এমারসন লেক অ্যান্ড পালমার: ইলিউশনের মিউজিক, মিউজিকের ইলিউশন

এমারসন লেক অ্যান্ড পালমারের সাথে পরিচয় হুট করে, এই পরিচয়গুলা হুট করেই হয়। আর পরিচয় হওয়ার পর মনে হয় ‘আরো আগে ক্যান হইলো না?’ কেইথ এমারসন, গ্রেগ লেক আর কার্ল পালমার মিলে যে বস্তুটা তৈরী করেছেন, সেটিকে মধু মধু বিষ বললেই মনে হয় যথার্থতার কাছাকাছি আসে। ব্যান্ড হিস্ট্রি লেখা মনিটর স্কৃণের সামনে বসার উদ্দেশ্য না, বরং ব্যান্ডের সাথে নিজের ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার জায়গাটা শেয়ার করা……
যাই হোক, পরিচয়ের কথা হচ্ছিলো। বিখ্যাত গিটারিস্ট সাকিব ভাই একদিন ফেসবুকে নক করে বললেন ‘এমারসন লেক অ্যান্ড পালমার শুনবি?’ সাকিব ভাই যত ভালো গিটারিস্ট, তার চেয়ে ভালো শ্রোতা, কিন্তু তার মধ্যে ফাউলামির স্বভাব যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান। জিজ্ঞাস করলাম ‘কিরকম গান করে ভাই?’ ভাই বলে ‘যা ইচ্ছা তাই বাজায়’! এরপরে অনেকদিন আর খোঁজ ছিল না কোনো, আমাদের এরকম ফুসফাস হাওয়া হয়ে যাওয়া ব্যাপারটা নিয়মিত ঘটে, ততদিনে জেনেসিস, কুইন, দ্যা হু, দ্যা বার্ডস ইত্যাদি ব্যান্ডে ভাইবন্ধু সমেত বুঁদ হয়ে আছি, আর বিটলস, পিংক ফ্লয়েড, লেড জেপলিন সাথে গ্যারি মুর, স্টিভেন উইলসন ডেইলি রুটিনের মত……এরমধ্যে খোঁজ পাইলাম ‘ইয়েস’ এর, সে আলাদা ইতিহাস। কয়েকদিন পরে আড্ডা দিতে দিতেই সাকিব ভাই বললেন ‘তোরে একটা জিনিস পাঠাইতেছি, শুনে দেখ, হেবি পিনিক’। বাসায় ফিরে শুনতে বসলাম, ঐটা ছিল ‘Trilogy’ অ্যালবামের ইউটিউব লিংক, তখনো বুঝিনাই রক মিউজিকের ইতিহাসের কত বড় একটা কাজ কানে লাগায়ে বসে আছি। প্রোগ্রেসিভ রক শুনা পড়ে অনেক আগের থেকে, বিটলস, জেনেসিস, পিংক ফ্লয়েড, লেড জেপলিন, ডিপ পার্পল থেকে শুরু করে ওপেথ, ড্রিম থিয়েটার, টুল, পরকুপাইন ট্রি- এদের সবার গানই শুনা হইছে প্রচুর, প্রায় সবাইই আলাদা আলাদা ফ্লেভারে বুঁদ করে রাখছে, ইএলপি শুরুতেই আলাদাভাবে কান কেড়ে নিলো একটা জিনিস দিয়ে- কিবোর্ড।
কেইথ এমারসন – ‘Trilogy’ অ্যালবামের শুরুতে, প্রথম ট্র্যাক ‘The Endless Enigma Part-1’ এর শুরুতে চিকন বাশির মত শব্দ, এরপরে বীণের মত সাউন্ড, তারপর আঙুলগুলো কী গুলোকে আদর করে করে দৌড়াতে শুরু করল। ৪২ মিনিটের অ্যালবাম প্রথম দিনেই বার পাঁচেক শুনলাম, অ্যালবামের কোনো গান আলাদাভাবে ভালো লাগলো না, বরং এমারসন লেক অ্যান্ড পালমারের বিশেষত্ব হল ট্র্যাক যে শেষ হল, আরেকটা ট্র্যাক শুরু হল এই ব্যাপারটা টের পাওয়া যায় না।

 

Trilogy অ্যালবামের গানগুলো হল ‘The Endless Enigma (Part One)/Fugue/The Endless Enigma (Part Two)’, ‘From The Beginning’,‘The Sheriff’,‘Hoedown (Taken from Rodeo)’,’Trilogy’,‘Living Sin’,’Abaddon’s Bolero’. ‘From The Beginning’ আর ‘Living Sin’ ট্র্যাক দুইটা নিজের অলটাইম ফেভারিটের মধ্যে পড়ে গেল কয়েকবার শুনার পরেই, আমি খাই -এমারসন চলে, ঘুমাই- লেক চলে, আমি যখন গোসলে তখনো পালমার সাহেব ড্রামস বাজায়। গত ছয়মাস এইভাবেই যাচ্ছে।
Trilogy এর পরে আমি তিন সাহেবের মিউজিকে আচ্ছন্ন, তিনদিন ধরে শুনলাম বিশ মিনিটের ট্রাক ‘Tarkus’, একে একে ‘Emerson Lake and Palmer’, ‘Pictures at an Exibition’, ‘Brain Salad Surgery’, ‘Love Beach’ শুনে ফেললাম। ১৯৭০ এ ব্যান্ড ফর্ম করে, ১৯৭৯ এ আলাদা হয়ে যাওয়ার পরে এমারসন আর লেক মিলে কিছু কাজ করেন, সঙ্গত কারণেই সেগুলোর প্রসঙ্গ আসছে না। ‘Black Moon’ আর ‘In the Hot Seat’ অ্যালবাম দুটো রিইউনাইট হবার পরে করা।

Related image
[অ্যালবাম কভারঃ Brain Salad Surgery; Emerson Lake and Palmer]

যাই হোক, আসছি ব্রিটিশ সাহেবদের মিউজিকের ব্যাপারে। প্রোগ্রেসিভ রক-এ ক্ল্যাসিক্যালের প্রভাব থাকে, এমারসন লেক অ্যান্ড পালমারের মধ্যে সেটা রীতিমত প্রকট, তারা ইভেন বাখের ‘French Suite No. 1 in D minor’ করছে নিজেদের সেলফ টাইটেল প্রথম অ্যালবামেই। জ্যাজ, ক্লাসিক্যাল, সিম্ফোনিক রক মিলায়ে এমারসন লেক অ্যান্ড পালমার এক উন্নত জগাখিচুড়ি, যেইখানে মিউজিককে লিড করে কেইথ এমারসনের কিবোর্ড। মুগ সিন্থেসাইজার নিয়ে দুনিয়া ঘুরে ঘুরে শো করার আইডিয়া এই ভদ্রলোকের মাথায়ই প্রথম আসে, এর আগে বিটলস বা রোলিং স্টোনস রেকর্ডিংএ এই জিনিস ইউজ করছে। সিন্থেসাইজার এমারসন পান প্রথম অ্যালবামের রেকর্ডিং এর শর্ত হিসাবে। হ্যামন্ড অর্গান আর মুগ সিন্থেসাইজার দিয়ে অদ্ভূত সব ইফেক্ট বের করা, আপাতভাবে শুনলে মনে হয় ‘যা ইচ্ছা তাই’ বাজাচ্ছে। ঐটাই ইএলপি’র ব্যাপার, পালমার সাহেবের ড্রামস বা লেক সাহেবের বেজ অথবা গিটার- সবকিছুই যেন ইচ্ছামত বাজে, আবার ইচ্ছামত বাজেও না। কখনোই শুনে ধারণা করা যাবে না পরের নোটখানা কি বাজতে যাচ্ছে, কম্পোজিশনের মধ্যে দুম করে চারিদিকে সাইলেন্ট করে দিয়ে সিম্ফনিক কিছু বেজে ওঠা, বা গিটারে মিষ্টি প্লাকিন, তার মধ্যে আবার ডিমিনিশড নোট- একেবারে যাচ্ছেতাই। লেক অসাধারণ ভোকাল ও বেজিস্ট, আবার দরকারমত একুস্টিক বা ইলেকট্রিক গিটারও বাজাইছেন আর পালমারের ড্রামসকে কম্পোজিশনের প্রাণ। জ্যাজ ড্রামিং অসাধারণ পালমারের, হাত দুইটা মেশিনের মতন চালান।‘Pictures at an Exibition’ অ্যালবামের একটা লাইভ আছে, ১৯৭০ এর সম্ভবত, দেখলে বোঝা যায় প্রোগ্রেসিভ রককে পাগলামির কোন স্তরে নিয়েগেছেন তিনজন মিলে।

 

এই অ্যালবামের ট্র্যাক ‘The Old Castle’ বা ‘The Gnome’ এর মত গানগুলো মিউজিককে নিজের ভেতরে একই সাথে খুব সহজ আবার খুব কঠিন করে তোলে। সাউন্ড নিয়ে কি করা যায়, কতদূর করা যায় শুনলে তব্দা খেয়ে খানিকক্ষণ বসে থাকা লাগে। লিরিক্যালি অদ্ভুত কাব্যিক, ‘Tarkus’, ‘Lucky Man’, ‘The Great Gates of Kiev’, ‘Jeremy Bender’- লিরিকে ভ্যারিয়েশন কম না, এমারসন লেক অ্যান্ড পালমারের একটা গান শুনে কখনো রেখে দেওয়া যায় না, এই ম্যাজিকটা সব ব্যান্ড তৈরী করতে পারে না।

 

পুরো অ্যালবাম কানে হেডফোন দিয়ে চোখ বুজে শুনতে শুনতে কয়েকবার গা শিরশির করে উঠবে, এবং ঘন্টাখানেক পর সিগারেট জ্বালায়ে বারান্দায় বসে চিন্তা করব ‘কি শুনলাম’!আর কানের মধ্যে বাজতে থাকবে-
They were, sent from [to] the gates
Ride the tides of fate
Ride the tides of fate
They were, sent from [to] the gates
In the burning all are [of our] yearning
For life to be
There’s no end to my life
No beginning to my death:
Death is life
(ট্র্যাকঃ The Great Gates of Kiev, লিরিকঃ Mussorgsky, Lake Emerson)

 

[ভিডিও লিংকঃ এমারসন লেক অ্যান্ড পালমার, লাইভ অ্যাট জুরিখ, ১৯৭০]

 

ফেইসবুক কমেন্ট
  • রেটিং স্কোর
    7
The Good
The Bad
710
আশফিক আহমদ
আশফিক আহমদ

আমি সেই মানুষ বুকের বোতামগুলো নেই বহুরাত যার কাঁধের ওপর সূর্য ডুবে যাবে।

No Comments Yet

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: