fbpx

দিস ইজ ওয়াটার। ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস

 

 

[ ২০০৫ সালে  ক্যানিয়ন কলেজ সমাবর্তনে বক্তৃতা দিছিলেন মার্কিন সাহিত্যের  একজন  মায়েস্ত্রো ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস। ক্লিশেভরা বাজারি ইন্সপিরেশনমার্কা তোষামোদমূলক বক্তৃতাবাজির জগতে ‘দিস ইজ ওয়াটার’ অনন্য জিনিস। ওয়ালেসের ক্ষমতা ছিলো কমপ্লেক্স আইডিয়াগুলিরেও নিখুঁত আর্টিকুলেট করতে পারার, প্রমাণ এই বক্তৃতায় পাওয়া যাবে। আমাদের জানামতে ডেভিড ফস্টার ওয়ালেসের কোনো লেখার এইটাই প্রথম বাংলানুবাদ।

সিরিয়াস, ‘গভীর’ লেখা তথাকথিত ‘অপ্রমিত’ বাংলায় লেখা বা বলা যায় না বলে যে মিথ চালু আছে সেইটা আরেকবার ভুল প্রমাণিত হইছে এই অনুবাদের মাধ্যমে। একটু  বুদ্ধিবৃত্তিক ধরনের আলাপ জনগণের বোধগম্য ভাষায় করা খুবই সম্ভব। ভদ্রলোকদিগের নেত্র-কর্ণ কিঞ্চিৎ ওপেন রাখলেই সম্ভব।

সিরিয়াস ধরণের যুক্তিতর্কমূলক, চিন্তাশীল লেখার বাংলানুবাদে পরিভাষাগুলি কষ্ট দেয়। একটা উপায় ‘অপিনিহিতি’ টাইপ তৎসমধরণের যান্ত্রিক পরিভাষা  বানানো –যেইটা সাধারণত করা হয়। গণবিচ্ছিন্নই খালি না, বেশিরভাগেরই মাথার  উপ্রে দিয়া যায়। (যেমন, ফেনমেননের-এর বাংলা করা ‘প্রপঞ্চ’)।  এমনকি  ব্রাকেটে ইংরেজিটাও লিখা দেওয়া লাগে বারবার । নাইলে কেউ বোঝে না। 

আরেকটা উপায় বাংলারই  বিভিন্ন চালু শব্দই, কাছাকাছি বা ভিন্ন অর্থে যা প্রচলিত, পরিভাষা হিসাবে ইউজ করা। এইটারে সৃজনশীল পরিভাষা বলা যায়। যেমনঃ ফুকোর ‘ডিসকোর্স’-এর বাংলা হিসাবে ‘বয়ান’’ শব্দটা ভালো চলতে পারে। এইজন্যে সো কল্ড  ‘প্রমীত’র বাইরে  বাংলা ভাষার বৈচিত্রময় শব্দসম্ভারের দিকে তাকাইতে হবে। অনুবাদকদের জন্যে কাজটা কঠিন কিন্তু আখেরে তাতেই লাভ।

‘দিস ইজ ওয়াটার’’-এর এই বাংলানুবাদে তানভীর হোসেন, ( নিজে কবি এবং সেইহেতু ভাষার ক্ষেত্রে সচেতন বলেই), সৃজনশীলতার পরিচয় দিছেন। এই অনুবাদে ডিফল্ট-এর মতো টেকনিকাল টার্মের বাংলা  ‘মজ্জাগত’ করায় সেইটার নমুনা আছে- সম্পাদক, মাদারটোস্ট]  

 

একদিন দুইটা পিচ্চি মাছ ঘুরতে বাইর হইছে। ঘুরতে ঘুরতে তাদের দেখা হইলো একটা সিনিয়র মাছের সাথে। সে তাদের কইলো, গুড মর্নিং পোলাপাইন, পানি কেমন লাগতেছে? তো এরা শুধু মুখ চাওয়াচাওয়ি করে কিন্তু কিছুই কইতে পারে না। সিনিয়র মাছটাও পাশ কাটায়ে চলে যায়। পিচ্চি মাছ দুইটা আবার ঘুরাঘুরি শুরু করে। এইভাবে খানিকক্ষণ ঘোরার পর নিচেরজন উপরের জনের দিকে তাকায়া কইলো, এই পানিডা আবার কী বাল?

Image result for this is water david foster wallace poster

এখন আপনেরা হয়তো ভাবতেছেন যে, আমি আপনাদের জুনিয়র মাছ ভাইবা সিনিয়র মাছ সাইজা পানির বিষয়টা খোলাসা করতে আইছি এইখানে, তা না! আমি মোটেও সেই পণ্ডিত বুড়া মাছটার মতো কেউ না। এই গল্পটার সারকথা হইলো সবচে অনস্বীকার্য সার্বজনীন আর গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাগুলাই আমাদের চোখে পড়ে না, কথাও হয় না এগুলা নিয়া। বাক্য হিসাবে এইটা স্রেফ মামুলী আর বস্তাপচা কিন্তু ঘটনা হইলো খানাখন্দে ভরপুর প্রাত্যহিক জীবনে এইরকম বস্তাপচা জিনিসও জীবন মরণের ব্যাপার হইয়া উঠতে পারে। এইটা অবশ্য আপনাদের কাছে অতিশয়োক্তি বা গালগপ্পোও মনে হইতে পারে।

 

যে বিষয়গুলার ব্যাপারে আমি চোখ বন্ধ কইরা নিশ্চিত বইলা মনে হয় সেগুলার বেশিরভাগই আসলে চরম ভ্রান্ত ধারণা । ধরেন যে, আমার এইরকমই একটা ধারণা  হইল আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি এই বিশ্বসংসারের কেন্দ্রীয় চরিত্র আমিই, বর্তমানের সবচে উজ্জ্বল, সাচ্চা আর গুরুত্বপূর্ণ কেউ। এইরকম ন্যাচারাল, বেসিক আত্মকেন্দ্রিকতা নিয়া আমরা আলাপই করি না কারণ সামাজিকভাবে এগুলা বেশঅস্বস্তিকর যদিও তলে তলে আমরা সবাই কমবেশি এইরকমই। হাড়েমজ্জায় জন্ম থেকেই আমরা এইরকম।

 

এখন ব্যাপারটা ভাবেন: আপনাদের জীবনে এমন কোন ঘটনাই নাই যেইটা আপনারে কেন্দ্র কইরা ঘটে নাই। এই যে জগতটায় আছেন সেইটা হয় আপনার সামনে বা পিছনে, বামে কিংবা ডানে, আপনের টিভিতে বা মনিটরে বা যেখানেই হোক আছে। অন্যদের ভাবনা চিন্তা আর অনুভূতিগুলারে আপনার সাথে একটা যোগাযোগে আসতে হয় অথচ আপনার নিজেরগুলা খুবই অকপট, জরুরি আর জ্বলজ্যান্ত- বুঝলেন বিষয়টা! কিন্তু দয়া কইরা এইটা ভাইবেন না যে আমি দয়া দাক্ষিণ্য, অন্যরে নিয়া ভাবার বা তথাকথিত সুকুমারবৃত্তির প্রচার চালাইতে যাইতেছি। এইটা সুকুমারবৃত্তির বিষয় না। এইটা হইল আপনার আমার সেই হাড়মজ্জাগত বিষয়টারে একটু এদিক সেদিক কইরা বা একেবারে ঝাইড়া ফেলাইয়া দিয়া দেখা বোঝার ব্যাপার যেইটা কিনা গভীর আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক।

 

যারা তাদের এই প্রকৃতিপ্রদত্ত হাড়মজ্জাগত বিষয়টারে এইরকম করতে পারে তাগো আমরা কই “ভালভাবে খাপ খাওয়াইতে পারা লোক” আর আপনাদের বইলা রাখি যে এই টার্মটা কিন্তু কোন গায়েবি টার্ম না।

এইখানকার বিজয়গর্বে গৌরবান্বিত প্রাতিষ্ঠানিক সেটিংয়ে একটা প্রশ্ন ফাল দিয়া উঠে যে, এই মজ্জাগত বিষয়টার খাপ খাওয়ানো সংক্রান্ত কামডার কতোটুকু আসল  জ্ঞান বা মগজরে ইনভলভ করে। প্রশ্নটা আরও ঘোলাটে হইতে থাকে। অন্তত আমার দিক থেইকা কলেজ শিক্ষার সবচে ভয়াবহ দিক হইল, সব কিছুরে ওভার ইন্টেলেকচুয়ালাইজ কইরা ফেলা, চোখের সামনে ঘটতে থাকা বিষয় বাদ দিয়া নিজের ভেতরে চলতে থাকা জিনিসগুলা বাদ দিয়া দুনিয়ার আজাইরা সব বিষয়ে মাথা ঘামানের একটা টেনডেন্সি তৈরি কইরা দেওয়া। যেহেতু আমি জানি এতোদিনে আপনেরা বুঝতে পারছেন যে নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত মনোলগগুলায় মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া থাকার চাইতে সজাগ আর মনোযোগী থাকতে পারাটা মুখের কথা না। গ্র‍্যাজুয়েশনেরও বিশ বছর পরে গিয়া আমি ধীরে ধীরে বুঝতে শিখছি যে ওই  “ আমরা শিখাই কেমনে ভাববেন “ নামক লিবারেল আর্টস ক্লিশেটার মাজেজা আসলে আরও গুরুগম্ভীর একটা আইডিয়া “ভাবতে শেখার শর্টহ্যান্ড”। যা আসলে বোঝাইতেছে যে আপনি কিভাবে কী নিয়া ভাববেন এই বিষয়গুলার কিছু নিয়ন্ত্রণকৌশলচর্চার চর্চা শেখা। মানে হইতেছে কোন জিনিসটায় আপনে মনোযোগী দিবেন তা বাইছা নেয়ার ক্ষেত্রে বা কেমনে আপনে অভিজ্ঞতার মানে করবেন তা বাইছা নেয়ার ক্ষেত্রে চোখ কান খোলা রাখতে শেখা। কারণ বাইছা নিতে শেখার এইসব চর্চা না থাকলে পরিণত জীবনে আপনেরে মাইনকা চিপায় পড়তে হবে। “মন হইল খাসচাকর আবার  আবার নিদারুণ মনিবও “ পুরান এই বাণীটা মনে কইরা দেখেন, এমনেতে উপ্রে উপ্রে খুব দায়সারা আর সাধারণ একটা কথা মনে হইলেও আদতে কথাটা বিশাল আর ভয়ংকর এক সত্যরে প্রকাশ করে। কাকতালীয় হইলেও মাথায় গুলি কইরা আত্মহত্যা করা পূর্ণবয়স্কদের সংখ্যা নেহাত কম না যাদের অনেকেই আসলে ট্রিগার টানার অনেক আগেই মইরা বইসা থাকে।

 

আর আমি এই জিনিসটারেই আপনাদের লিবারেল আর্টস শিক্ষার তথাকথিত সেই ফাউল ‘আসল মূল্যবোধ’ মনে করি যা মূলত: আপনারে কেমনে আপনের হাড়মজ্জাগত ম্যাড়মেড়ে, উড়াধুরা, নিজের মগজ খাটায়া এক্কেবারে আলাদা একটা জগতে জীবন যাপন করার থেইকা একটা আয়েশি আয়- উন্নতিওয়ালা মান ইজ্জতের জীবন যাপনের দিকে নিয়ে যাওয়া যাইতে পারে সেই ধান্দায় থাকে, ডে ইন, ডে আউট।

 

এগুলা আপনাদের কাছে হয়তো আলগা বা গাঁজাখুরি মনে হইতে পারে। তাইলে এবার আসল কথায় আসি শোনেন। আপনারা সিনিয়ররা যারা গ্র্যাজুয়েশন করতেছেন তাদের আসলে ডে ইন, ডে আউট ব্যাপারটা সম্পর্কে কোন ধারণাই নাই। আমেরিকান জীবনের একটা বিশাল অংশ নিয়া সমাবর্তনের বক্তব্যগুলায় কেউই কিছু বলে না। যেখানে বাস করে একঘেয়েমি, রুটিন আর ছাপোষা হতাশা। এইখানে বাবা- মা আর বয়স্ক যারা আছেন তারা জিনিসটা খুব ভাল বুঝবেন।

Image result for david foster wallace

ধরেন, একটা গড়পড়তা দিন, সকালে উইঠা আপনি আপনের চ্যালেঞ্জিং চাকরিটা করতে গেলেন, ৯/১০ ঘন্টা কঠিন পরিশ্রম কইরা দিনের শেষে ক্লান্ত অবসন্ন আপনের ভেতর তখন একটাই আকাঙ্ক্ষা, বাড়ি ফেরার, একটা ভাল ডিনার খাওয়ার হয়তো কিছুক্ষণ চ্যাগানোর আর তারপর যতো দ্রুত সম্ভব বিছনায় চইলা যাওয়া কারণ কালকে সকাল সকাল উইঠা আবার এই কাজগুলাই করতে হবে আপনের। কিন্ত বাসায় ফেরার সময় আপনের মনে হইলো রাতে খাওয়ার মতো তো কিছুই নাই বাড়িতে, কাজের চোটে সপ্তাহের বাজারটাও করা হয় নাই, তখন নিরূপায় আপনের বাজারে দৌড়াইতে হয়। আর তখন এমনিতেই অফিস ছুটির সময়, রাস্তায় ভয়াবহ জ্যাম, এগুলা পার হইয়া শেষতক যখন তীব্র ফ্লুরোসেন্টে ঝলসানো দোকানটায় ঢুকলেন তখন সেইটা আপনের মতোই আরও চাকরিজীবীতে ঠাসা, সবাই চিপাচাপা দিয়া ভিড় ঠেইলা যে যেভাবে পারতেছে বাজার করতেছে, বাতাসে ভাসতেছে প্রানঘাতী ঢিমেতাল মুজাক বা কর্পোরেট পপ, সব মিলায়া জায়গাটার পরিস্থিতি এমন যে চিপায় না পড়লে কেউ এইখানে আসতো না। আবার ব্যাপারটা এমনও না যে ঢুকলেন আর বাইর হইলেনঃ মানুষে ঠাসা এই বিশাল জায়গাটায় অন্যদের ট্রলি খেয়াল কইরা নিজের ট্রলি নিয়া প্যাঁচ খাইতে খাইতে আপনের  দরকারি জিনিসপত্র বাইছা নিতে হবে আর তার সাথে পথ আটকানোর জন্যে বরফের মতো জইমা যাওয়া বুড়া, কাণ্ডজ্ঞানহীন লোক, ADHD পোলাপানগুলা তো আছেই যাদের দিকে তাকায়া দাঁত বাইর কইরা হসি দিয়া যতোটা পারা যায় ততোটা বিনয় দেখাইয়া রাস্তা ছাইড়া দাওয়ার অনুরোধ করতে হবে যাতে আগাইতে পারেন আর সবশেষে যখন আপনের কেনাকাটা শেষ তখন দেখবেন দিনের শেষ সময় হইলেও চেক আউটের লাইন একটাও ফাঁকা নাই। তো চেক আউটের এই লম্বা লাইন দেইখা যতোই আপনের মেজাজ খারাপ হোক ক্যাশ কাউন্টারের শশব্যস্ত মহিলাটার উপর তার কিছুই ঝাড়তে পারবেন না। যাই হোক অবশেষে আপনি লাইনের সামনে পৌঁছান, খাবার-দাবারের দাম দেন, মেশিনে চেক বা কার্ডটা যাচাই- বাছাই হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করেন আর তারপর আপনাকে নিঃস্পৃহ গলায় বলা হয় “ভাল থাইকেন”। তারপর জিনিসপাতির অদ্ভুত পলিব্যাগ বোঝাই ট্রলিটা নিয়া আপনারে মানুষ ভর্তি, এবড়াথেবড়া, ময়লা পারকিং লটে রাখা গাড়িটার কাছে গিয়া তাতে ব্যাগগুলা এমন কায়দায় তুলতে হয় যাতে জিনিসপাতি ব্যাগ থিকা পইড়া না যায় আর তারপর রাশ আওয়ারের ভারি জ্যাম ঠেইলা বাড়ি ফিরতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

আর ব্যাপার হইল এই ছাপোষা হতাশাজনক জায়গাগুলাতেই বাইছা নেওয়ার সেই চিন্তা আসে। কারণ ট্রাফিক জ্যাম, রাস্তার ভিড় আর লম্বা চেক আউট লাইন আমারে চিন্তা করার সময় দেয়। আর কিভাবে ভাববো, কিসে মন দিবো এইসব বিষয়ে যদি ঠিকঠাক সিদ্ধান্ত না নিতে পারি তাইলে প্রতিবার বাজার করার সময় আমার খবর হয়ে যাবে, কারণ হাড়মজ্জাগতভাবেই আমি এইটা ভাবি যে এই বিষয়গুলা শুধুই আমি সম্পর্কিত; আমার ক্ষুধা, আমার ক্লান্তি, আমার বাসায় ফেরার তাড়া, আর তখনই অন্য সবাইরে রাস্তার কাঁটা মনে হয়, মনে হয় আমার পথ আটকায় খাড়ায় আছে এরা কারা? আর চেক আউট লাইনের খাড়ায়া থাকা এই লোকগুলার অধিকাংশই কত বিরক্তিকর গরুগাধা টাইপ, মরা আর অমানুষ কিংবা লাইনের মাঝখানে খাড়ায়া এই লোকগুলার উঁচা গলায় ফোনে প্যাচাল পাড়তে থাকাটা কী প্যারাদায়ক আর অভব্য, আর এই বেকুবদের কারণে সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা খটাখাটনির শেষে ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত আমার বাড়ি ফিরে খাওয়া আর আয়েশ না করতে পারাটা কী ভীষণ নাইনসাফি!

 

অথবা যদি আমি হাড়মজ্জাগত বিষয় থেকে সামাজিকভাবে সচেতন একটা অবস্থায় থাকি তাইলে দিনান্তের ওই ট্রাফিক জ্যামের সময়টায় লেন ব্লক কইরা রাখা ঢাউস ভারি এসইউভি, হামার, আর ভি-১২ পিক-আপ ট্রাকগুলার হুদাই তেল গ্যাস অপচয় করা দেখতে দেখতে রাইগা টাইগা বিরক্ত হইয়া সময় পার করতে পারি। আবার এমন বাজিও লাগতে পারি যে দেশপ্রেমের বা ধর্মীয় স্টিকারওয়ালা গাড়িগুলাই যে সবচে ঢাউস আর সবচে বেশি স্বার্থপর আর এগুলার সব সময় ফোনে কথা বলতে থাকা  ড্রাইভারগুলাই যে সবচে বড় জোচ্চোর, হঠকারী আর গোঁয়ার যারা মাত্র বিশ ফিট আগাইতে গিয়া অন্য গাড়িগুলারে বিপদে ফেলে আবার আমি এমনও ভাবতে পারি যে জ্বালানির এমন অপচয় আর জলবায়ুর শোচনীয় অবস্থার জন্য আমাদের বাচ্চাকাচ্চারা আমাদের কী অবজ্ঞার চোখে দেখবে এবং আমাদের কত ইতর কাণ্ডজ্ঞানহীন আর ফালতু মনে করবে আর এগুলা এই সবকিছুই কত লেজেগোবরে এবং এমন আরও বহুত বিষয় আশয়ে।

দেখেন, আমি যদি চিন্তা ভাবনা করার এই রাস্তাটা বাইছা নিই, যেভাবে অনেকে ভাবিও, সেইটা ভাল, খালি এইভাবে ভাবার সমস্যাটা হইলো চিন্তা ভাবনার এই রাস্তাটা এতো সরল আর স্বভাবজাত যে এইটারে আপনার আলাদা কইরা বাইছা নাওয়ার কিছু নাই আসলে। এইরকম কইরা ভাবাটাই আসলে আমাদের হাড়মজ্জাগত। এই স্বভাবজাত অবচেতন প্রক্রিয়াতেই আমি আপনি রোজকার জীবনের একঘেয়ে হতাশাব্যাঞ্জক ভিড়ওয়ালা অংশটা এক্সপেরিয়েন্স করি। এই সময় আমি স্বভাবজাতভাবে বা অবচেতনে বিশ্বাস করি যে আমিই জগত সংসারের মধ্যমণি আর আমার তাৎক্ষণিক চাহিদা বা অওনুভূতিগুলাই জগতের অগ্রাধিকারগুলা ঠিক কইরা দিবে। ঘটনা হইলো এই অবস্থাগুলা নিয়া চিন্তা ভাবনার নানান রকম রাস্তা আছে। এই জ্যামে যখন এসইউভিগুলা আমার বাড়ি ফেরার রাস্তাটারে দীর্ঘ কইরা ফেলতেছে: তখন আমার মনে হয় এমনও তো হইতে পারে যে এইসব এসইউভিগুলায় বইসা থাকা লোকগুলা আগে কখনও হয়তো এমন সব এক্সিডেন্টে পড়ছিল যে তাদের থেরাপিস্টরা ট্রমা কাটায়ে আবার ড্রাইভিংয়ে ফিরতে তাদেরকে বিশাল এই এসইউভিগুলা কিনতে বলছিল যাতে এগুলার বিশাল, মজবুত কাঠামোর ভিতর তারা নিরাপদ বোধ করে, অথবা যে হামারটা মাত্রই আমারে কাটায়া আগাইলো হয়তো সেইটাতে কোন বাবা তার অসুস্থ বাচ্চাটারে তাড়াতাড়ি হাসপাতাল নিয়া যাইতে চাইতেছে, আর তার এই তাড়াটা আমার তাড়ার চাইতেও অনেক বেশি জায়েজ- আমিই আসলে তার পথের বাধা। আবার নিজেরে আমি এভাবেও ভাবতে বাধ্য করতে পারি যে, সুপারশপের চেক আউট লাইনের বাকি মানুষগুলাও আমার মতোই হতাশ আর তাদের অনেকের জীবন হয়তো আমার চাইতেও বেশি কঠিন, ছাপোষা বা প্যারাদায়ক।

 

আবার বলি, আপনেরা ভাইবেন না যে আমি উপদেশ দিতেছি আপনাদের বা বলতেছি যে এইভাবেই ভাবতে হবে আপনাদের, বা কেউ আশা করতেছে যে এইটা কঠিন কাজ বইলা, করার জন্য ইচ্ছাশক্তি আর মনের জোর লাগে বইলা আপনি কাজগুলা কিছু না ভাইবাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কইরা ফেলবেন। আর যদি আপনি আমার মতো হন তাইলে একদিন এই কাজগুলা আর আপনারে দিয়া হবে না বা স্রেফ করতে ইচ্ছা করবে না। কিন্তু প্রায়ই যদি নিজেরে আপনি সচেতনভাবে চিন্তা ভাবনার সুযোগ দেন তাইলে দেখবেন যে চেক আউট লাইনে নিজের বাচ্চাটারে কঠিন ধমক দেওয়া ওই মোটা নিস্প্রাণ চোখের মহিলাটা আদতে হয়তো এমন না, হয়তো সে বোন ক্যান্সারে ভুগতে থাকা স্বামীটার মৃত্যুশয্যায় তার হাত ধইরা আগের তিনটা রাত না ঘুমায়া কাটায় দিছে, হয়তোবা এই মহিলাটা মোটর ভেহিকেল ডিপার্টমেন্টের সামান্য বেতনের একজন কেরানি যে গতকালই আপনার স্পাউসের রেড টেপ জনিত দুঃস্বপ্নের মতো মুশকিলটা সামান্য আমলাতান্ত্রিক দয়া দাক্ষিণ্য দিয়া আসান কইরা দিছে। এখন কথা হইতেছে এই ঘটনাগুলা যে ঘটবেই এমন না আবার ঘটার সম্ভাবনাকেও উড়ায়া দেয়া যায় না- এগুলা নির্ভর করে আপনি কি কি বিষয় আমলে নিতেছেন তার উপর। আপনি যদি স্বভাবজাতভাবেই বুইঝা নেন যে রিয়ালিটি কী, কে এবং কী গুরুত্বপূর্ণ- আপনি যদি মজ্জাগত সেটিংয়ে পরিচালিত হইতে চান তাইলে আপনি, আমার মতোই সেই বিষয়গুলা আমলে নিবেন না যেগুলা ভিত্তিহীন না, বিরক্তিকর না। আর যদি আপনি আদতেই শিইখা ফেলেন কেমনে ভাবতে হয়, আমলে নিতে হয় তাইলে আপনি বুঝতে পারবেন যে আপনের আরও অপশন আছে। তখন আপনের কাছে ওই ধীরগতির ভিড়ভাট্টার চিল্লাচিল্লির ভোক্তা- জাহান্নাম অবস্থাগুলারে শুধু অর্থপূর্ণই না পবিত্রও মনে হইতে পারে। আগুনের সাথে একইরকম আরও যে জিনিসগুলা তারাদের প্রোজ্জ্বল কইরা তোলে সেগুলা হইলো কমপ্যাশন, ভালবাসা আর সবকিছুর আপাত একতাবদ্ধতা। আবার রহস্যময় জিনিসগুলা যে সত্য হইতেই হবে তাও না- সবচে বড় সত্যটা হইল বিষয়গুলা কেমনে নিবেন সেই সিদ্ধান্তটা আপনের নিতে হয়। আপনের প্রতিটা মুহূর্তে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া লাগে যে কোন জিনিসটার মানে আছে আর কোনটার নাই।

আপনের সিদ্ধান্ত নেয়া লাগে যে আপনি কার আরাধনা করবেনকারণ এইখানে অন্যকিছুরে সত্য বইলা গণ্য করা হয় রোজকার জীবনের খানাখন্দেনাস্তিকতা বইলাই আদতে কিছু নাই আরাধনা না করার মতোই কিছু নাই আসলে সবাই আরাধনা করে কিসের আরাধনা করবেন এইটা বাইছা নেওয়াটাই শুধু আপনের হাতে আর আল্লাহ্‌ বা ক্রাইস্ট, ইয়াওয়েই বা চারি আর্য সত্য বা উইক্কান ঈশ্বরমাতা বা আবশ্যিক কিছু নীতি নৈতিকতার  মতো ঈশ্বর বা আধ্যাত্মিক গোছের কিছু বাইছা নেয়ার অদ্ভুত কারণটা হইল এগুলার বাইরে যা কিছুরই আরাধনা করেন না ক্যান তা আপনারে জ্যান্ত খায়া ফেলবে। আপনি যদি টাকা পয়সা বিষয় আশয়ের আরাধনা করেন- এগুলার মধ্যে জীবনের আসল মানে খুঁইজা পান তাইলে যতো টাকা বা বিষয় আশয়েরই মালিক হন না কেন তাতে মন ভরবে না। কখনও ভাইবেন না যে আপনের যথেষ্ট আছে। এটাই সত্য। নিজের দেহ, সৌন্দর্য,  যৌনাবেদনের আরাধনা করে দেখেন নিজেরে কুতসিত মনে হবে, আর সময় এবং বয়স একবার নিজের খেল দেখানো শুরু করে দিলে মরার আগেই কতবার যে মরবেন তার হিসাব নাই। এক কথায় আমরা এই জিনিসগুলার কোডিং কইরা ফেলছি মিথ, প্রবাদ- প্রবচন, শ্লেষ, প্যারাবল, ক্লিশে, হেঁয়ালি ইত্যাদি নামে যেগুলা বেশিরভাগ বড় গল্পের কংকাল। প্রাত্যহিক জীবনে সত্যগুলারে সামনে রাইখা আগানোটাই হইল খেলা। ক্ষমতার আরাধনা করেন- নিজেরে দুর্বল আর ভীতু মনে হবে, আর এই ভয়রে দূরে সরায়া রাখতে অন্যদের উপর ছড়ি ঘুরাইতে আপনের আরও ক্ষমতার প্রয়োজন পড়বে। নিজের বুদ্ধিবৃত্তির আরাধনা করলে আপনার নিজেরে হাবাগোবা, ঠক মনে হবে, মনে হবে এই বুঝি ধরা খায়া গেলাম।

 

এই নানান ফর্মের আরাধনা করার ভ্রান্ত দিক এইটা না যে এগুলা শয়তানী বা খারাপ কাম বরং এইটা যে এগুলা অজ্ঞান। এগুলা মজ্জাগত। ক্রমশ আপনি এগুলার দিকে আগাইতে থাকেন, আস্তে আস্তে নিজের অজান্তেই দেখার ব্যাপারে, গুরুত্ব মাপার ব্যাপারে আপনে আরও শুচিবায়ুগ্রস্ত হইয়া উঠতে থাকেন। আর জগতও আপনারে আপনের মজ্জাগত সেটিংয়ে চলতে মানা করে না, কারণ ভয়, অবজ্ঞা, হতাশা, আসক্তি আর আত্মগরিমার সাথে মানুষ, টাকাপয়সা, ক্ষমতা ভাল যায়। হালজামানার কালচার এই শক্তিগুলারে এমন কইরা সাজাইছে যে এগুলা আমাদের আইনা দিচ্ছে বেশুমার ধন- দৌলত, আরাম-আয়েশ আর ব্যক্তি স্বাধীনতা। সেই ব্যক্তি স্বাধীনতা যা এতোকিছুর মধ্যে থাকা সত্ত্বেও আমাদেরকে সামান্য একটা খুলির সাইজের সাম্রাজ্যের একাকী এক সম্রাট বানাইতেছে। এই ধরণের স্বাধীনতার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি আছে। কিন্তু এর বাইরেও আরও অনেক রকম স্বাধীনতা অবশ্যই আছে, এগুলার মধ্যে সবচে দামি স্বাধীনতার কথা আপনারা এই জয়, অর্জন আর দেখনদারির জগতের বাইরে খুব একটা শুনবেন না। সবচে গুরুত্বপূর্ণ সেই স্বাধীনতাটা হইল মনযোগ, সচেতনতা, প্রচেষ্টা আর নিয়মানুবর্তিতার, মানুষের প্রতি সব সময় সৎ থাকার, তাদের জন্যে আত্মত্যাগের। যার উল্টাটা হইতেছে অজ্ঞানতা, ওই মজ্জাগত সেটিং, ওই ইঁদুরদৌড়, নিজের ভেতর প্রতিনিয়ত চলতে থাকা অনেক পাওয়া না পাওয়ার ওই জ্বালা-যন্ত্রণা।

জানি এগুলা শুনতে খুব একটা আনন্দদায়ক বা সেইরকম প্রেরণাদায়ক লাগতেছে না। যাই হোক শেষ পর্যন্ত সব গলাবাজি বুলশিট বাদ দিয়া এই জিনিসটাকেই আমি সত্য বইলা দেখি। অবশ্যই আপনেরা এইটা নিয়া যা খুশি ভাবতে পারেন। তবে দোহাই লাগে ড. লরা নীতিবাগীশের মতো শুধু অঙ্গুলি হেলনে এইটারে নাকচ কইরা দিয়েন না। এগুলার কোনটার সাথেই নৈতিকতা বা ধর্ম বা মতবাদ বা জন্ম-মৃত্যুর মতো ফ্যান্টাসির কোনরকম সম্পর্ক নাই। সবচে বড় সত্য হইল মৃত্যুর আগের জীবনটা, মাথায় গুলি কইরা মইরা যাওয়ার আগ পর্যন্ত এইটাকে ৩০ বা ৫০ এ নিয়া যাওয়া। এইটা শুধুমাত্র আপাতদৃষ্টিতে লুকায়া থাকা খুব খাঁটি আর প্রয়োজনীয় বিষয়গুলার ব্যাপারে সচেতনতার। যেগুলা এতোই গভীরে লুকায়া থাকে যে আমাদের বারবার নিজেদেরকে মনে করায়া দিতে হয়, এটাই পানি, এটাই পানি।

ডে ইন, ডে আউট, সচেতন হয়ে বাঁইচা থাকাটাই একটা দুঃসাধ্য ব্যাপার।

 

 

 

 

 

 

 

তানভীর হোসেন
তানভীর হোসেন

কবিতা লেখেন। মিউজিক ও মুভিফ্রিক।

No Comments Yet

Comments are closed

error: