মার্শেল দ্যুশামের ফাউন্টেইন: হোয়াট ইজ আর্ট এ্যান্ড হোয়াট ইজন্ট

মার্সেল দ্যুশামের ‘ফাউন্টেইন’ শুধু একটা র‍্যাডিকেল শিল্পকর্মই না এটা  একটা দার্শনিক ডায়ালেথিয়াঃ একটা ট্রু কন্ট্রাডিকশান (ডায়ালেথিয়া হচ্ছে এমন বাক্য যা একই সাথে সত্য এবং মিথ্যা হতে পারে)

ড্যামন ইয়াং  এবং গ্রাহাম প্রিস্ট

 

১৯১৭ সালে শিল্প আর দর্শনের জগতে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। মার্সেল দ্যুশাম নিউইয়র্কের আলফ্রেড স্টিগলিটজ স্টুডিওতে তার শিল্পকর্ম ‘ফাউন্টেন’ এর উন্মোচন ঘটান, যা ছিল ‘আর মাট’ স্বাক্ষরিত একটা সাধারণ চিনামাটির ইউরিনাল মাত্র।

‘ফাউন্টেন’ ছিল এক কথায় কুখ্যাত, এমনকি আভাঁ গার্দ শিল্পিদের কাছেও। তবুও এটা বিশ শতকের সবচে আলোচিত একটি শিল্পকর্মে পরিণত হয়। যদিও প্রদর্শনী-ফি দেয়া প্রতিটা শিল্পীদেরই তাদের কাজ এক্সিবিশন দিতে পারার কথা তবুও ‘স্বাধীন শিল্পী সমাজ’(Society of Independent Artists, estd.1916) ‘ফাউন্টেন’কে এক্সিবিশন থেকে বাতিল করে দেয়।প্রায় এক শতক ধরে এটা জটিল-দুষ্পাচ্য একটা শিল্পকর্ম হিসাবে থেকে যায়। দার্শনিক জন পাসমোর ‘ফাউন্টেন’কে শিল্পজগতকে ভেঙ্গে খাওয়া একটা ফাজলামো হিসাবে দেখেছেন;যদিও অনেকেই এটাকে গুরুত্বের সাথে নিয়েছে।

কোন সন্দেহ নাই যে এটাতে কিছু ঠাট্টা-ইয়ার্কির ব্যাপার ছিল। তবে দ্যুশাম কিন্তু ইউরিনালটাকে র‍্যান্ডমলি নির্বাচন করেন নাই। ইয়ার্কির বাইরেও ‘ফাউন্টেন’ এর আরো দিক আছে। এই শিল্পকর্মটা যে কারণে লক্ষনীয় হয়ে উঠেছে তা হল-এর দার্শনিক অবদান।

ব্যাখ্যাকাররা প্রায়ই ‘কনসেপচুয়াল আর্ট’ এ ‘ফাউন্টেন’ এর প্রভাবের কথা উল্লেখ করে থাকেন এবং -রবার্ট হিউস যেমনটা বলেন- সবচে ‘মারমুখি’ রেডিমেড হিসেবে এর একটা স্থায়ী লিগ্যাসি রয়ে গিয়েছে। ২০০৪ সালে একশজন আর্ট এক্সপার্ট এটাকে বিংশ শতাব্দির সবচে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম হিসাবে নির্বাচিত করেন। এই ইউরিনালটা এন্ডি ওয়ারহল,  জোসেফ বোয়েস থেকে ট্রেসি এমেনকে পর্যন্ত ট্র্যাডিশানাল আর্টকে  পূনর্বিবেচনা করতে সাহায্য করেছে। চিত্রকর্ম আর ভাস্কর্যের বদলে, শিল্প হঠাৎ করে হয়ে ওঠে একটা ব্রিলোবক্স, একটা অগোছালো বিছানা বা লেবুতে আটকানো একটা লাইট-বাল্ব : আর্ট-গ্যালারিতে এক্সিবিশনে রাখা কিছু কারখানাজাত মূল প্রসংগ থেকে সরিয়ে আনা সাধারণ বস্তু।

শিল্প সমালোচক রবার্টা স্মিথ ব্যাপারটাকে এভাবে দেখেন: দ্যুশাম শিল্পের সৃজনশীল কাজটাকে একেবারে সাধারণ পর্যায়ে নামায়ে এনেছে : একদম একক, বুদ্ধিবৃত্তিক, মোটাদাগে লক্ষ্যহীন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এটা-সেটাকে ‘আর্ট’ নাম দেয়ার পর্যায়ে।যদিও আমরা দেখবো দ্যুশামের সিদ্ধান্ত মোটেও লক্ষ্যহীন না, স্মিথের বর্ণনা একটা বড় বিষয়ের দিকে নজর দেয়, যেটা দ্যুশামের কাজ (অন্য কাজকে) উস্কে দিতে ভূমিকা রেখেছে তা হলো- ‘এটা’ যদি আর্ট হতে পারে তাহলে যেকোন কিছু আর্ট হতে পারে।

তখন থেকেই পন্ডিত সমাজ শিল্পের নন্দনতত্ত্বের জায়গা থেকে চিন্তার জায়গায় যাওয়ার নমুনা হিসাবে ‘ফাউন্টেন’কে দেখিয়েছেন। যেমন, দার্শনিক নোয়েল ক্যারোল বলেছেন: দ্যুশামের কাজ না দেখে এটাকে নিয়ে চিন্তা করেও শিল্প উপভোগের মজা নেয়া যায় যেটা অঁরি মাতিসের উজ্জ্বল শিল্পকর্ম বা বার্বারা হেপওয়ার্থ এর পাথরের মহৎ ভাস্কর্যের বেলায় খাটে না।

আমরা দেখবো তিনটা চিরাচরিত ধারণা ‘ফাউন্টেন’ এর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু এগুলো এটাকে নিয়ে বেশিদূর যায় না। এগুলো ‘ফাউন্টেন’কে শিল্প হিসাবে বিবেচনা করে বটে কিন্তু সেটা করে একটু বিদ্রুপের সাথে:এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাচাল হিসাবে যা শিল্পীদের তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে  একাডেমিকভাবে উপহাস করার জন্যে খোঁচা দেয়। এই শিল্পকর্মের ক্ষমতার ব্যাপারে আমাদের ব্যাখ্যা আরো বিতর্কমূলক। আমরা বিশ্বাস করি ‘ফাউন্টেন’ ঠিক ততটাই আর্ট যতটা আর্ট হলে এটাকে আর আর্ট বলা যায় না। অন্য কথায় বলা যায় এই শিল্পকর্মটা এমন একটা সত্য অসংগতির জন্মদেয় যাকে বলা হয়-ডায়ালেথিয়া। ‘ফাউন্টেন’ খালি কন্সেপচুয়াল আর্টের জগতে উদিতই হয় নাই-এটা আমাদের একটা অসাধারণ ও বিহ্বল ধারণা বিবেচনা করার সুযোগ দিয়েছে। একটা শিল্পকর্ম যা আসলে শিল্পের কর্ম না, একটা প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত বস্তু যা আবার প্রাত্যহিকও না।

কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? চলেন যেসব ব্যাপার স্পষ্ট সেগুলো দিয়েই শুরু করা যাক। দ্যুশামের ‘ফাউন্টেন’ আসলেই একটা ইউরিনাল। এটা ইউরিনালের কোন চিত্র বা ভাস্কর্য না-যদিও ভাস্কর্যটা কৌতুহলোদ্দীপক দার্শনিক প্রশ্ন তুলতে পারতো- বরং একটা আসল, নির্দিষ্ট ধরণের জিনিসের নমুনা – প্রডাকশান লাইন থেকে উঠে আসা খালি চোখে আলাদা করা যায় না এমন বহুসংখ্যক ইউরিনালের একটি। আরেকটি সমগুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো,তার শিল্পের কাচামাল এই ইউরিনালটাকে নকশা করা বা তৈরীর ক্ষেত্রে দ্যুশামের কোন ভূমিকাই ছিল না । তার অবদান ছিল শুধু  ইউরিনালটাকে চিহ্নিত করা এবং শিল্পবস্তু হিসাবে এক্সিবিশনে দেয়া।

দার্শনিক আর্থার ডান্টো তার গবেষণা পত্র ‘শিল্প, দর্শন এবং শিল্পের দর্শন’  (১৯৮৩)-এ দ্যুশামের এই কাজে ঠিক কি হলো তা  বুঝতে একটা সহায়ক বর্ণনা দিয়েছেন। ডান্টো বলেন ( এই কাজের মাধ্যমে)  ইউরিনালটা হয়ে উঠলো কোন কিছুর ‘সম্পর্ক’। এটা আর প্রাথমিকভাবে ব্যবহারযোগ্য একটা বস্তু থাকলো না- এটা প্রাথমিকভাবে একটা অর্থবহ বস্তু হয়ে উঠলো।

মার্শেল দ্যুশাম্প

১৯৬৪ সালে একই নামের একটা প্রবন্ধে ডান্টো এর কারণ উল্লেখ করেন, কারণটা হলো ইউরিনালটি এখন ‘শিল্প জগত’ এর অংশ হয়ে গিয়েছে। সহজ করে বললে ‘শিল্পজগত’ হচ্ছে এমন একটা পরিবেশ যেখানে বস্তু একটা  নতুন ক্ষমতা লাভে সক্ষম। তারা একটা নতুন ধারার অংশ হয়ে যায়, শিল্পের ধারা, এবং একটা বার্তা লাভ করে যাকে কিনা তার ব্যবহার বা বিনিময় মূল্য এমন কি এই নতুন ধারা থেকেও আলাদা করা যায় ( এই আলাদা হবার কারণের আলোচনায় আমরা পরে আসবো) এটা শিল্পের বিখ্যাত একটা দিক যাকে সাদা চোখে দেখা যায় না, ডান্টোর ভাষায় যা ‘অদেখা’, শিল্পের অদৃশ্য দিক।

বিষয়টা এই না যে শিল্পজগতের বাইরের কোন বস্তুর কোন বার্তা থাকতে পারে না-গণশৌচাগারের চিহ্নগুলো সরাসরিভাবে কোন কিছুর ‘সম্পর্কে’ বলে। বরং বিষয়টা হল- যখনই তারা শিল্পজগতে চলে আসে,বস্তুগুলো তাদের সাধারণ ব্যবহারের ঊর্ধ্বে একটা অর্থ পায়, তারা কোন বস্তুর নামকরণ বা এর ব্যবহার দেখায় না : তারা এক ধরণের বক্তব্য প্রদান করে।

দ্যুশামের ‘ফাউন্টেন’ খোদ আর্ট সম্পর্কে একটা বার্তা ধারণ করে।আমরা দেখবো, ঠিক এজন্যেই এটা ডায়ালেথিক। ডান্টো ওয়ারহলের সাবানের বাক্সের ( আর্টের লাইনে দ্যুশামের ইউরিনালের নাতি-পুতি) উদাহরণ টেনে যুক্তি দেন : ‘এগুলা আর্টের ব্যাপারে কিছু বক্তব্য উপস্থাপন করে এবং এর পরিচয়ের মধ্যেই এর পরিচয় কি-এই প্রশ্ন ধারণ করে’। দ্যুশামের ইউরিনালের ব্যাপারেও এ কথা সত্য।যদিও এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে দোকান থেকে নিয়ে গিয়ে প্রদর্শনীতে না দিয়ে ওয়ারহল প্লাইউড দিয়ে ব্রিলোবক্সের খুবই রিয়েলিস্টিক কপি তৈরী করেছিলেন,অপরদিকে দ্যুশাম মূত্রাধারটি তৈরী করেন নাই, শুধু একটা নতুন কনটেক্সটে জিনিসটা উপস্থাপন করেছেন।

দ্যুশামের আর্টে যে বার্তা আছে তা খেয়াল করলে দেখা যায়,এটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা দেয়ার ব্যাপারে সহায়ক।বিশ শতকের শুরুর দিকে ভিজুয়াল আর্ট প্রধানত দক্ষতা নির্ভর ছিল-রং বা কাদামাটির ভৌত পরিবর্তন করা ইত্যাদির দক্ষতা নির্ভর।কিন্তু প্রায়ই দেখা যেতো, সাধারণ শিল্পদক্ষতার মূল্যের বাইরেও এই শিল্পকর্মগুলোর কোন ইঙ্গিত,সৌন্দর্য,আধ্যাত্মিকতা বা দার্শনিক সত্য প্রকাশের গুণে আরো মূল্যবান হয়ে উঠতো। যেমনটা সমাজতত্ত্ববিদ পিয়ের বুরদিও তার ‘Distinction’ ( ১৯৭৯) গ্রন্থে উল্লেখ করেন, একজন শিল্পী বস্তুর সাথে কাজ করে কিছু নৈতিক,মেটাফিজিকাল বা অন্তত কোন নান্দনিক দর্শন জুড়ে দিতে সক্ষম হয় যা হয়ে যায় সাধারণ বাণিজ্য ও শ্রমের ফসলের ঊর্ধ্বের কোন কিছু।

দ্যুশামের ‘ফাউন্টেন’ ঠিক এই ব্যাপারটারই বিপরীত কিছু। স্পষ্টত এতে কোন দক্ষতার ছোয়া নেই এবং নিঃসন্দেহে নেই কোন চারুকলা। ইউরিনালটি মূলত তার ব্যবহারিক মানদণ্ডে নকশা ও তৈরী করা হয়েছে, নান্দনিক গুণের মানদণ্ডে নয়।  এ ব্যাপারে  দ্যুশামের স্পষ্ট অবস্থান ছিল, তাই পরবর্তীতে শিল্প সমালোচকদের মধ্যে যারা ইউরিনালটিতে সৌন্দর্য খুজতে চেষ্টা করছিলেন,তাদের তিনি বিদ্রুপ করতে ছাড়েন নি। তিনি ১৯৬১ সালে বলেন- ‘আমি ইউরিনালটিকে তাদের মুখের উপর ছুড়ে দিয়েছিলাম আর এখন তারা আসছে আর এসে এর সৌন্দর্যের তারিফ করছে’।

এ থেকে বোঝা যায়, ইউরিনালটিও একটি ‘নিচুমানের’ বস্তু ছিল : কোন কিছু যাতে মূত্র ত্যাগ করা হয়, এমন কিছু না যার দিকে হা করে তাকিয়ে সৌন্দর্য বা দার্শনিক সত্য উপলব্ধি করা যায়। ই. এইচ. গ্রোমব্রিচ এর ভাষায় একে বলা যায়- চিরাচরিত ‘আর্ট’ -এর দেমাগ আর গাম্ভীর্যের সাথে এক ধরণের ফাজলামোর চেষ্টা। অন্য কথায় বলা যায়, ফাউন্টেনের ভূমিকাই ছিল আধুনিক শিল্পের আদর্শগুলোকে নিয়ে বিদ্রুপ করা। এটা চারুকলাকে বিদ্রুপ করেছে কিন্তু একে নিয়ে ভাঁড়ামি করে নাই কিন্তু কাজটা করেছে আর্টের ঠিক বিপরীত কিছু হয়ে : শিল্পীর দক্ষতাহীন, বিশ্রী,ব্যবহারিক, কুরুচিপূর্ণ,সহজলোভ্য ইত্যাদি হয়ে।

এই নির্দিষ্ট বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ যেহেতু এটা যে কোন কিছুকেই আর্ট বললেই সেটা আর্ট হয়ে যায়- এই ধারণার বিরুদ্ধে যুক্তি দেয়। যেমনটা আমরা দেখেছি যে দ্যুশামের ইউরিনালটি তার দ্বারা যথেচ্ছভাবে নির্বাচিত না এবং বস্তুটির নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলোই এই বার্তা প্রদানে সহায়তা করেছে। এবং এটা ইতিহাসের নির্দিষ্ট একটা যুগেই অর্জিত হয়েছে।আরো আগে হলে ‘ফাউন্টেন’ আর্ট হিসাবে বিবেচিতও হতো না এমনকি আভাঁ গার্দ আর্ট হিসাবেও না। আরো দেরীতে হলে এটা হয়ে যেতো ‘সেকেলে’ কিছু। আরেকটা গুরুত্বপূণ ব্যাপার হলো দ্যুশামের আগে থেকেই শিল্পজগতে একটা প্রভাব ছিল পিয়ের বুরদিও যেটাকে আর্ট-ওয়ার্ল্ডের ‘ক্যাপিটাল’ বলে থাকেন।

এই আলোকে এই যুক্তি দেয়া যায় না যে, শুধু শিল্পজগতের সদস্যদের সমর্থনের জোরে কোন কিছু শিল্প হয়ে ওঠে বরং তারা শিল্পকে শিল্প বলে কারণ এটাই সঠিক সময় এবং স্থানে সঠিক কাজ এবং সঠিক শিল্পীদের দ্বারা প্রদর্শিত হয়।

তাই আমরা বলতে পারি যে, যে কোন বস্তু শিল্প হওয়ার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু আসলে কখনও শিল্প হয় না-শিল্পজগত সবসময়ই একটা নির্দিষ্ট পরিবেশ যা কিছু শিল্পী,বার্তা এবং বস্তুকে অনুমোদন করে থাকে কিন্তু অন্যদের না। তাই, ফাউন্টেন শুধু একটা শিল্প বলার জন্যেই শিল্প না। এটা একটা শিল্প কারণ দ্যুশাম এটাকে স্বাক্ষর দিয়ে প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিল্প হিসাবে গণ্য করেছে এবং এই গণ্য করার বার্তা সময়ের সাথে স্বীকৃত হয়েছে এবং শিল্পজগতের সদস্যদের দ্বারা গৃহীত হয়েছে।

এর বিরুদ্ধে যে দাবিগুলো আসে সেগুলো নিয়েও কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ,তা হলো- ‘ফাউন্টেন’ একটা শিল্পবস্তুই না। এখন, এটা আসলে কোন শিল্পবস্তু না, কিন্তু এটা কোন শিল্পবস্তুই না বললে বক্তব্য প্রসংগ হারাবে। এটা সত্য যে, ইউরিনালটির নান্দনিক মূল্য খুবই কম- দার্শনিক মনরো বেয়ার্ডসলি যেমনটা বলেছেন। দৃশ্যত উল্লেখযোগ্য কোন বৈশিষ্ট্য না থাকায় এটা বেয়ার্ডসলির ভাষায় যাকে বলে ‘নান্দনিক অভিজ্ঞতা’ এটি তা ধারণে অক্ষম।

Nude Descending a Staircase, No. 2, Duchamp (1912)

তার মানে এই না যে এটি শিল্পই না। দ্যুশামের কাজ নান্দনিক গুণ সম্পন্ন নয় বরং উচ্চতর ধারণাগত। কিন্তু এ সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব শুধু এই কারণে যে শিল্পজগতের অংশ হবার কারণে এটা শিল্প এবং অন্য দিকগুলোর সাথে সাথে এর নান্দনিক মূল্যেও মূল্যায়নযোগ্য।

এই মূল্যায়ন দার্শনিকভাবে আকর্ষণীয় ওঠে এই কারণে যে, ‘ফাউন্টেন’ শিল্পকর্ম হিসাবে এই বার্তা রাখে যে –এটা আর্ট না। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক যেটা অনেক ট্র্যাডিশনাল ব্যাখ্যাকাররাই বিবেচনায় আনেন নি। ‘ফাউন্টেন’ শিল্প প্রদর্শনীর একটা স্তম্ভে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে-‘আমি আর্ট না’।পরোক্ষভাবে চিরাচরিত শিল্পধারার সবচিহ্ন যথা- সৌন্দর্য,দক্ষতা,স্বকীয়তা, শৈল্পিক ব্যক্তিত্ব, সেই সাথে শিক্ষাদিক্ষার আদর্শগত ধারণা, অভিব্যক্তি বা নান্দনিক সুখ ইত্যাদিকে  খারিজ করে দিয়ে এটা এর বার্তা বহন করছে। এই বার্তা তথাকথিত প্রতি-শিল্পের (anti-art) বার্তা। যেটা এই শিল্পকর্মকে এর ক্ষমতা দেয় তা হল এটা শিল্প না কিন্তু একই সময়ে এটা আবার শিল্প।

ইউরিনালটা দ্যুশাম নির্বাচন করেছেন ঠিক এই কারনেই যে এটা বিশ শতকের শুরুর দিকে আর্টের যেসব মৌলিক ধারণা ছিল তার বিরুদ্ধে যায়। সহজ করে বললে ইউরিনালটি আর্ট না এই কারণে যে এটার একটা নির্দিষ্ট শৈল্পিক বার্তা আছে এবং শুধু এই কারণেই আর্ট কারণ এটার শুধু বার্তাই আছে। অবশ্যই এটা অন্য বার্তা বহনে সক্ষম, উদাহরণ হিসাবে বলা যায়-সমকালীন শিল্পের ধারণা ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে,দক্ষতা শিল্পের জন্যে অপরিহার্য কিছু না, শিল্পের সৌন্দর্য বাধ্যতামূলক না।কিন্তু এটা এসব বার্তা এই কারনেই ধারণে সক্ষম কারণ এর সময়ের শিল্পজগতে এটা শিল্পকর্ম হিসাবেই বিবেচিত হয় নি।

তাই, আধুনিক শিল্পের জগতে দ্যুশামের অবদানকে এভাবে তুলে ধরা যায়:  এটা একই সাথে আর্ট আবার আর্ট না। এটা একটা সুস্পষ্ট অসংগতি। শিল্পজগতের অনেকের কাছে এই প্রস্তাবটি ছিল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সত্য। এটাই ‘ফাউন্টেন’কে খুব দ্রুত আকর্ষনীয় করে তোলে এবং যা অনেক প্রবন্ধ, শিল্পকর্মের অনুপ্রেরণা যোগায় এবং দর্শকদের গ্যালারিতে টেনে আনে। দ্যুশামের ইউরিনালটি  যথার্থই মনোযোগ কাড়ে কারণ এটার ভিত্তিই একটা ডায়ালেথিয়া- একটা ট্রু কন্ট্রাডিকশান,এমন কিছু যা চিরাচরিত যুক্তিবিদরা অসম্ভব বলে মনে করে।

ডায়ালেথেইজম হচ্ছে এমন একটা মত যা বলে- কিছু কন্ট্রাডিকশান হচ্ছে সত্য। এটা দার্শনিকদের কাছে সংগতি নীতি ( principle of non-contradiction) নামে পরিচিত নীতির বিরোধিতা করে। সহজ করে বললে, এটা হল এমন এক নীতি যা বলে কোন উক্তি যা একই সাথে সত্য এবং মিথ্যা হতে পারে না।যদিও পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে কেউ কেউ এই নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল ( তর্কসাপেক্ষে সবচে উল্ল্যেখযোগ্য ভিন্নমত পোষণকারী ব্যক্তি ছিলেন হেগেল) এটা পাশ্চাত্য দর্শনে গোঁড়ামী হিসাবে চলে আসছে এরিস্টটলের মেটাফিজিক্স ৪-এর জটিল এবং দ্বিধাগ্রস্ত প্রতিযুক্তির বদৌলতে। গত ৩০ বছরে ডায়ালেথেইজম এর কিছু নতুন সমর্থক দেখা দিয়েছে। এই সমর্থনের উৎস আধুনিক প্রধাগত যুক্তিবিজ্ঞান  এবং এর সব কলাকৌশল দ্বারাই এটি সমর্থিত। আশ্চর্যজনকভাবে, এখন এই ক্ষেত্রে একটা প্রাণবন্ত বিতর্ক দেখতে পাওয়া যায় কেননা সংগতিনীতি খুব শক্তভাবে সাধারণ জ্ঞানের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে।কোন প্রাণী যদি বিড়াল হয়,সেটা একই সাথে ‘বিড়াল না’ হতে পারে না। এটা হয় ‘বৃহস্পতিবারই বা ‘বৃহস্পতিবার না’: এখন এবং এখানে আজ একই সাথে ‘বৃহস্পতিবার’ এবং ‘বৃহস্পতিবার না’ হতে পারে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হুঁশিয়ার থাকা ভালো, যেমন লুডউইগ ভিটগেনস্টাইন ‘উদাহরণের অপর্যাপ্ত আহারের’ কথা বলেছেন!

এই ক্ষেত্রে ডায়ালেথেইজম এভাবে কাজ করে থাকে। বস্তুটির শ্রেণী হচ্ছে ‘আর্ট’ এবং আর্ট হিসাবে এটার একটা বার্তা আছে। এই ক্ষেত্রে এটার বার্তা হল নিজের শ্রেণীর ব্যাপারে: এটা এর দর্শকদের বলে –সত্যসত্যই-‘এটা আর্ট না’। ডায়ালেথিয়াটা আসে কেননা বার্তাটির ঠিক এই শ্রেণীরই প্রয়োজন পড়ে যেটা সে খারিজ করে দেয়,আর্টের,এবং তাই এটার বার্তাই হলো যে শ্রেণীতে থাকে সেই শ্রেণীকেই খারিজ করার বার্তা। আর্ট হিসাবে নিজের স্ট্যাটাসকে খারিজ করে দেয়ার ব্যাপারটাই এটাকে আর্ট বানায়- যেটাকে আবার এটা নিজেই খারিজ করে দিয়েছে।

এই আলোচনা থেকে বোঝা যায়, যে এটা বলা ভুল যে ‘ফাউন্টেন’ একটা শিল্পকর্ম না। এটা শুধু এই বার্তাই বহন করে যে এটা আর্ট না।এইভাবে, একটা সংকেত এই বার্তা দেখাতে পারে যে ‘এটা লালরঙ্গের কালিতে লেখা’ যখন আসলে লেখাটা কালো কালিতে লেখা। সংক্ষেপে বলা যায় : বোধ হয় দ্যুশামের শিল্পকর্ম শুধু নিজের ব্যাপারেই  ভুল।মনে হয় এটা আমাদের এই বলে খেপাচ্ছে যে –আমি আসলেই বোধ হয় আর্ট না।

কিন্তু ‘ফাউন্টেন’ এই বার্তাটি ঠিক এই কারনেই বহনে সক্ষম কারণ এটা আর্ট না হবার কারণেই আর্ট হয়েছে-এটার শিল্পজগতে প্রবেশই নির্ধারিত হয়েছে আর্টকে খারিজ করার কাজটির দ্বারা।এটা নিঃসন্দেহে একটা শিল্প হতো যদি দ্যুশাম একটা মূত্রাধারের তৈলচিত্র প্রদর্শনীতে দিতো, তাতে সেটা এই বার্তা বহন করতে পারতো না। যেহেতু বার্তাটি এতে দেয়াই আছে এটা যে চিহ্ন প্রদর্শন করছে তার বিপরীত চিহ্ন প্রদর্শন করে।তাই রেনে মাগ্রিতের ১৯২৮-২৯ সালের ‘পাইপ’ চিত্রকর্মটি বিবেচনা করা যাক। চিত্রকর্মটা আক্ষরিকভাবেই ‘এটা একটা পাইপ না’ এই বার্তাটি বহন করে।শব্দগুলোই বার্তাটি বহন করে।অন্যদিকে ‘ফাউন্টেন’ আক্ষরিকভাবে কোন বার্তা বহন করে না ,এটা যা তা হয়েই এর বার্তা বহন করে। এবং ঠিক এই কারণেই এটা একটা আর্ট। অন্যভাবে বললে: অসংগতি ‘ফাউন্টেন’ এর আর্ট হওয়ার জন্যে অপরিহার্য। অসঙ্গতি ধারণ না করলে এটা তেমন আকর্ষণীয়ও হতো না আর আমরাও এটা নিয়ে কথা বলতাম না।

অ্যান্ডি ওয়ারহোলের ব্রিলো বক্স স্কাল্পচার

 

মনে হতে পারে ইউরিনাল প্যারাডক্স একটা সাংস্কৃতিক অস্বাভাবিকতা যেটা শুধু সমসাময়িক শিল্পের উদ্ভট জগতেই ঘটতে পারে,  আসলে এটা আরো বড় কোন ঘটনা-কাঠামোর ছাঁচে দিব্বি বসে যাওয়া কিছু। কারণ এটা ঘটনা: ‘ক’ না কারণ এটা সে ঘটনা না যা ‘ক’।

সম্ভবত সবচে ঘনঘন আলোচিত ডায়ালেথিয়ার নমুনা হল সেলফ-রেফারেনশাল প্যারাডক্স যেমন:বিখ্যাত  লায়ার প্যারাডক্স  (এই বাক্যটা নিয়ে- ‘এই বাক্যটা সত্য নয়’) এগুলো স্পষ্টত সাচ্চা তর্ক যেগুলো কন্ট্রাডিকশান দিয়ে শেষ হয়, এই যৌক্তিক কাঠামোর সাথে যে কোন ঘটনা : ক এবং এটা সে ঘটনা না যা ‘ক’। যে সব প্যারাডক্সিকাল তর্ক এসব অসংগতির জন্ম দেয় সেগুলো নানা রকমের হতে পারে,কিন্তু এদের মধ্যে শুধু একটার কাঠামো নিয়ে আমাদের মাথা ঘামালেই চলবে।

কোনিগের  প্যারাডক্সটিই বিবেচনা করা যাক। প্যারাডক্সটি ক্রমবোধক সংখ্যা নিয়ে। ক্রমবোধক (ordinal) সংখ্যা এমন যা চেনা গণনা সংখ্যাগুলোকে ০,১,২… সীমার বাইরে পর্যন্ত নিয়ে যায়।সব সসীম সংখ্যার পরও একটা পরবর্তী সংখ্যা থাকে এবং এরপরও ‘পরবর্তী সংখ্যা যোগ এক’ এমন একটা সংখ্যা থাকে এবং এভাবে চলতে থাকে।গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায় ,এই সংখ্যাগুলো সংখ্যাগণনার এমন একটা বৈশিষ্ট্য বযায় রাখে যে তাদের যে কোন সংগ্রহের একটা ন্যুনতম সদস্য সংখ্যা থাকে। ক্রমবোধক সংখ্যা কত দূর অবধি যেতে পারে এটা একই সাথে গাণিতিকভাবে এবং দার্শনিকভাবে একটা বিতর্কমুলক প্রশ্ন। কিন্তু এটা বিতর্কমূলক না যে ক্রমবোধক সংখ্যা এত বেশি যে তাদের কোন ভাষা যেমন ইংরেজীর সীমিত শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যাবে। এটা একদম গাণিতিকভাবে প্রমাণযোগ্য।

এখন,যদি এমন ক্রমবোধক সংখ্যা থাকে যাদের এভাবে উল্লেখ করা যায় না, তাহলে, ক্রমবোধক সংখ্যার বৈশিষ্ট্য থেকে বলা যায় সেখানে নিশ্চয়ই ন্যুনতম এমন ক্রমবোধক সংখ্যা আছে যার উল্লেখ সম্ভব না (ভাষার শব্দগুলো দিয়ে)।এই বাক্যটাই বিবেচনা করা যাক- ‘ন্যুনতম ক্রমবোধক সংখ্যা থাকে যাকে উল্লেখ করা যায় না’ এটা অবশ্যই প্রশ্নের ক্রমবোধক সংখ্যাটিকে উল্লেখ করে।তাহলে,সংখ্যাটিকে একই সাথে উল্লেখ করা যায় আবার যায় না। কিন্তু,খেয়াল করে দেখুন যে এটাকে উল্লেখ করা যায় না ঠিক এই কারণটিই আমাদের এই সংখ্যাটিকে উল্লেখ করার সুযোগ দিচ্ছে। এটা উল্লেখযোগ্য কেননা  উল্লেখের অযোগ্য: ‘ক’ কারণ এটা সে ঘটনা না যা:  ‘ক’ একইভাবে ফাউন্টেন হচ্ছে একটা আর্ট কারণ এটা আর্ট না।

ফাউন্টেন প্যারাডক্স আর কিছু সেলফ-রেফারেনশাল প্যারাডক্সের মধ্যে মিল- ফাউন্টেন প্যারাডক্সে সেলফ-রেফারেন্স আছে কিনা এই প্রশ্ন ওঠে। একটু চিন্তা করলেই দেখা যায় ‘এটা শিল্পকর্ম নয়’ এই বার্তা বহন করে বলেই এটা সেলফ-রেফারেনশাল।

যদিও সব ডায়ালেথিয়া সেলফ-রেফারেনশাল না কিন্ত সেলফ-রেফারেন্স  অবশ্যই এটার একটা বড় উৎস। সেলফ রেফারেন্সের  চিরাচরিত আলোচনাগুলো কথ্য বা লেখ্যভাষার দিকে মনোযোগী ছিল। আমাদের আলোচনা যা দেখায় তা হল-  সেলফ-রেফারেন্স অন্য মাধ্যমগুলোতেও থাকতে পারে এমনকি ভিজুয়াল মিডিয়াতেও এগুলো সাধারণ ভাষার মতই তথ্য বহন করতে পারে।সেই তথ্য আবার সেলফ-রেফারেনশাল হতে পারে এবং সেলফ-রেফারেন্সটা আবার প্যারাডক্সের জন্ম দিতে পারে। দ্যুশামের প্রতিভা ছিল কোন একটা বস্তুকে এমনভাবে উপস্থাপিত করা যাতে সেটা একই সাথে শিল্প হয় আবার হয় না।এখনই এটা স্বীকার করার যথার্থ সময় যে দ্যুশামের অবদান ছিল গভীর এবং ইচ্ছাকৃতভাবে প্যারাডক্সিকাল।

 

ড্যামন ইয়াং  দার্শনিক এবং লেখক। বর্তমানে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত।

গ্রাহাম প্রিস্ট সিটি ইউনিভার্সিটি নিউ ইয়র্কের বিশিষ্ট অধ্যাপক এবং মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এমেরিটাস।

 

 

ফেইসবুক কমেন্ট
1 Comment
  1. তানভির ভাইয়ের দারুণ লেখা। দুর্দান্ত এক কথায়। dadaism নিয়ে আরেকটি তথ্যবহুল অনুবাদ লেখা http://www.eprokash.com/article/39 আগ্রহীরা পড়তে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: