ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর: পর্ব ৪

 

অধ্যায়

~

আম্বর দিয়া বানানো পাইপের গোড়ায় ঠোঁট চাইপা, নীলকান্তমণি হারের উপর লেপ্টে থাকা দাঁড়ি নিয়া, আর রেশমি স্লিপারের ভিতরে, উত্তেজনায়, পায়ের বড় বড় আঙুলগুলা ধনুকের মত বাঁকাইতে বাঁকাইতে, চোখের পাতা না তুইলাই, কুবলাই খান মার্কো পোলোর গল্প শুইনা গেলেন। আর এই সন্ধ্যাগুলাতেই, হাইপোকন্ড্রিয়া (স্নায়বিক ব্যাধিবিশেষ)-র একটা খারাপ ছায়া, তার বুকে চাইপা বসলো।

‘তোমার এই শহরগুলা আসলে তো নাই। কোনদিন এগুলার অস্তিত্ব ছিল বলেও মনে হয় না। আর, এইটা তো নিশ্চিতই যে, এইসব শহরের অস্তিত্ব ভবিষ্যতে আর কখনোই খুঁইজা পাওয়া যাবে না। তাইলে কেন নিজেরে এইসব সান্ত্বনামূলক রুপকথা শুনায়ে আমোদে রাখতেছো? আমি ভালোকরেই জানি, আমার এই সাম্রাজ্য ডোবার জলে পড়ে থাকা লাশের মত পঁচতেছে, তার ছুৎ লাগতেছে সেই লাশে ঠোকর দেওয়া কাউয়াদের গায়, ছুৎ লাগতেছে সেই লাশের দেহরসে সার পাওয়া বাঁশগুলাতেও। তুমি আমারে এইসব বলতেছ না কেন? কেন তাতার সম্রাটরে মিথ্যা বলে ভুলাইতেছ, বিদেশী জুয়ান?’

পোলো বুঝতে পারলো, সম্রাটের এই নারাজ মেজাজের লগে তাল দেওয়াটাই ভাল হবে। ‘হ্যাঁ, আপনার এই সাম্রাজ্য অসুস্থ হয়া পড়ছে। আরো খারাপ ব্যাপার হইলো, অসুখের ঘা, ক্ষতগুলার সাথে সে মানায়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেছে। আমার এইসব অনুসন্ধানী সফরের উদ্দেশ্য হইলো, শান্তির দিশার যেটুক ক্ষীণ আভাস এখনও দেখা যাইতেছে, সেগুলা পরীক্ষা করে দেখা, সেই অল্প সুখের সরবরাহ পরিমাপ করা। আপনি যদি আপনার চারপাশের আন্ধার সম্পর্কে আন্দাজা লাগাইতে চান, তাইলে অবশ্যই আপনার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করতে হবে, তাকাইতে হবে দূরের নিষ্প্রভ বিবর্ণ আলোর দিকে।’

কখনো কখনো, খান আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়েন। দেখা গেল, হঠাৎ উইঠা দাঁড়াইলেন গদির উপর, লম্বা লম্বা পদক্ষেপে পায়ের তলায় বিছানো কার্পেট মাপতে থাকলেন, বারান্দার রেলিং থেকে জ্বলজ্বলে চোখে তাকায়ে, দারুগাছের ডালে ঝুলানো লণ্ঠনের আলোয় উজ্জ্বল প্রাসাদের বাগানগুলার বিস্তৃতি দেখতে থাকলেন। ‘তারপরেও আমি জানি’, বলতে থাকলেন, ‘আমার এই সাম্রাজ্য স্ফটিকের জিনিশ দিয়ে বানানো, এর প্রত্যেকটা অণু ঠিকঠাক প্যাটার্নে বসানো। নানারকম উপাদানের উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে আকার পায় একটা অনিন্দ্য কঠিন হিরা, একটা বিশাল, বহুমুখী, স্বচ্ছ পর্বত। এই কঠোর প্রক্রিয়াটা কখনোই না দেইখা, তোমার ভ্রমণের অনুভূতি ক্যান খালি নানারকম হতাশাজনক দৃশ্যে আইসা থামে? কেন অপ্রয়োজনীয় বিষাদ নিয়া এই দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ? কেন তুমি সম্রাটের কাছে তার ভাগ্যের অসাধারণত্বরে লুকায়ে রাখতে চাও?’

মার্কো উত্তরে বললোঃ ‘হুজুর, যখন আপনের একটা সাইনেই আনকোরা সর্বশেষ শহরটার দাগহীন দেয়াল গইড়া ওঠে, তখন আমি ছাই টোকাই, সম্ভাব্য সেই শহরগুলার যেগুলা এই শহরটারে জায়গা দিতে গিয়া নাই হয়ে গেছে, যেই শহরগুলারে আবার বানানো কিংবা স্মৃতিতে ফিরায়ে আনা যাবে না। যখন আপনে দুঃখের বাকিটুক জাইনা যাবেন, কোন মূল্যবান পাথরেও যার ক্ষতিপূরণ হয় না, তখন আপনে হিশাব কইরা পারবেন যে, লাস্ট হিরাটার তাইলে কত ক্যারট হওয়া লাগবে। আর নাইলে, আপনার হুজুর বিসমিল্লাহয়ই গলদ।’

~

নগর নিশানি

~

পণ্ডিত কুবলাই, আপনারই এইটা সবচাইতে ভালো বোঝার কথা যে, যেসব শব্দে কোন শহরের বর্ণনা দেওয়া হয়, আসল শহরটারে ওইসব শব্দের সাথে গোলায়া ফ্যালা উচিত না। তারপরেও, এই দুইটা জিনিশ (শহর আর শহররে ফুটায়া তোলা শব্দসমূহ-অনুবাদক)-র মইধ্যে একটা সম্পর্ক কিন্তু আছে। পণ্য আর মুনাফাসমৃদ্ধ শহর ‘অলিভিয়া’র কথা যদি আপনারে বলতে চাই, এর সমৃদ্ধি ও উন্নতির আলাপ করতে চাই, তাইলে সোনা-রুপার কারুকার্যখচিত প্রাসাদগুলার কথা বলা লাগবে, যেসব প্রাসাদের গরাদটানা জালনাগুলার পাশে বসার জায়গায় ঝালরওয়ালা গদি বিছানো। উঠানের পর্দার ওইপাশে, ফোয়ারার জল পাক খেয়ে খেয়ে পড়তেছে লনে, সেখানে একটা শাদা ময়ূর পালক মেলতেছে। কিন্তু এই বর্ণনা শুনেই আপনে বুইঝা ফেলছেন, বাড়িঘর বোঝাই ঝুল আর গ্রিজের আবরণে কীভাবে চাপা পড়ছে ‘অলিভিয়া’; হল্লাহাটি ভরা রাস্তায় কীভাবে পথচারী মুসাফিরদের দেয়ালের গায়ে পিষা ফেলে ভ্রাম্যমান মালটানা ট্রেলারগুলি। শহরের বাসিন্দাদের শিল্পোদ্যোগের কথা কইতে চাই যদি,–চামড়ার গন্ধে ভরা জিনের দোকানগুলার কথা বলা লাগে, বলতে হয়, হড়বড় কইরা কথা কইতে কইতে রাফিয়া কম্বল (আফ্রিকা, বিশেষত মাদাগাস্কারের এক ধরণের স্থানীয় পাম গাছের নাম ‘রাফিয়া’, যার পাতার আঁশ দিয়া কম্বল বানানো হয়-অনুবাদক) বুনতে থাকা মহিলাদের কথা, কইতে হয় ঝুলন্ত খালগুলার কথা, যাদের প্রচণ্ড জলধারা এঞ্জিনের প্যাডেল ঘুরায়; কিন্তু এইসব বর্ণনা আপনের প্রাজ্ঞ মনে জাগায় তুলছে লেদমেশিনের দাঁতের উপরে বসানো দণ্ডের ছবি, এমন কাজের প্রতিচ্ছবি, যা সহস্র হাতে সহস্রবার সম্পন্ন হইতেছে, প্রত্যেকবারই সেই নির্ধারিত গতিতেই। অলিভিয়ার আত্মা ক্যামনে একটা মুক্ত জীবন আর শুদ্ধ সভ্যতার দিকে আগাইতেছে, সেইটা যদি আমি আপনারে বুঝাইতে চাই, তাইলে আমি বলব নদীর মোহনায় দুই তীরের মাঝামাঝি ঝিলিমিলি ডিঙ্গিনাওগুলায় ভাসতে থাকা মেয়েদের কথা; কিন্তু এইগুলি খালি আপনারে এইকথা ইয়াদ করায়ে দেবে যে, দূর সীমান্ত অঞ্চলে, যেখানে প্রত্যেকদিন সন্ধ্যায় নারী-পুরুষের দল স্বপ্নচারীদের মত লাইন ধরে নামে, সেইখানে সবসময়ই কেই না কেউ অন্ধকারে ঠা ঠা কইরা হাসতে থাকে, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের বন্যা বহায়ে দেয়।

এইটা মনে হয় আপনে ধরতে পারেন নাইঃ ‘অলিভিয়া’র কথা কইতে গিয়া, আমি আলাদা আলাদা শব্দ ব্যবহার করতে পারি নাই। ধরেন, যদি সত্যি সত্যিই, গরাদটানা জালনা আর ময়ূর, জিনের কারিগর আর কম্বল বুনতে থাকা মহিলা, ডিঙ্গিনাও আর মোহনা, এইসবে সমৃদ্ধ কোন অলিভিয়া শহর থাকতো, তাইলে সেইটা হইতো জঘন্য, অন্ধকার, মশামাছিতে ভরা একটা গর্ত; আর এর বর্ণনা দেওয়ার জন্য আমারে ফিরা আসতে হইতো ঝুলের রুপক, চাকার ক্যাঁচক্যাঁচ, বারবার হইতে থাকা সব কাজ আর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের কাছে। শব্দ ছলনা করে না, ছলনা থাকে (শব্দে বর্ণিত) জিনিশগুলার ভিতরেই।

~

রোগা শহর

~

‘সফরোনিয়া’ শহর গইড়া উঠছে দুইটা শহরের আধা-আধা নিয়া। একটার মধ্যে আছে খাঁড়া কুঁজসহ এক বিশাল রোলার কোস্টার; চেইন স্পোকসহ মেরি-গো-রাউন্ড; ঘুরান্টি খাইতে থাকা খাঁচার নাগরদোলা; উপুত হয়া থাকা মোটরসাইকেলিস্টদের ডেথ-রাইড; মাঝখানে ঝুইলা থাকা কতগুলা ট্রাপিজসহ বিরাট এক তাঁবু। অন্য আধা পাথর, মার্বেল, সিমেন্ট দিয়া বানানো; সেইখানে আছে ব্যাংক, কল-কারখানা, প্রাসাদ, কসাইখানা, ইশকুল আর অন্যসব। আধা আধা দুই শহরের একটা পার্মানেন্ট, অন্যটা টেম্পোরারি; যখন একটাতে সাময়িক থাকার টাইম শেষ হয়, তখন লোকজন এইটারে উপড়ায়ে ফ্যালে, টুকরা টুকরা কইরা ফ্যালে, এবং এইটারে উঠায়ে নিয়া অন্য অর্ধেক-শহরটার খালি জমিনে আবার লাগায়ে দেয়।

ফলে, প্রত্যেক বছরই সেই দিনটা আসে, যেদিন শ্রমিকেরা মার্বেল দিয়া বানানো পেডিমেন্ট (বিল্ডিংয়ের সামনের দিকে উপরে একটা ট্রায়াঙ্গল শেপ-অনুবাদক) সরায়ে ফ্যালে; নামায়ে ফ্যালে পাথরের দেয়ালগুলি, সিমেন্টের তোরণগুলি; ভাইঙা দেয় মন্ত্রীসভা, মনুমেন্ট, জাহাজঘাটা, পেট্রোলিয়াম শোধনাগার, হাসপাতাল; এবং সেগুলারে চাপায় ট্রেলারের উপরে, যাতে এক জায়গা থিকা অন্য জায়গায় তাদের বার্ষিক ভ্রমণটারে ফলো করা যায়। এইদিকে পইড়া থাকে শ্যুটিং গ্যালারি আর মেরি-গো-রাউন্ড আর মাথা বাইর কইরা দেওয়া রোলার কোস্টারের সিট থিকা ঝুইলা থাকা চিৎকারে ভরা আধা-সফরোনিয়া; এবং সে গুনতে থাকে মাসগুলি, মালামাল বোঝাই সেই ক্যারাভান ফিরা আসা এবং আবার নতুন কইরা একটা পূর্ণ জীবন শুরু করতে পারার অপেক্ষায় থাকা দিনগুলি।

~

বেসাতির শহর

~

যেই রাজ্যের রাজধানী ‘ইউট্রোপিয়া’, সেই রাজ্যে ঢুইকা পড়ার পরে, মুসাফির একটা না, বিশাল উঁচানিচা মালভূমির উপরে ছড়ানো-ছিটানো একই সাইজের, একই রকমের অনেকগুলা শহর দেখে। ‘ইউট্রোপিয়া’ কোন একটা আলাদা শহর না, বরং এই সব শহরগুলা মিলাই ‘ইউট্রোপিয়া’; একটা নির্দিষ্ট টাইমে এই শহরগুলার একটাতেই খালি বসতি-আবাদি থাকে, বাকিগুলা খালিই পইড়া থাকে; আর এই প্রসেসটা ঘুইরা ঘুইরা চলতে থাকে। এখন বলতেছি, এইটা ক্যামনে হয়। যেইদিনটায় ইউট্রোপিয়ার মানুশজনরে হুট কইরা ক্লান্তি-বিষাদ চাইপা ধরে, নিজের চাকরি, নানান সম্পর্কের প্যারা, ঘর আর সংসারজীবন, ঋণ, নানান লোকজনরে আবশ্যকীয়ভাবে হাই-হ্যালো করা বা তাদের হাই-হ্যালো সহ্য করা, এইগুলা যখন কেউই আর নিতে পারে না, তখন শহরের বাশিন্দারা পরের শহরটায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত লয়, যেইটা তাদের জন্য অপেক্ষা করতেছে, একদম খালি আর নতুনের মত সুন্দর; সেইখানে সবাই নেবে নতুন চাকরি, নয়া বউ, জালনা খুইলা দেখবে পুরাপুরি ভিন্ন একটা ল্যান্ডস্কেপ, অবসর কাটাবে একদম অন্যরকম বিনোদনে, নয়া নয়া গসিপে মইজা, একদমই নতুন বন্ধুগো লগে। ফলে, প্রতি পদে পদে তাদের লাইফ রিনিউ হইতে থাকে, সেইসব শহরে যেখানকার খোলামেলা অবস্থা, ঢাল-উৎরাই, জলের ধারা বা বইতে থাকা বাতাস প্রত্যেকটা জায়গারেই অন্যটার চাইতে কেমন একটু আলাদা কইরা তোলে। যেহেতু তাদের সমাজে সম্পদ বা ক্ষমতার বিশেষ কোন শ্রেণীভেদ নাই, ফলে এক কাজ ছাইড়া আরেক কাজ ধরায় বিশেষ কোন প্যারা নাই; নানান রকম কাজের মাধ্যমে একজন মানুশের জীবনে অটোমেটিকালি একটা ভ্যারাইটি নিশ্চিত করা হয়, যাতে জীবদ্দশায় একজন লোকের একবার করা কাজ ফিরা আর কখনোই প্রায় না করা লাগে।

এইভাবেই শহরটা, তার খালি দাবার বোর্ডের উপরে আগ-পিছ কইরা কইরা, রিপিট করে সেইখানের লাইফটারে, ভীষণ চেনা লাইফটারেই। শহরের পাবলিকেরা একই সিন রিপিট করতে থাকে, খালি অভিনেতাগুলা থাকে আলাদা আলাদা; একই কথাবার্তাগুলা তারা বারবার কইতে থাকে, অনেকরকম মিশ্র একসেন্টে; খুব চেনা পরিচিত হাই তুলতে গিয়া তারা খোলে আলাদা আলাদারকম মুখ। এই রাজ্যের সকল শহরের মইধ্যে, খালি এই ‘ইউট্রোপিয়া’ই অলটাইম একইরকম থাকে। খামখেয়ালের দেবতা মার্কারি, যার উদ্দেশ্যে এই শহর পবিত্র ভেটরুপে উৎসর্গীকৃত, তিনিই ঘটাইতেছেন দুর্বোধ্য এই অপার্থিব কাণ্ড।

~

নগর নয়ন

~

দর্শকের মেজাজ অনুযায়ী আকৃতি পায় জেমরুদ শহর। নাকটারে হালকা কাত করে শিস দিতে দিতে যদি আপনি হাঁইটা যান, তাইলে এই শহরটারে চিনবেন তলা থিকাঃ জালনার দেউলি, ঝুলতে থাকা, উড়তে থাকা পর্দা, ঝরনার ফোয়ারা। মাথা ঝুলায়ে, হাতের তালুতে নখ চেপে ধরে হাঁটলে আপনার চোখ আটকায়ে যাবে মাটিতে, নর্দমায়, ম্যানহোলের ঢাকনায়, মাছের আঁশে, পঁচা কাগজে। শহরের একরকম দৃশ্য অন্য দৃশ্যের চাইতে বেশি সত্য, এই কথা আপনি বলতে পারবেন না, কিন্তু আপনি উপরতলার ‘জেমরুদ’র স্মৃতিচারণ শুনতে পারবেন প্রধানত তাদের কাছে, যারা প্রতিদিন সেই একইরকম রাস্তার বিস্তার ধরে, প্রতি সকালে শহরের দেয়ালের নীচে আগের দিনের বিগড়ানো মেজাজটার ঝুইলা থাকা দেখতে দেখতে, ডুইবা যান নীচতলার ‘জেমরুদ’-এ। আগে-পরে, সবারই এমন দিন আসে, যেদিন আমরা ড্রেনের পাইপের দিকে চোখ নামাই এবং খোয়া-পাথরের দিক থিকা সেই চোখ আর সরাইতে পারি না। এর উল্টাটাও হইতে পারে, কিন্তু সাধারণত সেইরকম হয়ই না; আর তাই, পাতালপুরীর ভাড়ার, বিল্ডিংয়ের ভিত আর গভীর কুয়াগুলার ভিতরে চোখ গেঁথে গেঁথে আমরা হাঁটতে থাকি, ‘জেমরুদ’র রাস্তায়-রাস্তায়।

~

নাম নগর

~

‘অ্যাগলোরা’র ব্যাপারে আমি আপনারে বেশিকিছু বলতে পারব না, খোদ শহরের পাবলিকরাই যা বারবার বলে তার বাইরেঃ লাইন ধইরা সাজানো কীংবদন্তি সব গুণ আর সমান কুখ্যাত কিছু ভুলভ্রান্তি, কিছু মাথানষ্ট পাগলামি, আবার নিয়মকানুনের প্রতি হালকা ভালোমানুশিটাইপ শ্রদ্ধা। পুরান পর্যবেক্ষকগণ, যাদের সত্যনিষ্ঠ না ভাবার কোন কারণ নাই, তারা, নিশ্চিতভাবেই ওই সময়ের অন্যসব শহরের সাথে তুলনা কইরা, ‘অ্যাগলোরা’য় প্রতিষ্ঠা করছে এইরকম নানান শ্রেণীতে বিন্যস্ত একগাদা বৈশিষ্ট্য। লাগে যে, লোকের আলাপ আলোচনায় উইঠা আসা ‘অ্যাগলোরা’ অথবা বাস্তবে দৃশ্যমান ‘অ্যাগলোরা’ সেই থিকা তেমন একটা চেঞ্জ হয় নাই, কিন্তু যা একসময় ছিলো উদ্ভট তা-ই এখন স্বাভাবিক, আর যেগুলা নরমাল ছিলো ওইগুলা এখন হয়া গেছে অদ্ভুত, আর গুণ বা দোষের জন্য কৃতিত্ব বা কলঙ্কের অনুভূতি ভিন্নভাবে সাজানো গুণ আর দোষের সংজ্ঞা ও নিয়মের মধ্যে হারায়া গেছে। এই হিশাবে, ‘অ্যাগলোরা’ নিয়া বলা কোনকিছুরেই সত্য বলা যায় না, কিন্তু তাও এইসব বর্ণনায় একটা শক্ত আর নিরেট শহরের ছবি তৈরি হয়, অন্যদিকে সেখানকার বাশিন্দাদের দেইখা যেসব উলটাপালটা চিন্তা মাথায় আসতে পারতো, সেসবের কোন সার নাই। ফলাফল দাঁড়াইলো এইঃ তারা যে শহরের কথা কয়, অস্তিত্ব টিকায়ে রাখার জন্যে প্রয়োজনের অধিক গুণ সেই শহরের আছে, অন্যদিকে সেই জায়গায় যেই শহরটা আছে, তার অস্তিত্ব ন্যূন।

সুতরাং, পার্সোনালি আমি যা যা দেখছি, আমার যে অভিজ্ঞতা হইছে, সেসবের প্রতি বিশ্বস্ত থাইকা যদি ‘অ্যাগলোরা’র কথা আমি কইতে যাই, তাইলে আপনেরে আমার অবশ্যই কওয়া লাগে যে, এই শহরটা আসলে বিবর্ণ, চরিত্রহীন, এলোপাথারি তৈরি করা। কিন্তু এইটাও পুরাপুরি সত্য নাও হইতে পারেঃ বিশেষ বিশেষ সময়ে, রাস্তার নির্দিষ্ট কোন কোন জায়গায়, আপনি দেখবেন আপনার সামনে খুইলা যাইতেছে সন্দেহাতীত, বিরল, সম্ভবত অতি গুরুত্বপূর্ণ কোনকিছুর ইঙ্গিত; আপনার বলতে মনে চাবে জিনিশটা কী, কিন্তু ‘অ্যাগলোরা’-র ব্যাপারে কওয়া আগের সব কথাবার্তা আপনের শব্দগুলারে কয়েদ কইরা ফেলবে আর নয়া কিছু বলার চাইতে আগের সেই কথাই রিপিট করতে আপনারে বাধ্য করবে।

এইজন্যে, ওইখানের লোকেরা এখনও বিশ্বাস করে যে, তারা খালি ‘অ্যাগলোরা’ নাম নিয়া গইড়া ওঠা এক শহরে থাকতেছে, আর মাটির উপরে গজাইতেছে যে ‘অ্যাগলোরা’, সেইটারে তারা খেয়ালই করে না। এমনকি, যে আমি স্মৃতির ভিতরে দুইটা শহররে আলাদাই রাখতে চাই, সেই আমিও বলতে পারি খালি একটা শহরের কথাই, কারণ, অন্যটারে ঠিকঠাক সাজাইতে পারার মত শব্দের অভাবে, ওইটা হারায়ে গেছে।

~

‘এখন থেকে আমিই তোমারে বলব শহরগুলার কথা’, খান কইলেন, ‘তুমি তোমার যাত্রাপথে দেখবা, এগুলা আছে কিনা।’ কিন্তু মার্কো পোলোর দেখা শহরগুলা সবসময়ই সম্রাটের চিন্তা কইরা বানানো শহরগুলার চাইতে আলাদা ছিলো।

‘তাছাড়াও, আমি মনে মনে একটা মডেল সিটি বানাইছি, যে মডেল থিকা সম্ভাব্য সব শহরের কথাই ভাইবা লওয়া যায়’, কুবলাই বললেন। ‘আদর্শ মোতাবেক সবকিছুই সেইখানে আছে। যেহেতু যে নগরগুলার অস্তিত্ব আছে, সেগুলা বিভিন্ন মাত্রায় আদর্শবিচ্যুত, তাই আমারে আগে থিকাই ব্যতিক্রমী আদর্শগুলার কথা ভাইবা রাখা লাগে এবং হিশাব কইরা রাখা লাগে সবচাইতে সম্ভাব্য কম্বিনেশনগুলি।’

‘আমিও একটা আদর্শ নগরের কথা ভাইবা রাখছি, যেইটা থিকা আমি অন্যসব শহরের কথা ভাইবা নিতে পারি’, মার্কো উত্তর দিলো। ‘এই শহর ব্যতিক্রম, বর্জন, অসংলগ্নতা আর বিরোধ দিয়া বানানো। যদি এই টাইপের শহর একান্তই অসম্ভব কোনকিছু হয়, তাইলে এর অস্বাভাবিক উপাদানগুলা কমায়ে দিয়া আমরা এই শহরের অস্তিত্বের সম্ভাবনারে বাড়ায়ে তুলি। ফলে আমার খালি নিজের মডেল থেকে এক্সেপশনগুলা বাদ দেওয়া লাগে, আর আমি যেদিকেই যাই, এমন একটা শহরেই পৌঁছাই, যেইটা আগে থেকেই একটা ব্যতিক্রম হিশাবে বিদ্যমান। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সীমার বাইরে গিয়া জোর কইরা আমি কাজ করতে পারি নাঃ আমার অর্জন করতে চাই এমন সব শহর, যেগুলার বাস্তব হওয়া খুবই সম্ভব।’

ফেইসবুক কমেন্ট

আরও দেখেন

ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’: পর্ব ৩... কুবলাই খান খেয়াল করলেন যে, মার্কো পোলোর শহরগুলা একটা আরেকটার মতই, যেন এক শহর থেকে আরেক শহরে যাইতে জার্নি লাগে না, খালি উপাদানের পরিবর্তন লাগে। এখন, মা...
ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’ – ...   অধ্যায়ঃ এক  --------------- যাত্রাপথে দেখা শহরগুলার বর্ণনা যখন দেন মার্কো পোলো, তার সেই সকল আলাপই যে পুরাপুরি সত্য ভাইবা নিছিলেন ...
ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’- পর্ব ২...   'অন্য অন্য রাজদূতেরা আমারে দুর্ভিক্ষ, চাঁদাবাজি, নানামুখী ষড়যন্ত্র ইত্যাদি নিয়া সতর্ক করে; অথবা, নীলকান্তমণির খনি, বেজির চামড়ার লাভজনক দামের...
তুহিন খান
তুহিন খান

জন্ম ১৯৯৫। কবি ও অনুবাদক। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে অধ্যায়নরত।

error: