fbpx

ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’- পর্ব ২

 

‘অন্য অন্য রাজদূতেরা আমারে দুর্ভিক্ষ, চাঁদাবাজি, নানামুখী ষড়যন্ত্র ইত্যাদি নিয়া সতর্ক করে; অথবা, নীলকান্তমণির খনি, বেজির চামড়ার লাভজনক দামের খবর বা দামেশকের তরবারি-বর্শার ফলা রপ্তানির পরামর্শ দেয়, আর তুমি?’ মহাত্মা খান পোলোরে জিগেশ করলেন, ‘তুমি (তাগো মতই) দূর দূরান্তের দেশ থিকা ফিরা আইসা শুনাইতে পারো কেবল এমনসব চিন্তার কথা, যেগুলা সন্ধাবেলা ঘরের দরজায় ঠাণ্ডা বাতাস খাইতে বসা পাবলিকের চিন্তাভাবনা। তাইলে তোমার এইসব সফর কইরা লাভ কী?’

 

‘এখন সন্ধ্যা। আমরা আপনের প্রাসাদের সিঁড়িতে বইসা আছি। একটা মৃদু হাওয়াও বইতেছে’, মার্কো পোলো উত্তর দিল। ‘আমার বর্ণনায় যেই দেশের চিত্রই আপনারে ঘিরা গইড়া উঠুক না কেন, আপনে তো নিজের সুবিধামত জায়গা থিকাই সেইটারে দেখবেন, এমনকি এই প্রাসাদের বদলে যদি খুঁটির উপর অবস্থিত কোন গ্রাম থাকত, আর হালকা বাতাসে ভাইসা আসত কাদাঘোলা মোহনার দুর্গন্ধ, তাইলেও!

‘আমার চোখ হইল ধ্যানমগ্ন, চিন্তায় ডুবে যাওয়া এক মানুশের চোখ, কবুল করি। কিন্তু আপনের চোখ? আপনে অতিক্রম করেন দ্বীপপুঞ্জ, তুন্দ্রা-এলাকাগুলা, পার্বত্য অঞ্চল। এইখান থিকা আর কোনদিকে না গেলেই আপনের ভালো।’

 

ভিনিশীয় জানে, কুবলাই যখন তার ব্যাপারে বিরক্ত হয়ে ওঠেন, তখন সম্রাট চান আরো ক্লিয়ারলি একটা চিন্তাসূত্র ফলো করতে; অতএব, মার্কোর প্রশ্ন আর উত্তরগুলা, মহাত্মা খান সাহেবের মাথার ভিতর অলরেডি নিজে নিজেই চালু হওয়া একটা আলাপের ভিতরে ঢুইকা পড়ে। অর্থাৎ বলা যায়, কোন প্রশ্ন এবং উত্তর জোরে বলা হইল কিনা, কিংবা তারা দুইজনই নীরবে সেই প্রশ্নোত্তরের চিন্তায় মগ্ন হইলেন কিনা, এইটা তাদের কারো কাছেই কোন ম্যাটার ছিল না। ইন ফ্যাক্ট, তারা দুইজনই ছিলেন নীরব, চক্ষু আধবোজা, কুশনে হেলান দিয়া বসা তারা, হ্যামাকে দোল খাইতেছেন, লম্বা বাদামি রঙের পাইপে টানতেছেন ধোঁয়া।

 

মার্কো পোলো ভাবতেছিল, সে উত্তর দিতেছে ( কিংবা কুবলাই খানই ওর উত্তরগুলা কল্পনায় শুনতেছিলেন) দূর-দূরান্তের শহরগুলার অজানা অচেনা অঞ্চলে একজন মানুশ যত বেশি হারায়ে যাইতে থাকে, তত বেশি সে বুঝতে পারতে থাকে পথে অতিক্রম কইরা আসা অন্য শহরগুলারে; সে রোমন্থন করতেছিল তার ভ্রমণের পর্যায়গুলা, এবং তার মনে পইড়া যায় সেই বন্দরের কথা, যেইখান থেকে সে জাহাজের পাল তুইলা রওনা দিছিল, মনে পড়ে যৌবনের চেনা জায়গাগুলা, বাড়ির আশপাশের সবকিছু আর ভেনিশের একটা ছোট্ট চত্বর, যেইখানে সে ছোটবেলায় লাফালাফি খেলত।

 

এই জায়গায় আইসা কুবলাই খান তার কথায় বাধা দিলেন বা ভাবলেন যে বাধা দিতেছেন, অথবা মার্কো পোলোরই মনে হইল যে, তারে থামানো হইতেছে, এইরকম একটা প্রশ্ন দিয়া: ‘তুমি কি পিছন দিকে মাথা ঘুরায়ে সামনে আগাও?’ অথবা, ‘তুমি কি সবসময় পিছনের জিনিশই দ্যাখ?’ কিংবা, প্রশ্নটা এরকম ছিল বরং, ‘তোমার ভ্রমণ কি খালি অতীতেই নিয়া যায়?’

 

এই প্রশ্নগুলা এইজন্যেই করা, যেন মার্কো পোলো ব্যাখ্যা করতে পারে, বা কল্পনা করতে পারে যে ব্যাখ্যা করতেছে, অথবা অন্যের কল্পনায় ব্যাখ্যা করতে পারে অথবা শেষমেশ নিজেরে বুঝাইতে সক্ষম হয় যে, যেই জিনিশ সে চায়, তা সবসময় তার সামনেই ছিল, এমনকি যদি সেইটা অতীতের ব্যাপারও হয়, তাইলেও সেই অতীত এমন অতীত, সফরের অগ্রগামিতার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে যে অতীত বদলায়ে গেছে, কারণ মুসাফিরের অতীত তার ধরা ভ্রমণপথের সাপেক্ষে বদলায়: অতীত বলতে ইমিডিয়েট অতীত না, মানে, যেইখানে একটা বিগত দিন মানে অতীতের লগে যোগ হওয়া একটা নতুন দিন (সেই অতীত না-অনুবাদক), বরং তার চাইতেও  দূরের পরোক্ষ কোন অতীত। প্রত্যেকটা নতুন শহরে পৌঁছায়ে মুসাফির খুঁইজা পায় তার নতুন একেকটা অতীত, যেইটার ব্যাপারে সে আসলে জানতই না যে, তার এইরকম কোন অতীত ছিল: বর্তমানে তুমি যা না, বা যা আর তোমার দখলে নাই সেই অতীত জিনিশের অপরিচিত চেহারা তোমার জন্যে লুকায়ে অপেক্ষা করতে থাকে বিদেশে, অনাবিষ্কৃত কোন জায়গায়।

 

মার্কো পোলো এক শহরে ঢুইকা পড়ে: একটা চত্বরে সে দেখে এক লোকরে, যার যাপিত জীবন বা খালি ওই মুহূর্তটা হইতে পারত মার্কো পোলোর নিজের; সে এখন থাকতে পারত ওই লোকটার জায়গায়, যদি বহুদিন আগে, সময়ের ভিতরে সে থাইমা যাইত; অথবা বহুদিন আগে কোন রাস্তার মোড়ে, যে রাস্তাটা সে বাইছা নিছিল তার বিপরীতটা যদি বাইছা নিত, অনেক ঘোরার পরে সে হয়ত আইসা পড়ত এই চত্বরে, এই লোকটার জায়গায়। এদ্দিনে সে তার সেই বাস্তব বা কল্পিত অতীত থিকা বিচ্ছিন্ন; সে থামতে পারতেছে না, তার অবশ্যই যাইতে হবে আরেক নতুন শহরে, যেইখানে তার অপেক্ষায় আছে তার আরেক অতীত, অথবা এমনকিছু যা হইতে পারত তার সম্ভাব্য ভবিষ্যত আর যা এখন হয়া গেছে অন্য কারো বর্তমান। না-পাওয়া সম্ভাব্য ভবিষ্যতগুলা অতীতেরই শাখামাত্র: মৃত শাখা।

 

‘ভ্রমণ কি অতীতরে তাজা করার জন্য?’ এই পর্যায়ে এই ছিল খানের প্রশ্ন, যে প্রশ্নটা হয়ত এইভাবেও করা যাইত: ‘ভ্রমণ কি ভবিষ্যতরে পুনরুদ্ধার করার জন্য?’

আর মার্কোর উত্তর ছিলো: ‘অন্যদিক দিয়া ভাবলে নেতিবাচক চিত্রই দেখা যায়। নিজের যা কিছু ছিল, মুসাফির তার সামান্যই শনাক্ত করতে পারে, আর বেশিরভাগই সে নতুন কইরা আবিষ্কার করে, যা তার কখনওই ছিল না, আর ভবিষ্যতে কখনো তার হবেও না।’

~

 

স্মৃতির শহরগুলি-৫

~

মৌরিলিয়া-য় মুসাফিররে শহর দেখার আমন্ত্রণ জানানো হয়, নাইড়াচাইড়া দেখতে দেওয়া হয় কিছু পোস্টকার্ড, যেগুলা ফুটায়ে তোলে ওই শহরের পুরানা রুপঃ বাসস্ট্যাণ্ডের জায়গায় মুরগির ভাস্কর্যসহ সেই একইরকমের একটা গোল চত্বর; ওভারপাসের জায়গায় একটা গান-বাজনার আউটডোর মঞ্চ; অস্ত্রশস্ত্র বানানোর কারখানার জায়গায় ছোট্ট শাদা ছাতা হাতে দাঁড়ায়ে দুই যুবতী। শহরের লোকজনরে হতাশ করতে না চাইলে মুসাফির নির্ঘাত পোস্টকার্ডে আঁকা শহরটার প্রশংসা করবে আর এখনকার শহরটার চাইতে অতীতের সেই শহরটারেই বেশি ভাল বলবে। তবে শহরের পরিবর্তনগুলা নিয়া আফসুস করার ক্ষেত্রে তারে কিছুটা সতর্ক আর সীমাবদ্ধ  থাকা লাগবেঃ তার মানতেই হবে যে, পুরানা প্রাদেশিক মৌরিলিয়ার লগে তুলনায় আনলে এই মেগাসিটি মৌরিলিয়ার জাঁকজমক আর সমৃদ্ধি যদিও কোন একটা নির্দিষ্ট হারায়ে যাওয়া সৌন্দর্যের ক্ষতিপূরণ হইতে পারে না, যদিও, কেবল পুরাতন পোস্টকার্ডে দেইখাই এখন প্রশংসা করা যায় এইসব জাঁকজমকের, কিন্তু আগে, যখন প্রাদেশিক পুরান মৌরিলিয়া লোকের চোখের সাআমনে ছিলো, কেউ সেইখানে কোনরকম সুন্দর কিছুই দেখে নাই, এবং, মৌরিলিয়া যদি আগের মতন থাকত, তাইলে এই সময়ে এমনকি আরো কম সুন্দর লাগত শহরটারে; যাই হউক, এই মহানগরীর আছে আরো একটা বাড়তি এট্রাকশন। সেইটা হইল, এই শহর বর্তমানে যা হইছে, অতীতচারী কেউ পিছে তাকাইলে সেই রুপের ভিতর দিয়াই দেখতে পারবে যে, এইটা আগে কী ছিলো!

 

শহরের বাশিন্দাদের ভুলেও এইকথা বইলেন না যে, একই জায়গায় একই নামে গইড়া উইঠাও মাঝেমাঝে দুইটা আলাদা শহর, কেউ কাউরে চেনা ছাড়াই, কেউ কারুর লগে কোন যোগাযোগ ছাড়াই জন্ম লয়, আবার মারা যায়। এমনকি, মাঝেমইধ্যে বাশিন্দাদের নামও একই থাইকা যায়, একরকম শুনা যায় তাগো গলার আওয়াজ, একরকম দেখা যায় সকলের মুখগুলা, কিন্তু নামের তলে আর সেই স্থানের উপরে যে খোদারা থাকতেন তারা কোন কথা না বইলাই চইলা যান, আর তাদের জায়গায় আসন গাড়েন আগন্তুকেরা। নতুন আগতরা পুরানদের চাইতে ভাল না খারাপ—এই তর্কের কোনই মানে নাই, যেহেতু তাদের মাঝে কোন যোগাযোগই নাই, ঠিক যেমন, পুরান পোস্টকার্ডগুলা অতীত মৌরালিয়ার ছবি দেখায় না আসলে, বরং দেখায় একটা পুরা ভিন্ন শহর, যেইটারে আজকের শহরটার মতই, বাই চান্স, মৌরালিয়া ডাকা হইত।

~

 

শহর আর সাধ-৪

~

ফিডোরা, সেই এক ধূসর পাথরের মহানগরী, যার কেন্দ্রে দাঁড়ায়ে আছে একটা ধাতব বিল্ডিং, সেই বিল্ডিঙয়ের প্রত্যেক রুমে একটা কইরা স্ফটিকের গোলক। প্রত্যেকটা গোলকের ভিতর দিয়া তাকাইলে আপনে দেখবেন একটা নীল শহর, ভিন্ন আরেক ফিডোরার মডেল। আজকে যে শহরটারে আমরা দেখতেছি, কোন না কোন কারণে যদি ফিডোরা তা না হইতো, তাইলে এই রুপগুলাই ধারণ করতো। প্রত্যেক যুগেই ওই সময়ের ফিডোরার দিকে তাকাইয়া কেউ হয়তো এরে একটা আদর্শ নগর বানানোর কথা ভাবছে, কিন্তু শহরের মিনিয়েচার মডেল বানাইতে বানাইতেই দেখা গেছে, ফিডোরা আর আগের মত নাই, এবং, গতকাল পর্যন্তও যা হইতে পারতো ফিডোরার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ মডেল, তা কাচের গোল্লার ভিতরে খেলনা হইয়াই থাইকা গেছে। কাচের গোলকওয়ালা ওই বিল্ডিং এখন ফিডোরার জাদুঘরঃ শহরের সব লোকই এইটা ভিজিট করে, মনের আশা-আকাঙ্ক্ষার লগে মিলাইয়া শহরের একটা মডেল চুজ করে, চিন্তা করে সেই শহর নিয়া, কল্পনায় নিজের ছায়া দেখে মেডুসা পুকুরের পানিতে, যেইটা খাল থেকে পানি নিতে পারত (খাল শুকায়ে না গেলে), ভাবে, রাস্তার পাশে হাতির জন্যে সংরক্ষিত কাপড়ের শামিয়ানায় ঢাকা উঁচা বাক্স (এখন আর শহরে নাই) দিয়া দেখা দৃশ্যগুলার কথা, পেঁচানো স্লাইড দিয়া পিছলায়ে নামার মজাদার খেলার কথা, ঘুরানো-বাঁকানো মিনারগুলার কথা (যেগুলার নীচে কখনোই দাঁড়ানোর মত কোন বেদী ছিল না)।

 

দিলওয়ালা খান সাহেব, আপনের রাজ্যের মানচিত্রে এই বিশাল পাথুরে ফেডোরা, আর কাচের গোল্লার ভিতরের ওইসব ছোট ছোট ফেডোরা—দুইটাই থাকবে, এইজন্যে না যে, এই সবগুলা সমানভাবে রিয়ালিটি, বরং এইজন্যে যে, এই সবগুলাই কেবল ধরণামাত্র। একটারে স্বীকৃতি দেওয়া হয় প্রয়োজন হিশাবে, কিন্তু আসলে তখনো তা অতটা প্রয়োজনীয় না; আরেকটারে মনে করা হয়, সম্ভব, এবং একটু পরেই, তা আর সম্ভব না।

~

 

নগর ও নিশানি-২

~

 

যেই মুসাফির পথ চলতেছে, এবং তখনও সে জানে না যে, রাস্তায় কোন শহরটা তার জন্যে অপেক্ষা করতেছে, সে ভাবতে থাকে যে, প্রাসাদ, সেনাছাউনী, কারখানা, থিয়েটার, বাজার এগুলা কেমন হবে। সাম্রাজ্যের প্রত্যেকটা শহরের প্রত্যেক্টা বিল্ডিঙই আলাদা, আর ওইগুলার অবস্থানও ভিন্ন ভিন্ন স্থানেঃ কিন্তু এই আজনবি মুসাফির অচেনা নগরটায় ঢুকতেই যখন, ইতস্তত ছড়ানো খাল-টাল, বন-বাগান, আবর্জনার স্তুপ পেরোয়ে, তার চোখ যায় পাইন ফলের মতন প্যাগোডা, চিলেঘর আর মেইয়ের দিকে, তখনই সে আলাদা কইরা ফেলতে পারে যে, কোনটা রাজপুত্রদের প্রাসাদ, কোনটা মেইন পুরোহিতের মন্দির, কোনটা সরাই, কোনটা জেলখানা আর কোনটা বস্তি। এর দ্বারা—কিছু লোক বলে আরকি—এই ধারণাটাই সত্য প্রমানিত হয় যে, প্রত্যেকটা মানুশ তার মগজের ভিতরে খালি নানানরকম ডিফারেন্স দিয়া একটা শহর বানায়, তার না আছে কোন আকার, না কোন আকৃতি, আর আলাদা আলাদা শহরগুলা সেই কল্পনগরের শূন্যস্থানগুলা পূরণ করে।

 

কিন্তু এইটা যো-র বেলায় সত্যি না। এই শহরের প্রত্যেকটা জায়গায়ই আপনে পালাক্রমে পারবেন—ঘুমাইতে, যন্ত্রপাতি বনাইতে, রান্নাবাড়া করতে, সোনাদানা জড়ো কইরা রাখতে, ন্যাংটা হইতে, নেতামী করতে, বেচাবিক্রি করতে, দৈব কথাবার্তা নিয়া প্রশ্ন তুলতে। এই শহরের যেকোন পিরামিডাকৃতির ছাদের তলে ঢাইকা যাইতে পারে কুষ্ঠরোগের চিকিৎসাকেন্দ্র বা রাজার রক্ষিতাগো গোসলখানা। মুসাফির চারিদিকে খালি ঘুরতে থাকে আর জর্জরিত হইতে থাকে নানান সন্দেহেঃ সে শহরের চরিত্রগুলা আলাদা কইরা ধরতে পারে না, মাথার ভিতরে যেইসব চরিত্রের কথা সে আলাদাভাবে সাজায়ে রাখছিলো, সেইগুলাও যায় আউলাঝাউলা হয়া। …..কিন্তু তাইলে এই শহর টিকা আছে ক্যামনে? কোন রেখা আলাদা করে ভিতর আর বাহির, বাঘের গর্জন আর চাকার ঘটঘট?

~

 

রোগা শহর-২

~

এখন আমি আপনেরে বলব ‘যেনোবিয়া’-র কথা, যেই শহরের রুপের ধরণটা এইরকমঃ জমিনের উপরে অবস্থিত হইলেও, শহরটা দাঁড়ায়ে আছে উঁচা উঁচা খুঁটিতে ভর দিয়া, বাড়িগুলা বানানো হইছে বাঁশ আর দস্তায়, সেই ঘরগুলাতে নানারকম উচ্চতার অসংখ্য পাটাতন আর ব্যালকনি দাঁড়ায়ে আছে রণপা-য় ভর দিয়া, একটা আরেকটারে ছাড়াইয়া, মই আর ঝুলন্ত ফুটপাত দিয়া যুক্ত সেই বাড়িগুলার উপরে আছে মোচার মত ছাদবিশিষ্ট গম্বুজ, পানিভর্তি ঠিলা, হাওয়ানিশান, বাইরে বের হয়া থাকা পুলি আর ক্রেন।

 

কোন প্রয়োজন বা কার আদেশ অথবা কিসের খায়েশ ‘যেনোবিয়া’-র প্রতিষ্ঠাতাগো শহরের এইরকম নকশায় উদ্বুদ্ধ করছে, এই ব্যাপারে কারোই তেমন কিছু মনে নাই। আর সেইজন্যেই শহরটারে এখন যেমন আমরা দেখতেছি—এইটা লাগে যে, শুরু থিকাই একটার পর একটা জোর করা আরোপিত নকশার ভিতর দিয়া যাইতে যাইতে আজকের এই দুর্বোধ্য নকশায় রুপ নিছে—এই রুপ সেই প্রয়োজন, আদেশ বা খায়েশ তৃপ্তির লগে পুরা করতে পারছিল কিনা, সেইব্যাপারে কিছুই বলা যায় না। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই যা বলা যায় তা হইল, ‘যেনোবিয়া’র কোন বাশিন্দারে যদি আপনে একটা সুখী  জীবনের ব্যাপারে তার চিন্তাভাবনা কী, তা জিগেশ করেন, তাইলে সে সবসময়ই কল্পনা করবে খুঁটির উপরে খাড়ানো, ঝুলন্ত সিঁড়িওয়ালা ‘যেনোবিয়া’র মতনই কোন এক শহরের কথা, সেইটা হয়ত পুরাপুরি আলাদা কোন ‘যেনোবিয়া’, ব্যানার আর ফিতা-ওড়া কোন শহর, কিন্তু কল্পনার সেই শহরও সবসময়ই সেই প্রথম নকশার উপাদানগুলারে জোড়া দিয়াই তৈরি।

 

কথা হইল, ‘যেনোবিয়া’ সুখী শহরের ভিতরে পড়ে না অসুখী শহরের ভিতরে, এইটা ঠিক করার চেষ্টা অযৌক্তিক। কোন শহররে এই দুইভাগে ভাগ করার মানে নাই, বরং শহরগুলারে ভাগ করা যাইতে পারে অন্য দুই ভাগেঃ প্রথমত সেইসব শহর, যেগুলা বছরের পর বছর, নানারকম পরিবর্তনের ভিতর দিয়া গিয়াও মানুশের সাধ আহ্লাদগুলারে নিজেদের আকৃতিতে মূর্ত কইরা রাখে, আর হইল সেইসব শহর, যেইখানে মানুশের স্বপ্ন-সাধ মুইছা দিছে শহরের অস্তিত্ব, অথবা শহরই মিটায়ে দিছে সেইসব খোয়াব-খায়েশের অবয়ব!

~

 

বেসাতির শহর-১

~

বায়ুকোণ দিয়ে আসা বাতাসের ভিতর দিয়া আশি মাইল গেলেই আপনি আইসা পড়বেন ‘ইউফেমিয়া’ শহরে, যেইখানে সাত জাতির বানিয়ারা আইসা ভিড় করে প্রতি অয়নান্তে আর বিষুবে। আদা আর তুলাভর্তি নৌকাগুলা সেইখানে আইসাই আবার পাল তুইলা দেয়, তখন সেগুলার খোল ভরা থাকে পেস্তা বাদাম আর পপিফুলের বীজে; জায়ফল আর কিশমিশ খালাস করা কাফেলা আবার সাথেসাথেই ফিরতি যাত্রার জন্যে জিনেবাঁধা ব্যাগে ভরতে থাকে সোনালি মসলিনের গুঁটি। কিন্তু খালি পণ্যদ্রব্য বেচাকেনাই লোকজনরে সাগর-নদী আর মরুভূমি পার হয়া এই শহরে আসতে উদ্বুদ্ধ করে না—এইসব পণ্য তো আপনে একইরকম পাবেন সব জায়গায়, দয়ালু খান সাহেবের বাজারের ভিতরে আর বাইরের সব বাজারে, আপনের পায়ের কাছেই ছড়ানো দেখবেন সেই একই হলুদ চাদরের উপরে, মাছির হাত থিকা বাঁচানোর জন্যে সেই একইরকমের শামিয়ানার ছায়ায়, সেই একইরকম মিথ্যামিথ্যা দাম কমানোর কথা কইয়া দেখবেন সেগুলা কেনার জন্যে ডাকা হইতেছে। আপনে কেবল এই পণ্য কেনাবেচা করতেই ‘ইউফেমিয়া’য় আসবেন, তা না, বরং এইখানে আসার আসল কারণ এইটাও যে, রাতের বেলা বাজারের চারিদিকে আগুনের পাশে, বস্তা বা পানির ঢিলার উপরে বইসা অথবা কার্পেটের স্তুপের উপরে ছড়ায়া ছিটায়া শুইয়া কোন একজন যেইসব শব্দ উচ্চারণ করবে—যেমন, ‘নেকড়ে’, ‘বোন’, ‘গুপ্তধন’, ‘যুদ্ধ’, ‘খোস-পাঁচড়া’, ‘প্রেমিক-প্রেমিকা’—বাকি সবার, প্রত্যেকেরই সেই নেকড়ে, বোন, গুপ্তধন, খোস-পাঁচড়া, প্রেমিক-প্রেমিকা আর যুদ্ধ নিয়া নিজেদের গল্পগুলা বলা লাগবে। আপনে জানেন যে, সামনে দীর্ঘ এক সফর, আর তখন উটের পিঠে দুলতে দুলতে বা জাংক নৌকার(চীনের একটা বিশেষ টাইপের নৌকা)দুলুনির ভিতরে বইসা এসবের বিরুদ্ধে আপনেরে জাইগা থাকা লাগবে, তখন আপনে ডাইকা আনতে থাকবেন একটার পর একটা স্মৃতিরে, আপনের নেকড়ে হয়া যাবে আরেক নেকড়ে, আপনের বোন হয়া যাবে আরেকটা ভিন্ন বোন, আপনের যুদ্ধগুলা অন্য আরেক যুদ্ধ, ঘটবে এইসব, যখন আপনে ফিরতেছেন ‘ইউফেমিয়া’ থিকা, সেই শহর থিকা যেইখানে প্রতি অয়নান্তে আর বিষুবে আসলে বেচাকেনা হয় স্মৃতি!

~

 

 

 

…..এই এলাকায় নবাগত এবং লেভান্ত-র ভাষা না জানা মার্কো পোলো, নিজের কথাগুলা প্রকাশ করতে পারত খালি তার ঝোলা থেকে নানান জিনিশ–ড্রাম, নোনা মাছ, ওয়ার্টহগের দাঁত দিয়া বানানো নেকলেস (ওয়ার্টহগ হইল সারাগায়ে আঁচিলযুক্ত এক ধরণের জন্তু-তুহিন খান)–বের করে, আর সেগুলার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করত অঙ্গভঙ্গি, লাফঝাঁপ, বিস্ময় বা ভয়ের চিৎকার এবং শিয়াল আর পেঁচার ডাক নকল কইরা।

 

কাহিনীর এক অংশের লগে আরেক অংশের সম্পর্ক সম্রাটের কাছে সবসময় পষ্ট লাগত না; ঝোলা থিকা বের করা জিনিশগুলার তো কত অর্থই হইতে পারে: তীরভর্তি তূণীর বুঝাইতে পারে যুদ্ধপ্রস্তুতি অথবা শিকারের প্রাচুর্য, অথবা বুঝাইতে পারে কোন অস্ত্রবিক্রেতার দোকান; একটা বালিঘড়ি বুঝাইতে পারে চলমান বা চলে যাওয়া সময়রে, কিংবা বালি অথবা এমন কোন জায়গা যেইখানে বালিঘড়ি বানানো হয়।

কিন্তু এই নিঃশব্দ সংবাদদাতার বলা ঘটনা বা টুকরা খবরগুলি কুবলাইর জন্যে বাড়ায়ে দিত এর চারপাশের স্পেশ, একটা শূন্যস্থান যেইটা শব্দ দিয়া পুরা হয় না। মার্কো পোলোর দেখা শহরগুলার বর্ণনার ভাল দিক ছিল: আপনে কল্পনায় পারবেন ওইগুলার ভিতর ঘুরতে, হারায়ে যেতে, একটু থাইমা ঠাণ্ডা হাওয়া খাইতে অথবা দৌড়ায়া পালাইতে।

 

যত সময় যাইতেছিল, পোলোর গল্পের বর্ণনায় ঝোলার জিনিশপত্র আর অঙ্গভঙ্গির জায়গা দখল কইরা নিতে থাকল শব্দেরা: প্রথমে বিস্ময়সূচক কিছু শব্দ, তারপরে ছাড়াছাড়া কয়েকটা বিশেষ্য, রসকষহীন ক্রিয়াপদ; তারপর  বিভিন্ন ফ্রেজ, শাখায় শাখায় ভাগ করা, লতায় পাতায় জড়ানো কথাবার্তা, উপমা, বক্রোক্তি। বিদেশি যুবক সম্রাটের ভাষা বলতে শিখে গেলেন অথবা সম্রাটই বুঝতে শিখলেন বিদেশির ভাষা।

 

কিন্তু আপনে এইটা বলতে বাধ্য যে, তাদের এই নতুন যোগাযোগের পদ্ধতিটা আগের চাইতে ভাল না: সত্য বলতে, বিভিন্ন প্রদেশ আর শহরের গুরুত্বপূর্ণ জিনিশগুলা–মন্যুমেন্ট, বাজার, পোশাকাদি, জীবজন্তু, উদ্ভিদ–ভালভাবে শোনার জন্যে ঝোলার প্রতীকী জিনিশপাতি আর অঙ্গভঙ্গির চাইতে শব্দই বেশি উপযোগী, কিন্তু তাও, পোলো যখন বলতে শুরু করলো, ওইসব জায়গায় জীবনটা আসলে কেমন হবে, দিনের পর দিন, রাইতের পর রাইত, তখন শব্দ খুঁইজা পাইতে সে অক্ষমই হইল আর ধীরে ধীরে, সেই আগের মতই অঙ্গভঙ্গি, মুখবাঁকানো আর চোখের ইশারা-ইঙ্গিতের উপরেই নির্ভরশীল হয়া পড়ল।

 

তো এমন হইল, প্রত্যেকটা শহরের ব্যাপারে প্রাথমিক তথ্যগুলা পরিমিত শব্দে বইলা, সে একটা নির্বাক আলাপরীতি–একদম সোজা অথবা তেরছাভাবে, হঠাৎ বা ধীরেসুস্থে,  মুঠখোলা হাত উপরে তুইলা, বা পিঠ ঘুরাইয়া অথবা পাশ ফিরা–ফলো করলো। নতুন এক ধরণের আলাপভঙ্গি চালু হইল: মহাত্মা খানের আংটি-ব্রেসলেটভরা ফরশা হাত রাজকীয় ভঙ্গিতে সেই বানিয়ার পেশল, চালু হাতের প্রত্যুত্তর করলো। এইভাবে যখন তাদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া গইড়া উঠল, তখন তাদের হাত নির্দিষ্ট কিছু ভঙ্গিতে অভ্যস্ত হয়া উঠল, প্রত্যেকটা ভঙ্গিই, পালাক্রমে একটার পর আরেকটা করা বা একটারেই রিপিট করার ভেতর দিয়া, একেকটা মুডের পরিবর্তনরে বুঝাইতে লাগলো। কিন্তু, ঝোলার ভিতরের পণ্যদ্রব্যের নতুন নতুন নমুনা বের করার সাথে সাথে যখন আবার নানান জিনিশের জন্যে নতুন নতুন ভোকাবুলারি তৈরি হইল, তখন এই নির্বাক আলাপরীতির ভাঁড়ার আস্তে আস্তে ফুরায়ে, স্থির হয়ে আসলো। নতুন কইরা আবার এই আলাপরীতিতে মগ্ন হওয়ার উচ্ছ্বাসও নষ্ট হয়া গেল দুইজনেরই; তাদের বাকি আলাপে বেশিরভাগ সময়ই তারা নিশ্চুপ হয়ে নেতায়ে থাকলেন।

 

 

আরও দেখেন

ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’: পর্ব ৫... প্রাসাদের উঁচা রেলিং থিকা মহান খান সাহেব তার সাম্রাজ্যের বিস্তার দেখেন। প্রথমে দেখেন অধিকৃত অঞ্চলগুলারে মিলায়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বিস্তৃত সীমান্তরেখা, ক...
অপ্টিমিস্টের প্রতি জিজ্ঞাসা... গেল বছর ম্যান বুকার বিজয়ি জর্জ সন্ডার্সের 'Ask the Optimist!' প্রথম প্রকাশিত হয় New Yorker-এ, ২০০৬ সালে। প্রিয় অপ্টিমিস্ট, আমার স্বামি ভাল ক...
ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর: পর্ব ৪...   অধ্যায়-৪ ~ আম্বর দিয়া বানানো পাইপের গোড়ায় ঠোঁট চাইপা, নীলকান্তমণি হারের উপর লেপ্টে থাকা দাঁড়ি নিয়া, আর রেশমি স্লিপারের ভিতরে, উত্তেজনা...
ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’: পর্ব ৩... কুবলাই খান খেয়াল করলেন যে, মার্কো পোলোর শহরগুলা একটা আরেকটার মতই, যেন এক শহর থেকে আরেক শহরে যাইতে জার্নি লাগে না, খালি উপাদানের পরিবর্তন লাগে। এখন, মা...
তুহিন খান
তুহিন খান

জন্ম ১৯৯৫। কবি ও অনুবাদক। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে অধ্যায়নরত।

error: