fbpx

ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’: পর্ব ৫

প্রাসাদের উঁচা রেলিং থিকা মহান খান সাহেব তার সাম্রাজ্যের বিস্তার দেখেন। প্রথমে দেখেন অধিকৃত অঞ্চলগুলারে মিলায়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বিস্তৃত সীমান্তরেখা, কিন্তু সৈন্যদলের অগ্রযাত্রার পথে সবসময় আইসা পড়ে আধামরা সব এলাকা, কুঁড়েঘর আর ঝোপঝাড়ময় গ্রামাঞ্চল, জলাভূমি, যেখানে ফসল হয় না, রোগা রোগা লোকজন, মরা নদী, নলখাগড়ার ঝোপ। ‘আমার সাম্রাজ্য বাইরের দিকে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়ায়ে পড়ছে’, খান সাহেব বলেন, ‘এখন সময় এর ভিতরে ভিতরে বাইরা ওঠার।’ কল্পনায় তিনি দেখতে থাকেন খোসা ফাইটা যাওয়া টসটসা ডালিমের বাগান, শিকের আগায় বাদামি হইতে থাকা, ফোঁটায় ফোঁটায় চর্বি ঝরতে থাকা ষাঁড়ের কাবাব, ঝকঝকা সোনার তাল নিয়া ভূমিধ্বসের জায়গায় ভাইসা ওঠা ধাতব রেখা।

এখন, বহুকালের প্রাচুর্যে সমস্ত শস্যের গোলা পরিপূর্ণ। মন্দির আর রাজপ্রাসাদের ব্রোঞ্জের ছাদে ঠেকনা দিতে বানভাসা নদী নিয়া আসছে অজস্র কড়িকাঠ। দাসদের ক্যারাভান সাম্রাজ্যের এমাথা থেকে ওমাথা টাইনা নিয়া গেছে সর্পিল পাথরের পাহাড়। মহাত্মা খান সাহেব ভাবতে থাকেন এমন এক সাম্রাজ্যের কথা, যা দুনিয়া আর দুনিয়ার মানুশের উপর চাইপা বসা বড় বড় শহরে ভর্তি, নানারকম সম্পদ আর যানবাহনে ঠাসা, অলঙ্কারাদি আর অফিস-টফিসে বোঝাই, বিভিন্ন ধরণের কলকব্জা আর শ্রেণীবিভক্তিতে জটিল, স্ফীত, উত্তেজিত, ক্লান্তিকর।

‘নিজের ভারেই সাম্রাজ্য চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়া যায়’, কুবলাই মনে মনে ভাবেন; আর তার স্বপ্নে ভাইসা ওঠে ঘুড়ির মতন উড়তে থাকা অসংখ্য শহর, ফিতার মতন অসংখ্য ছিদ্রওয়ালা শহর, মশারির জালের মত স্বচ্ছ শহর, পাতার শিরার মতন শহর, হাতের তালুর মতন দাগেভরা শহর, সোনা-রুপার কারুকাজ করা ঝালরের মতন শহর, যেগুলারে তাদের অস্বচ্ছতা ও কাল্পনিক ঘনত্ব ভেদ কইরা দেখা লাগে।

‘গেল রাতে আমি কী স্বপ্নে দেখছি, তোমারে বলি’, তিনি মার্কোরে বললেন। ‘উল্কাপিণ্ড আর ইতস্তত বড় বড় পাথর পইড়া থাকা একটা হলুদ, নাবাল জমিনের মাঝখানে—একটু দূরে দাঁড়ায়ে আমি দেখলাম—, একটা শহরের অসংখ্য সর্পিল চূড়া উপরের দিকে উইঠা গেছে, সরু সরু চূড়া; আর ওইগুলা এমনভাবে বানানো যে, চাঁদ তার পরিভ্রমণের পথে একবার এক চূড়া ,আরেকবার আরেক চূড়ার উপর বিশ্রাম নিতে পারে, অথবা ক্রেনের তারগুলা থিকা দোল খাইতে পারে।’

পোলো উত্তরে কইলো: ‘আপনার স্বপ্নে দেখা এই শহরের নাম ‘লালেজ’। এই শহরের লোকজন রাতের আকাশে চান্দের এমন বিশ্রামের আয়োজন করছে, যাতে চাঁদ এই শহরের প্রত্যেকটা জিনিশরে বাইড়া ওঠার, অন্তহীনভাবে বাইড়া ওঠার শক্তি-সামর্থ্য দেয়।’

‘আরেকটা ব্যাপার আছে, তুমি জানো না’, কুবলাই যোগ করেন। ‘কৃতজ্ঞ চাঁদ ‘লালেজ’ শহররে একটা বিরলতর সুযোগ দিছে—লঘুতার মইধ্যেই বাইড়া ওঠার সুযোগ।’
~

রোগা শহর-৫
~
যদি আমার কথা বিশ্বাস কইরা থাকেন, ভাল। এখন আপনারে আমি বলব, কীভাবে মাকড়সার জালের মত শহর ‘অক্টাভিয়া’ তৈরি হইছে। খাড়া দুই পর্বতের মাঝে আছে গভীর এক খাদ—শহরটা সেই খাদের উপর শূন্যে, দড়ি, শিকল আর সরু সেতুপথ দিয়া পর্বতের দুই চূড়ার লগে বান্ধা। আপনার পা ফেলতে হবে পরস্পর বান্ধা কাঠগুলার উপর, খেয়াল রাখা লাগবে, যেন ফাঁকা জায়গায় পা পইড়া না যায়, অথবা শনের রশি ধইরা রাখতে হবে। নিচে, হাজার হাজার ফিট পর্যন্ত কিছুই নাই, ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘেরা কেবল ভাসতেছে; আরেকটু নিচে হয়ত নজরে আসতে পারে কোন খাদের তলা।

শহরের ভিত হইলো একটা জাল, যেইটা একইসাথে চলাচলের রাস্তা, আবার শহরের ঠেকনাও। বাকি সব জিনিশ, উপরের দিকে উইঠা থাকার বদলে ঝুইলা আছে নিচের দিকে: দড়ি দিয়া বানানো মই, হ্যামোক, বস্তার মতন উল্টায়ে থাকা ঘরবাড়ি, জামা-কাপড় ঝুলানোর হ্যাঙ্গার, গন্ডোলার মতন বাড়ির উঠান, জলের ধারা, গ্যাসের ফুলকি, কাবাব বানানোর শিক, দড়িতে ঝুলানো ঝুড়ি, ডাম্ব ওয়েটার (এক ধরণের লিফট। তবে এই লিফট জিনিশপত্র ওঠানো-নামানোর কাজে ব্যবহার করা হয়-অনুবাদক), শাওয়ার, ট্রাপিজ, বাচ্চাদের খেলার রিং, ক্যাবল কার, ঝাড়বাত্তি, লতানো গাছসহ পট।

এইরকম অতল শূন্যের উপরে ঝুইলা থাইকাও, ‘অক্টাভিয়া’র লোকেদের জীবন অন্যান্য শহরের লোকজনের চাইতে বেশি নিশ্চিন্ত। তারা জানে, জালটা ম্যালাদিন টিকবে।
~

বেসাতির শহর–৪
~

যে সম্পর্কগুলা শহরের প্রাণ, সেগুলা রক্ষা করতে ‘এরসিলিয়া’র বাশিন্দারা বাড়ির কোনা থিকা দড়ি ঝুলায় দ্যায়; রক্তের সম্পর্ক, ব্যবসার সম্পর্ক, অথরিটি বা এজেন্সির সম্পর্ক—এইসব সম্পর্কের বিভিন্নতারে মার্ক করতে তারা ঝুলায় বিভিন্ন কালারের দড়ি—শাদা, কালো, ধূসর বা শাদা-কালো।
যখন দড়ি এত বেশি হয়া যায় যে, এর ভিতর দিয়া হাঁটাচলাই মুশকিল হয়া যায়, তখন শহরের লোকজন সেই জায়গা ছাইড়া দ্যায়, ঘরগুলা ভাইঙা ফ্যালা হয়; খালি দড়ি আর দড়ি বান্ধার খুঁটিগুলা থাইকা যায়।

কোন উঁচা পর্বতের পাশে, গৃহস্থালির জিনিশপাতি সাজাইয়া ক্যাম্প করতে করতে, ‘এরসিলিয়া’র এই রিফিউজিরা সমতল থিকা জাইগা ওঠা রশি আর খুঁটির গোলকধাঁধাঁর দিকে তাকায়ে থাকে। ওই তো ‘এরসিলিয়া’, আগের মতই আছে, খালি তারা আর নাই।

তারা অন্য কোথাও আবার একটা ‘এরসিলিয়া’ বানায়। এবং, তারা আগের চাইতে আরো বেশি জটিল ও ঘন ঘন কইরা সেই একইরকম দড়ির গোলকধাঁধাঁ বানায়। তারপরে তারা সেই শহরও ছাইড়া দেয়, আর নিজেদের ঘরবাড়ি নিয়া চইলা যায় আরো অনেক দূরে।

এইজন্যেই, ‘এরসিলিয়া’র বিশাল ভূখণ্ডে ঘোরার সময়, আপনে আইসা পড়বেন পরিত্যক্ত অনেক শহরের ধ্বংসস্তুপের কাছে, যেখানে কোন দেয়াল অবশিষ্ট নাই, নাই লাশগুলার হাড্ডিগুড্ডিও, বাতাসে উইড়া গেছে সব ; খালি মাকড়শার জালের মতো জটিল সব সম্পর্ক একটা আকৃতির তালাশে পইড়া আছে।
~

নগর ও নয়ন-৩
~

ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়া সাতদিন হাঁটার পরও, ‘বওসিস’-র দিকে যাইতে থাকা মুসাফির শহরটা দেখতে পারবে না, কিন্তু ততখনে সে শহরে আইসা পড়ছে। মাটি ফুঁইড়া গজানো, অনেক দূরে দূরে বসানো, মেঘের উপরে হারায়ে যাওয়া চিকন রণপা-গুলার উপরেই ভর দিয়া আছে শহরটা। আপনে মই দিয়া সেগুলায় চড়তে পারবেন। শহরের লোকজনের ছায়টায়াও নিচে দেখাই যায় না প্রায়; প্রয়োজনীয় সবকিছুই যেহেতু উপরেই আছে, তাই নিচে না নামাই তাদের কাছে বেটার মনে হয়। শহরের ভর ধইরা রাখা, ফ্লামিঙ্গোর (রাজহাঁসের মত একপ্রকার পাখি-অনুবাদক) ঠ্যাঙের মত লম্বা রণপাগুলা আর রৌদ্রজ্জ্বল দিনে গাছের পাতাদের উপরে পড়া ছেঁড়া ছেঁড়া ব্যাকাত্যাড়া ছায়া—এ ব্যতীত শহরের আর কোনকিছুরই জমিনের লগে কোন সম্পর্ক নাই।

‘বওসিস’র লোকজনের ব্যাপারে তিনরকম ধারণা প্রচলিত: তারা দুনিয়াটারে ঘেন্না করে; তারা দুনিয়াটারে এতই সম্মান করে যে, দুনিয়ার লগে সবরকমের যোগাযোগ এড়ায়ে চলে; তারা নিজেদের অস্তিত্বলাভের আগের দুনিয়াটারে ভালোবাসে; আর তাই, নিচের দিকে তাক কইরা রাখা স্পাইগ্লাশ আর টেলিস্কোপের ভিতর দিয়া, একটা একটা পাতা, একটা একটা পাথর, একটা একটা পিঁপড়া—এইভাবে খুঁটায়ে খুঁটায়ে নিচের দুনিয়াটারে নীরিক্ষা করতে করতে, নিজেদের না-থাকার চিন্তায় মগ্ন হইতে, তাদের কখনোই ক্লান্তি লাগে না।
~

নাম ও নগর-২
~

দুই ধরণের দেবতারা মিলা ‘লিয়ান্দ্রা’ শহরটারে রক্ষা করে। এই দুই ধরণের দেবতাই আকারে অতি ক্ষুদ্র, সংখ্যায় অতি নগন্য। এক ধরণের দেবতারা দাঁড়ায়ে থাকে ঘরের দরজায়, ভেতরে, কোটের হ্যাঙ্গার বা ছাতা রাখার জায়গার পাশেই; বাসা পাল্টানোর সময় তারা পরিবারগুলার পিছে পিছে যায়, আর নতুন ঘরে চাবির গোছার সাথেসাথেই, সেই ঘরে নিজেদের জায়গা সেট কইরা ফেলে। অন্য প্রজাতির দেবতারা থাকে রান্নাঘরে, যার যার সুবিধা অনুযায়ী পটের নীচে, চিমনীর ধোঁয়ার রাস্তায়, ঝাড়ু রাখার ঘরে এরা লুকায়ে থাকে, আর যখন ঐ বাসার লোকজন অন্যখানে যায় গা, তখনও তারা নতুন ভাড়াটিয়াগো সাথে ঐখানেই থেকে যায়; সম্ভবত এরা আবাদ হওয়ার অনেক আগ থেকেই থাকতে ছিলো এইখানে, শূন্য জমিনের আগাছার ভিতর, জং-ধরা ক্যানের মধ্যে লুকায়ে; যদি এই বাড়িটা ভেঙে ফেলা হয়, পঞ্চাশটা পরিবার যদি সেইখানে তাদের বিশাল আবাসিক এলাকা বানায়ে ফেলে, তবুও এই দেবতাদের সেইখানে খুঁজে পাওয়া যাবে, বহুগুণে বেড়ে তারা ছড়ায়ে যাবে প্রত্যেকটা অ্যাপার্টমেন্টের রসুইঘরে। এই দুই ধরণের দেবতাদের আলাদা আলাদাভাবে চেনার জন্যে, আমরা এখন থেকে একটারে ডাকব ‘পিনেট’, আরেকটারে বলব ‘ল্যার’।

একটা নির্দিষ্ট বাড়িতে, ‘ল্যার’রা কেবল ‘ল্যার’দের সাথেই থাকবে, আর ‘পিনেট’রা ‘পিনেট’গো লগে—এমন কোন কথা নাই: তারা পরস্পরে দেখা-সাক্ষাৎ করে, পলেস্তারা দেওয়া কার্নিশে আর রেডিয়েটার পাইপের উপরে একসাথে হাঁটাহাঁটি করে; পরিবারের নানান ঘটনা নিয়া তাদের মন্তব্য থাকে; মাঝেমধ্যেই তাদের ভিতরে মারামারি লাগে না, এমনও না; কিন্তু বছরের পর বছর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানেও তারা কাটায়ে দিতে পারে—এক সারিতে সবগুলারে দেখলে, আপনে বলতেই পারবেন না যে, ওরা বিভক্ত। ‘ল্যার’রা দিনের পর দিন দেখছে, নানা জাতের, নানান পদের পিনেট তাদের দেয়াল ফুঁইড়া উদয় হইছে; পিনেটদেরও নিজেদের জায়গা নিজেদেরই কইরা নিতে হইছে হাতাহাতি কইরাই—কখনও আদ্যিকালের ক্ষয়া যাওয়া মশহুর প্রাসাদের দেমাগি ল্যারদের সাথে, আবার কখনও টিনের ঝুপড়িতে থাকা নাজুক আর অবিশ্বস্ত ল্যারদের সাথে।

মূলত ‘লিয়ান্দ্রা’র আসল প্রাণ কারা, এই বিতর্কের কোন সুরাহা নাই। ‘পিনেট’রা বিশ্বাস করে, তারাই এই শহরের রুহ, যদিও তারা মাত্র এক বছর আগে আসছে; তারা এও বিশ্বাস করে যে, অন্য কোথাও যাওয়ার আগে তারা ‘লিয়ান্দ্রা’রে সাথে কইরা নিয়া যাবে। ‘ল্যার’রা পিনেটদের দেখে দুইদিনের নাছোড়বান্দা মেহমান হিশাবে, অনেকটা ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’টাইপের; আসল ‘লিয়ান্দ্রা’, যা এর ভিতরের সবকিছুরে গইড়া তোলে, ওইটা তাদেরই, যে ‘লিয়ান্দ্রা’ এইসব ভুঁইফোড়রা আসার আগেও ছিলো, এবং এরা চইলা যাওয়ার পরেও থাইকাই যাবে।

এই দুই ধরণের দেবতা একটা জায়গায় কিন্তু এক: কোন পরিবারে বা শহরে কোন ঘটনা ঘটলেই এরা সমালোচনা করে। ‘পিনেট’রা দোষ দেয় আগেরকালের লোকজনরে, দাদা-দাদির বাপ-মা’রে, বাপ-মা’র খালা-ফুফুরে, পরিবারের প্রাচীন সদস্যদেরে; ‘ল্যার’রা কয় শহর ধ্বংস হয়া যাওয়ার আগমুহূর্তের পরিবেশের কথা। কিন্তু তার মানে এই না যে, খালি স্মৃতির উপর ভর দিয়াই এরা বাঁইচা থাকে: বড় হওয়ার পরে বাচ্চারা কেমন পেশা বাইছা নেবে, এইটা নিয়া তারা দিবাস্বপ্ন দেখে (পিনেটরা), কিংবা ভালো লোকের হাতে পড়লে পাশের বাড়িটা কেমন হইতো, এইটা নিয়াও তারা ভাবে (ল্যাররা)। ভালোমত যদি কান পাতেন, স্পেশালি রাইতে, তাইলে ‘লিয়ান্দ্রা’র ঘরে ঘরে আপনে এদের আওয়াজ শুনতে পারবেন: একটানা ফিসফিসাইতেছে, একজন আরেকজনের আলাপে বাগড়া দিতেছে, অভিমান করতেছে, বিদ্রুপ করতেছে, হাসতেছে চাপা চাপা আয়রনিক হাসি।
~

শহর ও শব-১
~
‘মেলানিয়া’ শহরটার চত্বরে ঢুকলেই আপনে একটা কথোপকথনের সিনে আটকা পড়বেন: দেখবেন, কোন এক ঘর থেকে বেরোয়ে আসা বেপরোয়া এক সৈনিক আর তার সাথে থাকা মোসাহেব একটা লাফাঙ্গা জুয়ান পোলা আর শহরের বেশ্যাটার লগে দেখা করতেছে; আর নাইলে কিপটা বাপটা দোড়গোড়ায় দাঁড়ায়ে শেষবারের মত তার কামুক দুশ্চরিত্র মেয়েটারে সতর্ক কইরা দিতেছে, এর মধ্যে আবার এক ভোদাই কর্মচারী ডিস্টার্ব করতেছে, কুটনি বুড়ির কাছে যার চিঠি নিয়া যাওয়ার কথা। অনেক বছর পরে যদি আপনে আবার ‘মেলানিয়া’ যান, দেখবেন সেই একই আলাপ চলতেছে; এরমধ্যে চাটুকার, ডাইনি বুড়ি আর কিপটা বাপ মইরাও গেছে; কিন্তু তাদের জায়গা দখল কইরা নিছে বেপরোয়া সৈনিক, কামুক মাইয়া আর ভোদাই কর্মচার—তারা নিজেরাই আবার যথাক্রমে ধূর্ত চাটুকার, বিশ্বস্ত বউ আর জ্যোতিষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইছেন।

‘মেলানিয়া’র লোকজন বিবিধ চরিত্রে নিজেদের নবায়ন করতে থাকে: বিভিন্ন কথোপকথনে অংশগ্রহনকারীরা একের পর এক মরতে থাকে, আর এরইমধ্যে তাদের জায়গা যারা নেবে তারা জন্মাইতে থাকে, তারা একেকজন একেক চরিত্রে পুনরায় অংশ নেয়। যখন কেউ তার চরিত্র বদল করে, অথবা কেউ চিরতরে মঞ্চ ছাইড়া চইলা যায়, কিংবা নতুন কেউ মঞ্চে প্রবেশ করে, তখন একটানা অনেকগুলি চেঞ্জ আসে, সব চরিত্রগুলা আবার বদলায়ে দেওয়া হয়; কিন্তু এর মধ্যেই, রাগী বুইড়াটা রসিক কাজের বুয়ার কথার উত্তর দিতে থাকে, সুদখোরটা উত্তরাধিকারের সম্পত্তি বঞ্চিত পোলাপানের পিছ ছাড়ে না, নার্স তার সৎ মেয়েরে সান্ত্বনা দিতে থাকে, যদিও এদের কারুরই আর আগের চরিত্রের মত চোখ বা গলার স্বর থাকে না।

মাঝেমাঝে এমনও হইতে পারে যে, একই লোক অভিনয় করতেছে দুই বা ততোধিক চরিত্রে—অত্যাচারী রাজা, পরোপকারী দাতা, নবি; অথবা একই চরিত্র দেওয়া হয় দুই বা ততোধিক, মেলানিয়ার শত শত বা হাজার হাজার লোকরে: ধূর্তের ভূমিকায় তিনশোজন, পরজীবীর চরিত্রের জন্য ত্রিশ হাজার, দুর্দশাগ্রস্ত, স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকা রাজপুত্রের চরিত্রে এক লাখ।

সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে, ভূমিকাগুলাও আর পুরাপুরি আগের মত থাকে না; বিভিন্ন ছলাকলা আর বিস্ময়ের ভিতর দিয়া যে কাজটা তারা করতেছিলো, তা নিশ্চিতভাবেই কোন একটা অন্তিম পরিণতির দিকে আগায়ে যায়, এবং আগাইতেই থাকে, তা কাহিনীর নীল নকশা যতই গভীর থেকে গভীরতর হোউক, বাধা-বিপত্তি যতই বাড়তে থাকুক। একটু পর পর যদি আপনি সেই চত্বরের দিকে তাকান, শুনবেন, চরিত্রভেদে ক্যামনে বদলায়ে যাচ্ছে কথোপকথন, যদিও ‘মেলানিয়া’র লোকজনের জীবন এতই ছোট যে, তারা এইটা টেরই পায় না।
~

মার্কো পোলো একেকটা পাথর ধইরা ধইরা একটা ব্রিজের বর্ণনা দিলো। ‘কিন্তু কোন পাথরটা ব্রিজটারে খাঁড়া কইরা রাখছে?’ কুবলাই খান জিগাইলেন। ‘ব্রিজটা কোন পাথরের সাথে ঠেস দেওয়া না, সবগুলা পাথর মিলা যে খিলানের সারি, ওইটার উপরেই ব্রিজের ভর’, মার্কো জবাব দিলো।

কুবলাই খান চুপ হয়া যান, ভাবতে থাকেন। হঠাৎ বইলা ওঠেন, ‘তাইলে পাথরগুলির কথা তুমি আমারে কইতেছ কেন? খিলানটাই তো আমার কাছে মূল ব্যাপার।’ পোলো উত্তরিল, ‘পাথরগুলা ছাড়া খিলানই তো নাই!’

আরও দেখেন

ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’: পর্ব ৩... কুবলাই খান খেয়াল করলেন যে, মার্কো পোলোর শহরগুলা একটা আরেকটার মতই, যেন এক শহর থেকে আরেক শহরে যাইতে জার্নি লাগে না, খালি উপাদানের পরিবর্তন লাগে। এখন, মা...
ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’- পর্ব ২...   'অন্য অন্য রাজদূতেরা আমারে দুর্ভিক্ষ, চাঁদাবাজি, নানামুখী ষড়যন্ত্র ইত্যাদি নিয়া সতর্ক করে; অথবা, নীলকান্তমণির খনি, বেজির চামড়ার লাভজনক দামের...
ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’ – ...   অধ্যায়ঃ এক  --------------- যাত্রাপথে দেখা শহরগুলার বর্ণনা যখন দেন মার্কো পোলো, তার সেই সকল আলাপই যে পুরাপুরি সত্য ভাইবা নিছিলেন ...
স্লোগান নিয়া খাঁজকাটা কুমিরের রচনা... স্লোগান নিয়া একটা রচনা কিভাবে শুরু করা উচিত ‘স্লোগান একটা গৃহপালিত প্রানী’ এইভাবে নাকি আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে একটি স্লোগান বয়ে গেছে? ঠিক বুঝতে প...
তুহিন খান
তুহিন খান

জন্ম ১৯৯৫। কবি ও অনুবাদক। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে অধ্যায়নরত।

error: