fbpx

ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’ – পর্ব ১

[ইতালো কালভিনোর বিখ্যাত উপন্যাস ‘ইনভিজিবল সিটিজ’ আগে অনুবাদ বাংলায় হইছে। জি এইচ হাবীব করছেন ‘অদৃশ্য নগর’ নামে। পশ্চিমবাংলাতেও বাংলানুবাদ হইছে। ভাষার ভঙ্গিমা ও সাংস্কৃতিক দ্যোতনা সময়ের সাথে সাথে বদলায়। বদলায় বলেই নতুন নতুন অনুবাদ দরকার, নয়তো পুরানো অনুবাদেরই নবায়ন প্রয়োজন হয়। ‘অদৃশ্য শহর’ আমরা ধারাবাহিক প্রকাশ করবো মাদারটোস্টে।

তুহিন খানের করা এই অনুবাদ পড়লেই বোঝা যাবে এর মেজাজ এই সময়ের বাংলা ভাষার মেজাজ। পুরানো তথাকথিত ‘প্রমীত’ নামের কৃত্রিম বাংলায় অভ্যস্তদের এই গদ্য একটু ‘অন্যরকম’ / ‘কেমন জানি!’ লাগতে পারে। একটু খেয়াল করলেই এই ভাষার প্রাঞ্জলতা ও পোয়েজি টের পাওয়া যাবে।

লেখ্যভাষা হিসাবে কোনো নির্দিষ্ট ধরণ/ ডায়ালেক্টকে মাদারটোস্ট প্রেস্ক্রাইব করে না, (যদিও ডেমোক্রেটিক, অধিক মানুষের যোগাযোগে ব্যবহৃত যেকোনো ভাষারে প্রমোট অবশ্যই করে), এবং লেখকের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তাই এই অনুবাদের বানান ও ভাষারীতি অনুবাদকের ইচ্ছানুযায়ী রাখা হইছে। যেমন: ‘মানুশ’ বা ‘শ্যাশ’ এইগুলা টাইপো না, অনুবাদকের মনমতো বানান। ~ সম্পাদক]

 

অধ্যায়ঃ এক 

—————

যাত্রাপথে দেখা শহরগুলার বর্ণনা যখন দেন মার্কো পোলো, তার সেই সকল আলাপই যে পুরাপুরি সত্য ভাইবা নিছিলেন কুবলাই খান, তা না; কিন্তু অন্য যেকোন সংবাদদাতা বা পর্যটকের চাইতে এই জুয়ান ভেনিশীয় পর্যটকের কথা, তাতার সম্রাট খুব আগ্রহ আর কৌতূহল নিয়া শুইনা যাইতেছিলেন।

 

রাজা-বাদশাদের জীবনে এমন টাইমও আসে যখন বিজিত টেরিটরিগুলার সীমানাহীন বিস্তৃতির কারণে অহংকার পয়দা হয়, মনে আসে একধরণের অবসাদগ্রস্ত শান্তি এই ভাইবা যে, খুব তাড়াতাড়ি আমরা তাদেরকে জানা বা বুঝা নিয়া চিন্তা-ভাবনা ছাইড়া দেব। এক ধরণের খালি খালি লাগার ব্যাপার আছে, বৃষ্টি শেষ হওয়ার পরে হাতির পালের গন্ধ আর ধূপদানে ক্রমশ ঠাণ্ডা হইতে থাকা চন্দনের ছাইয়ের ঘ্রাণ নিয়া, সন্ধাবেলায় সেই শূন্যতাবোধ আমাদের উপরে ভর করে; এক ধরণের মাথাধরা ভাব হয়, সে বাবদে কাঁইপা ওঠে সমতলে আঁকা তারাদের মানচিত্রের অনাবাদী বাঁকের উপরে চিত্রিত পাহাড়-নদী; যা একের পর এক গুটায়ে ফেলে সর্বশেষ শত্রুসৈন্যদলের বিধ্বস্ত হওয়ার, একটার পর একটা হাইরা ভূত হওয়ার, ঘোষণা দেওয়া ডাকবার্তাগুলারে; আর থরে থরে সাজায়, মূল্যবান ধাতু, শোধিত চামড়া আর কচ্ছপের খোলের বার্ষিক উপঢৌকনের বিনিময়ে, আমাদের আর্মির কাছে আশ্রয় চাওয়া অজ্ঞাত রাজাদের সীলমোহরের মোম।

 

এইটা সেই নিদারুণ সময়, যখন আমরা ধইরা ফেলি,  সকল বিস্ময়ের সার যারে ভাবতাম, মানে এই রাজত্ব, আসলে একটা সীমাহীন, বিমূর্ত ধ্বংসলীলা; আমরা জাইনা ফেলি যে, দুর্নীতির ঘা এতদূর ছড়ায়ে গেছে, আমাদের রাজদণ্ডের আর সাধ্য নাই তার শেফা করে;  বুইঝা ফেলি , সার্বভৌম শত্রুগো উপরে আমাদের জয়জয়কার আসলে আমাদের তাগো দীর্ঘ ধ্বংসাত্মক কাজকারবারের ওয়ারিশ বানাইছে। মার্কো পোলোর বয়ানই খালি কুবলাই খানরে বুঝাইতে পারলো, ভাঙ্গনোন্মুখ দেয়াল আর দালানগুলার ভিতর দিয়া, একটা নকশার সূক্ষ্ম কারুকাজ, এতই সূক্ষ্ম যে, উইপোকার দাঁতের কামড় থেকে সে রক্ষা পাইছিল।

 

 

 

 

 

স্মৃতির শহরগুলি-১

 

সেইখান থেকে পুবদিকে তিনদিনের পথ হাঁটলে আপনে পাবেন দিওমিরা, যে শহরে আছে ৬০ টা রুপার গম্বুজ, সকল দেবতার ব্রোঞ্জের মূর্তি, পিচঢালা রাস্তা, একটা স্ফটিকের থিয়েটার আর একটা সোনালি মোরগ, রোজ সকালে টাওয়ারের উপর দাঁড়ায়ে ডাকে সে! এইসকল সৌন্দর্য ততক্ষণে বেশ আটপৌরে লাগতে থাকবে দর্শকের, যে অন্যান্য শহরেও এইসব দেইখা আসছে। কিন্তু কোন সেপ্টেম্বরের সন্ধ্যায় সেই শহরে পৌঁছানো মুসাফিরের জন্য ওই শহরের বড় চমক হইতেছে, যখন দিন ফুরায়ে আসতে থাকবে আর খাবারের দোকানগুলির দরজায় একযোগে জ্বলে উঠবে রঙবেরঙের বাতি, বারান্দা হতে শোনা যেতে থাকবে কোন এক নারীর কান্নার ‘আহ, আহ’ ধ্বনি, তখন তার হিংসা লাগতে থাকবে ওইসব লোকেরে যারা বিশ্বাস করে যে, এরকমই একটা সন্ধ্যা তাদের কাটছিলো এইখানে আর তখন তারা ছিলো হ্যাপি।

 

 

স্মৃতির শহরগুলি-২

 

জঙ্গলের পথে বহুদিন হাঁটার পরে, একটা মানুশ খুব করে চাইতে থাকবে একটা শহর। আর তখনই সে আইসা পড়বে ইসিদোরায়; সেই ইসিদোরায় যেইখানে সব দালানের প্যাঁচ খাওয়া সিঁড়িগুলি সর্পিল ঝিনুকের খোল দিয়া তৈরি, যেই শহর ভাল ভাল দূরবীন আর সুন্দর ভায়োলিনের জন্যে বিখ্যাত, যেই শহরে আগন্তুকেরা দুই মহিলার ব্যাপারে দ্বিধায় ভুগতে ভুগতে অল টাইম সামনে পায় তৃতীয় আরেকজনরে, যেইখানে মোরগলড়াই নিয়া জুয়াড়িগুলা ঘটায় রক্তারক্তি কাণ্ড। শহরের কামনায় থাকাকালীন সে এইসব ব্যাপার নিয়াই ভাবতেছিলো। তাই বলাই যাক, ইসিদোরা তার স্বপ্নের শহর, খালি একটা ব্যাপার ছাড়া। স্বপ্নে দ্যাখা সেই শহর বুকে ধরছিলো তার জুয়ানকাল, আর ইসিদোরায় সে আসলো বৃদ্ধ এই কালে। চত্বরের কাছে একটা দেয়ালের ধারে বসে বসে বুড়ারা চ্যাংড়া পোলাপানের আসা-যাওয়া দেখতেছিলো, সেও তাদের ভিতরে একটা সারিতে বসা। কামনাটামনা সব অখনে খালি স্মৃতি।

 

 

 

 

শহর আর সাধ-১

 

ডরোথিয়া শহরের কথা দুইভাবে কওয়া যায়ঃ আপনে বলতে পারেন, এর চারপাশের দেয়ালে চারটা এলুমিনিয়মের টাওয়ার আছে, দেয়ালঘেঁইষা আছে সাতটা দরজা; এর লগেই আছে স্প্রিংচালিত অপসারণযোগ্য সেতু, যেগুলার অবস্থান নগরপরিখার উপরে এবং এই পরিখার পানিই শহরের চারটা সবুজ খালে পানি সরবরাহ করে। এই খালগুলি শহররে নয়ভাগে ভাগ করছে, প্রত্যেক অংশে আছে তিনশো ঘর আর সাতশো চিমনী। এবং প্রত্যেক ভাগের বিবাহযোগ্য মেয়েরা বিয়া করে অন্য অংশের যুবক ছেলেদের, আর তাদের বাবা-মায়েরা নিজেদের একচেটিয়া দখলে থাকা নানান রকম দ্রব্য নিজেদের মধ্যে বিনিময় করে–বার্গামোট কমলা, স্টারজান মাছের ডিম, নানান রকমের এস্ট্রলেব, নীলকান্তমণি–এইগুলা মাথায় রেখে, তারপর আপনে সহজেই এইসব ব্যাপার নিয়া কাজ করতে পারবেন, যতখন না এই শহরের অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের সবকিছু ইচ্ছামত আপনে জানতে পারতেছেন। অথবা আরেকভাবে এই শহরের পরিচয় দিতে পারেন, যেমন দিছিল সেই উটের রাখাল যে আমারে নিয়া গেছিলো ওইখানেঃ এই শহরে আমি আসলাম আমার পয়লা জুয়ানিরকালে, এক সকালে। রাস্তাভর্তি মানুশ তাড়াহুড়া করে বাজারে যাইতেছিল, মেয়েদের দাঁতগুলা ছিলো খুব সুন্দর আর ওরা একদম চোখে চোখ দিয়া তাকাইতেছিলো, প্লাটফর্মে তিনজন সৈন্য বাঁশিতে ফুঁ মারতেই গাড়ির চাকাগুলি ঘু্রা ধরল, রঙবেরঙের পতাকাগুলো বাতাসে লাগাইলো উড়াল। এর আগ পর্যন্ত, আমি খালি মরুভূমি আর মরুকাফেলার রাস্তাই চিনতাম। ওইদিনের পরে আমার চোখ আবার মরুভূমির বিস্তার আর মরুকাফেলার রাস্তা পর্যবেক্ষণে দেল লাগাইলো; কিন্তু এখন আমি জানি, ডরোথিয়ায় সেইদিন বেইনে যেসব রাস্তা আমার সামনে খুইলা গেছিলো, এই রাস্তা সেগুলার মইধ্যে একটামাত্র।

 

 

স্মৃতির শহরগুলি-৩

 

হুদাই, হে মহান কুবলাই, আমি আপনারে বলার কোশেশ করতে পারি, উঁচা উঁচা গম্বুজের শহর ‘যাইরা’-র কথা। আমি আপনারে বলতে পারি, সিঁড়ির মত উপরে উইঠা যাওয়া রাস্তাগুলার কতগুলি ধাপ, তোরণঢাকা রাস্তার বাঁকগুলা কয়স্তরের কিংবা কোন ধরণের দস্তার পাত দিয়া ছাতগুলা ঢেকে দেওয়া হইছে; কিন্তু আমি জানি যে, এইগুলি বলা মানে আসলে কিছুই না বলা। এইগুলা দিয়া এই শহর তৈরি হয় নাই, বরং এই শহরের উপাদান হইলো এর জায়গার মাপজোখ আর অতীতের ঘটনাগুলার মধ্যকার সম্পর্কঃ একটা ল্যাপম্পোস্টের হাইট আর জমি থেকে ফাঁসিতে ঝুলানো দখলদার বাহিনীর এক সৈন্যের ঝুলতে থাকা পায়ের দূরত্ব; ল্যাম্পপোস্ট থেকে উ্লটাদিকের রেলিংয়ের সাথে বাঁধা রশি এবং রাণীর বিবাহ-শোভাযাত্রার রাস্তা সাজানোর জন্যে লাগানো সারি সারি ফেস্টুন; ওই রেলিঙের উচ্চতা আর ভোরবেলায় ওই রেলিঙে চড়া পরকীয়ায় আসক্ত লোকটার লাফ; একটা নর্দমার এলায়ে থাকা ঢাল আর ওই একই জানালার ভেতরে পিছলায়ে ঢুকে পড়ার জন্যে একটা বিড়ালের সেই নর্দমার দিকে আগাইতে থাকা; অন্তরীপের পেছন দিকে হঠাতই ভেসে ওঠা একটা কামানবাহী যুদ্ধজাহাজের ফায়ারিং রেঞ্জ আর ওই নর্দমার জায়গাটা উড়ায়ে দেওয়া একটা বোমা; মাছ ধরা জালের ভেতরের অসংখ্য ফুটা আর ডকে বইসা তিন বুড়ার সেই জাল মেরামত করতে করতে দখলদারদের গানবোটের গল্প একশোবার নিজেদের মধ্যে আলোচনা করা; রাণীর জারজ বাচ্চা বলে কথিত এক পরিত্যাক্ত শিশুর সেই ডকে তালিপট্টিমারা পোশাকে পড়ে থাকা-এই সবই এই শহরের উপাদান।

স্মৃতির এইসব উন্মত্ত ঢেউ যখন বইতে থাকে, এই শহর তারে স্পঞ্জের মতন নিজের ভিতরে গিলা ফালায় আর ছড়াইতে থাকে। আজকের যাইরার বর্ণনা দিতে গেলে অবশ্যই বলা লাগবে যাইরার অতীতের সব কথা। আজকের এই শহর যদিও তার অতীতের কথা কয় না, কিন্তু তারে ধারণ করে হাতের রেখাগুলার মতন; সেই অতীত লেখা আছে প্রতিটা রাস্তার কোণায় কোণায়, জানালাগুলার কপাটে কপাটে, প্রত্যেকটা সিঁড়ির রেলিঙে, বিদ্যুতের খাম্বার প্রতিটা এন্টেনায়, সবগুলা পতাকাদণ্ডে–প্রতিটা জিনিশের গায় ধারাবাহিক লাইগা আছে অজস্র আঁচড়, অসংখ্য গভীর খাঁজ আর সীমাহীন দলানো-মোচড়ানোর ছাপ।

 

শহর আর  সাধ-২

 

তারপর, দক্ষিণদিকে আগায়ে তিনদিন পরে, আপনে আইসা পড়বেন এনাস্টাসিয়ায়, যে শহররে ঘিরা আছে অনেক খাল, যেগুলা শহরের ভেতরে পানি সাপ্লাই দেয়, আর সে শহরের আকাশে উড়ে রঙ বেরঙের ঘুড়ি। এখন আমার উচিত সেইসব দ্রব্যের নাম কওয়া, যেগুলা ওইখানে সুলভ দামে পাওয়া যায়ঃ আকীক, বহুস্তরিক স্ফটিক অনিক্স, ক্রাইসোপ্রেস এবং আরো নানা রকমের দামী ও কমদামী পাথর; আমি প্রশংসা করব ফিজন্ট পাখির গোশতের যেইটা এখানে শুকনা চেরিকাঠের আগুনে পুড়ায়ে অতি মিষ্টি মারজোরাম মাখায়ে খাওয়া হয়; আর মাইয়াগো গল্প যদি বলিঃ ওই শহরের মাইয়াগুলারে আমি দেখছি একটা উদ্যানের ভেতরে পুকুরে গোসল করতেছে, আর শোনা যায়, এরা মাঝেমাঝে নতুন আসা লোকদের তাদের সাথে কাপড় খুইলা পুকুরে নামতে আর সাঁতার প্রতিযোগিতা করতে কয়। তবে এতসব বইলাও, আমি আপনারে ওই শহরের আসল প্রাণের খবর কিন্তু বলি নাই। কারণ, এনাস্টাসিয়ার বিবরণ যখন আপনার ভিতরে একের পর এক কামনা-বাসনা জাগাইতেছে, কিন্তু আপনি সেগুলারে অন্তরে চাপা দিয়া রাখতে বাধ্য হইতেছেন; কোন এক সকালে যখন আপনি এনাস্টাসিয়ার বুকের ভেতর দিয়া যাবেন, আপনার সমস্ত কামনা একযোগে জেগে উঠে আপনারে ঘিরা ফেলবে। সেই শহররে আপনার তখন মনে হবে এক সম্পূর্ণ জগত, যেইখানে কোন স্বপ্নই হারায়ে যায় না আর আপনি যার একটা অংশমাত্র; আর যেহেতু এই শহরে আছে উপভোগ্য সেইসবকিছু যা আপনি কোন্ওদিনও ভোগ করতে পারেন নাই, ফলে সন্তুষ্টমনে সেই স্বপ্ন-সাধের মইধ্যে বসতি গড়া ছাড়া আর উপায়  থাকবে না আপনের। এই ক্ষমতা, –যারে কেউ বলে ক্রুর, কেউ বলে শুভ–এনাস্টাসিয়া, সেই বিশ্বাসঘাতক শহর, এই ক্ষমতা ধারণ করে; যদি আপনে কখনো একদিনে আট ঘন্টা ওই শহরে আকিক, অনিক্স, ক্রাইসোপ্রেস এইসব পাথর কাটার কাজ করেন, আপনার যে পরিশ্রম আপনার স্বপ্ন-সাধরে বাস্তবের আকার দিছিলো, সেই শ্রমই আপনার স্বপ্নের গাও থেকে খুলে নিয়া যাবে তার মূর্ত আকার, আর আপনে বিশ্বাস করতে থাকবেন, এনাস্টাসিয়ায় আপনে জীবনরে পুরাপুরি উপভোগ করবেন কেবল তখনই, যখন আপনে এই শহরের একজন শ্রমিক, দাস।

 

 

নগর ও নিশানি-১

 

গাছ-গাছালী আর পাথুরে পথের ভিতর দিয়া, আপনি তারপরে কয়েকদিন হাঁটবেন। চোখে পড়ার মত তেমন কোন জিনিশ পাবেন না, আর তারপরে হঠাত দেখবেন কিছু জিনিশ, যেগুলা দেইখা শনাক্ত করতে পারবেন যে, এইগুলি আসলে অন্য কিছু জিনিশের ইশারা, বালির উপরে পদচ্ছাপ, মানে বাঘের চলাচলের রাস্তা; নিম্নভূমি মানে ওইখানে বয়ে যাচ্ছে জলের ধারা; গোলাপ ফুল, মানে, শীতকাল শ্যাশ। সমস্ত জিনিশই দেখবেন খুব নীরব আর একটা আরেকটার প্রতীক হিশাবে ইন্টারচেঞ্জেবল, গাছ আর পাথরগুলিই কেবল তারা যা, সেই অর্থই বহন করতেছে।

এই পথে চলতে চলতেই অবশেষে আপনার পথ ফুরাবে ‘তামারা’ শহরে। শহরে ঢোকার রাস্তাগুলা দেখবেন যে, নানারকমের সাইনবোর্ডে বোঝাই, দেয়ালের গায়েও আর আঁটতেসে না, বাইরে ঝুলে আছে। আপনার চোখ কোন আসল জিনিশ দেখবে না, দেখবে নানা ধরণের নিশানি আর চিন, যেগুলা অন্য জিনিশরে নির্দেশ করেঃ চিমটার ছবি নির্দেশ করে দাঁতের ডাক্তারের ঘর; হাতলওয়ালা বড় সুরাপাত্রঃ সরাইখানা; যুদ্ধের কুড়ালঃ ব্যারাক; দাঁড়িপাল্লাঃ মুদির দোকান। মূর্তি আর বর্মগুলা সিংহ, ডলফিন, টাওয়ার, তারা এইসব আকৃতির। এই একটা সিংহ কিংবা একটা ডলফিন, একটা টাওয়ার অথবা একটা তারা, এগুলা যে কোন একটা কিছুর—কে জানে, কী—প্রতীক, তারই ইঙ্গিত এইটা। অন্যান্য নিশানিগুলা নির্দেশ করে যে, একটা নির্দিষ্ট জায়গায় কী কী করা নিষেধ ( সরুগলিতে ওয়াগন নিয়া ঢোকা, ফুটপাতের ছোট দোকান বা স্টলের সামনে পেশাব করা, ব্রিজে দাঁড়ায়ে বরশি দিয়া মাছ ধরা) আর কী কী করা যাবে ( জেব্রারে পানি খাওয়ানো, বল খেলা, আত্মীয় স্বজনের মৃতদেহ পোড়ানো)। উপাসনালয়ের দরজা দিয়াই নানান দেবদেবীর মূর্তি দ্যাখা যায়, প্রত্যেকের লগেই লেখা আছে তার নাম, বৈশিষ্ট্য, গুণাগুণ ইত্যাদি–করন্যুকোপিয়া (প্রাচুর্যের প্রতীক ছাগলের শিং), বালিঘড়ি, মেডুসা (গ্রীক পুরাণের দেবী)–যাতে উপাসকেরা তার পছন্দের উপাস্যরে চিনতে পারে এবং ঠিকঠাকমত ঠিকঠাক উপাস্যেরে পূজা দিতে পারে। যদি কোন ভবনের গায়ে কোন সাইনবোর্ড বা চিহ্নবাচক কোনকিছুর আকৃতি না থাকে, তাইলে ওই ভবনের একান্ত নিজস্ব গঠনাকৃতি আর শহরের ভিতরে তার অবস্থানস্থলই নির্দেশ করবে তার কী কাজঃ রাজপ্রাসাদ, জেল, টাকশাল, পিথাগোরিয়ান স্কুল, বেশ্যাপল্লী। দোকানদাররা যেসব জিনিশপাতি কেনার জন্যে দেখাবে সেগুলাও নিজগুণে দামী না, অন্য আরেকটা জিনিশের প্রতীক হিশাবে দামীঃ এমব্রয়ডারি করা হেডব্যাণ্ডঃ সৌন্দর্য; সোনালি পালকিঃ ক্ষমতা; ইবনে রুশদের বইঃ জ্ঞান; পায়ের নূপুরঃ ইন্দ্রিয়সুখময়তা। আপনের দৃষ্টি সেই শহরের রাস্তাগুলারে খুঁটায়ে খুঁটায়ে দেখতে থাকবে, যেন ওইগুলা লিখিত পৃষ্ঠাঃ আপনার অবশ্যই ভাবা দরকার এমন সবকিছুর কথাই এই শহর প্রতীকের মাধ্যমে কইয়া দিবে, আপনারে দিয়া আবার বলায়ে নিবে তার কথা, আর, এইভাবে আপনি যখন ভাবতেছেন যে, ‘তামারা দেখতেছি তাইলে!’, তখন আপনি আসলে মনে রাখতেছেন জাস্ট কিছু নাম, যেগুলা দিয়া এই শহর নিজের এবং নিজের বিভিন্ন অংশের পরিচয় দেয়।

ঘোরতর ইশারা-ইঙ্গিতের আবরণে ঢাকা এই শহর আসলে যেমনই হউক, যা কিছুই সে গোপন করুক অথবা চাইপা রাখুক–আপনার ‘তামারা’ ছাড়তে হবে এর রহস্য উন্মোচন করা ছাড়াই। শহরের বাইরে দিগন্তজোড়া ফাঁকা জমিন, খোলা আসমান, মেঘেদের ব্যস্ত চলাচল। বাতাসের তোড়ে মেঘেদের যে কাকতালীয় আকার-আকৃতি, সেইসবের মইধ্যে তখন আপনে অলরেডি চিহ্নিত করতে শুরু করছেন নানান প্রতীকী ফিগারঃ একটা পালতোলা জাহাজ, একটা হাত, একটা হাতি……!

 

Related image
‘অদৃশ্য শহর’এর অলঙ্করণ © Karina Puente Frantzen

 

স্মৃতির শহরগুলি-৪

 

ছয় নদী আর তিন পর্বতের পিছে গইড়া উঠছে ‘যোরা’, যে শহররে একবার দেখলে কেউই আর ভুলতে পারে না। কিন্তু তা এইজন্যে না যে, অন্যান্য স্মরণীয় শহরগুলার মত, এই শহর আপনের স্মৃতির ভিতরে একটা ব্যতিক্রমী ইমেজ রাইখা যায়। আপনের মেমোরিতে একের পর এক ধারাবাহিকভাবে থাইকা যাওয়ার একটা ক্ষমতা আছে যোরার, রাস্তাঘাট, তার পাশে ঘরবাড়ি, সেই বাড়িঘরের দরজা-জালনা; যদিও এইসবের কোনকিছুরই আলাদা কোন সৌন্দর্য বা ইউনিকনেস নাই। যোরার রহস্য লুকায়ে আছে, নকশাগুলার উপরে আপনার চোখ বুলায়ে যাওয়ার ভিতরেই, যেগুলা একের পর এক সাজানো, স্বরগ্রামের মতন, যার কোন একটা নোটও পালটানো বা ডিসপ্লেস করা যায় না। যোরা ক্যামনে তৈরি হইল, সেইকথা যে লোক হৃদয় দিয়া জানে, রাতের বেলায় ঘুম না আসলে, সে কল্পনার ভিতরে হাঁটতে পারে শহরের রাস্তাগুলায়, আর তার ধারাবাহিকভাবে, মনে পড়তে থাকে নানা জিনিশের বিন্যাসক্রম, নাপিতের চেকচেক শামিয়ানার পরেই তামার ঘড়ি, তারপরে নয় নলবিশিষ্ট জলের ফোয়ারা, জ্যোতির্বিদের কাচের টাওয়ার, তরমুজ-ব্যবসায়ীর দোকান, তপস্বী আর সিংহের মূর্তি, তুর্কি হাম্মাম, রাস্তার কোণায় কাফে, পোতাশ্রয়ের দিকে চইলা যাওয়া সরু রাস্তা। এই শহর, যারে মন থিকা মুইছা ফেলা অসম্ভব, একটা বর্মের মতন, একটা মৌচাকের মতন, যার মধুকোষগুলায় আমাদের প্রত্যেকেই ইচ্ছামতন স্মৃতি জমায়ে রাখতে পারেঃ বিখ্যাত লোকজনের নাম, গুণাগুন, সংখ্যা, উদ্ভিদ আর খনিজ পদার্থের নানা জাত, যুদ্ধের দিন তারিখ, নক্ষত্রপুঞ্জ, গ্রামারের পার্টস অফ স্পিচ। মানুশের প্রত্যেকটা ধারণা আর ভ্রমনপথের প্রতিটা মোড়ের মাঝে একটা সাদৃশ্য বা বিরোধ তৈরি হইতে পারে, যেইটা (ওই ভ্রমনের) স্মৃতি ধইরা রাখতে একটা তাৎক্ষণিক সহায়ক হিশাবে কাজ করে। সেইজন্যেই, পৃথিবীর সবচাইতে মেধাবী লোক তারাই যারা যোরার কথা মনে রাখতে পারে।

 

কিন্তু এই শহর ঘোরার কথা আমি বলতেছি হুদাইঃ গতিহীন এবং সবসময় একই রকম থাকতে বাধ্য হইয়া, আরো সহজে স্মরণীয় হইতে গিয়া, যোরা ম্লান, খণ্ড-খণ্ড, নাই হয়া গেছে। পৃথিবী ভুইলা গেছে তারে।

 

 

 

শহর আর সাধ-২

 

ডেস্পিনায় যাওয়া যায় দুইভাবেঃ জাহাজে অথবা উটে চড়ে। মরুপথের আগন্তুকরে ওই শহর যে রুপ দেখায়, তার ঠিক ভিন্ন রুপ দেখায় সমুদ্রপথের যাত্রীরে। অধিত্যকার শেষ মাথায় দূর দিগন্তের দিকে যখন উটের রাখাল তাকায়, চোখে পড়ে উঁচা উঁচা অট্টালিকার চূড়া, রাডারের এন্টেনা, বাতাসে উড়তেছে লাল-শাদা উইণ্ডসক, চিমনীগুলা ধোঁয়া ছাড়তেছে–সে তখন ভাবে একটা জাহাজের কথা; সে জানে যে, এইটা একটা শহর, অথচ সে এইটারে ভাবতে থাকে একটা জাহাজ, যে জাহাজ তারে এই মরুভুমি থেকে অনেক দূরে নিয়া যাবে, যেন এইটা দূরদেশে যাত্রার জন্যে প্রস্তুত কোন বানিজ্যতরী, বাতাসে তার পাল অলরেডি ফুলতে ফুলতে উপরে উঠতেছে, এখনও পুরাপুরি ফোলে নাই; অথবা লোহার তলাযুক্ত কোন স্টিমার, যার বয়লার শব্দ করে কাঁপা শুরু করছে; সে ভাবতে থাকে সেইসব বন্দরের কথা, যেখানে ক্রেন দিয়া ডকে মালামাল খালাস হইতেছে, সরাইগুলায় বসে বিভিন্ন জাহাজের খালাসিরা একে অপরের মাথায় ভাঙতেছে মদের বোতল, আলোকিত, নীচতলার প্রত্যেক্টা জানালায়, একজন নারী বসে চুলে চিরুনি করতেছে।

আর নাবিক, সেই শহরের উপকূল থেকে আবছা আবছা দেখে একটা উটের পিঠ, তার দুই কুঁজের মাঝখানে ঝলমলে ঝালরওয়ালা জিন, হেইলাদুইলা হাঁটতেছে; সে জানে যে, এইটা একটা শহর, কিন্তু সে এইটারে ভাবতে থাকে একটা উট, যার পিঠের মালপত্রের ঝোলা থেকে ঝুইলা আছে পানির মশক, নানারকম সুস্বাদু ফল, পাকা খেজুর আর তামাক পাতা; আর ততক্ষণে সে নিজেরে আবিষ্কার করে এক লম্বা মরুকাফেলার অগ্রভাগে, যেই কাফেলা তারে নিয়া যাইতেছে সমুদ্র থেকে মরুভূমি থেকে অনেক দূরের মরুদ্যানের পথে যেইখানে পামগাছের তেরছা ছায়ায় আছে টলটলা পানি; যেই কাফেলা তারে নিয়া যাইতেছে পুরু পুরু চুনকাম করা দেয়ালঘেরা রাজপ্রাসাদের দিকে, যেখানে টাইলস করা মেঝেতে খালিপায়ে নাচতেছে মেয়েরা, তাদের বাহু দুলতেছে, তাদের মুখ অর্ধেক নেকাবে ঢাকা, অর্ধেক খোলা।

প্রত্যেক শহর তার আকৃতি ধারণ করে বিপরীত দিকের মরুভূমি থেকে, আর সেইভাবেই উটের রাখাল আর নাবিক দেখে ডেস্পিনারে, দুই মরুভূমির মাঝখানে এক সীমান্তশহর।

 

 

 

নগর ও নিশানি-২

 

‘যিরমা’ শহর থেকে মুসাফিররা ফিরা আসে দগদগে কিছু স্মৃতি নিয়াঃ একটা কালা অন্ধ লোক ভিড়ের ভিতর চিল্লাইতেছে, চাঁদে ধরা একটা পাগল উঁচা এক অট্টালিকার কার্ণিশে মাতালের মত হাঁটতাছে, শিকলে বান্ধা একটা পুমা নিয়া এক মাইয়া যাইতেছে। আসলে যিরমার রাস্তায় ছড়ানো খোয়াগুলায় ছড়ি দিয়া গুঁতা মারতে মারতে যাওয়া অন্ধ লোকেদের বেশিরভাগই কালা; প্রত্যেকটা উঁচা বাড়ির ছাদেই কেউ না কেউ পাগল হইয়া ঘুরতেছে; সেই সমস্ত পাগলেরাই কার্ণিশে কাটাইতেছে ঘন্টার পর ঘন্টা; সব পুমাগুলারেই খামখেয়ালি কইরা পুষতেছে কোন না কোন মাইয়া। শহরটার  সবই কেমন বাড়তি বাড়তিঃ এইটা নিজেরে রিপিট করে, যাতে কিছু একটা মগজে গাঁইথা যায়।

 

আমিও যিরমা থিকা ফিরতেছিঃ আমার স্মৃতির ভিতরে আছে, সব জায়গায় জানলা সমান উচ্চতায় উড়তেছে অনেকরকম বেলুন; দোকানওয়ালা রাস্তাগুলা যেইখানে নাবিকেরগায়ে আঁকা হইতেছে উল্কি; গরমে কষ্ট পাইতে থাকা মোটা মোটা বেঢপ মহিলায় ভর্তি পাতাল ট্রেন। আর অন্যদিকে আমার সফর সঙ্গীরা, তারা কসম কাইটা বলতেছিল যে, তারা কেবল একটা বেলুনরেই শহরের মাথায় উড়তে দেখতেছে, কেবল একজন আর্টিস্টই বেঞ্চে বইসা সুঁই, কালি আর খোঁচায়ে খোঁচায়ে করা নকশাগুলারে ঠিকঠাক করতেছেন, একটামাত্র মোটা মহিলা একটা রেলস্টেশনে দাঁড়ায়ে নিজের গায়ে বাতাস দিতেছে। স্মৃতির খালি বাড়াবাড়িঃ এইটা প্রতীকরে রিপিট করতে থাকে, যাতে শহরটা অস্তিত্বে আসা আরম্ভ করতে পারে।

 

 

Image result for italo calvino
ইতালো ক্যালভিনো

 

রোগা শহর-১

 

বলা হয় যে, হাজার কুয়ার শহর ‘ইসাউরা’ গইড়া উঠছে একটা গভীর ভূগর্ভস্থ লেকের উপরে। সবদিকে, যেইখানেই শহরের বাশিন্দারা মাটিতে গভীর খাড়া গর্ত খোঁড়ে, তারা পানি পেয়েই যায়, যতদূর শহরের বিস্তার ততদূর, তার পরে আর না। শহরের সবুজ সীমান্ত সেই ভূগর্ভস্থ কুয়ার কালা পাড়রে বারবার দেখায়, অদৃশ্য এক প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে দৃশ্যমান ভূচিত্ররে, সূর্যের আলোয় ঘুইরা বেড়ানো সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় পাহাড়ের চুনাধরা আকাশের নীচে বেষ্টিত, উপচাইয়া পড়া বাতাসের মাধ্যমে।

ফলে, ইসাউরায় দুই ধরণের ধর্ম আছে।

 

এই শহরের খোদারা, কিছু মানুশের মতে, থাকে গভীরে, সেই কালো লেকের মইধ্যে, যেইটা থেকে ভূগর্ভস্থ নদীগুলা পানি পায়। অন্যদলের মতে, খোদারা থাকে সেই বালতিগুলাতে, যেগুলা তার দিয়া বান্ধা, যখন সেইগুলা কুয়ার কিনারে উইঠা আসে, খোদারা থাকে ঘুরতে থাকা পুলিতে, পানি উঠানো চরকির কপিকলে, পাম্পের হাতলগুলায়, গর্ত থিকা পানি উঠানো বাতাসকলের পাখায়, প্যাঁচানো শলাকাগুলারে সাপোর্ট দিয়া রাখা অস্থায়ী পায়াগুলায়, ছাদের উপরে রণ-পায় বসানো চৌবাচ্চায়, কৃত্তিম নালার ধনুকাকৃতির চিকন খিলানে, সকল জলস্তম্ভে, খাঁড়া পাইপে, প্লাঞ্জারে, ড্রেনে, পুরাপুরি উর্ধ্বমুখী শহর ইসাউরার পলকা মাচার উপরে থাকা হাওয়ানিশানের কাছে যাওয়ার সমস্তটুক উর্ধ্বপথে।

 

 

দূরের এলাকাগুলার খোঁজখবর নেওয়ার জন্যে দয়ালু খান সাবের পাঠানো দূত আর ট্যাক্স কালেক্টরেরা আবার যথাসময়ে কাই-পিং-ফু’তে ফিরা আসত, চলে যেত ম্যাগনোলিয়ার বাগানে, সেই বাগানের ছায়ায় হাঁটাহাঁটি করতে করতে বাদশা তাদের লম্বা লম্বা রিপোর্টগুলা শুনতেন। দূতেরা ছিল নানা জাতির–পার্শিয়ান, আর্মেনিয়ান, সিরিয়ান, মিশরিয় কপ্ট অথবা তুর্কমান; আর সম্রাট এমন একজন, যিনি তার প্রত্যেক প্রজার কাছেই অপরিচিত বিদেশি, এবং, কেবল বিদেশি চোখ আর কানের মারফতেই কুবলাই-য়ের কাছে এই সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব সন্দেহাতীতভাবে প্রমান হইতে পারত। দূতেরা না-বোঝা ভাষায় শোনা সব তথ্য এসে খানরে বলতো, এমন ভাষায় যা খানও বুঝত নাঃ এইরকম ঘোলাঘোলা জটিল শব্দের ভিতর হইতেই বেরোয়ে আসত, ন্যায়ত রাজকোষে জমা পড়া রাজস্বের হিশাব, ফাঁসি দিয়া হত্যা করা কর্মচারীদের নামের প্রথম ও শেষের অংশ, খরার সময় সরু নদীগুলা থেকে পানি পাওয়া খালগুলির আয়তনের খবর। কিন্তু সেই জুয়ান ভিনিশিয় যখন তার অভিযানের বয়ান শুনান, তার আর সম্রাটের ভিতরে একটা আজিব যোগাযোগসূত্র খাঁড়া হয়। এই দেশে নতুন আসা এবং লেভান্ত (ভূমধ্যসাগরের পুবদিকের এলাকাগুলারে ‘লেভান্ত’ কয়)- এর ভাষা সম্পর্কে পুরাপুরি অজ্ঞ মার্কো পোলোর কাছে, নিজেরে প্রকাশ করার উপায় ছিলো শুধু অঙ্গভঙ্গি, লাফঝাঁপ, ভয় অথবা বিস্ময়ের জন্যে কান্নাকাটির ভঙ্গি, জন্তু-জানোয়ার বা পেঁচার ডাক অথবা তার ঝোলা থেকে নেওয়া নানান জিনিশ–উটপাখির পালক, মটরদানা ছোঁড়ার খেলনা গুলতি, স্ফটিকমণি–, এগুলারে দাবার ঘুঁটির মত সে সম্রাটের সামনে সাজায়ে রাখত। কুবলাই যে মিশনে পাঠাইছিলেন, সেখান থেকে ফেরার পরে এই কুশলী বিদেশি মূকাভিনয় করে যেতে থাকেন, যা ব্যাখ্যা করা লাগে সম্রাটেরঃ করমোরান্ট পাখির মুখ থেকে পালায়ে জালের ভিতরে পড়ার জন্যে একটা মাছের লাফ দেওয়ার দৃশ্য দিয়া চিত্রিত করেন একটা শহর;  আরেকটা শহর ফুটায়ে তোলেন, আগুনের ভেতর দিয়া নিরাপদে দৌড়াইতে থাকা এক ন্যাংটা লোকরে দিয়া; তৃতীয় আরেক শহরের দৃশ্য আঁকেন একটা গোল শাদা মুক্তা সজোরে কামড়ায়ে ধরা, ময়লা পড়ে সবুজ হয়ে যাওয়া দুইপাটি দাঁতসহ একটা মাথার খুলি দিয়া। মহানুভব খান সাহেব নিশানিগুলার অর্থ উদ্ধার করতে পারেন, কিন্তু সেই নিশানি আর দেইখা আসা শহরগুলার ভিতরে সম্পর্কটা অধরাই থাইকা যায়; মার্কো তার ভ্রমনের ভিতরে ঘটা কোন রোমাঞ্চকর কাহিনী, শহরনির্মাতার কোন দখল অভিযান, কোন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর ভবিষ্যতবাণী, কোনকিছুর নাম বলার জন্যে চিত্রজট বা শব্দজট খেলা–এগুলার কোনটা অভিনয় কইরা দেখাইলেন কিনা, সম্রাট তা কখনোই জানতে পারেন না। কিন্তু, অস্পষ্ট বা স্পষ্ট যেমনই হউক, মার্কোর দেখানো জিনিশগুলায় ছিল প্রতীকী পাওয়ার, যেগুলা একবার দেখলে, আর ভোলা কিংবা প্যাঁচ লাগায়ে ফেলা সম্ভব না। খান সাবের, তার সাম্রাজ্যটারে মনে হইতে লাগল বালুকনার মতন অস্থিতিশীল আর ইন্টারচেঞ্জেবল তথ্য-উপাত্তের এক মরুভূমিতে প্রতিফলিত, যেইখান থেকে, সেই ভিনিশীয়ের লোগোগ্রাফ (চিত্র ও দৃশ্যের বয়ান) মোতাবেক দৃশ্যমান হইতেছে প্রত্যেকটা শহর আর প্রদেশের মূর্তি!

 

সময়ের সাথে সাথে, অব্যাহতভাবে চলতে থাকা মিশনের ভিতরে ভিতরে, মার্কো জাতীয় মানভাষা এবং গোত্রীয় উপভাষাগুলাসহ তাতারি ভাষা শিখা ফেললো। এইবার তার বর্ণনাগুলা, দয়ালু খান সাবের চাহিদামত, বেশ যথাযথ এবং ডিটেইলড হওয়া ধরল, আর, তাদের কোন অতৃপ্তিজাত কোশ্চেন বা কৌতূহলও আর থাকল না। কিন্তু তখনও, কোন জায়গার ব্যাপারে প্রতিটা ইনফরমেশন  সম্রাটরে মনে করায়ে দিতে লাগল সেই প্রথম অঙ্গভঙ্গি বা বস্তুর কথা, যার মাধ্যমে মার্কো ওই জায়গাটার চিত্রায়ন করছিলেন। তথাপি, নতুন প্রতিটা তথ্য সেই প্রতীক থেকে একটা নতুন অর্থ নিলো, আবার সেই প্রতীকের লগে একটা নতুন অর্থ এডও করলো। কুবলাই-র মনে হইল, এই সাম্রাজ্য ব্যাপারটা, মেবি, মনের ভূতের একটা চক্র ছাড়া আর কিছুই না।

 

‘যেদিন আমি এই সব নিশানিগুলা শিখা ফেলব,’ তিনি মার্কোরে জিগাইলেন, ‘সেইদিন কি শেষ পর্যন্ত আমি আমার রাজ্যের উপর পুরাপুরি দখল আনতে পারব?’ ভিনিশিয় যুবক উত্তরিলঃ ‘হুজুর, এইরকম ভাইবেন না। সেইদিন আপনেও, সকল প্রতীকের ভিতরে একটা প্রতীক হইয়া যাবেন।’

আরও দেখেন

ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’: পর্ব ৫... প্রাসাদের উঁচা রেলিং থিকা মহান খান সাহেব তার সাম্রাজ্যের বিস্তার দেখেন। প্রথমে দেখেন অধিকৃত অঞ্চলগুলারে মিলায়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বিস্তৃত সীমান্তরেখা, ক...
ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’- পর্ব ২...   'অন্য অন্য রাজদূতেরা আমারে দুর্ভিক্ষ, চাঁদাবাজি, নানামুখী ষড়যন্ত্র ইত্যাদি নিয়া সতর্ক করে; অথবা, নীলকান্তমণির খনি, বেজির চামড়ার লাভজনক দামের...
ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর: পর্ব ৪...   অধ্যায়-৪ ~ আম্বর দিয়া বানানো পাইপের গোড়ায় ঠোঁট চাইপা, নীলকান্তমণি হারের উপর লেপ্টে থাকা দাঁড়ি নিয়া, আর রেশমি স্লিপারের ভিতরে, উত্তেজনা...
ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’: পর্ব ৩... কুবলাই খান খেয়াল করলেন যে, মার্কো পোলোর শহরগুলা একটা আরেকটার মতই, যেন এক শহর থেকে আরেক শহরে যাইতে জার্নি লাগে না, খালি উপাদানের পরিবর্তন লাগে। এখন, মা...
তুহিন খান
তুহিন খান

জন্ম ১৯৯৫। কবি ও অনুবাদক। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে অধ্যায়নরত।

error: