fbpx

কার্ট ভনেগাটের লাস্ট ইন্টারভিউ

 

প্রশ্নঃ সৃষ্টির কোন দিকটা বেশি টানে আপনাকে, লেখকের নাকি আর্টিস্টের জীবন?

ভনেগাটঃ শখের বশে সারাটা জীবন ভরেই কিছু না কিছু এঁকেছি। কাউকে সেভাবে দেখানোর জন্য না। কেবল আনন্দের জন্য। এবং সবাইকে এইৃ ব্যাপারে সাজেস্ট করি। লোকেদের বলি, শিল্পের যেকোন মাধ্যমে লেগে থাকেন, খারাপ বা ভাল যাই হোক না কেন (করতে থাকেন)। কারণ হয়ে উঠার ব্যাপারটায় আপনার এক ধরণের অভিজ্ঞতা হবে, এটা আপনার আত্মাকে বিকশিত করবে। এর মধ্যেঃ- গান গাওয়া, নাঁচা, লেখা, আঁকা, যেকোন ধরণের গানের যন্ত্র বাজানো। ইদানিংকার একটা ব্যাপার আমি অপছন্দ করি যে, স্কুল কমিটি তাদের কারিকুলাম থেকে সব ধরণের শিল্পকেই বাদ দিয়ে দিয়েছে। তারা বলে, এটা নাকি জীবন ধারণের ক্ষেত্রে কোন কাজেই আসবে না। ভাল, অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে যেগুলো জীবন ধারণের জন্য অপ্রয়োজনীয়।(হাসি।) আনন্দদায়ক জীবন আরো আনন্দদায়ক জীবন তৈরি করতে পারে।

প্রশ্নঃ উত্থানের প্রক্রিয়ার মধ্যেই আপনি পৃথিবীকে অনেক উত্তেজনা ও হাস্যরস দিয়েছেন। এই হলো ব্যাপার, তাই না?

ভনেগাটঃ আমার পুত্র মার্ককে জীবন সম্পর্কে কি চিন্তা করে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে বললো, ‘আমরা এইখানে এসেছি একে-অপরকে সাহায্য করার জন্য, যাই হোক না কেন।’ আমি মনে করি, উত্তরটা বেস্ট। আপনি যেকোন কাজই করতে পারেন যেমন: কমেডিয়ান, লেখক, পেইন্টার, মিউজিশিয়ান। সে একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। একে-অন্যকে সাহায্য করতে আমাদের জন্য বিভিন্ন ধরণের কাজ আছে। যেকোন কিছুই হতে পারে, যা যে কাউকে সাহায্য করতে পারে। মিউজিশিয়ানরা সত্যি আমাকে খুব সাহায্য করেছে। আমি যদি তাদের মত হতে পারতাম, কারণ তারা অনেক অনেক সাহায্য করে। জীবনের মূল্যবান মুহূর্তগুলা ফিরে পেতে মিউজিক সাহায্য করে।  

প্রশ্নঃ ‘‘সিরিয়াসনেসের অভাবই,’’ আপনি লিখেছেন,‘‘দারুণ সব অন্তর্দৃষ্টির দিকে নিয়ে গ্যাছে।’’

ভনেগাটঃ হ্যাঁ। পৃথিবী প্রচন্ড রকমের গম্ভীর। কোন শিল্পকর্মের উপর ক্ষেপে যাওয়া হট ফাজ সানডের (Hot fudge sundae)* উপরে ক্ষেপে যাওয়ার মতই ব্যাপার।

প্রশ্নঃ প্রায় চল্লিশ বছর ধরে লোকজন এখনও আপনার স্লটার-হাইজ-৫ পড়ছে এবং তা খুবই আনন্দের সঙ্গে। আপনার বইগুলা সবাই এত পছন্দ কেন করে?

ভনেগাটঃ আগেও বলেছি: আমি লিখি বাচ্চাদের ভয়েসে। সেইজন্য হাই-স্কুলে আমাকে পড়া হয়।(হাসি) আমি খুব অল্প সংখ্যক বড় বাক্য ব্যবহার করেছি। আশা করি আমার আইডিয়াগুলো একদম জীবন্ত, যদিও বাক্যগুলো খুবই সিম্পল। এই সিম্পল বাক্যগুলাই আমাকে খুব সাহায্য করেছে। কখনও সেমি-কোলন ব্যবহার করি না। সেমিকোলন ব্যবহার করলে পড়তে কিছুটা সমস্যা হয়, বিশেষ করে হাই স্কুলে। আর অবশ্যই জটিলতা পরিহার করি। কেউ একটি কথা বলল-শুনলাম-কিন্তু বুঝলাম না মানে তাদের কথার মিনিং আলাদা, তাদেরকে আমি পছন্দ করি না।

প্রশ্নঃ দশ বছর আগে যখন ‘টাইমকোয়েক’ প্রকাশ হয়েছিল, বলেছিলেন লেখক হিসিবে আপনি রিটায়ার্ড। তার পরে দুইটা প্রবন্ধের বই, ‘ড.কেভোরকিয়ান’ এবং বেস্ট সেলার বই ‘এ ম্যান উইদাআউট এ কান্ট্রি’ প্রকাশিত হয়। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুক। অবাক হয়েছি যে, ভিজুয়াল আর্ট আপনার জীবনে লেখার একটি বিকল্প হিসিবে কাজ করে।  

Image result for a man without a country kurt vonnegut poster
‘এ ম্যান উইদাউট এ কান্ট্রি’ বইয়ের প্রচ্ছদ

ভনেগাটঃ ওয়েল, এইগুলা বৃদ্ধ বয়সের কাজ।(হাসি) আপনি কি জানেন, সিগারেট কম্পানির নামে আমি মামলা করেছি, কারণ তাদের সিগারেট আমাকে এখনও হত্যা করতে পারে নাই।

প্রশ্নঃ বসে বসে লেখা অথবা তুলি হাতে কিছু আঁকা, দুইটা কি আপনার জন্য আলাদা?

ভনেগাটঃ না। ষাট দশকে ইউনিভার্সিটি অফ আইওয়ায় লেখালেখির ওয়ার্কশপের কোর্সে পড়াতে যেতাম এবং প্রতি সেমিস্টারের শুরুতে সবার উদ্দেশ্যে বলতাম,‘এই কোর্সের রোল মডেল হলো, ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ, যে তার ভাইয়ের কাছে মাত্র দুইটা পেন্টিং বিক্রি করেছিল।’(হাসি) আমি জাস্ট বসে পড়ি এবং অপেক্ষা করতে থাকি ভিতর থেকে কি আসে, এটাই হচ্ছে আমার লেখা বা আঁকার পদ্ধতি। এবং পরে তা আসেও। এমন সময়ও গেছে যখন ভিতর থেকে কিছুই আসে নি। জেমস ব্রুকসকে (ফাইন এ্যাবসট্রাক-এক্সপ্রেসসনিস্ট) জিজ্ঞেস করেছিলাম পেইন্টিং-এর ক্ষেত্রে কোন ধরণের প্যাটার্ন সে ব্যবহার করে। সে উত্তর দিয়েছিলো, ‘ক্যানভাসে প্রথমে তুলির আচড়  রাখি এবং ক্যানভাসই বাকি অর্ধেক কাজ করে দেয়।’ সিরিয়াস পেইন্টার-রাই এমন। তারা ক্যানভাসের অর্ধেক কাজের জন্য অপেক্ষা করে।(হাসি) আসো আসো, জেগে উঠো।

প্রশ্নঃ বর্তমানে আমরা সম্পূর্ণ ভিজুয়াল দুনিয়ায় বসবাস করি। শব্দের কি এখনও কোনো শক্তি বাকি রয়েছে?

ভনেগাটঃ কয়েক বছর আগে একটি আলোচনা সভায় আমি এবং আমার দুই বন্ধু জোসেফ হেলার ও উইলিয়াম স্টাইরন (দুইজনেই মৃত) উপস্থিত ছিলাম। আমরা উপন্যাসের মৃত্যু এবং কবিতার মৃত্যু নিয়ে কথা বলছিলাম। স্টাইরন একটা বলে যে, উপন্যাস সবসময়ই একটা এলিটিস্ট ঘরানা ছিল। এটা হচ্ছে অল্প সংখ্যক মানুষের জন্য, কারণ খুব অল্প লোকই ভাল মত পড়ে। আমি বলেছিলাম, উপন্যাস শুরু করা মানেই একটি মিউজিক হলে প্রবেশ করা এবং হাতে একটি ভায়োলিন নেওয়া। তোমাকেও পার্ফম করতে হবে।(হাসি) ফোনেটিক চিহ্নের আনুভূমিক লাইন এবং আরবি নাম্বারগুলাকে ঠিকমত ঠাওরাতে না করতে পারলে নিজের মাথায় সেগুলোকে ঠিক মত ভিজুয়ালাইজ করা সম্ভব না। সুতরাং পাঠকদেরও পার্ফম করতে হবে। যদি আপনি তা পারেন, তাহলে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে হারমান মেলভিলের সঙ্গে তিমি মাছ ধরতে যেতে পারবেন অথবা ম্যাডাম বোভারি প্যারিসে গিয়ে নিজের জীবনকে কিভাবে জগাখিচুরী বানিয়েছিলেন তা দেখতে পারবেন। আপনি সবকিছুই বসে বসেই দেখতে পারবেন একেবারেই ছবি এবং সিনামার মতন।

প্রশ্নঃ অনেক বছর আগে বলেছিলেন, একজন লেখকের কাজ হচ্ছে একজন অপরিচিত লোকের সময় ব্যয় করা যাতে তাদের মনে না হয় যে, সময় আসলেই নষ্ট হচ্ছে। এখন কিন্তু অপরিচিত লোকের সময় কাটানোর অনেক পথ রয়েছে।

ভনেগাটঃ ঠিকাছে। সময় কাটানোর অনেক কিছুই আছে। আগেকার দিনে মানুষ শীতকালে কি করবে সেটা ভেবেই পেত না। তারপর একটি ঢাউস সাইজের বই বের হয়ে আসল-বিশাল, চমৎকার বই-এবং প্রত্যেকেই সেই বইটা পড়ে সময় কাটাতে চাইল। টেলিভিশন আবিষ্কারের আগে এটা একটা প্রাচীন পরীক্ষাও বলতে পারেন, যেখানে লোকজন কাগজের উপর কালো কালি দেখার জন্য উদগ্রীব হয়েছিল। আমি নিজেই বড় হয়েছি রেডিও’র যুগে। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই রেডিও চালু করতাম। সেখানে ফানি কমেডিয়িান ছিল, সুন্দর সুন্দর গান বাজত এবং নাটকও ছিল। রেডিও শুনে অনেক সময় কাটাতাম বলতে পারেন। এখন, সুন্দর সময় কাটানোর জন্য আপনাকে শিক্ষিত হতে হবে এমন কোন কথা নেই।

প্রশ্নঃ আপনি বলেছিলেন, পৃথিবীতে এখন সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হচ্ছে টেলিভিশন।

ভনেগাটঃ অব্যশই। এটা স্বপ্নের মত কাজ করে। এ্যাটেনশন ধরে রাখার ক্ষমতা এটার খুবই ভাল, বলা যায় অসাধারণ। প্রচুর মানুষের নিকট টিভি হচ্ছে তাদের জীবন। আগে বাড়ি থেকে চার্চ মানুষদের ভাল সঙ্গ দিত। এখন দেখেন, প্রতিবেশী বা পরিবারের কি হচ্ছে তা দেখার অত সময় নেই, টেলিভিশন চালু করলেই অনেক প্রতিবেশি আর পরিবার পাওয়া যায়। আমি জানি না, আপনি শুনেছেন কিনা, বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে বের করেছে যে বাচ্চারা বিশ্বাস করে একটি এ্যারোপ্লেন তাদের মা। মানুষ এমন কিছুই বিশ্বাস করে যা আসলে সত্য নয়, এবং তা ঠিকও আছে। এবং টিভি হল তাদের মধ্যে একটি।

প্রশ্নঃ বাই চান্স, আপনার দ্বারা কি আর কোন বই লেখা সম্ভব?

ভনেগাটঃ না। দেখুন, আমার বয়স ৮৪। ফিকশন রাইটাররা তাদের সবচেয়ে ভাল কাজগুলো করে যখন বয়স ধরেন ৪৫। দাবারুরা ৩৫ পর্যন্ত, বেসবল প্লেয়ার-রাও। লেখার জন্য তো অন্যদের মাঠ ছেড়ে দেওয়া দরকার, তাই না? তাদেরকেই করতে দ্যান।

প্রশ্নঃ তাহলে বৃদ্ধ লোকদের  কী হবে?  

ভনেগাটঃ আমার দেশ ধ্বংসের মুখে। তাই আমি এখন বিষাক্ত মাছ রাখার বাটিতে একটি মাছ। এই ব্যাপারে খুবই হতাশ হয়েছি। কিছুটা আশা থাকা উচিত। কোনো দিন হয়তো মহান রাষ্ট্রে পরিণত হবে। কিন্তু আমরা পৃথিবীর অন্য দেশ গুলাকে ঘৃণা করি। একটি দেশ গঠন করতে চাই এবং তার সাহিত্যকেও। সেইজন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাহায্য করেছি। সেইজন্যেই বইগুলো লেখা হয়েছিল।

প্রশ্নঃ যখন কেউ আপনার বই পড়ে, তখন তাদের অভিজ্ঞতা থেকে কী নিতে চান?

ভনেগাটঃ পাঠক বই পড়া বাদ দিয়ে চিন্তা করছে,‘জীবিতদের মধ্যে ইনি-ই সেরা’ -এমনটাই চাইতাম। (হাসি।)

 

*  Hot Fudge Sundae: আইসক্রিম সহযোগে প্রস্তুত খাদ্য বিশেষ।

 

ফেইসবুক কমেন্ট

আরও দেখেন

স্লটারহাউস ফাইভঃ বুক রিভিউ... চিন্তা করে দেখলাম বয়স শুধু বাড়ছে , কমছে না । তাই কবে অবসর পাবো সেই আশা বাদ দিতে হবে।  এই দৌড়ের উপর জীবনেই যা যা পড়তে চাই সব পড়ে শেষ করতে হবে । স্লটারহ...
Avatar
হুমায়ূন শফিক

গল্পকার ও অনুবাদক।

No Comments Yet

Comments are closed

error: