fbpx

ছাতি দিয়া আমার মাথায় অবিরাম বাড়ি দিতে থাকা লোকটা

[অনুবাদকের নোটঃ আর্হেন্তিনীয় লেখক ফার্নান্দো সোরেন্তিনোর ফিকশন  ফ্যান্টাসি আর রসবোধের অদ্ভুত মিশ্রনে ভাস্বর। ফ্যান্টাসি ঘরানার হইলেও তার লেখা অস্বাভাবিক, সুররিয়াল বা ম্যাজিক ঘরানার ফ্যান্টাসি না। বরং কন্ট্রাডিক্টরি শুনাইলেও সোরেন্তিনোর ফিকশনে ফ্যান্টাসি রিয়ালিটির খুবই কাছাকাছি।  সোরেন্তিনোর  চরিত্রদের সাথে যে অদ্ভুত ঘটনাগুলি ঘটে, বা চরিত্রেরা ঘটায় তা  বাস্তবে ঘটা  সম্ভব। পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রধান ভাষাগুলিতে এমনকি তামিল ভাষাতেও তার লেখা অনূদিত হইছে। অবশ্য সম্ভবত বাংলা ভাষায় সোরেন্তিনোর কোনো গল্পের অনুবাদ এই প্রথম।
দীর্ঘকাল সাহিত্য  সাধনায় থাকলেও  তার রচনা সংখ্যায় অল্প। কয়েকটা ছোটগল্পের বই আর একটা নভেলা -এই তার  রচনাকর্ম। এছাড়া দুইটা ইন্টারভিউ-এর বই আছে সোরেন্তিনোর যার একটাতে বোর্হেসের ইন্টারভিউ নিছেন তিনি।
বর্তমান গল্পটা নরম্যান টমাস ডি গিওভান্নি ও প্যাট্রিসিয়া ডেভিডসন ক্র্যান  এবং ক্লার্ক এম. জ্‌লোচ-কৃত -দুইটা ইংরেজি তর্জমারে সামনে রেখে করা অনুবাদ।]

ছাতি দিয়া আমার মাথায় অবিরাম বাড়ি দিতে থাকা একটা লোক আছে

ছাতি দিয়া আমার মাথায় অবিরাম বাড়ি দিতে থাকা একটা লোক আছে। পাঁচ বছর হইলো সে আমার মাথায় ছাতি  দিয়া বাড়ি মাইরা যাইতেছে। শুরুতে আমি একদম সহ্য করতে না পারলেও এখন মানায়ে নিছি।

লোকটার নাম জানি না। তবে এইটা জানি, কাঁধের উপ্রের দিকটা মলিন হয়া যাওয়া আটপৌরে পোশাকের,  বৈশিষ্ট্যহীন চেহারার এক অতি সাধারণ লোক সে। পাঁচ বছর আগের এক ভ্যাপসা সকালে তার সাথে প্রথম দেখা।  পালেরমো পার্কে গাছের ছায়ায় একটা বেঞ্চে চুপচাপ বইসা খবরের কাগজ পড়তেছিলাম।  হঠাৎ মাথায় কিছু একটা লাগল মনে হইলো। যার কথা লিখতেছি এই লোকটাই সে যে যান্ত্রিক ও নির্বিকারভাবে ছাতি দিয়া  মাথায় বাড়ি দিতে থাকলো।

চরম মেজাজ খারাপ অবস্থায়  তার দিকে ফিরলাম (খবরের কাগজ পড়ার সময় কেউ বিরক্ত করলে আমার অসম্ভব রাগ লাগে); ভ্রুক্ষেপহীন সে আমার মাথায় বাড়ি দিয়া যাইতেছিল। জিজ্ঞেস করলাম এমএমএল কিনা। সে আমার প্রশ্ন শুনলো বলে মনে হইলো না। আমি  পুলিশ ডাকার হুমকি দিলাম।  সম্পূর্ণ অবিচলিত সে তার কাজ চালায়ে যাইতে থাকলো। কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করলাম; সে তখনও থামলো না দেইখা, উইঠা দাড়ায়ে  মুখের উপর ঘুষি মারলাম। সন্দেহ নাই সে দূর্বল লোকঃ ক্রোধুজনিত শক্তি সত্ত্বেও তাকে অতটা জোরে ঘুষি মারি নাই আমি। তা-ও মৃদু গোঙানি দিয়া লোকটা মাটিতে পইড়া গেল। তক্ষুনি, মনে হইলো ভীষণ কষ্ট কইরা সে সোজা হইয়া খাড়াইলো। অথচ আবার আগের মতো ছাতা দিয়ে মাথায় বাড়ি মারতে থাকলো। তার নাক দিয়া রক্ত ঝরতেছিলো তখন আর সেই মুহূর্তে ক্যান জানি না তার জন্যে আমার খুবই খারাপ লাগলো। তারে ওইভাবে ঘা মারছি বইলা  বিবেকের দংশনে কষ্ট পেলাম।  সব সত্ত্বেও সে খুব জোরে মাথায় বাড়ি মারতেছিলো না, বরং ধীর ও যন্ত্রণাহীন বাড়ি দিয়া যাইতেছিলো সে। তবুও ওই বাড়িগুলা চরম বিরক্তিকর। সবাই জানে, একটা মশা  কারো  কপালে আইসা বসলে  সে ব্যাথা পায় না কিন্তু অসম্ভব বিরক্ত বোধ করে। অবশ্য, ছাতিটা ছিলো এক বিশাল মশা, নির্দিষ্ট বিরতিতে যা আমার মাথায় নাইমা আসে।  আরও ঠিক মতো বললে, বাদুরের মতো বড় মশা।

Image result for fernando sorrentino and borges
বোর্হেসের সঙ্গে ফার্নান্দো সোরেন্তিনো

 

কোনোমতেই আমি ওই বাদুররে সহ্য করতে পারতাম না। মনে হইলো পাগলের পাল্লায় পড়ছি। ফলে পাগল হইতে তফাতে থাকার চেষ্টা  করলাম।  লোকটা আমার পিছু নিলো। চুপচাপ। ছাতার বাড়ি না থামাইয়াই। ঐ পরিস্থিতে, হঠাৎ আমি দৌড় দিলাম ( এইখানে  উল্লেখ করা যাইতে পারে  যে খুব অল্প লোকই আছে যারা আমার মতো দ্রুত ছুটতে পারে। )। সেও ছুটল আমার পিছে পিছে, ছাতি দিয়া মাথায় বাড়ি মারার  ব্যর্থ চেষ্টা করলো কয়েকবার। ঘন ঘন শ্বাস টাইনা হাঁপাইতেছিলো এমনভাবে যে আমার মনে হইলো, আর কিছু যদি আমার পিছে এইভাবে ছুটতে থাকে  সে হয়তো পইড়া গিয়া  মারা পড়বে।

এই কারণে আমি গতি  কমায়া হাঁটতে শুরু করলাম। তার দিকে তাকাইলাম। তার মুখে কৃতজ্ঞতা বা ক্ষোভ কোনোটারই আভাস দেখা গেল না। আগের মতোই  ছাতি দিয়া মাথায় শুধু বাড়ি মারা মারতে থাকলো। ভাবলাম, হাইটা  থানায় গিয়ে পুলিশরে বলি,  ‘অফিসার,  এই লোকটা  আমার মাথায় ছাতি দিয়ে বাড়ি মারতেছে।  এইটা নজিরবিহীন ঘটনা হইতো। অফিসার হয়তো সন্দেহজনক নজরে তাকাইতো, কাগজপত্র দেখতে চাইতে পারতো,  শুরু করতে পারতো  অস্বস্তিকর সব প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত আমারে গ্রেফতার কইরাও বসতো পারতো।

চিন্তা করলাম বাসায় যাওয়াটাই বিবেচনার কাজ হবে। উঠে পড়লাম ৬৭ নাম্বার বাসে।   ছাতির কাজ এক মুহূর্তের জন্যেও না থামাইয়া সেও আমার পিছে পিছে উঠে পড়লো। প্রথম সিটে বসলাম আমি। নিজেরে সে আমার পাশেই রাখল; ভারসাম্য রাখতে বা হাতে স্ট্র্যাপ ধরলো আর  ডান হাত দিয়া ছাতি ধইরা আমার মাথায় বাড়ি মারতে লাগল। যাত্রীরা নিজেদের মইধ্যে মুচকি মুচকি হাসতেছিলো। বাসের ড্রাইভার আয়নায় দেখতেছিল আমাদের। ধীরে ধীরে হাসির গমক থেইকা এক পর্যায়ে সমস্ত যাত্রীদের মধ্যে হুল্লোড় পইড়া গেলো। আমি লজ্জায় কুঁকড়াইয়া গেলাম।  আমার যন্ত্রনাদানকারী, যাত্রীদের এই তুমুল হুল্লোড়েও নির্বিকারভাবে,  তার কর্ম কইরা যাইতেছিলো।

পুয়েন্তে পাকফিকোতে আমি নাইমে পড়লাম- আমরা নাইমা পড়লাম।  সান্তা ফে এভেনিউ থেকে  আবার মাথায় ছাতার বাড়ি শুরু হইলো। তাজ্জব হইয়া লোকজন আমাদের দিকে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকাইতেছিলো। একবার মনে হইলো তাদেরে বলি, ‘দেখেন কী আপনেরা? হুহ্‌? আবাল লোকজন কোনখানকার!  ছাতা দিয়া মাথায় বাড়ি মারা কখনও দ্যাখেন নাই?’ কিন্তু তখন এইটাও মনে হইলো যে তারা হয়তো আসলেই দেখে নাই। জঙ্গলের ইন্ডিয়ানদের মতো পাচ-ছয়টা বাচ্চা আমাদের অনুসরণ করা শুরু করলো।

অবশ্য,  আমার একটা পরিকল্পনা ছিল। বাসায় পৌছে তার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। হইতে পারে,  সে আগেই পরিকল্পনা বিষয়ে অনুমান করছে।  শক্ত হাতে সে, দরজার হাতল ধরলো, কিছুক্ষনের চেষ্টায় ভিতরে প্রবেশ করলো।

তারপর থেকে সে আমার মাথায় ছাতির বাড়ি মারা চালাইয়া যাইতে থাকলো। যতদূর জানি, সে কখনও ঘুমায় নাই, এমনকি কিছু খায়ও নাই। কাজের মইধ্যে সে শুধু ছাতি বাড়ির মারতে থাকলো। সমস্ত কাজে সে আমার সঙ্গে রইলো, এমনকি একান্ত অন্তরঙ্গ কাজগুলির সময়ও। আমার মনে আছে, প্রথম দিকে ছাতির বাড়িগুলা ঘুমাইতে দিত না। আর এখন আমার বিশ্বাস ওইগুলা ছাড়া আমার ঘুমানো অসম্ভব হবে।

তা সত্ত্বেও, আমাদের সম্পর্ক সবসময় ভাল যায় নাই।  অসংখ্যবার , বিভিন্ন স্বরে আমি তাকে ব্যাপারটার ব্যাখ্যা দাবি করছি। কোনো লাভ হয় নাই। স্বভাবসুলভ চুপ থেকে সে মাথায় ছাতার বাড়ি মাইরা গেছে লাগাতার। বিভিন্ন সময়ে আমি তাকে লাথি ঘুষি দিছি- এবং আল্লা মাফ করুক –ছাতা দিয়াও মারছি। সে প্রতিবাদহীন এসবই মেনে নিছে, যেন এইটা খুবই স্বাভাবিক। এইটাই তার সবচাইতে ভয়াবহ দিকঃ তার ঠান্ডা জেদ, ঘৃণার অনুপস্থিতি;যেন গোপন-জরুরি কোনো মিশন পালনের অন্তর্গত দৃঢ় প্রত্যয়।

আমি জানি, তারে যখন আঘাত করি মনোজগতের এই অনুভূতিশূণ্যতা সত্ত্বেও  সে ব্যথা পায়। জানি, সে দূর্বল, নশ্বর। এইটাও জানি একটা প্রচন্ড আঘাতেই তার থেকে মুক্তি পাইতে পারি আমি। যেইটা জানি না তা হইলো, যখন আমরা দুইজনেই মইরা যাবো সে তার ছাতা দিয়া আমার মাথায় মারতে থাকবে কি?  জানি না, সেই ঘায়ের ব্যাথা কার গায় লাগবে, তার না আমার নিজের। যাই হউক, এইসব ভাবনা ভাবার কোনো মানে হয় নাই। আমি খুব ভালো কৈরাই জানি তারে বা নিজেরে, কাউরেই আমি মারতে পারবো না।

 

অথচ ইদানিং আমার মনে হয়  তার এই ছাতির বাড়ি ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না। বার বার আমার কেবলি অস্বস্তিরকর খারাপ কিছুর বোধ হইতেছে। খুব সম্ভব আমার খুব দরকারের সময় এই লোকটাও আমারে ছাইড়া  যাবে আর আমি মাথায় তার ছাতির মৃদু আঘাত পাইবো না, যেই আঘাত আমার নিশ্চিন্ত নিরাপদ ঘুমে খুব সাহায্য করে। এই ব্যাপারটা মনে হইলেই  আমি বিষাদাক্রান্ত –গভীর বিষাদাক্রান্ত হয়া পড়ি।


 

আরও দেখেন

শহীদুল জহির-এর অনুবাদে বোর্হেসের গল্প...   অযোগ্য বন্ধু মূলঃ হোর্হে লুই বোর্হেস ভাষান্তরঃ শহীদুল জহির   শহরটি সম্পর্কে আমাদের মানসচিত্র সর্বদাই কিছুটা পশ্চাৎম...
Avatar
কে এম রাকিব

Share a little biographical information to fill out your profile. This may be shown publicly.

No Comments Yet

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: