fbpx

কিন্তু আক্রমণটা আমরাই আগে করি – মার্সেলো

কোত্থেকে শুরু করা যাইতে পারে?

আমি আজকে আপনাদের কইতে চাই কিভাবে আমার দাদা আমার জীবনটা পাল্টে দিছিলো। কিন্তু এছাড়াও আমি কইতে চাই রোনালডো সম্বন্ধে। আর বিমানের প্রায় বাইরে ঝুলে থাকা রোমারিওরে নিয়া আর সেই কমলা ভকসওয়াগনটার ব্যাপারে।

আমাদের অনেককিছু নিয়া আড্ডা মারার আছে। তো যাই হোক একটা গন্ধ’র প্রসঙ্গ দিয়া শুরু করা যাক।

আমার জীবনের একদম শুরুর যে ঘটনাগুলার কথা মনে করতে পারি এইটা সেগুলার একটা। যখন আমার ছয় বছর বয়স তখন স্কুলে গরমের ছুটি চলতেছিল কিন্তু তারপরেও আমি প্রত্যেকদিন সকাল সাড়ে সাতটায় উঠে আমার ফুটবলটা নিয়া বোটাফাগো বিচে চলে যেতাম।

সেইটা হইলো রিওতে যেখান থেকে ফুটবল ওস্তাদেরা উঠে আসে।

সেইখানে বিচের ধারের সেই ফুটসাল কোর্ট আর বাচ্চাদের ছোট্ট স্লাইডওয়ালা পার্কটা আর গাড়ি পার্কিং করতে আসা লোকগুলারে চিল্লায়া এক ডলার এক ডলার এক ডলার কইতে থাকা সেই একই বুড়া লোকটা।

সে এক ডলারের বদলে আপনের গাড়িটা আগলায় রাখবে।

আমার তার গলার স্বরটা মনে পড়ে তবে সবচে বেশি মনে পড়ে জায়গাটার মাটির গন্ধটা। সেইখানে কোর্টের পাশে মাটিতে পানি ফেলার জন্য একটা ভাঙ্গাচোরা ড্রেইনপাইপ ছিল। তো সেই পানির কারণে মাটিগুলা কাদাকাদা হইয়া থাকতো। ফলে প্রত্যেকদিন সকালে পার্কটায় ঢোকার সময় ওই গন্ধটা পাইতাম আমি, কসম।

কোর্টটা ছিল বোটাফাগো এফআর ফ্যানাটিকদের এলাকা। কোন কোন দিন আমি পৌঁছতে পৌঁছতেই জায়গাটা তাদের দখলে চইলা যাইতো ফলে আমারে একলা একলাই পাশে বল নিয়া লাত্থালাত্থি করতে হইতো। অন্যান্য দিনগুলাতে গিয়া দেখতাম কেউ নাই সেখানে। কোন ব্যাপার না- পিচ্চি মার্সেলিতো প্রত্যেকদিনই লাইগা থাকতো সেখানে।

সেই গন্ধটা, আর বল নিয়ার খেলার অনুভূতিটা আমার স্মৃতিতে এখনও কী জীবন্ত! একটা জিনিস যা এখনও আমার ক্ষেত্রে চরম সত্য বলে মানি সেটা হল, পায়ে বল থাকলে আপনি কখনও পাগলামি করতে পারেন না। এমনকি খেলার জন্য কাউরে দরকারও নাই আপনার। শুধু বলটাই যথেষ্ট।

ওই গরমেই আমেরিকায় চলতেছিল ‘৯৪ বিশ্বকাপ। ব্রাজিলে বিশ্বকাপ শুরুর আগে আগে পাড়ার সবাই রাস্তায় রাস্তায় ম্যুরাল আঁকায়া সেলিব্রেট করে। সবকিছু সবুজ নীল আর হলুদে ঢেকে যায়- রাস্তা, বেড়া, লোকজনের চেহারা। এইটা ব্রাজিলের প্রত্যেকটা শিশুর জীবনের একটা স্পেশাল স্মৃতি।

সেইদিন আমি রোনালডোর লেখা একটা গল্প পড়তেছিলাম, আর সেখানে সে কইতেছিল ‘৮২ বিশ্বকাপের আগে কেমনে সে রাস্তায় জিকোর একটা ম্যুরাল আঁকাইতে হাত লাগাইছিল।

রোনালডো, ভাবতে পারেন?

রোনালডো তুমি যদি এইটা পড় তাইলে শোনো ছয় বছর বয়সে আমরা বন্ধুরা মিলে তোমার চেহারা আঁকাইছিলাম রাস্তায়। তুমি ছিলা আমাদের হিরো। এই স্মৃতিটা আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে।

কী সব ব্যাপার যে মনে থাকে জীবনের ভাবতেই আশ্চর্য লাগে। ব্রাজিলের ফাইনাল জিততে দেখার কথা তেমন একটা মনে নাই আমার। ওই স্মৃতিগুলা কেমন যেন ভাসা ভাসা। কিন্তু একটা লোকাল খবরের কাগজের প্রথম পাতায় ছাপা একটা ছবির কথা আমার খুব পরিষ্কার মনে আছে। জাতীয় দল তখন দেশে ফিরছে মাত্র, আর রোমারিও বিমানটার ককপিটের সামনের জানলা দিয়া প্রায় বাইরে ঝুলে ব্রাজিলের একটা বিশাল পতাকা দোলাইতেছে যেন মাত্র সে বিশ্বটা জয় কইরা আনছে আমাদের জন্যে।

সেই ছবিটা দেইখা বুকটা গর্বে ফুলে ওঠার অনুভূতিটা আমার এখনও মনে পড়ে। আমি ভাবছিলাম, আল্লাগো, আমারো এইরকম কিছু একটা করতে হবে।

নানান কারণে এমন স্বপ্ন দেখাটা ছিল নিঃসন্দেহে অদ্ভুতুড়ে। প্রথমত, ব্রাজিলের লোকসংখ্যা হল ২০০ মিলিয়ন যারা সবাই ফুটবলার হইতে চায় (এমনকি বুড়া লোকগুলাও)। দ্বিতীয়ত, আমি তখনও পর্যন্ত পেশাদারই হইতে পারি নাই। মাত্র এলাকায় ফাইভ আ সাইড ফুটসাল খেলি। ক্লাব ফুটবলের জন্য আমার এখানে সেখানে দৌড়াদৌড়ি করাটা  আমার পরিবারের কাছে অবাস্তব একটা ব্যাপার ছিল। হয়তো আমেরিকা বা ইংল্যান্ডের লোকেরা ব্যাপারটা বুঝতে পারবে না কিন্তু সেই সময় মানে আমি যখন পিচ্চি তখন ব্রাজিলে গ্যাসোলিন অনেক অনেক দামী ছিল।

ভাগ্য ভাল থাকায় আমার দাদা আমার জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে রাজী ছিলেন। আমার গল্পটায় যদি সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ কেউ একজন থেকে থাকে তাইলে তিনি হইলেন আমার দাদা। তো আপনি যদি তারে মনে মনে কল্পনা করতে চান তাইলে শোনেন, উনি  চিড়িয়া ছিলেন একখান। উনি সবসময় একজোড়া সানগ্লাস পইরা থাকতেন আর বন্ধু-বান্ধবদের সাথে থাকলে প্রত্যেকটা দিনই একটা স্পেশাল ডায়লগ ঝাড়তেন।

Related image
দাদা পেদ্রোর কোলে ছোট্ট মার্সেলো

 

কেমনে যে জিনিসটারে ইংলিশে (বাংলায়) অনুবাদ করি?

সে কইতো……

” আরে বাল আমারে দেখ, পকেটে একটা ফুটা কড়িও না নিয়া কি ফুর্তিতে আছি!”

সে তার পুরান সেই ভক্সওয়াগনটাতে কইরা আমারে ফুটসালে নিয়া যাইতো। মনে হয় সেইটা ১৯৬৯ সালের একটা মডেল। কিন্তু আট নয় বছর বয়সে যখন আমি টিমের সাথে বিভিন্ন জায়গায় খেলতে যাইতে শুরু করলাম তখন গাড়ির তেল আর আমাদের খাওয়া দাওয়ার খরচ খুব বেড়ে গেছিলো আর ঠিক সেই সময়ই দাদার একটা একটা সিদ্ধান্ত আমার জীবনটা পালটে দেয়।

সে তার গাড়িটা বেচে দেয় এবং সেখান থেকে পাওয়া টাকাটা দিয়ে আমাদের বাস টিকিটের খরচ যোগাতে থেকে। এইরকম একটা আত্মত্যাগের পর আপনাদের মনে হতে পারে যে নিজেরে শহিদ টহিদ টাইপের কিছু ভাবা শুরু করছিল বা পস্তাইছিল।

কখনই না।

বরং সে কইতো, ” আমার নাতী হইল রিওর সেরা! ব্রাজিলের সেরা প্লেয়ার! দুর্দান্ত! অপ্রতিরোধ্য!”

তার মতে আমি ছিলাম নির্ভুল। সেইরকম খুশির একটা ব্যাপার ছিল সেটা। খেলা দেইখা বাড়ি আইসা সে আমার বাবারে বলতো, “তোর মার্সেলোর খেলা দেখতে আসা উচিত! আজ সে কী করছে জানিস? খোদার কসম, ভেল্কিবাজি, অবিশ্বাস্য!”

কিন্তু সব সময় কাজে ব্যস্ত থাকায় আমার বাবার খেলা দেখার সময় ছিল না। সে হয়তো দাদারে পাগল ভাবতো। সবচে মজার ব্যাপার হইতো যখন আমি একদম ফালতু খেলতাম আর আমার দল হারতো। দাদা তখন শুধু শ্রাগ কইরা কইতো, ” ধুর যাই হোক। পরে দেখে নিস।”

সে আমারে এমন কইরা বলতো যে আমার মনে হইতো যেন আমি রোনালডো। খোদার কিরা, উদাম বুকে যখন ঘরে ঢুকতাম তখন মনে হইতো ইয়েস, আমি একজন ফুটবলার।

“আরে বাল আমারে দেখ, পকেটে একটা ফুটা কড়িও না নিয়া কি ফুর্তিতে আছি!”

এরপর একদিন মনে হয় তখন আমার ১২ বছর বয়স, খেলা শেষে দেখি একটা কমলা ভক্সওয়াগন বিটল নিয়া দাদা হাজির।

কইলো, “ওঠ, আমরা গাড়ীতে কইরা যাবো।”

আমার তখন অবস্থাটা এমন যে, “কী হইতেছে এগুলা? এই জিনিস কই পাইলা তুমি?”

সে কইলো, “জোগো দো বিচো।”

রিওতে এইটারে আমরা কই এনিমেল লটারি। পুরাপুরি বৈধ না হলেও লোকজন খেলাটা ভালবাসতো। আপনারে যে কোন একটা পশুর যেমন অস্ট্রিচ বা মোরগ এগুলার সাথে  মিলাইয়া একটা সংখ্যা ধরতে হবে। আর রোজই পশুগুলা তারা বদলাইতো। এনিমেল লটারি থেকে দাদা যে কয় টাকা জিতছিল আর কত দিয়াই বা বিটলটারে আবার কিনছিল তা আমার মনে নাই।

অবিশ্বাস্য হলেও গাড়িটা নিয়া প্রায় সব জায়গাতেই যাইতাম আমরা। কিন্তু ১৫ বছর বয়সে ফ্লুমিনেন্স ইয়ুথ টিমের সাথে আসল ১১ জনের খেলায় যখন আমার ডাক আসলো তখন হইলো ঝামেলা। ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল আমার বাড়ি থেকেও ২ ঘন্টার দূরত্বে জেরেম এ। আর এতোদূর যাইতে যে পরিমাণ তেল খরচ হবে তা যোগাড় করাও আমাদের জন্য অসম্ভব ব্যাপার। তাই আমি জেরেম এই ডরমিটরিতে উঠে পড়ি। পরিবার থেকে দূরে সেইখানে একা একা থাকতাম। দাদা শনিবার করে এসে আমাকে বাড়ি নিয়া যাইতো যাতে রবিবারটা বাড়িতে কাটাইতে পারি তারপর আবার ডরমিটরিতে রাইখা যাইতো।

লটারি জিতলেও টাকাটা কিন্তু খুব বেশি ছিল না। আর গাড়িটাও ছিল সেই ‘৭০ এর পুরানা মডেলের একটা বিটল।

তার অবস্থা এতোই নাজুক ছিল যে স্টিয়ারিং একটু বেশি ঘুরাইলেই রেডিও স্টেশন বদল হইয়া যাইতো।

আপনাদের এই ব্যাপারগুলা বুঝতে হবে।

কয়েকদিন এইরকম রিও- জেরেম করতে করতে আমি একদম নাজেহাল হইয়া গেলাম। নিজেরে আমার ফুটবলের দাস মনে হইতে লাগলো। আমার বন্ধুরা যেইখানে বাড়িতে বিচে যাইতেছে জীবন উপভোগ করতেছে সেইখানে আমি খালি ট্রেনিংই করে যাচ্ছি।

একদিন যখন দাদা আমারে নিতে আসলো তখন আমি কইলাম, “এই শেষ আর না, আমি বাড়ি চলে যাবো।”

উনি বললেন, ” প্রশ্নই আসে না, তুই এইটা করতে পারবি না। এতোদিনের এতো কষ্টের পর?”

আমি বললাম, ” আমি বেঞ্চে আটকে গেছি। তরুণ বয়সটা বরবাদ করতেছি। আর না, যথেষ্ট হইছে।”

এই কথা শুনেই উনি কাঁদতে শুরু করলেন।

বললেন, ” মার্সেলো, একটূ শান্ত হ। তুই এখন খেলা ছাড়তে পারিস না। আমি তোরে একদিন মারাকানায় খেলতে দেখতে চাই।”

তার এই কথাটা আমারে কাবু করলো। বললাম, ” ঠিক আছে, আর এক সপ্তাহ দেখবো।”

এইভাবেই আমি হাল ছেড়ে দাওয়া ছেড়ে দিই।

দুই বছর পর আমি যেদিন ফ্লুমিনেন্সের মূল দলের হয়ে মারাকানায় খেলতে নামি তখন দাদা গ্যালারিতে ছিলেন। তিনি জানতেন। সেই প্রথম দিন থেকেই আমার উপর তার বাজি।

১৮ তে পড়তে না পড়তেই ইয়োরোপের ক্লাবগুলা আমার পিছে ঘুরঘুর করা শুরু করে দেয়। শুনছিলাম সিএসকেএ মস্কো, সেভিয়া আমারে চাইছিল। সেই সময় সেভিয়ার পোয়াবারো অবস্থা আর দলে ব্রাজিলিয়ানও ছিল অনেক। তাই ভাবলাম আরে এইখানে গেলে তো চরম হয়!

তারপর একদিন এক এজেন্টের ফোন পাইলাম। সে কইল, ” রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার কোন ইচ্ছা আছে আপনের?”

ঠিক এইভাবেই কথাটা বলছিল সে।

তো আমি কইলাম, “ওহহহ। অবশ্যই, আবার জিগায়?”

কিন্তু আমি জানতাম না ওই লোকটা কে ছিল।

তো এরপর সে কইল, “আপনে রিয়ালেই যাইতেছেন, লিখে রাখেন।”

এর সপ্তাহ খানেক পরের কথা, আমরা পোর্তো আলেগ্রেতে একটা ম্যাচ খেলতেছিলাম আর ওই সময়ই রিয়াল মাদ্রিদ আমাদের হোটেলে এক লোকরে পাঠায় আমার সাথে দেখা করার জন্য। তো লবিতে তার সাথে দেখা করতে গেলাম, ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন। কিন্তু উনি রিয়ালের ব্যাজ পরেছিলেন না। আমারে কোন কার্ড বা কিছু দিলেনও না।

তার উপর আবার নানারকম প্রশ্ন করা শুরু করে দিলেন।

সেগুলা আবার এই টাইপের-

” আপনের কি বান্ধবী আছে?”

আমি কইলাম, ” আহ, হ।”

সে কয়, ” কার সাথে থাকেন?”

আমি মনে করেন, ” আহ, আমার দাদীর সাথে।”

আবারও একই ভাবসাব, না কোন অফিসিয়াল কার্ড। না পেপারওয়ার্ক। তো আমার সত্যিই চিন্তা হইতে লাগলো এই ভেবে যে, এইটা কি বাস্তব? আমারে কি প্লেনে কইরা সাইবেরিয়া টাইবেরিয়া পাঠায় দিবে না কি?

দুইদিন পর, একটা ফোনে আমারে জানানো হয় যে রিয়াল আমারে মেডিকেলের জন্যে মাদ্রিদে চায়।

আর আমি ভাবতেছিলাম যে, এইটা কি বৈধ?

দেখেন ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত আমি এটাই জানতাম না যে চ্যাম্পিয়নস লিগ নামের একটা বস্তু আছে। আমার এখনও মনে আছে, জেরেমে টিম রুমে বসে আছি আর কয়েকজন টিভিতে একটা পোর্তো আর মোনাকোর একটা ম্যাচ দেখতেছিল। কিন্তু ম্যাচটা কেমন যেন অন্যরকম দেখাচ্ছিল। রাতে, উজ্জ্বল আলোর নীচে, হাজার হাজার ফ্যানদের সামনে। আর মাঠটা একদম চকচকা, কী সুন্দর… দুর্দান্ত! ব্রাজিলিয়ান লিগে অন্তত সেই সময় এতো উজ্জ্বল আলোর ব্যবস্থা ছিল না। ঘাসগুলাও অতো সবুজ ছিল না।

যাই হোক এসব কারণে মনে হচ্ছিল খেলাটা যেন অন্য কোন অচেনা এক গ্রহ থেকে সম্প্রচারিত হচ্ছে।

এক সময় তো আমি বলেই ফেললাম, ” এইটা কোন লিগের খেলা রে ভাই?”

বন্ধুরা কইল, ” চ্যাম্পিয়নস লিগ।”

আমি কইলাম, “কিসের চ্যাম্পিয়ন?”

সে কইল, ” আরে এইটা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল।”

আমার কোন ধারণাই ছিল না সে কী কইতেছিল। ব্রাজিলে

তখন পে পার ভিউ চ্যানেলেই শুধু চ্যাম্পিয়নস লিগের খেলা দেখাতো। আর আমার মতো লোকেদের সাধ্যে কুলাতো না সেগুলা।

যাই হোক, যা বলতেছিলাম, তো একদিন মাদ্রিদগামী একটা বিমানে চড়ে বসলাম। 😀

মনে রাইখেন, তখন মাত্রই ১৮ বছরে পড়ছি। খোদার কসম আমি ভাবছিলাম যে আমি হয়তো শুধু কথাবার্তার জন্যেই যাচ্ছি। ক্লাবের সাথে যেদিন দেখা হল দেখি টেবিলে চুক্তির কাগজপত্র রিয়াল মাদ্রিদের ক্রেস্টট্রেস্ট দিয়া চাপা দিয়া রাখা। আর আমিও ব্যাপারটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেললাম।

আর তারপরই স্যুট পরা লোকগুলা আমারে সোজা মাঠে নিয়া গেল। মিডিয়ার সামনেও ব্যাপারটা আনলো তারা। আমি কিছুই বুঝতে পারিতেছিলাম না। ব্রাজিলে থাকা আমার পরিবার পরে বলছিল যে গ্লোবো স্পোর্ট এর ” রিয়ালে ১৮ বছরের মার্সেলো” এই শিরোনামের খবরটা দেখার আগ পর্যন্ত তারা এগুলা বিশ্বাসই করেনি।

এইসব কিছুই আমার কাছে অবাস্তব লাগতেছিল মনে হয় আমার আদর্শ রবার্তো কার্লোসের কারণে। আমার কাছে সে ছিল ঈশ্বরের মতো। তার দলেই তারই পজিশনে আসাটা বিশ্বাসই হইতেছিল না আমার।

লকার রুমে ঢুকলেই… আপনার দেখা হচ্ছে রবিনহো, সিসিনহো, হুলিও ব্যাপতিস্তা, এমারসন, রোনালডো, রবার্তো কার্লোসদের সাথে। তার সাথে ক্যাসিয়াস, রাউল, বেকহ্যাম, ক্যানাভারোরা তো আছেই।

পিচ্ছি মার্সেলিতো সেইখানে যখন ঢোকে তখন খালি মনে হয় এই লোকগুলারে তো শুধু ভিডিও গেমেই দেখতাম এদ্দিন!

আমারে জ্যান্ত খায়া ফেলা তাদের জন্য কোন ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ সম্পর্কে আপনাদের একটা কথা বলে রাখি। এই ক্লাবটা তাদের নিজেদের ধাঁচে অনন্য। প্রথমদিন রবার্তো কার্লোস আমার কাছে আসলেন, বললেন, ” এই নাও আমার ফোন নাম্বার রাখো। যখন যা লাগবে কল দিবা।”

মাদ্রিদে আমার প্রথম ক্রিসমাসে সে আমারে আর আমার বউরে তার বাড়িতে দাওয়াত করছিল। অথচ এই মানুষটা ছিল আমার আদর্শ আর তার সাথেই কিনা একই পজিশন নিয়া আমার লড়াই। কোন লোকই সামান্য একটা পিচ্চি ছেলের জন্যে এতো করতো না। কিন্তু এটাই রবার্তো কার্লোস। উনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। সেটাই একজন খাঁটি মানুষের পরিচয়।

Related image
‘এই মানুষটা ছিল আমার আদর্শ আর তার সাথেই কিনা একই পজিশন নিয়া আমার লড়াই। কোন লোকই সামান্য একটা পিচ্চি ছেলের জন্যে এতো করতো না। কিন্তু এটাই রবার্তো কার্লোস’ -মার্সেলো

মাঠে তার খেলা আমারে অনুপ্রাণিত করতো। রবার্তো কার্লোস মনে করেন অমানুষের মতো লেফট উইং দিয়া খালি উপরে উঠবে আর নামবে। আপনি আমারে ভালবাসেন আর ঘৃণাই করেন আপনি জানেন আমারে মাঠে নামাইলে আপনি কী দেখবেন। আমি আক্রমণ করতে ভালবাসি। শুধু আক্রমণ না,  আ ক্র ম ণ, বুঝতে পারছেন তো?

তাইলে ব্যাক এ কী হবে? কোন সমস্যা হইলে সেইটা পরে দেখা যাবে। কিছু একটা বের কইরা ফেলা যাবে। কিন্তু সবার আগে আক্রমণ।

টিমমেটদের সাথে ভাল বোঝাপড়া না থাকলেই কেবল এমন ইচ্ছামতো খেলা সম্ভব। ফাবিও ক্যানাভারো আমার পাশেই খেলতো আর বলতো, ” উপরে ওঠ মার্সেলো, আমি এইদিক দেখতেছি। রিল্যাক্স। আমার নাম ক্যানাভারো, এগুলা আমার কাছে কোন বিষয় না।

ইদানীং কাসিমিরো আমার সাথে এইটা করে। ” আগাও। অন্যসব পরে দেখা যাবে।”

আহ, কাসিমিরো। পোলাটা আমার জীবন বাঁচাইছিল। এই পোলার সাথে ৪৫ বছর বয়সেও খেলতে পারবো আমি।

প্রথম যখন মাদ্রিদে যাই, ক্যানাভারো আমাকে খাপ খাওয়াইয়া নিতে খুব সাহায্য করছিল। নিয়মটা ছিল যে দৌড়াইয়া ফিরতে পারলে উপরে উঠতে আমার কোন বাধা নাই। কিন্তু ফিরতে ফিরতে যদি দেরি হয়ে যাইতো তাইলে কি হইতো? তাইলে খবর হইতো আমার। তাছাড়া সে চিল্লাইতেও পারতো কম না। ব্রাজিলে একটা কথা চালু আছে যে অকাম না করলে তো শুধু শুধু গালি খায় না কেউ আর!

ক্যানাভারোও ওইরকম ছিল, ওই উপরে গিয়া ঠিক সময় ফিরতে না পারলে সে আমারে ঝাড়তো আর এজন্য আমি তাকে ভালবাসি।

তাছাড়া রিয়ালের মান এতো ভাল যে আপনি দ্রুতই সব শিখে ফেলতে পারবেন। আমার প্রথম সিজনের পর ডিরেক্টর আমারে তার অফিসে ডাকছিলেন। তখন আমি ক্ষ্যাপা একটা বাচ্চা ছেলে। আমি আমার বেসবল ক্যাপটা পরে তার অফিসে এই ভেবে গেছিলাম যে হয়তো টুকটাক আলাপ-সালাপ আছে কোন।

সে বলল, ক্লাব আমারে ধারে অন্য ক্লাবে পাঠাইতে চায়

আমি বুঝলাম তাদের ধান্দা কী। তারা চাইতেছিল আমি আরেকটু অভিজ্ঞ হই। কিন্তু আমি ভাবলাম, এইটা রিয়াল। যদি এখন এখান থেকে চলে যাই তাহলে হয়তো আর কোনদিনই তারা আমারে ফিরায়ে নিবে না।

তো সে আমারে একটা কাগজে সই করাইতে চাচ্ছিল।

আমি তারে একটা কথা জিগাইলাম, ” যদি সই না করি তাইলে তো আর যাইতে হবে না, ঠিক না?

সে বলল, ” হ্যাঁ, তুমি সই না করলে তোমারে লাইগা থাকতে হবে। যদি কোচেরা তোমারে রাখতে তাহলে তাই সই। কিন্তু আমার মনে হয় তোমার একটু অভিজ্ঞতা অর্জনের দরকার আছে।”

আমি মনে মনে ভাবলাম, ” সই নিতে হইলে আমারে গাড়ল দিয়া ধোলাই দেওয়াইতে হবে তোমাদের।”

আমি কইলাম, ” অভিজ্ঞতা হবে। ওইটা আমার উপর ছাইড়া দেন।”

পরে তারে ধন্যবাদ দিয়া ওই রুম থেকে বেরিয়ে আসি।

সেই গ্রীষ্মেই রবার্তো কার্লোস ক্লাব ছাড়লেন আর আমিও বেশি বেশি খেলতে শুরু করলাম। এরপর, পিচ্চি মার্সেলিতোরে আর কে পায়?

ছুটিতে ব্রাজিলে বাসায় গেলেই দাদাবাড়ি যাওয়া হইতো আর তার কেবিনেট দিনে দিনে ভরতেই থাকতো।

দাঁড়ান কেবিনেটের ব্যাপারটা খোলাসা করি।

আমার যখন ৬ বছরের মতো বয়স তখন থেকেই তিনি আমার ক্যারিয়ারের জন্যে একটা প্রার্থনালয় গড়া শুরু করেন। আমার খেলা সব দলের ছবি আর জেতা সব ট্রফি এই কাঠের ঢাউস কেবিনেটটায় তুইলা রাখতেন দাদা। আর যখনই গোল করতাম সেইটা একটা খাতায় টুইকা রাখতেন। স্কুল থেকে শুরু করে যতো গোল করছি সব টুইকা রাখতেন। লোকাল খবরের কাগজে আমারে নিয়া নিউজ হইলেই তারে বড় কাঁচি হাতে বইসা পড়তে দেখা যাইতো। তারপর সেই আর্টিকেলটা কাটা থেকে লেমিনেট করা আরও যে কত কী করতেন!

তো একবার রিয়াল মাদ্রিদ থেকে গরমের ছুটিতে আসছি। দেখলাম উনি তখনও ওই পেপার কাটিং, লেমিনেটিং কিসিমের কামগুলা জারি রাখছেন। লা লিগা জেতা থেকে শুরু করে যা কিছু আছে সব খবরের কাগজ উনি জোগাড় করতেন, কিছুই বাদ যাইতো না তার।

সেই কেবিনেটে আমি সব সময়ই  দুইটা জিনিস যোগ করতে চাইছি:  চ্যাম্পিয়নস লিগের ল্লল্লল্লল্লট্রফি হাতে আমার একটা ফটো আরেকটা হইলো বিশ্বকাপ জেতার পর জাতীয় পতাকা হাতে বিমানের প্রায় বাইরে লটকে থাকা রোমারিওর মতো ফটো।

অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিরুদ্ধে যখন আমরা ২০১৪’র চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে উঠলাম তখন দাদা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ফাইনালের আগের পরপর চার ম্যাচে আমি মাঠে নামছিলাম। ফাইনাল খেলার জন্যে তাই একদম প্রস্তুত ছিলাম। দুর্ভাগ্যক্রমে অ্যাটলেটিকোর সাথে ফাইনালে ম্যানেজার আমার জায়গায় আরেক খেলোয়াড়কে নামান।

কী আর কমু কন? প্রথমে ভীষণ খারাপ লাগতেছিল। পরে রাগটা কমলো। কিন্তু মনে মনে আমি জানতাম যে আজকের রাতে আমার জীবনে আরও বড় কিছু অপেক্ষা করছে। আমি বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমরা যখন ১-০ তে পিছায়ে, তখনও আমি অপেক্ষা করতেছি। ৯০ তম মিনিট, তখনও অপেক্ষায়। আর তারপরই সার্জিও রামোস আরও একবার এক্কেবারে শেষ সময়ে হেড করে আমাদের বাঁচাইলো। জানি না এই লোকটার ঘটনা যে কী। মনে হয় অর চুলগুলার ভেতর কোন ব্যাপার আছে।

যখন ম্যানেজার আমারে আর ইসকোরে অতিরিক্ত সময়ে নামাইলো তখন আমার মনে প্রচণ্ড রাগ। কিন্তু রাগটা ছিল ভাল কিসিমের। আমি জিততে চাচ্ছিলাম। আমি চাচ্ছিলাম মাঠেই রাগটা ঝেড়ে আসতে।

যখন আমি অতিরিক্ত সময়ে গোল করলাম তখন সত্যি সত্যি মনে হচ্ছিল আমার মাথা আর কাজ করতেছে না। একবার ভাবলাম জার্সিটা খুলে ফেলি তারপর আবার ভাবলাম এইটা করলে তো আবার হলুদ খাইতে হবে। তাই একটু সিরিয়াস হইলাম। আর তারপরেই কাইন্দা দিলাম। পুরা মাথানষ্ট অবস্থা।

এইটা ছিল জেরেমে টিভিতে দেখা সেইদিনের ঠিক ১০ বছর পরের ঘটনা যেদিন আলো আর সবুজ ঘাসের মাঠে খেলা হতে দেখে আমি বলে উঠেছিলাম, “এইটা কোন লিগের খেলা রে ভাই?”

১০ বছর পর সেই ট্রফিটাই তখন আমার হাতে। লা ডেসিমা- রিয়ালের ১০ নাম্বার ইয়োরোপীয় কাপ।

ফাইনালের কয়েক মাস পর রিওতে দাদা মারা যান

আমি খুব গর্ববোধ করি এই ভেবে যে বেঁচে থাকতে উনি আমার হাতে চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফি দেখে গেছেন। উনি ছিলেন বলেই আমি ওই মঞ্চে উঠতে পারছিলাম।

মাঝেমধ্যে ঘুম থেকে উঠে ভাবি, ” রিয়ালে ১১ টা সিজন। ১১ বছর ব্রাজিলের জার্সিতে খেলা। আমার মতো একটা পাগলা আক্রমণাত্মক ফুলব্যাকের জন্য! কেমনে এইখানে টিকে আছি এখনও?

যদি বলি, এমনই তো হওয়ার ছিল, তাইলে মিথ্যা বলা হবে।

রোজ ট্রেনিংয়ে এসে গাড়িটা পার্ক করে যখন রিয়ালের লকার রুমে ঢুকি তখন রাজ্যের আবেগ চেপে ধরে। না দেখালেও সেইটা গভীরভাবে অনুভব করি আমি। এই ক্লাবটা এখনও আমারে তব্দা খাওয়ায়।

আমার জন্য এই ক্লাবের পরম্পরার অংশ হইতে পারাটা অমূল্য।

কিন্তু আমার একটা শেষ মিশন আছে।

২০১৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিল আবার মাঠে নামবে। লিখে রাখেন, পারলে একটা স্ট্যাম্প মাইরা সেইটা নিজেরে পাঠান। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি তিতের দেখানো পথে হাঁটতে পারলে ব্রাজিলের পতাকা আবার শীর্ষস্থান ফিরে পাবে।

তিতে একজন কিংবদন্তীতুল্য ব্যক্তিত্ব।

এমনকি, যখন তিনি চাকরিটা নিলেন, আমারে ফোন করে বললেন, ” যদিও আমি তোমারে ডাকবো এ ভরসা দিতে পারছি না তবুও বলি, ডাকলে আসবা তো?”

আমি বললাম, “প্রফেসর, আপনি যে আমারে ফোন করছেন এইটা আমার কাছে বিশাল ব্যাপার। ১৭ বছর বয়স থেকে আমি জাতীয় দলে খেলতেছি। আগে আমি মিডল সিটে বইসা ২০ ঘন্টার ফ্লাইট পার করতাম, আর এখন ভাল সিটে বসতে পারি, আর আপনি মনে করতেছেন, আমি যাবো কি না? আপনার যখনই দরকার পড়বে আমি হাজির থাকবো।”

সেই ডাকটাই ছিল আমার কাছে সব। ১১ বছর জাতীয় দলে কাটানোর পরেও জাতীয় দলের কোন ম্যানেজারের কাছ থেকে পাওয়া প্রথম ফোন ছিল সেটাই। তিতের জন্যে আমি খুন করতেও রাজী আর দাদার ড্রয়ারে সোনার একটা ছোট্ট ট্রফি রাখার জন্য যা যা করা দরকার তার সবই আমি করব।

আর যদি না পারি তাইলে কিইবা বলতে পারি? আমি মার্সেলোই থাকবো, মাদারচো****র মতো সুখী।

 

 

 

 

তানভীর হোসেন
তানভীর হোসেন

কবিতা লেখেন। মিউজিক ও মুভিফ্রিক।

No Comments Yet

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: