fbpx

ঋত্বিক ঘটক: সিনামা পুনরাবিষ্কার

ঘটক কখনো জাক তাতির মাস্টারপিস ‘মঁশিয়ে উলো’স হলিডে’ (১৯৫৩) দেখছিলো কিনা আমার জানা নাই, কিন্তু যতবার ঘটকের সেকেন্ড ফিচার অযান্ত্রিক দেখি, তাতির সিনামার কথা মনে পড়ে যায়। তাতি এই সিনামা দিয়ে আবিষ্কার করে তার সবচে জনপ্রিয় চরিত্র উলোর —তাতির নেক্সট তিনটা সিনামার (মন অঙ্কলা, প্লেটাইম  & ট্র্যাফিক) প্রধান চরিত্র ছিলো এই উলো — উপস্থিতি বুঝাতে প্রতিবার উলোকে স্ক্রিনে দেখানোর দরকার নাই। জাস্ট উলোর গাড়ির (বিব্রতকর-রকমের-ঘর্ঘর-আওয়াজ-করা অ্যান্টিকধাঁচের এই গাড়ি ছিলো উলোর একমাত্র দোসর; সিনামার শুরুতেই, সামারটাইম বিচ রিসোর্টে সবার মাঝে এই গাড়ি উলোকে পুরোদমে উদ্ভট করে তোলে) হর্ন দিয়েই উলোর উপস্থিতি দর্শকদের বুঝানো সম্ভব।

Monsieur Hulot’s Holiday (1953) by Jacques Tati

অযান্ত্রিকের ক্যাবচালক বিমলের সাথেও তার ভাঙাচোরা গাড়ির সিমিলার এসোসিয়েশন পাওয়া যায়। ইন ফ্যাক্ট এই গাড়ির একটা নামও আছে — জগদ্দল। এমনকি ফিল্মের ক্রেডিট লাইনেও জগদ্দলের নাম আছে — যা মিথোজিবীতার প্রতীক বলে মনে হয়। ইন্টারেস্টিংলি অযান্ত্রিকের সাউন্ডট্র্যাকে ঘটক এমন কিছু আর্টিফিশিয়াল সাউন্ড ইউজ করছে যা অদ্ভুতভাবে সায়েন্স ফিকশনের কথা স্মরন করায় দেয়, যেন ঘটক তার ফ্যাসিনেশন, বিস্ময় আর আনন্দ ব্যক্ত করতে চাইছে, বিমল তার শেভ্রলেট ১৯২০-এর সাথে এমনভাবে কথা বলে যেন তা একটা জীবন্ত প্রানি, এবং তার ব্যক্তিত্বের-ই আরেক এক্সটেনশন। (সাক্ষাৎকারে ঘটক জানায় সে মানুষ আর মেশিনের যে সম্পর্ক, তার দার্শনিক ইমপ্লিকেশন নিয়ে বহু বছর ভাবছে — এই সম্পর্ক এমনকি ফিল্মের টেকনোলজির বেলাতেও প্রাসঙ্গিক)। আর অনস্ক্রিন-অফস্ক্রিনে যেসব সাউণ্ড ইউজ করে ঘটক জগদ্দলের কন্ডিশন আর ফিটনেস বুঝাইছে তা এই সিনামার ট্র্যাজিকমিক টোনের মেজর অ্যাস্পেক্ট, এবং এইসব আর্টিফিশিয়াল সাউন্ড ফিল্মের মিউজিক কিংবা সিনামাশেষে জগদ্দলের বিকল হয়ে যাওয়ার পর বিমলের কান্নার শব্দের সমান গুরুত্ব বহন করে। শেষ সিনে গাড়ির ধ্বংসাবশেষ টেনে নেয়ার সাউন্ড তীক্ষ্ণ ও ঝাঁজালো হলেও বাচ্চা ছেলেটা যখন গাড়ি-খসা হর্ন টিপে ভেঁপু বাজায়, বিমলকে আমরা তখন হাসতে দেখি — যেন রেভেলেইশন।

সংক্ষেপে, স্বীকার করতেই হবে যে সাউন্ড এই সিনামায় ইমেজের অনুষঙ্গ আর পরিপূরকের চে-ও বেশি কিছু। সত্যি বলতে, যখন আমরা ঘটকের অন্যান্য সিনামার সাউন্ডট্র্যাক বিবেচনা করি, যেমন মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), তখন বুঝতে পারি, ঘটক কার্যত তার সিনামাগুলো দুইবার করে বানাইছে — প্রথমবার যখন শ্যুট করছে, আর দ্বিতীয়বার যখন সাউন্ডট্র্যাক তৈরি করছে।

অযান্ত্রিক, বিহাইন্ড দ্য সিন

ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট এই সিনামার DVD বের করছে, তাতে গার্ডিয়ানের সাবেক ফিল্ম ক্রিটিক ডেরেক ম্যাল্কম যে ডিটেইল্ড ইন্ট্রোডাকশন দিছেন সেখানেও তিনি সাউন্ডে জোর দিছেন। ম্যালকম এই সিনামায় সাউন্ডের ইনোভেটিভ ব্যবহারের নাম দিছেন ‘ন্যাচারাল সাউন্ড’, যদিও আমি ‘ডিরেক্ট সাউন্ড’ বলার পক্ষপাতি। ঘটকের ছেলে ঋতবান থেকে জানছি তার বাপে নিজের সিনামায় কোনো ধরনের ডিরেক্ট সাউন্ড প্রয়োগ করে নাই, বরং সব সাউন্ড-ই পোস্ট-ডাবড্‌। শেষ  তথ্যটা বরং আরও জোরালো করে যে ঘটক আসলে কোন মাত্রায় সাউন্ডট্র্যাক কম্পোজ করতো! এবং আমাকে যে বিষয়টা সবচে তাড়িত করে তা হইলো: ঘটকের এই হাইলি আনর্থোডক্স সাউন্ড কম্পোজিশন তার সিনামার দৃশ্যগুলার ড্রামাটার্জি (=নাট্যকলা) নতুনভাবে রিড করতে বাধ্য করে, এবং আমরা যেকোনো সিনের কোন্‌ কোন্‌ ডিটেইলে মনোযোগ দিবো আর কোন্‌ কোন্‌ ডিটেইলে দিবো না সেইটা নির্ধারন করে দেয়।

ঘটক তার সিনামায় ভিজ্যুয়াল মিজ-অঁ-সিন আর অরাল (aural) মিজ-অঁ-সিন আলাদা আলাদা লেয়ারে কম্পোজ করে এই কায়দা রপ্ত করছিলো। সে ঘনঘন ডিপ-ফোকাস সিনেমাটোগ্রাফি ইউজ করতো, ব্যাকগ্রাউন্ড আর ফোরগ্রাউন্ডের মাঝে একটা নির্দিষ্ট কাউন্টারপয়েন্ট আরোপ করতো যা কিনা সময়ে সময়ে অরসন ওয়েলসের আর্লি সিনামার কথা মনে করায় দিতো। (সাউথ কোরিয়ার জিওঞ্জু ফিল্ম ফেস্টে ঘটক রেট্রোস্পেকটিভে শেষবার মেঘে ঢাকা তারা দেখার সময় ওয়েলসের সেকেন্ড ফিচার, দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট অ্যাম্বারসন্স-এর সাথে ঘটকের সিনামার মধ্যকার মিল আমাকে অবাক করছিলো। অ্যাম্বারসন্স-ও কালচারাল পরিবর্তনের কারনে ভাগ্যহত এক পরিবারের ট্র্যাজিক পোর্ট্রেয়াল, এবং এই সিনামাতেও পরিবারের কয়েক সদস্যের স্যাক্রিফাইজরে হাইলাইট করা হইছে)। আর ঘটক মিউজিক, ডায়লোগ সাথে সাউন্ড ইফেক্ট এমনভাবে লেয়ার করতো যে মনে হইতো খুব ন্যাচারাল (কড়াইয়ে ভাজির সাউন্ড, ম্যালকম এইটার কথা মেনশন করছে DVD-তে) অথবা এক্সপ্রেশনিস্ট (বারেবারে চাবকানোর সাউন্ড, ম্যালকম এইটার কথাও মেনশন করছে)। সাধারনত যেকোন শটে আমাদের ভিজ্যুয়াল অ্যাটেনশন ফোরগ্রাউন্ড থেকে ব্যাকগ্রাউন্ডে শিফট করে তারপর আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়, এমনটা ঘটে ইমেজে থাকা লেয়ারগুলার সাজানোর স্টাইলের কারনে; আমাদের অরাল (aural) অ্যাটেনশনও এরকম সময়ে সময়ে মিউজিক, ডায়লোগ আর সাউন্ড ইফেক্টের মাঝে শিফট করতে থাকে, যা কিনা আবার ঐ ইমেজের সাপেক্ষে আমাদের পার্স্পেক্টিভের দিক্‌পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫-১৯৭৬)

একজন ফিল্মমেইকারকে ফিল্ম হিস্ট্রির সাথে রিলেইট করা যায় দুইভাবে: প্রথমভাগে থাকে সেইসব মেইকার যারা বিদ্যমান প্রথামাফিক কাজ করে, আরেকভাগে থাকে যারা এতটাই মৌলিক, মনে হয় যেন কেউ কোনোদিন ফিল্ম বানায় নাই আগে। আই থিঙ্ক এইটা বলা মোটামুটি নিরাপদ যে আমাদের দেখা ৯৯% সিনামা প্রথম স্টাইলে বানানো। ডেনমার্কের ন্যারেটিভ ফিল্মমেইকার কার্ল ড্রেয়ার এবং আম্রিকান এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্মমেইকার স্ট্যান ব্র্যাকেইজ হচ্ছে দুই ব্যতিক্রম যারা দ্বিতীয় পদ্ধতি ফলো করছে। যদিও দুইজনেরই বিদ্যমান প্রথামাফিক কাজ আছে, তারপরও তাদের সম্পাদনার স্টাইল, ক্যামেরার মুভমেন্ট আর টেম্পো বা ভিজ্যুয়াল টেক্সচার প্রচলিত সিনামার ধরন থেকে বেশ আলাদা। ফলে এই দুই আর্টিস্টের কাজ পুরোপুরি রসাস্বাদন করতে গেলে দর্শককে তার রেগুলার ভিউয়িং হ্যাবিট ভেঙে বেরিয়ে আসতে হয়। এই চেষ্টাটুকুন না থাকলে, ব্র্যাকেইজ বা ড্রেয়ারের সিনামার সাথে যে কারও মোলাকাত কিছু নির্মম বিভ্রান্তির জন্ম দেয়।

ঘটক, আমার মতে, আরেক বিরল ব্যতিক্রম যে এই দ্বিতীয় পথে হাঁটছে। ঘটকের সাউন্ডট্র্যাক কম্পোজ করার পদ্ধতি, সাথে সিনামায় সাউন্ড আর ইমেজকে সে যেভাবে ইন্টাররিলেইট করছে একজন ফিল্মমেইকার হিশাবে তা তাকে অনন্য করে তুলছে। অন্য কথায়, ঘটক সিনামাকে তার নিজের খাতিরে পুনরাবিষ্কার করছে। প্রথমত কনসেপচুয়ালি, তার সামগ্রিক কাজের ধরনের কন্টেক্সটে, এবং প্র্যাক্টিক্যালি, কোনো সিনে হুট করে সাউন্ড অন করে কিংবা সাউন্ড অফ করে, কখনো কখনো মুড আর টোন ভেঙে দিয়ে। এভাবে অলরেডি শ্যুট করা শটগুলা ঘটক সিনামায় নতুনভাবে, ভিন্ন পার্স্পেক্টিভে রিড করাতো।

তর্ক করাই যায় যে এই ভাঙচুরগুলা হয়তো সচেতন ছিল না। অন্তত আমি ঘটকের কোনো লেখায় বা লেকচারে কিছু পাই নি। ‘নিরীক্ষামূলক ছবি’, ‘পরীক্ষা- নিরীক্ষামূলক চিত্র এবং আমি’, ‘ছবিতে শব্দ’ এই প্রবন্ধগুলায় এ সম্পর্ক একটা অক্ষরও বলে নি ঘটক। কিন্তু একই ভাবে, কার্ল ড্রেয়ারও নিজের কোনো লেখায় তার সিগনেচার আনর্থোডক্স এডিটিং নিয়ে কিছু বলে নাই। সম্ভবত শিল্পির শৈল্পিক অভিপ্রায় নিয়ে শিল্পি নিজে খুব ভালো বলতে পারে না এবং অতি অবশ্যই শিল্পি কী বলে  তার চে গুরুত্বপূর্ন শিল্পি কী করে (অন্তত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে)। ঘটকের সিনামার সাউন্ডট্র্যাকে এইসব ভাঙচুর তাই তার থিওরেটিক্যাল স্টেইটমেন্টের চে বেশি গুরুত্ব বহন করে, এবং তার সিনামা পুনরাবিষ্কারের ঢং আরও ভালোভাবে ইলুস্ট্রেইট করে। আরও সুন্দর করে বলা যায়, দর্শক পুনরাবিষ্কার করেই তারা সিনামাকে পুনরাবিষ্কার করে — প্রতিটা মুহূর্তে, প্রচলিত সাউন্ডট্র্যাক ফর্ম্যাট ভেঙে তারা দর্শককে সিনামার সাথে আরও বেশি ইনক্লুড করে। আর এগুলাই সত্যিকার অর্থে পিউর ক্রিয়েশন মোমেন্ট।

 


[লেখক পরিচিতি: জোনাথন রোজেনবাম আম্রিকান ফিল্ম ক্রিটিক। শিকাগো রিডারের হেড ক্রিটিক ছিলেন ২২ বছর। ফিল্ম নিয়ে বই লিখেছেন ১৩ টা। টাচ অফ ইভিল , রিলিজের ৪০ বছর পরে, ইউনিভার্সাল পিকচার্সকে লেখা অরসন ওয়েলসের মেমো থেকে যখন রি-এডিট হয়, তখন কনসাল্ট্যান্ট ছিলেন। গদার তার সম্পর্কে বলছিলো, “হি ইজ ওয়ান অফ দ্য  বেস্ট; এই সময়ে ফ্রান্সে তার সমকক্ষ একটা লেখকও নাই। সে আমারে আঁদ্রে বাঁজার কথা মনে করায় দেয়।”
এই নন-ফিকশনটি Goodbye Cinema, Hello Cinephilia (2010) বই থেকে নেয়া]

আরও দেখেন

১০-এর দশকের সেরা ১০ সিনামা (so far)... ’১০-এর দশক শেষ হতে এখনো ২ বছর বাকি, কিন্তু আমরা, মাদারটোস্ট সিনে টিম ঠিক করছি দশকওয়ারি সিনামার তালিকা করবো উলটা দিক থেকে। ’১৭ মাত্র ফুরায় গেল, অস্কার ...
ট্যারান্টিনো on পাল্প ফিকশন... যখন পাল্প ফিকশন নিয়ে কাজ শুরু করি তখন যেকরেই হোক একটা ফিচার ফিল্ম বানাইতে হবে — এই ধান্ধায় ছিলাম। ঠিক করলাম ছোটখাট একটা ক্রাইম স্টোরি লিখে সেটা নি...
আবীর হাসান একা
আবীর হাসান একা

True life is elsewhere. We are not in the world.

No Comments Yet

Comments are closed

error: