাইপের ভিতরে চোখ তুইলা তাকাইলে আপনি হয়ত দেখতে পাবেন এক যুবতী মহিলারে, বা একদল যুবতীরে, স্লিম, খুব লম্বাও না, দেখবেন ওরা বাথটাবে শুইয়া আরাম করতেছে, বা শূন্যে ঝুলানো শাওয়ারের তলে পিঠ মোচড়াইতেছে, গা ধুইতেছে, শুকাইতেছে অথবা পারফিউম মাখতেছে, কিংবা আয়নার সামনে

দাঁড়াায়ে লম্বা চুল আঁচড়াইতেছে। শাওয়ার থিকা ছিটকায়ে আসা পানির ধারা, ট্যাপ দিয়া পড়তে থাকা পানির স্রোত, হঠাৎ কইরা তৈরি হওয়া বেগবান জলধারা, হালকা পানির ছিটা আর স্পঞ্জের সাবান-ফেনা দেখবেন, চকচক করতেছে সূর্যের আলোয়।

 

আমি শেষমেশ এই ব্যাখ্যা খাঁড়া করলাম: আর্মিলার পাইপগুলার ভিতর দিয়া বইতে থাকা পানির স্রোতগুলি মূলত বনপরী আর জলপরীদের দখলে থাইকা গেছে। মাটির তলের শিরা উপশিরার ভিতর দিয়া চলাচলে অভ্যস্ত হওয়ায় তাদের কাছে সোজাই লাগে এক নয়া জলের জগতে ঢোকা; অসংখ্য ঝরনা দিয়া প্রবল বেগে বাহির হওয়া; নয়া আয়না আর নয়া খেলা, জলকেলির নয়া নয়া উপায় আবিষ্কার করা। তাদের আক্রমণে হয়ত লোকেরা পালায়ে গেছে, কিংবা, পানির অপব্যবহারে অসন্তুষ্ট এই বনপরীদের  মন জুগাইতে ভক্তিমূলক ভেট হিশাবে মানুশ আর্মিলা বানাইছে। সেইটা যাই হোক, এখন তাদের, এই কুমারীদের, সন্তুষ্টই মন হয়: বেইন্যাকালে, আপনে শুনবেন ওরা গান গাইতেছে।

~

বেসাতির শহর-২

~

 

বিরাট শহর ‘ক্লো’র রাস্তায় যেসব লোক ঘুইরা বেড়ায় তারা সকলেই মুসাফির। দেখা হইলেই তারা একে অপররে নিয়া হাজাররকম কল্পনা করে; তাদের মাঝে যেইটাইপের দেখা-সাক্ষাত হইতে পারত, আলাপসালাপ, সারপ্রাইজ, চুমাচুমি, কামড়াকামড়ি—এইসব। কিন্তু তারা কেউ কাউরে শুভেচ্ছা বাক্যটাক্য কয় না; এক সেকেন্ডের জন্য চোখে চোখ পড়ে, পরেপরেই আরেক চক্ষুর খোঁজে সইরা যায় দৃষ্টি, থামে না কখনোই।

 

ঘাড়ের উপর ছোট একটা ছাতা নাড়তে নাড়তে, গোলগাল পাছা দুলাইয়া এক মাইয়া আসে। কালো কাপড়ে আসে এক মহিলা, তার বয়স তবুও পুরাপুরি বুঝা যায়, নেকাবের তলে চোখ তার চঞ্চল, ঠোঁট কাঁপতেছে। উল্কি-আঁকা এক দৈত্যাকার লোক আগায়ে আসে, আগায়ে আসে শাদাচুলের এক্টা জুয়ান পোলা, একটা বামুন মহিলা, প্রবালের কাপড় পরা জমজ দুইটা মাইয়া। কিছু একটা চলে ওদের ভিতরে, একটা চোখাচুখি—যেন কয়েকটা রেখা একটা ফিগাররে আরেকটার লগে যুক্ত কইরা আঁকতেছে ধনুক, তারা, ত্রিভূজ, আর ততক্ষণে এইসব কম্বিনেশন পুরান হইয়া গিয়া দৃশ্যে আসে নতুন সব চরিত্রঃ শিকলে বান্ধা চিতা নিয়া আসে এক অন্ধ লোক, উটপাখির পাখনা দিয়া বানানো পাখা হাতে এক বেশ্যা, এক তরুণ, একটা মোটা মহিলা। আর এইভাবেই, বৃষ্টি থিকা বাঁচতে কোন ছাউনির তলে আশ্রয় নেওয়ার সময়, বাজারের কোন শামিয়ানার তলে জটলা করতে করতে, চত্বরের মোড়ে গানবাজনা শুনতে থামার সময় যখন কিছু লোক নিজেগো একসাথে আবিষ্কার করে, তখন কোন শব্দ বিনিময়, আঙুল ধরাধরি ছাড়াই, এমনকি চোখ না তুইলাই প্রায়, ওদের ভিতরে ঘইটা যায় সাক্ষাত, ফুসলানি, যৌনমিলন, উন্মত্ত ড্রিংক আর সেক্সপার্টি।

 

একটা ইন্দ্রিয়সুখের কাঁপুনি শুদ্ধ শহর ‘ক্লো’রে অনবরত কাঁপাইতে থাকে। যদি নারী ও পুরুষ তাদের ক্ষণস্থায়ী খোয়াবের ভিতরে জীবনযাপন শুরু করতো, তাইলে প্রতিটা ছায়ামূর্তিই হইয়া উঠত এমন পূর্ণ ব্যক্তি যার লগে শুরু করা যাইত পিছু ধাওয়া, ছলনা, ভুল বোঝাবুঝি, সংঘর্ষ আর শোষণের খেলা, আর এই ফ্যান্টাশির হাউকাউ বন্ধ হইয়া যাইত।

~

নগর ও নয়ন-১

~

 

প্রাচীন লোকেরা ‘ভালদ্রাদা’ শহর বানাইছেন একটা লেকের ধারে, একটার উপর আরেকটা বারান্দা নিয়া যেইখানে দাঁড়ায়ে আছে সব বাড়িঘর, যেই শহরের উঁচা রাস্তাগুলার রেলিং দেওয়া প্রাচীরগুলা উৎসুক হইয়া তাকায়ে আছে পানির উপর। তাই মুসাফির সকল, এইখানে আইসা, দেখে দুই শহরঃ একটা খাঁড়া দাঁড়ায়ে আছে হ্রদের উপরে, আরেকটা উল্টায়ে আছে পানিতে ছায়া ফেলে। এক ভালদ্রাদায় যা আছে বা যা কিছুই ঘটে তার রিফ্লেকশন হয় অন্য ভালদ্রাদায়, কারণ শহরটা বানানোই হইছে এইভাবে যে, এর প্রত্যেকটা বিন্দুরই প্রতিফলন হয় বিপরীত আরশিতে; পানির নীচের ভালদ্রাদায় খালি যে লেকের উপরে দাঁড়ায়ে থাকা প্রাসাদ-সদরের খাঁজকাটা নকশা আর বের হয়া থাকা অংশই আছে তা না, বরং ফ্লোর আর সিলিংসহ রুমগুলার ভিতরের অংশ, হলঘরগুলার নানা এঙ্গেলের দৃশ্য আর ওয়ারড্রোবের আয়না—এইগুলাও আছে।

 

ভালদ্রাদার পাবলিক জানে যে, তাদের সমস্ত কাজ কারবার একইসাথে, ওই কাজটা, আবার ওই কাজের আয়নাবাজি দৃশ্যও; আয়নার সেই দৃশ্যে থাকে ইমেজগুলার একটা আলাদা সম্ভ্রান্ত ভাব, আর এই সচেতনতাই তাগো দৈব আর ভুইলা যাওয়ার সামনে নত হওয়া থেকে বাঁচায়ে দেয়। এমনকি চামড়ার লগে চামড়া ঘষতে ঘষতে, একজনরে আরেকজনের ভিতর সর্বোচ্চ সুখ দিতে পারে এইরকম পজিশন খুঁজতে খুঁজতে, প্রেমিক-প্রেমিকা যখন শরীর মোচরাইতে থাকে, এমনকি খুনীরা যখন গলার কালা শিরাগুলায় ছুরি  ঢুকায়ে দেয়, কণ্ডরার মধ্য দিয়া পিছলায়ে যাওয়া ব্লেডে যত জোরে তারা চাপ দেয় ততবেশি যখন বেরোয়ে আসে জমাটবাঁধা চাপ চাপ রক্ত, তখনও তাগো এই যৌনমিলন বা খুন আয়নার ফকফকা আর ঠাণ্ডা সেক্স বা খুনের প্রতিদৃশ্যের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।

 

মাঝে মাঝে এই আয়না কোন জিনিশের দাম বাড়ায়ে দেয়, আবার মাঝে মইধ্যে সেইটারে অস্বীকার কইরা কমায়ে দেয়। আরশিনগরের উপরে দামী দামী লাগা সব জিনিশই আরশিতে ঢুকলেই আর সেই শক্তি ধইরা রাখতে পারে না। এই যমজ দুই শহর আসলে এক না, কারণ ভালদ্রাদায় যা কিছু আছে বা যা যা ঘটে তার কিছুই প্রতিসম নাঃ প্রতিটা মুখ আর হাবভাবের জবাব আয়না থেকে দেওয়া হয়, উলটা এক মুখ আর হাবভাব দিয়া, যথাযথভাবে। এই দুই ভালদ্রাদা একজন আরেকজনের জন্যেই বাঁচে, তাদের চক্ষু পরস্পরের উপর নিবদ্ধ, কিন্তু তাদের ভিতরে কোন প্রেম নাই।

~

 

মহাত্মা খান সাব একটা শহর স্বপ্নে দেখছেন; মার্কো পোলোর কাছে সেইটার বর্ণনা তিনি দিতেছেন এইভাবে—

 

‘পোতাশ্রয়টা উত্তরমুখী, ছায়াঢাকা। বাঁধের মতো দেয়ালগুলার গায়ে আছড়াইয়া পড়তে থাকা কালা পানির উপরে উঁচা উঁচা ডক; সমুদ্রশ্যাওলায় পিছলা পাথরের পথ নাইমা গেছে নীচে। আলকাতরা লেপা নৌকাগুলান ঘাটে বান্ধা, পরিবারের কাছ থিকা বিদায় নিতে নিতে ঘাটে দেইরি কইরা ফেলা বিদায়ী যাত্রীগো জন্যে অপেক্ষা করতেছে। বিদায় দেওয়া-নেওয়া হইতেছে নীরব অশ্রুবর্ষণের ভিতর দিয়া। শীতকাল; সবাইর মাথায় শাল জড়ানো। মাঝির একটা ডাকে এই লম্বা বিদায়ে বাধা পড়ে; ঠেলাঠেলি কইরা নৌকার সামনের অংশে গিয়া দাঁড়ান যাত্রী, পিছনে থাইকা যাওয়া লোকজনের দিকে তাকায়ে তিনি চইলা যাইতে শুরু করেন; তীর থিকা তার আকার আকৃতি আর বুঝা যায় না; নোঙর ফেলা এক জাহাজের পাশে গিয়া নৌকা থামে; ছোট এক ছায়ামূর্তি রশির মই বাইয়া ওঠে, হারায়ে যায়; হোসপাইপের লগে ঘষা খাইতে খাইতে জংধরা শিকল টাইনা তোলার শব্দ শোনা যায়। পিছনে থাইকা যাওয়া পাবলিক জেটিতে পইড়া থাকা পাথরের স্তুপের উপর দিয়া তাকায়, পুরা অন্তরীপ একপাক দেওয়া ফিরা আসা নাই।’    পর্যন্ত তারা দেখতে থাকে জাহাজটারে; শ্যাশবারের মত তারা শাদা কাপড়ের টুকরাটা নাড়ে।

 

‘যাও, সবগুলা উপকূল তন্নতন্ন কইরা খোঁজ, এই শহরটা খুঁইজা বাইর করো’, গ্রেট খান মার্কোরে কইলেন। ‘তারপর আমারে আইসা কও যে, বাস্তব আমার স্বপ্নের লগে যায় কিনা।’ ‘হুজুর, মাফ করেন, সন্দেহ নাই, আইজ অথবা কাইল আমি সেই ডক থিকা পাল উড়ামু’, মার্কো কইলো, ‘কিন্তু এইটার ব্যাপারে ডিটেইল জানাইতে আমি আর ফিরা আসব না। শহরটা আছে, আর এইটার একটা ছোট সিক্রেটও আছেঃ এই শহরে খালি বিদায় আছে, ফেরা নাই।

 

আরও দেখেন

ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’ – ...   অধ্যায়ঃ এক  --------------- যাত্রাপথে দেখা শহরগুলার বর্ণনা যখন দেন মার্কো পোলো, তার সেই সকল আলাপই যে পুরাপুরি সত্য ভাইবা নিছিলেন ...
ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’- পর্ব ২...   'অন্য অন্য রাজদূতেরা আমারে দুর্ভিক্ষ, চাঁদাবাজি, নানামুখী ষড়যন্ত্র ইত্যাদি নিয়া সতর্ক করে; অথবা, নীলকান্তমণির খনি, বেজির চামড়ার লাভজনক দামের...
ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর: পর্ব ৪...   অধ্যায়-৪ ~ আম্বর দিয়া বানানো পাইপের গোড়ায় ঠোঁট চাইপা, নীলকান্তমণি হারের উপর লেপ্টে থাকা দাঁড়ি নিয়া, আর রেশমি স্লিপারের ভিতরে, উত্তেজনা...
ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’: পর্ব ৫... প্রাসাদের উঁচা রেলিং থিকা মহান খান সাহেব তার সাম্রাজ্যের বিস্তার দেখেন। প্রথমে দেখেন অধিকৃত অঞ্চলগুলারে মিলায়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বিস্তৃত সীমান্তরেখা, ক...
তুহিন খান
তুহিন খান

জন্ম ১৯৯৫। কবি ও অনুবাদক। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে অধ্যায়নরত।

error: