fbpx

ট্রেভর নোয়ার স্মৃতিকথা | পর্ব ১

[সম্পাদকের নোটঃ ট্রেভর নোয়া দক্ষিণ আফ্রিকান কমেডিয়ান, রেডিও ও টেলিভিশন উপস্থাপক। বর্তমানে তিনি মার্কিন কেবল টেলিভিশন চ্যানেল কমেডি সেন্ট্রালের লেট নাইট ফেইক নিউজ শো ডেইলি শো’র উপস্থাপনার দায়িত্বে আছেন। এই সময়ের সেরা একজন কমেডিয়ান ও বর্নবাদের সমালোচক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত এবং প্রশংসিত ট্রেভর।

ট্রেভর নোয়ার স্মৃতিকথা  ‘বর্ন আ ক্রাইমঃ স্টোরিজ ফ্রম আ সাউথ আফ্রিকান চাইল্ডহুড’ নিউইয়র্ক টাইমস বেস্টসেলার, ন্যাশনাল বেস্টসেলারসহ অনেকগুলি বেস্টসেলিং লিস্টে জায়গা করে নেয়। জেমস থার্বার প্রাইজ অফ এমেরিকান হিউমারসহ অনেকগুলি পুরষ্কারও জিতে নেয় বইটা। একইসাথে পাঠকপ্রিয়তা ও সমালোচকদের প্রশংসা পাওয়া বিরল বইগুলির একটা বর্ন আ ক্রাইম।

মাদারটোস্টের পাঠকদের জন্যে বইটার ধারাবাহিক অনুবাদ করছেন আতাউর রহমান সিহাব। প্রতি সপ্তাহে একটা করে পর্ব প্রকাশ করবে মাদারটোস্ট। আজ থাকলো প্রথম পর্ব।]


 

মুখবন্ধঃ ইমোরালিটি অ্যাক্ট, ১৯২৭ (Immorality act, 1927)

ইউরোপীয় স্থানীয় অধিবাসী এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীদের মধ্যে অবৈধ যৌন সম্পর্ক নিষেধকল্পে।

দক্ষিণ আফ্রিকান ইউনিয়নের মহামাণ্য রাজা, সিনেট এবং এসেম্বলি হাউজ কতৃক এই মর্মে প্রণীত হইল যেঃ

১। যদি কোনও ইউরোপীয় পুরুষ কোনো স্থানীয় কোনও নারীর সহিত অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং কোনো ইউরোপীয় নারী স্থানীয় কোনও নারীর সাথে অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। তবে তা অপরাধ বলিয়া বিবেচিত হইবে এবং তাহারা উক্ত অপরাধে দোষী সাব্যস্তপূর্বক সর্বোচ্চ বছর কারাদন্ডে দন্ডিত হইবে।

২। যদি কোনো স্থানীয় নারী কোনও ইউরোপীয় পুরুষকে তাহার সহিত যৌন সম্পর্ক স্থাপনে সম্মতি প্রদান করেন এবং কোনো ইউরোপীয় নারী কোনও স্থানীয় পুরুষকে তাহার সহিত যৌন সম্পর্ক স্থাপনে সম্মতি প্রদান করেন। তবে উভয়েই উক্ত অপরাধে অভিযুক্ত হইয়া, দোষী সাব্যস্তপুর্বক সর্বোচ্চ বছর কারাদন্ডে দন্ডিত হইবে।

 

 

এপার্টহেইড (Apartheid) বা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণ​বাদের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলের একটা ছিল,  সব বড় গোত্রগুলোকে  একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়া। ‘Apartheid’ না বলে একে ‘Apart hate’ বলাই ভাল। আপনি মানূষকে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করুন আর তারপর তাদের একে অপরেকে ঘৃণা করতে দিন। এভাবে তারা সবাই আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকায়  কালোরা সাদাদের চেয়ে ৫:১ অনুপাতে  সংখ্যাগুরু ছিল, তবুও তারা আলাদা ভাষা আর গোত্রে বিভক্ত ছিল। যেমনঃ জুলু, ঠোসা, সাওয়ানা, সোথো, ভেন্ডা, ডেবেলে, সোঙ্গা, পেডিসহ আরো অসংখ্য গোত্র। এপার্টহেইডের বহু আগ থেকেই এই গোত্রগুলো একে অপরের সাথে সংঘর্ষ আর যুদ্ধে লিপ্ত থাকতো। তারপর সাদারা এল। তারা এই শত্রুতাকে ব্যবহার করে একে একে সব দখল করে নিল। সব অশ্বেতাঙ্গকে কৌশলে বিভিন্ন দল আর উপদলে ভাগ করে ফেলা হল। তারপর এই দলগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন লেভেলের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে  তাদের মধ্যে প্রভেদ সৃষ্টি করে ফেলা হল।

এই প্রভেদ সবচেয়ে তীব্র ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান দুই গোষ্ঠী, জুলু আর ঠোসাদের মধ্যে। জুলুরা যোদ্ধা জাত। তারা  গর্বিত সৈনিক। ঢালের পেছনে মাথা নামিয়ে লড়াই করে। ঔপনিবেশিক সেনারা যখন আগ্রাসন চালালো, তখন জুলুরা বর্শা আর ঢাল নিয়ে বন্দুক সজ্জিত সেনাদের বিরুদ্ধে লড়তে গেল। ফলে জুলুরা হাজারে হাজারে মারা পড়লো কিন্তু তারা কখনোই লড়াই করা থামায়নি। অপরদিকে ঠোসারা নিজেদের চিন্তাশীল মানসিকতা নিয়ে গর্ব করতো। আমার মা ছিলেন ঠোসা। নেলসন ম্যাণ্ডেলাও ছিলেন ঠোসা। ঠোসারাও লম্বা সময় ধরে সাদাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেছে। কিন্তু একটা সময়পর তারা এই সুসজ্জিত শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনর্থকতা বুঝতে পেরে ভিন্ন পন্থা অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিল। তারা বলল, “আমরা মানি আর না-ই মানি, সাদা মানুষরা এখানে এসে গেছে।” “দেখি তাদের কাছে কি কি যন্ত্রপাতি আছে, যা আমাদের  কাজে লাগতে পারে। ইংরেজদের বিরোধিতা না করে বরং ইংরেজি শিখি। এতে আমরা বুঝতে পারবো সাদারা কি বলছে, যাতে আমরা ওদের আমাদের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি করাতে পারি।”

জুলুরা সাদাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেল। ঠোসারা সাদাদের সাথে দাবা খেলায় মাতলো। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে তাদের সব চেষ্টা বিফলে যেতে লাগলো এবং এক পক্ষ আরেক পক্ষকে এমন এক সমস্যার জন্য দায়ী করতে লাগলো যার জন্য আসলে তারা কেউই দায়ী নয়। দু’পক্ষের মধ্যে তিক্ততা বাড়লো। বছরের পর বছর ধরে, এই তিক্ততা এক প্রধান শত্রুর জন্য চাপা পড়ে রইল। তারপর একদিন, এপার্টহেইডের পতন হল, ম্যান্ডেলা মুক্ত হলেন আর কালোদের দক্ষিণ আফ্রিকা একটা গৃহযুদ্ধের মধ্যে পড়ে গেল।

 

১ম অধ্যায়ঃ দৌড়

কখনও কখনও বড় হলিউড মুভিগুলোতে কিছু দুর্দান্ত তাড়া করার দৃশ্য থাকে, যেখানে কেউ চলন্ত গাড়ী থেকে লাফ দিচ্ছে বা কাউকে গাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলছে। ছুড়ে ফেলা মানুষটা প্রথমে মাটিতে আছড়ে পড়ে, কয়েক পাক গড়াগড়ি খায়। পাক খাওয়া থেমে গেলে উঠে দাঁড়ায়। তারপর গায়ে লেগে থাকা বালি ঝেড়ে ফেলে দেয়। যেন কিছুই হয়নি! যতবারই আমি এমন কিছু দেখি ততবারই আমার মনে হয়, দ্যটস রাবিশ! চলন্ত গাড়ি থেকে কেউ ছুড়ে ফেললে এর চেয়ে হাজার গুণ বেশি লাগে।

আমার তখন ৯ বছর বয়স, যখন আমার মা আমাকে একটা চলন্ত গাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। দিনটি ছিল রোববার। আমি জানি সেদিন রোববার ছিল । কারণ আমরা চার্চ থেকে ফিরছিলাম আর আমার ছেলেবেলায় রবিবার মানেই চার্চ। আমরা কখনোই চার্চ মিস করতাম না। আমার মা সেসময়, এমনকি এখনও একজন অতি ধার্মিক নারী। অতি খ্রিশ্চিয়ান। পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার আদিবাসীদের মত, দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় অধিবাসীরাও তাদের ঔপনেবেশিকদের ধর্মে দীক্ষিত হল। ‘দীক্ষিত’ বলতে আমি জোর করে বোঝাচ্ছি। সাদা মানুষেরা স্থানীয়দের প্রতি বেশ কঠোর ছিল। “তোমাদের যিশুকে প্রার্থনা করতে হবে। যিশু তোমাদের রক্ষা করবেন।” এটা শুনে স্থানীয়রা বলতো, “হ্যা, আসলেই আমাদের রক্ষা করা প্রয়োজন। তোমাদের হাত থেকে! কিন্তু যাই হোক  দেখি একবার এই যিশুর ব্যাপারটা ট্রাই মেরে।”

আমার পুরো পরিবার খুব ধার্মিক ছিল। আমার মা ছিলেন পুরোপুরি যিশুর অনুরক্ত আর আমার নানী আমাদের পুর্বপুরুষদের আত্মার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা চালিয়ে, তার খ্রিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাস আর তার মধ্যে ছোট থেকে ধারণ করা ঠোসা বিশ্বাসগুলোর মধ্যে একটা সমতা বজায় রাখার চেষ্টা করতেন।  দীর্ঘ সময় ধরে আমি বুঝে  উঠতে পারিনি, কেন এত কালো মানুষ তাদের পুর্বপুরুষদের ধর্ম ছেড়ে খ্রিষ্টান ধ্রর্ম গ্রহণ  করেছিল? কিন্তু যতই আমি চার্চের পিউতে* বসতে লাগলাম, ততই আমি খ্রিষ্টান  ধর্মটাকে উপলব্ধি করতে লাগলাম। যেমন, যদি আপনি আমেরিকার স্থানীয় অধিবাসী হন আর নেকড়ের উপাসনা করেন, তবে আপনি বর্বর। যদি আপনি আফ্রিকান হন আর পূর্বপুরুষদের উপাসনা করেন, তবে আপনি আদিম। কিন্তু যদি আপনি সাদা মানুষ হন, আর এমন কারো প্রার্থনা করেন, যিনি জলের উপর হাটতে পারতেন কিংবা  পানিকে ওয়াইনে পরিণত করতে পারেন, তখন আপনি সভ্য। হুম! ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক বটে!

আমার ছেলেবেলায় সপ্তাহে অন্তত ৪ রাত, চার্চ অথবা চার্চ সংশ্লিষ্ট কিছু না কিছু জড়িত থাকত। মঙ্গলবার রাত মানে প্রার্থনা সভা। বুধবার রাত ছিল বাইবেল স্টাডি। বৃহস্পতিবার রাত মানে  বাচ্চাদের চার্চ।  শুক্র ও শনিবার আমাদের বন্ধ ছিল (পাপ করার জন্য)।  তারপর রবিবার আবার আমরা চার্চে যেতাম। চার্চ মানে অন্তত তিনটা চার্চ । তিনটা আলাদা চার্চে যাওয়ার ব্যাপারে আমার মা বলতেন, প্রতিটা চার্চই আমাকে আলাদা  কিছু দেয়। প্রথম চার্চ ঈশ্বরের  উৎফুল্ল প্রশংসা করতো। পরের চার্চ ধর্মশাস্ত্রের গভীর আলোচনা করতো, যা আমার মা খুব ভালবাসতেন। আর ৩য় চার্চ একটা উষ্ণ আর বিশুদ্ধ আবেগ এনে দিত; এটা এমন একটা জায়গা যেখানে আপনি আপনার ভেতর পবিত্র আত্মার উপস্থিতি টের পাবেন। কাকতালীয়ভাবে এই চার্চে আসা যাওয়ার সময়, আমি লক্ষ্য করেছি , প্রতিটি চার্চের আলাদা আলাদা  জাতিগত বৈশিষ্ট্য আছেঃ ঈশ্বরের প্রশংসাকারী চার্চ ছিল মিক্সড চার্চ। শাস্ত্রের ব্যাখাকারী চার্চ ছিল সাদাদের চার্চ। আর উষ্ণ আবেগময়  চার্চ ছিল কালোদের চার্চ।

মিশ্র চার্চগুলো ছিল রেহমা বাইবেল চার্চ। রেহমা চার্চগুলো ছিল আকারে বিশাল, অত্যাধুনিক, শহরতলীর মেগাচার্চ। প্যাস্টর রে ম্যককলি একসময় বডিবিল্ডার ছিলেন। তার ছিল বিশাল হাসি আর  চিয়ারলিডারের মত ব্যক্তিত্ব। প্যাস্টর রে ১৯৭৫ সালে মিঃ ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। সেবার তিনি ৩য় হয়েছিলেন। আর প্রথম হয়েছিল আর্নল্ড শোয়ার্জনেইগার। প্রতি সপ্তাহে, রে চার্চের স্টেইজে উঠে, যিশুকে ‘কুউল’ দেখানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম করতেন। সেখানের এরেনার মত বসার ব্যবস্থা ছিল আর নিজস্ব রকব্যান্ড, যারা  ধর্ম নিয়ে সমসাময়িক জনপ্রিয় গান বাজাত।  সবাই এক সাথে গাই, যদি  আপনি গানের  কথা নাও জানেন, সমস্যা নেই। কারণ, সেখানে বড় স্ক্রিনে তা আপনার জন্য প্রদর্শিত হত। এটা ছিল খ্রিষ্টানদের কারাওকে।  আমি সবসময় তা দারুণ উপভোগ করতাম।

সাদাদের চার্চ ছিল স্যন্ডটনের রোজব্যাংক ইউনিয়নে, জোহেনেসবার্গের শ্বেতাঙ্গবহুল আর সম্পদশালি অংশে। আমার সাদাদের চার্চ ভাল লাগত। কারণ, সেখানে আমার মেইন সার্ভিসে অংশ না নিলেও চলতো। সেখানে বাচ্চাদের জন্য ছিল সান ডে স্কুল। আমরা অনেক মজার গল্প শুনতে পেতাম। নিঃসন্দেহে নোয়া(নুহ) আর তার মহাপ্রলয়ের গল্প ছিল আমার সবচে প্রিয়।  কারণ, সেখানে আমার নাম জড়িত ছিল। কিন্তু আমার মুসা নবীর লোহিত সাগর দু’ভাগ করে ফেলা, ডেভিডের গোলিয়াথ বধ, মন্দিরের মধ্যে যিশু কতৃক মুদ্রা জালকারীদের চাবকানোর গল্পওগুলোও প্রিয় ছিল।

আমি এমন একটা ঘরে জন্ম নিয়েছিলাম যেখানে পপ কালচারে প্রবেশাধিকার ছিল খুবই ক্ষীণ। আমার মায়ের বাসায় ‘বয়েজ টু ম্যান’ এর  গানের অনুমতি  ছিল না।‘ সারারাত কোনো মেয়ের কথা ভেবে হয়রান হওয়া’  এধরনের গান! না, না, না। তা ছিল একেবারেই নিষিদ্ধ।

স্কুলে আমি অন্য বাচ্চাদের ‘এন্ড অব দ্য রোড’ গাইতে শুনতাম আর আমার কোনো ধারণাই ছিল না এটা কি? বয়েজ টু ম্যানকে আমি চিনতাম কিন্তু আমার কোনো ধারণাই ছিল না এরা কি গাইত। গান বলতে আমি বুঝতাম সুতীব্র, ধীর লয়ে  উঁচুতে  উঠতে থাকা কিছু সংগীত যেখানে শুধু যিশূর প্রশংসা করা হয়। একই অবস্থা মুভির বেলায়ও। আমার মা আমাকে এমন কোনো মুভি দেখতে দিতেন না, যেখানে যৌন  দৃশ্য অথবা সহিংসতা থাকে।  ফলে বাইবেলই আমার একশ্যান মুভি। স্যামসন আমার সুপারহিরো। তিনি ছিলেন আমার সুপুরুষ। একজন মানুষ হাজার  হাজার মানুষকে মেরে তক্তা বানাচ্ছে গাধার চোয়ালের হাড় দিয়ে!  এটা রীতিমত দুঃসাহসী। কিন্তু সেইন্ট পল নামে এক বেটা এফিসিয়ানদের কাছে চিঠি লেখা শুরু করলো আর প্লটটা ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে গেল।  কিন্তু ওল্ড টেস্টামেন্ট আর গসপেল? আমি আপনাকে সেখানকার পেইজগুলো থেকে  যে কোনো চাপ্টার, স্লোক বলে দিতে পারবো। সাদাদের চার্চে প্রতি সপ্তাহে  বাইবেলের উপর কুইজ আর গেমস হত, সেখানে কেউ আমার সামনে দাড়াতেই পারতো না।

আর তারপর ছিল কালোদের চার্চ। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কালোদের চার্চ সার্ভিস চলতে থাকত আর আমরা সেখানে যেতাম। শহররের মধ্যে হলে বাইরে রাস্তার ধারে তাঁবু গেড়ে চার্চ বসতো। আমরা সাধারণত  আমার নানীর  চিরাচরিত ধর্মসভায় অংশ নিতাম।  প্রায় পাচশতাধিক  আফ্রিকান দাদী-নানী  চামড়া পোড়া  রোদের নিচে নীল-সাদা রোব পরে, বাইবেলে হাত বুলাতেন। আমি মিথ্যা বলবো না, কালোদের চার্চ ছিল কষ্টের। কোনো এয়ার-কন্ডিশনিং নেই। বড় স্ক্রিনে কোনো গানের কথা নেই। আর এটা প্রায় অনন্তকাল ধরে চলতো, অন্তত ৩-৪ ঘন্টা । এটা  আমাকে খুব অবাক করতো। কারণ, সাদাদের চার্চ মাত্র ঘন্টাখানেকের মত চালু থাকতো। এলাম, চলে গেলাম। আসার জন্য ধন্যবাদ। কিন্ত কালোদের চার্চে এই অনন্তকাল ধরে বসে বসে ভাবতাম, সময় এত আস্তে যায় কেন! সময় কি আসলেই থেমে থাকতে পারে? যদি তাই হয়, তবে সময় কেন শুধু কালোদের চার্চে থেমে থাকে আর সাদাদেরটায় কেন না? কিন্তু শেষমেশ আমি বুঝতে পারলাম, কালোদের যিশুকে বেশি প্রয়োজন। কারণ ,আমরা ভুগেছি বেশি। আমার মা বলতেন, “আমি পুরো সপ্তাহের জন্য আর্শীবাদ নিতে এখানে আসি।” “আমরা চার্চে যত বেশি সময় থাকবো, অতত বেশি আর্শীবাদ পাব।” যেন এটা স্টারবাকসের রিওয়ার্ড কার্ড।

তবে কালোদের চার্চে লম্বা সময় ধরে থাকার একটা পুরষ্কার ছিল। যদি আপনি ৩-৪ ঘন্টা কাটিয়ে দিতে পারেন, তবে আপনি প্যাস্টরকে মানুষের ভেতর থেকে  পিশাচ তাড়ানো দেখতে পাবেন। সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। যাদের দেহে পিশাচ ঢুকে গেছে, তারা উন্মাদের মত সিটের মাঝখান দিয়ে দৌড় শুরু করতো। প্যাস্টরের সহযোগীরা ক্লাবের বাউন্সারদের মত তাদের জাপটে ধরতো। প্যাস্টর তাদের মাথা শক্ত করে ধরতেন। তারপর ভীষণভাবে ঝাঁকাতেন, সাথে চিৎকার করে বলতেন, “যিশুর নামে, আমি এই অশুভ আত্মাকে বিতাড়িত করছি!”  অনেক প্যাস্টররা এর চেয়ে অনেক বেশি হিংস্রতা দেখাতেন, কিন্তু এরা প্রায় সবাই ততক্ষণ পর্যন্ত এমন করতেন, যতক্ষণ না পিশাচ চলে যায় আর আক্রান্ত ব্যাক্তি নিস্তেজ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যেত। আক্রান্ত ব্যাক্তিকে পড়তেই হত। তা না হলে বুঝতে হবে, পিশাচ খুবই শক্তিশালী আর প্যাস্টরকে আরো কঠোর হতে হবে। আপনি আমেরিকান রাগবি লীগ, এনএফএলের লাইনব্যাকার হতে পারেন কিন্তু প্যাস্টর আপনাকে নামিয়ে ছাড়বেই। গুড লর্ড! এটা দারূন মজার ছিল।

খ্রিষ্টান কারাওকে, অ্যাকশনে ভরা দুর্দান্ত সব গল্প, ক্ষ্যাপাটে ফেইথ হিলারের দল- উফফ! আমি চার্চ দারুণ ভালোবাসতাম। কিন্তু যে জিনিসটা অপছন্দ করতাম, তা হল, চার্চে যেতে আসতে যে সময়টা লাগতো। সে ছিল এক মহাকাব্যিক যাত্রা। আমরা  জোহেনেসবার্গের বাইরে এক মফস্বলে থাকতাম, যার নাম ইডেন পার্ক। ইডেন পার্ক  থেকে সাদাদের চার্চ ছিল এক ঘন্টার পথ। সেখান থেকে আরো ৪৫ মিনিটের পথ মিক্সড চার্চ আর সবশেষে আরো ৪৫ মিনিটের দুরত্বে ছিল সোয়েওটো, কালোদের চার্চ। যদি এতটুকু শুনে আপনার অবাক লাগে তাহলে আরো বলছি, মাঝেমধ্যে আমরা আবার সাদাদের চার্চে ফিরে আসতাম, সন্ধ্যার বিশেষ প্রার্থনায় অংশ নিতে। এত প্রার্থনা শেষে যখন বাসায় ফিরতাম, আমি ক্লান্তিতে বিছানায় এলিয়ে পড়তাম।

—-ঃ—-

সেই বিশেষ রবিবারে, যেদিন আমাকে চলন্ত গাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল। সেটি আর দশটা রবিবারের মতই ছিল। আমি ঘুম থেকে উঠলাম, মা আমাকে পরিজ দিয়ে  নাস্তা দিল। আমি গোসল করছিলাম আর মা আমার ছোট ভাই অ্যান্ড্রুকে ড্রেস পরাচ্ছিল। তারপর আমরা ড্রাইভওয়ে ধরে গাড়িতে উঠে যখন যাবার জন্য তৈরি হলাম, ঠিক তখনই গাড়ি স্টার্ট নিল না। আমার মায়ের একটা সুপ্রাচীন, লক্কড় -ঝক্কড়  মার্কা , উজ্জ্বল কমলা রঙের ভক্সওয়াগন বিটল গাড়ি ছিল। প্রায় নাম মাত্র মূল্যে তিনি এটা পেয়েছিলেন। নাম মাত্র দামে পেয়েছিলেন, কারণ,  প্রায় নিয়মিতই এর ইঞ্জিন ফেইল করতো। আজ অবধি আমি তাই সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ি অপছন্দ করি। আমার জীবনে যত  দুর্ঘটনা  ঘটেছে তার সাথে কোনো না কোনভাবে সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ি জড়িত ছিল। সেকেন্ডহ্যাণ্ড গাড়ির জন্য আমি স্কুলে দেরিতে পৌছাতাম। মাঝেমধ্যে রাস্তায় হিচ-হাইকিং করতে বাধ্য হতাম। সেকেন্ডহ্যাণ্ড গাড়ির জন্যই আমার মা বিয়ে করেছিলেন। এই পুরোনো ভক্সওয়াগন গাড়ি ঠিক করতেই আমাদের একজন মেকানিকের দরকার পড়েছিল। যে মানুষটা  পরে আমার মায়ের স্বামী হন। এই লোকটাই আমার সৎ বাবা, যিনি আমাদের পরবর্তীতে অনেক বছর নির্যাতন করবেন আর একদিন আমার মায়ের ঘাড়ে গুলি চালিয়ে বসবেন। আমি সবসময় ওয়ারেন্টিসহ নতুন গাড়ি কি্নতেই পছন্দ করি।

 

Related image
মায়ের সাথে ট্রেভর নোয়া

আমি চার্চ যতই ভালোবাসি না কেন, ৯ ঘন্টা ধরে টানা বকবক শোনা, মিক্সড চার্চ, সাদা চার্চ, কালো চার্চে দৌড়াদোড়ি করা-এসব ছিল আমার ভব্যতার বাইরে। গাড়িতে করে যাওয়াটাই ছিল যথেষ্ট যন্ত্রণার তার উপর এখন পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ধরা ছিল দ্বিগুণ বিরক্তিকর। ভক্সওয়াগন যখন স্টার্ট নিচ্ছিল না, আমি মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম, “ইশশ! আজ যদি না যাওয়া লাগতো। প্লিজ বলো, আজ যাবো না।” কিন্তু যখনই আমি আমার মায়ের দঢ়প্রতিজ্ঞ মুখ আর চোয়ালের দিকে তাকালাম, তখনই বুঝে ফেললাম আজ কপালে একটা লম্বা দিন অপেক্ষা করছে।

“চল, ট্রেভর। আমরা মিনিবাস ধরবো।” মা বললেন।

আমার মা ছিলেন যেমন ধার্মিক তেমন একগুঁয়ে। একবার মনস্থির করে ফেললেই হল। যেমন, সাধারণ কেউ যদি গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ার মত কারণে বাইরে বের হবার পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে আসে, আমার মা সেখানে আরো দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে সেই পরিকল্পনার দিকে এগিয়ে যাবে। “এটা শয়তানের কাজ।” গাড়ি স্টার্ট না হবার পর তিনি বললেন। “শয়তান চায় না আমরা চার্চে না যাই।এজন্যই আমরা মিনিবাস ধরতে যাব।”

যতবারই আমি নিজেকে আমার মায়ের ধর্মীয় অবস্থানের বিপক্ষে দেখতে পাই, ততবারই আমি আমার মনে সম্পুর্ণ বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে আসা  ভাবনাগুলো সাবধানে তার সামনে উত্থাপন করি।

“অথবা ঈশ্বর চাইছেন আমরা আজ চার্চে না যাই। এজন্যই হয়ত গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না। যাতে আমরা পরিবারের সবাই বাসায় থাকি আর একদিন বিশ্রাম নেই। ঈশ্বরও তো পৃথিবী সৃষ্টির সময় একদিন বিশ্রাম নিয়েছিলেন।”

“উফ! এটা শয়তানের মত ভাবনা, ট্রেভর।”

“না, সবকিছু যদি যিশুই নিয়ন্ত্রণ করেন। তবে তিনি নিয়শ্চই গাড়িও নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি চাইলে গাড়ি স্টার্ট হত, তাই না?”

“না, ট্রেভর! মাঝেমধ্যে যিশু আমাদের পরিক্ষা করতে আমাদের সামনে বাধা সৃষ্টি করেন। অনেকটা বাইবেলের জবের মত।যাতে আমরা তা জয় করতে পারি।“

“ও, তা হতে পারে। কিন্তু মা, এমনও তো হতে পারে, এই পরিক্ষার মাধ্যমে যিশু দেখতে চাইছেন, আমরা আমাদের ভাগ্যে যা ঘটে তা গ্রহণ করতে পারি কিনা। চল আমরা আজ বাসায় থাকি আর যিশুর প্রার্থণা করি।”

“না, এটা শয়তানের মত কথাবার্তা।যাও পোশাক বদলে আসো।”

“কিন্ত, মা!”

“ট্রেভর! শান’কেহলা!”

শান’কেহলা একটা আফ্রিকান প্রবাদ। এর মানে অনেকগুলা- ‘আমাকে ক্ষেপিও না’ ,’আমাকে বোকা ভেব না’। এটা একই সাথে আদেশ আর হুমকি। ঠোসা বাবা-মায়েরা এটা খুব ব্যবহার করে। যতবারই আমি এটা শুনেছি, আমি জানতাম, আর কথা বাড়ালে আমাকে পালিয়ে যেতে হবে! মার খাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে। সেসময় আমি একটা ক্যাথলিক স্কুলে পরতাম। যার নাম ছিল, ম্যারিভিল কলেজ।সেখানে  প্রতিবছর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আমি প্রথম হতাম আর আমার মা ‘মাদারস ট্রফি’ জিততেন। কেন? কারণ, প্রায় প্রতিদিন তিনি আমাকে মার দিতে আমার পিছু নিতেন আর আমি মার খাওয়া থেকে বাঁচতে দৌড়াতাম। তাই দৌড়ে আমাদের কেউ হারাতে পারতো না। আমার মা টিপিক্যাল ‘বাইরে আয়। মজা দেখাচ্ছি টাইপ মা’ ছিলেন না। তিনি আমার পিছু নিতেন। একই সাথে তিনি ছিলেন দুর্দান্ত থ্রোয়ার। হাতের কাছে যা পেতেন তাই ছুড়ে মারতেন। যদি তা ভাঙার উপযোগী হত, তবে আমি তা খপ করে ধরে ফেলতাম আর রেখে দিতাম। আর যদি তা ভেঙে যেত, তার দোষটাও আমার ঘাড়ে এসে পড়তো। আর মারের মাত্রা বেশি হত। যেমন, প্রায়ই ছুড়ে মারা বস্তু একটা ফুলদানী হত, আমি তা ধরে রেখে দিতাম আর দৌড়ে পালাতাম। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে আমাকে ভাবতে হত, এটা কি দামী? হ্যা। এটা কি ভাঙার উপযুক্ত? হ্যা। এটা ধর, রাখো আর ভাগো।

আমি আর আমার মায়ের মধ্যে টম এন্ড জেরি টাইপ সম্পর্ক ছিল। তিনি ছিলেন কঠোর নিয়মানুবর্তী আর আমি ছিলাম  বদের হাড্ডি। তিনি প্রায়ই আমাকে মুদি দোকানে পাঠাতেন আর আমি জিনিস কিনে বেচে যাওয়া টাকা দিয়ে সুপারমার্কেটে গেম খেলতাম। সহজে বাসায় ফিরতাম না। আমি ভিডিও গেম ভালোবাসতাম। আর স্ট্রিট ফাইটার গেমে রীতিমত মাস্টার ছিলাম। আমি ঘন্টার পর ঘণ্টা খেলতে পারতাম। আমি একটা কয়েন ঢোকাতাম, গেম চালু হত। তা্রপর সময় উড়ে যেত আর হঠাত আমি আমার পেছনে মা’কে আবিষ্কার করতাম। তার হাতে একটা বেল্ট। সে ছিল এক মরণপণ দৌড় প্রতিযোগিতা। আমি ছো মেরে দরজা দিয়ে বের হয়ে ইডেন পার্কের ধুলোময় রাস্তায় এসে পড়তাম। একের পর এক উঠোন পেরিয়ে, দেয়াল টপকে যেতাম।  আমাদের পাড়ায় এ ছিল এক সাধারণ দৃশ্য। সবাই জানতোঃ ট্রেভর নামের বদমাশ বাচ্চাটা নরকের বাদুড়ের মত ঊড়ে এসে পড়তো আর তার ঠিক পেছনেই তার মা ছুটতে থাকতো। তিনি হিল পরেই ফুল স্পিডে দৌড়াতে পারতেন। কিন্তু যদি তিনি সত্যিই আমাকে ধরতে চাইতেন তবে তিনি ফুল স্পিড থাকা অবস্থায় এক অদ্ভুত কেরামতি দেখাতেন। দৌড় দেয়া অবস্থাতেই পা থেক হিল খুলে ফেলতেন, এক মুহুর্তের জন্য থামতেন না। আমি তখনই বুঝতাম, এবার মা টার্বো মোডে আছে।

আমি যখন ছোট ছিলাম, তিনি আমাকে ধরে ফেলতাম। কিন্তু যতই বড় হতে লাগলাম, তার পক্ষে আমাকে ধরা অসম্ভব হয়ে দাড়াল। তখন তিনি বুদ্ধি কাজে লাগাতেন। আমি পালিয়ে যাওয়ার মুহুর্তেই তিনি চিৎকার  করতেন, চোর! চোর! ধর! ধর!। তিনি তার নিজের ছেলের সাথেই এমন করতেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় সাধারণত কেউ কারো বিষয়ে নাক গলাত না কিন্তু যদি এটা হত মব জাস্টিস, তখন প্রায় সবাই পিছু নিত। তাই, চিৎকার করতেন, চোর! আর পুরো পাড়া আমার পিছু নিত। আমার তখন অচেনা সব লোকদের ট্যাকেল করতে হত। ডাইভ দিয়ে, ডজ দিয়ে আমি তাদের ফাকি দিতাম আর চিৎকার করে বলতাম, “আমি চোর নই! আমি উনার ছেলে!”

রবিবার দিনে লোক ভর্তি বাসে উঠে পড়ার মত কষ্টের আর কিছুই হতে পারতো না কিন্তু যখনই আমি শুনতাম, মা বলছেন, শান’কেহলা! তখনই বুঝতাম কপালে আজ দুঃখ আছে। তিনি আন্ড্রুকে কোলে তুলে নিতেন আর আমরা  ভক্সওয়াগন ছেড়ে মিনিবাস ধরতে চলে যেতাম।

—-ঃ—-

আমার বয়স তখন পাঁচ কি ছয়, যখন নেলসন ম্যাণ্ডেলা কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন।  আমার মনে আছে আমরা টিভিতে তা দেখছিলাম আর সবাই বেশ খুশি ছিল। আমি জানতাম না কেন আমরা খুশি ছিলাম। আমি জানতাম এপার্টহেইড বলতে কিছু একটা ছিল আর এটা এবার শেষ হতে চলেছে। এটা খুব বড় ব্যাপার ছিল কিন্তু আমার এই রাজনীতিক মারপ্যাঁচের ব্যাপারে কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু আমার মনে আছে আর সম্ভবত আমি কখনোই ভুলবো না, ম্যাণ্ডেলার মুক্তির পর যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেকেই এপার্টহেইডের বিপক্ষে গণতন্ত্রের বিজয়কে রক্তপাতহীন বিপ্লব বলে আখ্যা  দেন। একে রক্তপাতহীন বিল্পব বলা হয়, কারন, এতে সাদাদের রক্ত অনেক কম ঝরেছিল। কিন্তু কালোদের রক্তে রাজপথ ভেসে গিয়েছিল।

 

Image result for trevor noah childhood photos
বাবার সাথে যুবক ট্রেভর নোয়া

এপার্টহেইডের পতনের পর আমরা জানতাম, এখন কালো মানুষরা দেশ শাসন করবে। কিন্তু কোন কালো মানুষেরা? ক্ষমতার দ্বন্দে ইনকাথা ফ্রিডম পার্টি আর আফ্রিকান ন্যশনাল কংগ্রেসের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হল। এই দু’দলের ক্ষমতার দ্বন্দ বোঝা বেশ জটিল কিন্তু সহজ ভাষায় বললে এটা জুলে আর ঠোসাদের মধ্যে প্রক্সি ওয়ার। ইনকাথা পার্টি ছিল জুলু সংখ্যাগরিষ্ঠ। এরা বেশ যুদ্ধংদেহী আর জাতীয়তাবাদী। আর আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস ছিল বিভিন্ন গোত্রর সমন্বয়ে গড়া একটি জোট, যাদের বেশিরভাগ নেতাই ছিলেন ঠোসা। তারা শান্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ হবার বদলে, তারা একে অপরের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য বর্বরতায় জড়িয়ে পড়লো। বিশাল দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লো। গলা কেটে খুন একেবারে সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ালো। সেই সময় লোকেরা একজনকে চেপে ধরে, তাকে একটা টায়ারের মধ্যে ঢুকিয়ে দিত। তারপর তার গেয়ে পেট্রোল ঢেলে তাতে আগুন ধরিয়ে দিত। ইনকাথার লোকেরা এনএনসিদের আর এনএসসিরা ইনকাথাদের সাথে এমন বহু সহিংসতা চালিয়েছে। একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় আমি এমন একটা ভস্মীভূত মৃতদেহ দেখেছিলাম। সন্ধ্যায় আমি আর মা আমাদের ছোট সাদা-কালো টিভিটা ছাড়তাম আর খবর দেখতাম। ১২ জন। ৫০ জন। ১০০ জন নিহত হবার কথা প্রতিদিন শুনতে পেতাম।

ইডেন পার্ক পুর্ব র‍্যাণ্ড, ঠুকুজা আর ক্যাটলহং থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না। এই শহরগুলোতে ইনকাথা আর এএনসি সমর্থকদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছিল।  মাসে অন্তত একবার  আমরা বাসায় ফেরার সময় দেখতাম পুরো পাড়া জুড়ে আগুন জ্বলছে। শত শত দাঙ্গাকারী রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। আমার গাড়িটা খুব সন্তপর্ণে মানুষ আর পুড়তে থাকা টায়ারের  প্রতিবন্ধকতা ঠেলে সামনে টেনে নিয়ে যেতেন। কোনো কিছুই টায়ারের মত পোড়ে না- সে এক কল্পনাতীর আক্রোশ নিয়ে, যা না দেখলে বিশ্বাস হয় না। এর পাশ দিয়ে যাবার সময় মনে হত, যে একটা গরম ওভেনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। আমি মাকে বলতাম, “শয়তান বোধহয় নরকে টায়ার পড়ায়।”

যখনই দাঙ্গা শুরু হত, প্রতিবেশিরা সবাই বুদ্ধিমানের মত দরজা আটকে ঘরের ভেতর আশ্রয়ে চলে যেত। কিন্তু আমার ছিলেন ব্যাতিক্রম। তিনি সোজা আমার হাত ধরে ঘর থেকে বের হতেন। দাঙ্গাকারীদের পাশ দিয়ে যাবার সময় তিনি তাদের দিকে এমনভাবে তাকাতেন, যেন বলছেন, আমাকে যেতে দাও। আমি এসব ঝামেলায় নেই। তিনি বিপদে একদম নির্বিকার থাকতেন। যা আমাকে সবসময় অবাক করতো। এমনকি বাইরে যুদ্ধ বেঁধে গেলেও তিনি তার স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতেন, বিভিন্ন জায়গায় যেতেন। এটা সেই একগুঁয়েমি, যাতে ভর করে তিনি ভাঙা গাড়ি নিয়েও চার্চে যেতেন। ইডেন পার্কের রাস্তায় হয়ত পাচশতাধিক দাঙ্গাকারী টায়ার জ্বালিয়ে দাড়িয়ে আছে কিন্তু তিনি এর মধ্যেই বলতেন, “ড্রেস পরে নাও। আমার বাইরে বেরুতে হবে। তোমার স্কুলে যাওয়া লাগবে।”

“তোমার কি ভয় নেই?’ আমি জিজ্ঞেস করতাম। “ওরা এত এত মানুষ আর আমরা মাত্র দু’জন।“

“আমরা মোটেও একা নই, লক্ষ্মীসোনা।” মা বলতেন। “আমাদের সাথে স্বর্গের ফেরেশতারা আছেন।”

“বুঝলাম, ভাল হত না, যদি তাদের দেখা যেত।” আমি বলতাম। “দাঙ্গাকারীরা হয়ত জানে না আমাদের সাথে ফেরেশতারা আছে।”

তিনি আমাকে দুশ্চিন্তা করতে না করতেন  আর তিনি তার জীবনের নীতিমালাতে ফিরে যেতেন, “যদি ঈশ্বর আমার সাথে থাকেন, তাহলে কে আর আমার ক্ষতি করতে পারবে?” তিনি একদমই ভয় পেতেন না এমনকি যখন উনার ভয় পাওয়ার দরকার ছিল।

—-ঃ—-

সেই অসতর্ক রবিবারে আমরা চার্চ ঘোরার চক্র শেষ করে আবার সাদা চার্চে ফিরে এসেছিলাম। রোজব্যাংক ইউনিয়নে আমরা বেরিয়ে এসেছিলাম ততক্ষণে আধার নেমে এসছিল আর আমরা একা ছিলাম।  সারাদিন মিনিবাসে এক চার্চ থেকে আরেক চার্চে আসা-যাওয়া করতে করতে আমি ছিলাম ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। তখন রাত প্রায় ৯টা বাজে। সেই সময় সঙ্ঘাতময় দিনে, এত রাতে বের হওয়া মোটেও ঠিক ছিল না। আমরা জেলিকো এভিনিউ আর অক্সফোর্ড রোডের এককোণে দাঁড়িয়ে ছিলাম। জোহেনেসবার্গের সম্পদশালি এই অংশে কোনো মিনিবাস ছিল না । রাস্তাঘাট একদম ফাঁকা। আমার মাকে খুব বলতে ইচ্ছে করছিল, “দেখেছ, এজন্যই ঈশ্বর চায় নি আজ আমরা ঘর থেকে বের হই।” কিন্তু আমি মায়ের মুখে দুঃশ্চিন্তার ছাপ দেখে কিছু না বলার সিদ্ধান্ত নিলাম। সেটা আসলে এমন কিছু বলার সময় ছিল না।  আমরা মিনিবাসের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে রইলাম।

এপার্টহেইডে দক্ষিণ আফ্রিকার কালোদের জন্য কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু তারপরও সাদাদের ঘর মোছা আর বাথরুম পরিষ্কার করার জন্য আমাদের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রয়োজনই আবিষ্কারের প্রসূতি। কালোরা তাদের নিজস্ব ট্রানজিট ব্যবস্থা দাঁড় করিয়ে ফেললো। তারা তাদের নিজস্ব বাসরুট বানিয়ে ফেললো, যা প্রাইভেট এ্যাসোসিয়েশন নিয়ন্ত্রন করতো। এটা ছিলে সম্পূর্ণ আইনের বাইরে। কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণের আওতায় না থাকায়, মিনিবাস ব্যবসা ছিল রীতিমত মাফিয়া কারবার। একেক গ্রুপ একেক রুট নিয়ন্ত্রণ করতো আর রুটের নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিয়মিত সংঘাতে জড়িয়ে পড়তো। সেখানে ঘুষ, মারামারি ছিল আবার মারামারি এড়াতে  চাঁদার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু একটা জিনিস মোটেও করা যাবে না, অন্য বাসের রুট চুরি। যেসব ড্রাইভাররা এ নিয়ম মানতোনা, তাদের মেরে ফেলা হত। মিনিবাসগুলো্র উপর তাই লোকের বেশ অনাস্থা ছিল। তারা আসলে আসতো, আর না আসলে না।

রোজব্যাংক ইউনিয়নের সেই বাসস্ট্যান্ডে আমি প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। কোনো মিনিবাস আসার লক্ষণও দেখলাম না। শেষমেশ বাধ্য হয়ে আমরা হিচহাইক করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমরা অনন্তকাল ধরে হাঁটলাম। অবশেষে একটা গাড়ি এসে থামলো। ড্রাইভার আমাদের লিফট অফার করলো। আমরা গাড়িতে চড়ে বসলাম। দশ ফুটও যাইনি। এমন সময় একটা মিনিবাস এসে আমাদের গাড়ির সামনে থামলো। একজন জুলু ড্রাইভার, একটা বিশাল সাইজের ইওইসা* হাতে নামলো। ইওইসা  জুলুদের ঐতিহ্যবাহী  মুগুর বিশেষ। এক বাড়িতে মানুষের মুণ্ডু ভর্তা করে দেবার ক্ষমতা রাখে এ জিনিস। ড্রাইভারের সাথে তার চ্যালাও গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলো। তারা আমাদের লিফট দেয়া ড্রাইভারের পাশে এসে দাঁড়ালো, তাকে একটানে গাড়ি থেকে টেনে নামালো। তারপর অমানুষের মত পেটানো শুরু করলো।

“শালা, আমাদের কাস্টমার ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিস?”

মনে হচ্ছিল তারা লোকটাকে মেরেই ফেলবে। এরকম তখন অনেক হত। আমার মা তখন বলে উঠলো, “উনি আমাদের সাহায্য করছিল। আমরা এতক্ষণ মিনিবাসের খোঁজই করছিলাম।” তারা লোকটাকে ছেড়ে দিল আর আমরা মিনিবাসে চড়ে বসলাম। দক্ষিণ আফ্রিকার মিনিবাসের ড্রাইভাররা খুন, চাদাবাজির পাশাপাশি যাত্রীদের উপর হামলার জন্য কুখ্যাত ছিল। আর আমদের বাস ড্রাইভরও ছিল বেশ বদরাগী। বাসে তখন আমরাই একমাত্র যাত্রী। বাসে উঠার পরপরই ড্রাইভার আমার মাকে অপরিচিত লোকের গাড়িতে উঠার জন্য লেকচার দেয়া শুরু করলো। আমার মা মোটেও লেকচার শোনার অবস্থায় ছিলেন না। তিনি ড্রাইভারকে নিজের চরকায় তেল দিতে বললেন। মায়ের মুখে ঠোসা ভাষা শুনে ড্রাইভার আরো ক্ষেপে গেল। জুলু আর ঠোসা মেয়েদের সম্পর্কে কিছু অদ্ভুত স্টিরিওটাইপ প্রচলিত আছে। যেমন, জুলু মেয়েরা খুব ভদ্র আর কর্তব্যপরায়ণ। আর ঠোসা মেয়েরা স্বভাবে উগ্র আর বেঈমান। আর সেখানে আমার মা ছিলেন ঠোসা, যে কিনা তার জাত শত্রু, সাথে দু’টো ছোট শিশু, যাদের একজন আবার মিশ্র বর্ণের। ড্রাইভারের কাছে তিনি যেনতেন পতিতা নয়, সাদা মানুষের সাথে শোয় এমন পতিতা।

“ওহ, তুমি ঠোসা।” ড্রাইভার শিতল গলায় বললো। “আর বলতে হবে না। পরপুরুষের সাথে গাড়িতে উঠে। বাজে মহিলা।”

তারপর শুরু হল একটানা ঝগড়া। আমার মা তাকে চুপ থাকতে বললো আর সে মাকে নানা নামে গালি দিতে থাকলো। রিয়ারভিউ মিররে আমি তাকে তর্জনী উঁচু করে শাসাতে দেখছিলাম।

“ঠোসা মেয়ে গুলোর এই এক সমস্যা। সবগুলো বেশ্যা-মাগী। আজ রাতে তোকে উচিত শিক্ষা দিব।”

সে বেশ জোরে গাড়ি চালাতে শুরু করলো। ট্রাফিক সিগন্যালের জন্য মাঝেমধ্যে গতি কমিয়ে আনলেও সে একবারও থামলো না। সে সময় মৃত্যু সবার আশেপাশেই ঘুরতো। আমার মা ঘটনার ভয়াবহতা অনুভব করতে পারলেন। আমরা খুন হতে পারতাম। তিনি ধর্ষিত হতে পারতেন। সে সময় আমার ধারনাই ছিল না আমরা কতটা বিপদে ছিলাম। আমি এতটাই ক্লান্ত ছিলাম যে, আমার শুধু ঘুমাতে ইচ্ছা করছিল। তবে আমার মা খুব শান্ত ছিলেন। তিনি একটুও আতংকিত হননি। তিনি বুদ্ধি ব্যবহার করে ড্রাইভারের সাথে সমঝোতা করার চেষ্টা করতে লাগলেন।

“আমাদের ভুল হয়ে গেছে, ভুটি*। আমাদের এখানেই নামিয়ে দিলেই চলবে।”

“না।”

“আমরা হেটে চলে যেতে পারবো।”

“না।”

অক্সফোর্ড রোডের ফাঁকা রাস্তায় সে তীব্র গতিতে গাড়িয়ে চালিয়ে যচ্ছিল। আমি গাড়ির স্লাইডিং ডোরের পাশে বসেছিলাম। আমার পাশেই মা অ্যান্ড্রুকে কোলে নিয়ে বসেছিল। মা বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। আর আমার কানে ফিসফিস করে বললো, “ও পরের সইন্টারসেকশনে থামলেই আমরা লাফ দিব।” আমার তখন কিছুই মনে নেই। একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। পরের ট্রাফিক লাইটে আসার পর, ড্রাইভার ঝুকে ট্রাফিক লাইট দেখার চেষ্টা করলো। আমার তখন আমার কাছে ঝুকে আমাকে তুলে নিলেন। তারপর শরীরের স্মস্ত শক্তি প্রয়োগ করে আমাকে যত দূরে সম্ভব ছুঁড়ে ফেললেন আর আমার ভাই অ্যান্ড্রুকে নিয়ে ঝাঁপ দিলেন। ব্যাথার অনুভূতি আসার আগ পর্যন্ত পুরো ব্যাপারটা স্বপ্নের মত মনে হচ্ছিল।

বুম!

আমি মাটিতে আছড়ে পড়লাম। তারপর মাটিতে গোত্তা খেলাম। তারপর অনন্তকাল ধরে পাক খেতে লাগলাম। যখন মাটিতে গড়াগড়ি শেষ হল, ততক্ষণে আমি আধো ঘুম থেকে পুরোপুরি জাগ্রত, বিধ্বস্ত। পাশে তাকিয়ে দেখি মা দাঁড়িয়ে অ্যান্ড্রুকে কোলে নিয়ে ফেলেছে। তিনি আমার দিকে তাকালেন আর চিৎকার করে বললেন, “ট্রেভর, দৌড়!”

আমার জন্য অতটুকুই যথেষ্ট। আমি আর মা প্রাণপণে  ছুটলাম। দৌড়ে কেউই আমাদের হারাতে পারবে না। পুরো ব্যাপারটা আসলে ব্যাখাতীত, আমরা দুজনেই সহজাত প্রবৃত্তির বশে ছুটেছি। সেসময় মৃত্যু সবখানে ওত পেতে থাকতো আর সহিংস জনতা বিস্ফোরণের অপেক্ষায় ফুসতে থাকতো। শহরে পুলিশ দাঙ্গা থামাতে রায়ট গিয়ার, সাঁজোয়া যান আর হেলিকপ্টার নিয়ে আসতো। ৫ বছর বয়সী আমি জানতাম- দোড়াও! আশ্রয় খোঁজ! পালাও! আমার জীবন যদি আর দশটা সাধারণ বাচ্চার মত হত, তাহলে হয়ত চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ দেয়া আমাকে আতংকিত করে ফেলতো। আমি হয়ত সেখানে স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে থাকতাম আর মাকে প্রশ্ন করতাম, “কি হয়েছে মা? আমার পা দুটো এমন অসাড় লাগছে কেন?” কিন্তু এমন কিছুই হয়নি। মা ছুটতে বললো আমিও ছুটলাম। সিংহের ভয়ে হরিণের পাল যেভাবে পালায়, আমিও তেমনি পালালাম।

বাসের লোক দুটো নেমে এল। তার আমাদের তাড়া করতে চাইল কিন্তু আমাদের গতির সামনে পাত্তাই পেল না। আমার এখনো মনে আছে, আমি পেছনে তাকিয়ে লোকদুটোকে বিস্ময়ভরা মুখে হাল ছেড়ে দিতে দেখেছিলাম। এটা কি ঘটে গেল? তাদের ধারনাই ছিল না, একজন মহিলা দুটি ছোট বাচ্চাকে নিয়ে কিভাবে দৌড়াতে পারে? কিন্তু তারা জানতো না তারা ম্যারিভিল কলেজের বর্তমান চ্যম্পিয়নদের মোকাবেলা করছে। আমরা ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে এমন একটা পেট্রোল স্টেশনের সামনে এসে থামলাম। সেখান থেকে পুলিশে খবর দিলাম। ততক্ষণে অবশ্য লোকদুটো পালিয়ে গেছে। আমি এখনও জানি না, কিভাবে কি ঘটেছিল? আমি শুধু এড্রেনালিনের তাড়নায় দৌড়েছি। কিন্তু দৌড় থেমে যেতেই আবিষ্কার করলাম, আমি কতটা আহত! আমার হাতের চামড়া ছিড়ে গেছে, পুরো গা রক্তাক্ত। মায়েরও একই দশা। অবিশ্বাস্যভাবে, অ্যান্ড্রুর কিছুই হয়নি। মা ওকে নিজের দেহের সাথে আকড়ে ধরে রেখেছিল। আমি মার দিকে আতংকে তাকিয়ে বললাম, “কি হয়েছে? আমরা দৌড়ালাম কেন?”

“ওরা আমদের মারতে চেয়েছিল?’

“তুমি আমাকে তা বলোনি। তুমি আমাকে বাস থেকে ছুঁড়ে ফেলেছ!” আমি চিৎকার করে হাত-পা ছুঁড়তে ছুড়তে প্রশ্ন করলাম।

“আমি তোমাকে বলেছি, ট্রেভর। তুমি লাফ দিলে না কেন?”

“লাফ? আমি ঘুমিয়েছিলাম।”

“তো আমি কি করবো? তোমাকে ওদের কাছে ফেলে চলে আসবো? ওরা তোমাকে মেরে ফেলতো।”

“ওরা অন্তত মারার আগে ঘুম থেকে ডেকে তুলতো।”

আমরা সেখানে পায়চারী করতে লাগলাম। আর বাসায় ফেরার জন্য পুলিশের গাড়ির অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমি তখন একই সাথে হতভম্ব আর রেগে গিয়েছিলাম। কারণ, মা আমাকে বাস থেকে ছুঁড়ে ফেলেছিল। ৯ বছর বয়সী আমি সেদিন বুঝতে পারিনি, আসলে মা আমার জীবন বাচিয়েছিলেন।

“ঈশ্বরকে ধন্যবাদ আমরা বেচে গেছি।”

“না, মা। আমাদের ঈশ্বরের কথা তখনই শোনা উচিত ছিল যখন গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছিল না। আমি নিশ্চিত শয়তানই আমাদের এখানে টেনে এনেছে।”

“না। ট্রেভর শয়তান এভাবে কাজ করে না। এটা ঈশ্বরের পরিকল্পনার অংশ। তিনি হয়ে আমাদের কোনো কারনে এখানে ডেকে এনেছেন।”

তারপর এ নিয়ে অনেকক্ষণ মায়ের সাথে তর্ক চললো। অবশেষে আমি বললাম, “দেখ মা, আমি জানি তুমি যিশুকে অনেক ভালোবাস কিন্তু আগামী সপ্তাহ থেকে তুমি তাকে বলবে আমাদের বাসায় এসে দেখা করতে। আজকের অভিজ্ঞতা মোটেই ভাল ছিল না।”

এ কথা শোনার পর মা হাসিতে ফেটে পড়লেন। মা’র সাথে আমিও হাসিতে যোগ দিলাম। আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে হাসছিলাম, মাঝরাতে পেট্রোল স্টেশনের আবছা আলোয়, এক মা আর তার ছোট বাচ্চা। রক্ত আর কাদায় যাদের পুরো গা ভরে আছে।

আরও দেখেন

“বিশের দশকের হলিউড ছিল নান্দনিকতার আধার”: আলেক্সান... “আমি শুধুই নেব্রাস্কার একজন বাসিন্দা”: আলেক্সান্ডার পেইন   প্রশ্নঃ Nebraska আপনার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র যার চিত্রনাট্য আপনি লেখেননি।...
ট্রেভর নোয়া’র স্মৃতিকথা | পর্ব ২... এপার্টহেইড ছিল আদর্শ বর্ণবাদ। শতাব্দির পর শতাব্দি জুড়ে এর বিবর্তন হয়েছিল। এর শুরুটা হয়েছিল ১৬৫২ সালে যখন, ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ‘কেইপ অব গুড হোপ’ ...
আতাউর রহমান সিহাব
আতাউর রহমান সিহাব

উনি কুকুর ভালবাসেন। গান শুনেন আর জোছনা দেখে আবেগাপ্লুত হন।

error: