fbpx

নিশীথে সুকুমার — শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

[ফ্ল্যাটবাড়ির অন্ধকার বারান্দায় ছাপোষা লোক সুকুমারের মাতাল নাচানাচি আর দাম্পত্য, সংসার, জীবন-জীবিকা ইত্যাদি নিয়ে রিফ্লেকশন মিলে গল্পটা। এই গল্পের উল্লেখযোগ্য দিক পরিমিতিবোধ, স্বল্পায়তন হওয়া যা ছোটগল্পের জন্যে জরুরি।

কিছুটা এ্যাবসার্ডিস্ট মেজাজ আর ‘তুমি আমার ধর্ম নেবে’ কথাটার রিপিটিটিভ কিন্তু কৌশলী ব্যবহার গল্পটারে কাব্যিক ব্যঞ্জনা দিছে। পাঠ শেষ হইলেও তাই কবিতার মতো একটা রেশ থেকে যায়।

দরকারি মনে করে, এমন লেখা,বিশেষত যা আণ্ডার-এপ্রিশিয়েটেড, নিয়মিত অনলাইনে পুন:প্রকাশ করবে মাদারটোস্ট। এই অনলাইন আর্কাইভিং-এর অংশ নিশীথে,সুকুমার। ~ সম্পাদক, লিটারেচার সেকশন, মাদারটোস্ট]

 

প্রায় পঁচিশ বছর আগে সুকুমার হাফপ্যান্ট পরত। এখন সে সরু পাজামার ওপর কলিদার পাঞ্জাবি পরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে। রাত বারোটা। বউ পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছে।

এই ড্রেসিং টেবিলটি সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই মেয়ের। তারা সম্প্রতি শাড়ি ধরেছে। পিঠোপিঠি ওরা। আয়না সমেত ওটি কিনতে সুকুমারের একশো কুড়ি টাকা লেগেছে। দক্ষিণের এক চাকুরে বাসা তুলে দিয়ে ত্রিবান্দ্রমে বদলি হওয়ার সময় যা-ইচ্ছে দামে নানান জিনিস ঝেড়ে দিয়ে যায়। তখন সুকুমারের বউ বেলা গিয়ে কিনে আনে।

আয়নার পাশেই মেয়েদের খাট। দুজনই মশারির ভেতর ঘুমুচ্ছে। ছোটটি শাড়ি খুলে এখন ইজেরে আছে। ওপরে ব্লাউজ। বড়োটির কাঁথা মুড়ি দিয়ে শোয়া অভ্যেস। তাই তার মুখ দেখতে পেলো না সুকুমার। তখন আয়নায় নিজের মুখে তাকাল। এই মুখখানি সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের খুব প্রিয়। বহুদিন ধরে দেখে আসছে। এখন ওই মুখের দু’পাশে দু’খানি স্থায়ী পাউরুটি। মাত্র দশ বছর আগে ভাগ্যিস ব্যাকব্রাশ করে চুল আঁচড়ানো বন্ধ করেছিল। তখন থেকে সিঁথি কেটে আঁচড়ানোর ফলে এখনো তার সমবয়সীদের মতো মাথার চুল অতটা পিছিয়ে যায়নি। সব মিলিয়ে একটা নির্বোধ তৃপ্তভাবে গোল মুখখানা সবসময় ভাসছে। এই জিনিসটি সুকুমারের সাইন বোর্ড।

পাঞ্জাবির ওপর শরীরের বিষুবরেখার জায়গাটি যে কিছু উঁচু আয়নাতেও তা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। ওখানে তার পেট এখন আস্ত একটা তরমুজ। বেড়েই চলেছে। দম বন্ধ করে পেট কমিয়ে নিয়ে আয়নার সামনে ভালো করে দাঁড়িয়ে সে পরিষ্কার বুঝল – এরকম যখন ছিলাম – তখন যুবক ছিলাম।

পা টিপে টিপে সুকুমার নিজের ঘরে ঢুকল। ইদানিং বাইরে খাওয়া-দাওয়া করলেই তার অম্বল হয়ে যায়। তাই সাদা কাঁপে ঝাঁঝালো যোয়ানের আরক জল মিশিয়ে খেয়ে নিল। তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মশারির ভেতরে চলে গেল।

বউকে হাতড়াল। বউ বলল, উহু। আঃ! বলে তারপর তার সেই ভঙ্গিতে পাশ ফিরে শুলো যাতে কিনা সুকুমারের শরীর আরো খারাপ হয়।

সম্মান বলে একটা কথা আছে। বিয়ের সতেরো বছর পরে এই পাশ ফিরে শোয়াটা তার বড়ো অপমান লাগল। সে খানিকক্ষণ চিৎ হয়ে থাকল। তারপর মাথার নিচের জোড়া বালিশ থেকে একটি কমিয়ে পায়ের দিকে ছুঁড়ে দিল। উঁচু বালিশে শুয়ে শুয়ে একটা অসুখ তাকে ধরে ফেলেছে। আর কিছুদিন পরেই গলায় বগলস লাগিয়ে ঘুরতে হবে। এখনো সাবধান হওয়ার সময় আছে। তার ঘাড় কাৎ হয়ে যাচ্ছে। গর্দানে অনেক মাংস হয়ে গলাটি হারিয়ে গেছে। এখন তার ধড়ের ওপর মাথাটি স্রেফ কাটামুণ্ডুর মতন জুড়ে দেওয়া বলে মনে হয়।

খালি গায়ে পাজামা পরে পাশের ঘরে গেল। আবার সুইচ টিপে আলো করে নিল ঘরখানা। মশারি তুলে ঘুমন্ত ছোট মেয়ের গালে একটা চুমু দিল। মুশকিল বাধাল বড়ো মেয়ে। কাঁথা টেনে মুখ খুঁজতে যেতেই ঝাঁঝিয়ে উঠল, রোজ খেয়েদেয়ে রাত করে ফিরবে। ঘুমোও না গিয়ে –

চুমু দেবার জন্য সুকুমারের মুখ নিচু হয়ে এসেছিল। মুখ জায়গামতো তুলে নিয়ে বলল, কেন? গন্ধ পেলি?

এখন জ্বালিয়ো না যাও। বলে মেয়ে পাশ ফিরে শুল। আবার কাঁথা দিয়ে মুখখানা ঢেকে ফেলল।

নিজের ঘরে ফিরে এসে সেই চুমুটা বউয়ের গালে দিল। অঘোরে ঘুমুচ্ছিল বলে কিছুই টের পেল না। আবার ভালো করে দেখল সুকুমার। ভগবান যে কি করে মেয়েলোক বানায়। একটু বেঁকে শুলেই অন্যরকম। তখনই পাওয়ার ইচ্ছে হয়। অনেক কষ্টে নিজেকে সম্বরণ করল। এভাবে অপমান সহ্য করে বউয়ের ঘুম ভাঙিয়ে আদর করতে তখন রাজি ছিল না সুকুমার। বিয়ের পর এত বছর হয়ে গেল – কই? কোনোদিন তো বেলা তাকে নিজে থেকে দু হাতে গলা জড়িয়ে একটা চুমু দেয়নি। একবারও ওগো বলে ডাকেনি। এত সংযত কেন? এরই নাম কি অহংকার? না, ফ্রিজিড?

দু-একবার জিজ্ঞাসাও করেছে সুকুমার! তুমি এ-রকম কেন?

কি রকম?

একদিনও তো নিজে থেকে একটা চুমু খেলে না আমায়।

ওগো হ্যাঁগো ওসব বাড়াবাড়ি আমার একদম আসে না।

 

সুকুমার নিজেকে প্রশ্ন করল একটা। তোমার কি এসবের আর বয়স আছে?

আলবাৎ আছে।

না। নেই।

কেন নেই?

কারণ, তুমি বুড়িয়ে গেছ। তুমি জোরে হাসতে পারো না। হাসলে ঠিকই আওয়াজ হয়। আর, হাঁ করে হাসলে খুনীর মতো লাগে।

কিন্তু আমি তো একটা পোকাকেও কোনোদিন ব্যাথা দিইনি। সিলিং থেকে টিকটিকি নিচে পড়লে আলগোছে তুলে দিই।

তবু তোমাকে খুনীর মতো দেখায় হাসলে।

আমি তো বেশিরভাগ সময় গম্ভীর থাকি।

তখন তোমাকে গরুর মতো নির্বোধ লাগে।

কোনো ব্যক্তিত্বই ফুটে ওঠে না? মানে, যাকে বলে পার্সোনালিটি। চার্ম?

একদম না। গম্ভীর অন্যমনস্ক অবস্থায় তোমাকে আরো খারাপ লাগে। মনে হয় কোনো মতলব ভেঁজে চলেছ।

তা সত্যি! আমার লাকটাই এরকম। বেশিরভাগ লোক আমাকে ডিসলাইক করে। অথচ দেখি দু’ একজনকে – তাদের কোনো চেষ্টা ছাড়াই বেশিরভাগ লোক তাদের খুব লাইক করে।

তবে!

Male Dancer by Ingrid Kleins-Daniels

নিজের সঙ্গে এরকম কথোপকথনের পর সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় – হাইট পাঁচ ফুট সাত ইঞ্জি, উমর তিতাল্লিশ, ছাতি একচল্লিশ – আলমারির আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে পাজামা ছেড়ে ফেলল। নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে কোথাও মনে হলো না শ্যাওলা পড়েছে। বাঁ উরু এবং গলা বেশ গরম। এসবের ভেতর দিয়ে রক্ত বয়ে যাচ্ছিল। চর্বি থাক-থাক জমেছিল। প্রায়ই পান করা সত্ত্বেও ব্লাড ক্লোরেস্টেরল খুব নর্মাল।

প্রতিবেশিদের দোতলার জানলাগুলি খোলা। অন্ধকার। সুকুমার একতলা ফ্ল্যাটের টানা খোলা লাল বারান্দার আলো জ্বালিয়ে নিল! নিশুতি রাতে পরিত্যক্ত বিয়েবাড়ির চেহারা। সেখানে নিজের মনোমতো স্টাইলে সুকুমার নিজের আবিস্কৃত মুদ্রায় নাচতে শুরু করে দিল।

ফাঁকা বারান্দায় আলোর নিচে নিজের নাচ সুকুমারের খুব ভালো লাগতে লাগল। এক-একটা পাক দিয়ে কোমরের ওপরের দিকটা ঘুরিয়ে নিয়েই মনে হয় – আমি পারি। ঠিক উদয়শংকরের মতো। চিবুকের নিচে বাঁ হাতের পাতা পাত্রের মতো ধরে মাথাটি নাড়াল। একেবারে একদম কত্থকভঙ্গি। নিজেকেই সুকুমার বলল, কী গ্রেস!

এমন সময় সুকুমারের মনে হলো উল্টোদিকে দোতলার ঝুলবারান্দায় আলোর একটা লাল ফলক রেলিঙয়ের বাইরে ঝুলছে। অর্থাৎ বেশি রাতে বাড়ি ফিরে গণেশ ডাক্তার সিগারেট টানছে। ঘুম আসছে না।

সুকুমার তার নাচের স্পীড বাড়িয়ে দিল। নিজের মুদ্রায় সুকুমার যখন বিভোর – তখন ঝুলবারান্দা থেকে প্রশংসার তিনটি হাততালি পর পর ভেসে এল। অন্ধকার অডিটরিয়ামে দর্শক একমাত্র গণেশ। শর্টে গেণু ডাক্তার। তবু সুকুমার যেন বিরাট হলঘরের বিশাল দর্শকপুঞ্জকে কৃতার্থ করে দিচ্ছে – নাচ থামিয়ে সেই ভাবে নুয়ে পড়ে বাও করল।

কতটা হয়েছে আজকে? গেণুর একদম মাজা গলা। বাড়ি গিয়ে দেখালে আট টাকা ভিজিট। চেম্বারে ষোলো। ভিড় লেগেই থাকে। নিজের গাড়িতে পাখা এবং চিক লাগিয়েছে। ফ্রিজে ছানা রেখে খায়। চোখ দেখাতে গিয়ে সুকুমার একদিন খেয়েছিল। তার আজকাল খালি চোখে ক ব ষ খ – সব সমান লাগে। পড়তে গিয়ে মনে হয় প্রতিটি হরফের গা থেকে ছাল উঠে গেছে।

তোমার কতটা?

আজকাল বেশি পারি না। দু’টো বড়ো একটা ছোট। তাই মাথা ভার লাগে। একটু নেচে নাও না। হাল্কা হয়ে যাবে।

নাচার মতো অতটা খাইনি। তুমি তো বেশ নাচো।

খারাপ নাচব কেন? নাচ আমাদের ধর্ম এখন।

কলকাতার বাড়িগুলো পাশাপাশি। গেণু ডাক্তারের ঝুলবারান্দা থেকে ফিতে ফেলে মাপলে সুকুমারের লাল বারান্দা দশ ফুটের ভেতর। নাচ আমাদের ধর্ম এখন – বলেই সুকুমার আবার নাচতে শুরু করে দিয়েছে। নিওনের আলো পড়ে তার উরু দু’খানি তরুণ শালতরুর মাংস মাখানো কাণ্ড হয়ে অন্ধকারে আলোয় একবার ঝলকাচ্ছিল, একবার হারিয়ে যাচ্ছিল। সেই অবস্থাতেই সদ্য সদ্য নিজের আবিষ্কৃত সব মুদ্রার দুঃসাহসিক শরীর ঘোরানো পা মেলে দিয়ে প্রবাহিত হতে হতে সুকুমার আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছিল। আমি যে এতো সুন্দর নাচি কোনোদিন জানতাম না তো!

একথা ভেবেই একটা বিশ্বাস ফিরে আসছিল মনে। সেই জোরেই বলল – অনেক আগেই আমাদের নাচা উচিত ছিল।

আর নেচো না। গা ব্যাথা করবে। অভ্যেস নেইতো।

তা কেন! তোমার মতো অল্পেই গলে যাই না আমরা। চেম্বারে এয়ারকুলার বসিয়েছ।

সে তো তোমাদের মত পেশেন্টদের জন্যে।

সারা দিনে ভিজিট কতো পাও?

গুনে দেখিনি।

না গুনেই ব্যাঙ্কে পাঠাচ্ছ!

ঠাণ্ডা লেগে যাবে। ঘরে গিয়ে একটা লুঙ্গি পাজামা যা হয় পরে ফেল।

তাতো বলবেই। নাড়ি টিপে এখন অঢেল পয়সা।

পরিশ্রম করে পাই।

কচু পরিশ্রম। ডাক্তারী শাস্ত্রটাই আন্দাজী।

মাঝরাতে এ নিয়ে তোমার সঙ্গে আর তর্কে যাবো না সুকুমার। কলম পিষে কী এমন হাতি ঘোড়া করছ শুনি?

একথায় সুকুমার তেরিয়া হয়ে ঘুরে দাঁড়াল। আমার মাইনে কতো জান?

কত?

মাসে ন’ হাজার টাকার মতো।

কি রকম?

আমার ওপরওয়ালা যিনি কাজ দেন তার দিন-মাইনে সত্তর টাকার মতো। আমি সে-কাজটা করি। আমার দিন মাইনে সত্তর টাকার মতো। সে-কাজটা যিনি চেক করেন – তার দিন-মাইনে তিরিশ টাকা। এসব কাজ যিনি অবহেলায় ফেলে দিয়ে সন্ধেয় ক্লাবে যান তার দিন মাইনে দেড়শো টাকার মতো। সব মিলিয়ে তিনশো টাকার মতো আমার কাজের জন্যে খরচ হয়। তার মানে মাসে ন’ হাজার টাকার মতো খরচ। তারপর সেসব কাজ ফেলে দেওয়া হয়।

বেশ আছ!

কোথায় ভাই! এর চেয়ে যখন আমরা দু’জনে স্কুলে পড়তাম – তখন সব কাজের একটা মানে ছিল। তাতে যত অল্প পয়সাই লাগুক। এখন কতো খরচ হয়। অথচ কোনো কাজ নেই। রবীন্দ্রসংগীত, ভাষাতত্ত্ব, পূর্ব-ভারত, ব্রজেন শীল নিয়ে কী সুন্দর আলোচনা করে যাচ্ছি। বলতে বলতে সুকুমার আবার নাচতে শুরু করে দিল।

ভেতরে শুতে যাবার আগে গণেশ ডাক্তার চেঁচিয়ে বলে গেল, আলোটা নিভিয়ে নাচো। এখন বয়স হয়েছে তোমার। কে কোনদিক থেকে দেখে ফেলবে।

সুকুমার আলোটা নিভিয়ে দিল। সে-জায়গায় রাত করে পাঠানো চাঁদের আলো এসে সুকুমারের সঙ্গে নাচে জয়েন করল। একটু তামা মাখানো আলো। তাই ময়লা মতো। তার ভেতরে সুকুমারের ভালোই লাগছিল নাচতে।

অফিস। সংসারের প্রয়োজনের গর্তগুলোয় নানারকমের নোট জোগাড় করে এনে গুঁজে দেওয়া ইত্যাদি করার পর সে আর কোনোদিন নিজেকে এমন করে পায়নি। পাওয়ার মধ্যে নাচের মতো ঘাম ঝরানো একটা ব্যাপার থাকায় সুকুমার রীতিমতো সুকুমারকে টাচ করতে পারছিল।

এই সময় বেলা বারান্দায় উঠে এসে নাচিয়ে সুকুমারকে দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে ভ্রূ কুঁচকে গেল। কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে কলঘরে চলে গেল। ফি-রাতে মোট তিনবার যায়। বড়ো পাতলা ঘুম হয়ে গেছে ইদানীং। ফিরে এসে বলল, কি হচ্ছে শুনি? এসব কি! এভাবে একটা ধাড়ি লোক –

আমার কেউ নেই বেলা – তাই – একা একা দেখছিলাম –

কি করে কেউ থাকবে শুনি রোজ যদি খাওয়া-দাওয়া করে ফের? না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়? খাও কেন বলতো?

খাবার পর ঠোঁটের নিচে বাঁদিকে একটু কাঁপতে থাকে। ঝিমুনি একদম থাকে না। তখন সিগারেট টেনে কতো সুখ। খিদে বেড়ে যায় –

তবে খাও না কেন বাড়ি এসে?

আগেই অনেক কিছু খেয়ে ফেলি তো। তাছাড়া –

কি?

একা একা কোন্‌ শালা ভাত খায় বল। লাইট জ্বালিয়ে –

তোমার এখন থেকে একাই কাটবে। যাও। দেখতে ভালো লাগছে না। আমি কতক্ষণ না খেয়ে বসে থাকব বলতে পার?

তখনই সুকুমার আবার নাচ শুরু করে দিল। বেলার কাছাকাছি এসে পাক খেয়ে পিছিয়ে গেল। আবার সময় বলল – নাচ আমাদের এখন ধর্ম। তুমি এই ধর্ম নেবে? নাচতে নাচতে ফিরে এসে বেলার কাছে চিবুকটা কত্থকের ভঙ্গিতে দুলিয়ে আবার বলল, এই ধর্ম তুমি নেবে? স্বামীর ধর্ম?

বেলার মুখে এসেছিল শুয়োর। কিন্তু স্বামীকে কোনোদিন এসব কথা বলেনি বলে আস্তে বলল, বিচ্ছিরি। কালই আমি সালকে চলে যাব।

সালকে সুকুমারের শ্বশুরালয়। সেখানে বর্ষাকালে গেলে তার পাম্পসু আমসত্ত্ব হয়ে যায়। নাচ না থামিয়েই সুকুমার আবার বলল, তোমার স্বামীর ধর্ম নেবে?

অসভ্যতা? তাই নিতে হবে? যে-কোনো বাড়ির আলো জ্বললেই তোমায় এ অবস্থায় দেখতে পারে। ভেতরে এস।

কেউ এখন আলো জ্বালাবে না। নিজের উপর মুদ্রায় হাতের আঙুলগুলো ঘোরাল সুকুমার। বিশেষ ঘোরে না। গাঁটে-গাঁটে চর্বি। তরমুজ সমেত কোমরটি বেঢপ। চাঁদের ময়লা লাইটে প্রাচীন মূর্তি হয়ে বেলা দাঁড়ানো।

জামাকাপড় পরে এসো যাও।

এরকম কি তুমি আমায় আগে আর দ্যাখোনি?

অনেকবার দেখেছি। নেশা কেটে গেলে গা ব্যাথা হবে খুব।

ব্যথা মনে থাকে। ভালোবাসা মনে থাকে। তুমি আমায় আর ভালোবাসো না কেন?

বন্ধুদের ভালোবাসা তো পাচ্ছ অনেক।

হ্যাঁ, খুব মেশামেশি হচ্ছে।

যাও পাজামা পরে এসো। আর নেচো না। মেয়েরা হঠাৎ জেগে উঠতে পারে।

ওরা এখন জাগবে না। এই দ্যাখো ওরিয়েন্টাল ড্যান্স। এরকম পারবে?

হাঁপাচ্ছো তো। একটু জিরিয়ে নাও বরং।

এককথায় সুকুমার বারান্দার বেঞ্চটায় বসে পড়ল। কোমরে দুটো বড়ো ঘামের ফোঁটা। হাসতে হাসতেই আস্তে বলল, কাছে এসে বসো না।

বসবো। কিন্তু ছোঁবে না বলে দিলাম।

কেন বলতো? ছুঁলে পুড়ে যায়!

বসতে বসতে বেলা বলল, ওকি অসভ্যের মতো বসেছ! বাবু হয়ে বসো। পা ভাজ করে বসতে জান না?

সে তো ট্রাউজার পরলে বসি। এখন তো দিব্যি চাঁদের আলোয় আছি। বলে সুকুমার বেলার কাঁধে ডান হাতখানা রাখল। যেন বিয়ের আগেকার তারা দু’জন সন্ধের কোনো পার্কে বেঞ্চে বসে আছে। পার্থক্য শুধুঃ বেলা চার রকমের চারটি জিনিস পরে আছে। শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ, ব্রেসিয়ার। আলো থাকলে দেখতে পেত, কাজলও আছে চোখে। কপালে সিঁদুরের টিপ। হাতে লোহা, শাঁখা এবং চুড়ি। কানে নতুন কানপাশা।

সুকুমারের গায়ে কোনোরকমের কিছু নেই। বুকটা ধড়াস ধড়াস করছিল তার। মোটর-মিস্ত্রির ওভারঅলের মতো শুধু একখানা চামড়া দিয়ে সাড়া গা মোড়া। এখন তা গরম। এখানা নিয়েই জন্মেছিল। ইলাস্টিক। তার বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সমান তালে বেড়ে বেড়ে সবসময় তার মাংস, চর্বি, হাড়, রক্তের ওপর এই চামড়াখানি লেগে আছে। তাতে কোথাও কোথাও ফুটো। সেখানে চোখ, নাক, কান ইত্যাদি সব বসানো।

লোকে বাজার করে। সংসার করে। ছেলেমেয়ে পড়ায়। রেশন আনে। তার কোনো ঝঞ্ঝাট তোমাকে পোহাতে দিই না আমি।

একটা ঝক্কি আমি পোহাই কিন্তু। টাকা আনি। অফিসে গিয়ে ঘর ঝাঁট দিই। বাসন মাজি। কাপড় কাচি। বাবুদের গা টিপি। তাদের মন বুঝে কাশি। তাতে ভালোবাসা আসে না। মেশামেশি হয় না। সব বাসি গন্ধ বেরোয়। তার নাম কাজ। কতকগুলো মরা কাজ। সেজন্য মাঝে মাঝে টাকা দেয়। তাই নিয়ে আমাদের সংসার হয়।

কি বাজে বকছো সেই থেকে। সবাই তো এরকমই করে।

আমিও তো তাই বলছি। তুমি আমার ধর্ম নেবে?

কিসের ধর্ম?

এই নাচের ধর্ম। নাচ আমাদের ধর্ম এখন। এতে মিশে যেতে হয়। তাতে ভালোবাসা-বাসি হয়। পুরানো ভালো ভালো দিন তাতে ভেসে চলে আসে। একদম তীরে। দাঁড়ালেই দেখা যায়।

কতটা খেয়েছো আজ? কে কে ছিল বলতো!

সবাই ছিল। সবাইকে চিনবে তুমি। ছুঁতে পারবে না কিন্তু! আমাদের ধর্ম নিলে তবেই না টাচ করা যায়। এসো নাচি। লজ্জা কিসের? এসো না –

উঁহু। আমার হয় না। আমার আসে না।

তুমি আসতে দাও না বলে আসে না। গান জানো তবুও গাও না। তুমি গাইলে আমি তোমায় টাচ করতে পারি। ভালোবাসতে পারি। আমি জানলে তো নিশ্চয় তোমাকে শোনাতাম।

চেষ্টা করলে পার।

সুকুমার তখন নাচতে নাচতে বলেছিল আমার হয় না। আমার দেখছি – আজই রাতে দেখছি – আমি কত সুন্দর নাচতে পারি। বলতে বলতে সুকুমার প্রবাহিত স্ত্রোতের প্রথম ঢেউটির ধারায় বাঁ পা-খানা এগিয়ে প্রায় ভেসে বেলার কাছে চলে এলো। তখন দু’খানা হাতের পাতা দুটি ছায়াসত্রের মতো তার মাথা ও চিবুকের নিচে। সেই অবস্থায় পাকা কত্থক শিল্পীর স্টাইলে সে তার আস্ত মাথাটা বেলার মুখের কাছে নিয়ে একটু ঝাঁকিয়ে ফিরে এলো।

তখন বেলার চোখে যে-দৃষ্টি তার অর্থ মরণ।

তাতে একটুও ঘাবড়ে না গিয়ে নাচতে নাচতেই সুকুমার বলল, তুমি আমার ধর্ম নেবে?

কোনো জবাব না পেয়ে এবার সুকুমার তার নিজস্ব তৈরি স্রোতধারার ভেতর ভাসতে ভাসতেই বলল, আমার গান শিখতে ইচ্ছে করে। গুন গুন করে।

শিখলে পার।

হারমোনিয়াম নেই। সরগম জানি না।

কিনে দেব। শিখিয়ে দেব। বলেই বেলা সবে টের পাচ্ছিল, সে কতকাল পরে আবার সুকুমারের সঙ্গে মেশামেশি করতে পারছে। প্রায় ভালবাসাবাসির মতো। এখন বোধহয় সে সুকুমারের ধর্ম নিতে পারে। তাই ভেবে যেই না নিজস্ব মুদ্রায় প্রবাহিত হতে গেল – অমনি অন্ধকার বারান্দায় গণেশ ডাক্তারদের আলো এসে লাফিয়ে পড়ল। সেই ঝোঁকেই বেলা একলাফে ঘরে। গেণুর বউ শেষরাতে অনেক ফেনা করে রোজকার মতো বারান্দায় বেসিনে দাঁত মাজতে শুরু করেছে। তারই আলো।

ভেতরে এসো বলছি।

ভেতরে এসো বলছি।

সুকুমার যেতে পারল না। মাত্র একটা লাফ দিলেই ঘরে যাওয়া যায়। সেটা কিছুতেই টপকাতে পারল না। সে তখন স্বচ্ছন্দ শরীরে তারই নিজের বানানো স্রোতে অবলীলায় এগোচ্ছিল পিছোচ্ছিল।

তোমার বন্ধুর বউ দেখতে পেলে কিন্তু একটা কেলেঙ্কারি হবে। সারা পাড়ায় ঢিঢি পড়ে যাবে।

সুকুমার তার প্রবাহে ভাসতে ভাসতেই বলল, ওকে আমার ধর্ম নিতে বলব।


[লেখক পরিচিতি: শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক।  জন্ম : ১৯৩৩-এর ২৫ মার্চ, খুলনা, বাংলাদেশ। ২ খন্ডে প্রকাশিত শাহজাদা দারাশুকো এবং কুবেরের বিষয় আশয় তাঁর বিখ্যাত দুই উপন্যাস। ২০০১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর  তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।]

ফেইসবুক কমেন্ট
No Comments Yet

Comments are closed

error: