আমার বাবা বসে থাকে অন্ধকারে

জেরোম ওয়াইডম্যান

অদ্ভুত একটি  অভ্যাস আছে আমার বাবার। অন্ধকারে বসে থাকতে পছন্দ করে সে, একা একা। মাঝেমধ্যেই আমি দেরিতে বাসায় ফিরি। সমস্ত বাড়িঘর অন্ধকার। মাকে ডিস্টার্ব করতে চাইনা বলে নিঃশব্দে আস্তে করে আমি ঘরে ঢুকে পড়ি। কেননা খুব কাঁচা ঘুম আমার মা’র। বেড়ালের মতো পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকে প’ড়ে অন্ধকারেই কাপড় ছাড়ি। পানি খেতে রান্নাঘরে যাই। আমার খালি পা কোনো আওয়াজই হতে দেয় না। রুমে ঢুকতে গিয়েই বাবার গায়ে ধাক্কা খাই। সে রান্নাঘরে বসে আছে -পাজামা পরে-  পাইপ টানছে।
‘হ্যালো বাবা’  আমি বলি।
‘হ্যালো খোকা’। সে বলে।
‘শুতে যাও না কেন, বাবা?’
‘যাচ্ছি’।
কিন্তু সে ওখানে বসেই থাকে। আমি ঘুমিয়ে পড়ারও অনেক পরে, নিশ্চিত জানি, ওখানে বসে আছে আমার বাবা। বসে পাইপ টানছে।

অনেকসময়, হয়তো পড়ছি আমি। মা, রাতের জন্য ঘর গোছাচ্ছেন, আমি টের পাই। শুতে যায় আমার ছোট্ট ভাইটা। টের পাই, আমার বোনটা ঘরে আসে। বয়াম আর চিরুনি দিয়ে কি যেন করে, তারপর শান্ত হয়ে যায় ও। আমি বুঝি ঘুমিয়ে পড়েছে আমার বোন। কিছুক্ষণ পর শুনতে পাই, বাবাকে মা গুডনাইট বলে যায়। পড়া চালিয়ে যাই আমি। হঠাৎ আমার তৃষ্ণা লাগে খুব। (প্রচুর পানি খাই আমি)। পানি খেতে কিচেনে যাই। ঠিক তখনই বাবার গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ি। আমার অবাক লাগে খুব কখনও। কখনো বা তাকে ভুলে থাকি। কিন্তু ওখানে সে বসে আছে, পাইপ টানছে, ভাবছে।
‘শুয়ে পড়ো না কেন, বাবা?’
‘পড়ব এখনই, খোকা’  সে বলে।
সে কিন্তু ওখানে বসেই থাকে। পাইপ টানে। চিন্তাভাবনা করে। ব্যাপারটা আমাকে ভাবায়। আমি বুঝি না, কী নিয়ে এতো ভাবে সে? একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
‘কী নিয়ে এতো চিন্তা করো, বাবা?’
‘কিছু না’। সে বলে।
একদিন ওখানে তাকে রেখে শুয়ে পড়লাম। কয়েক ঘন্টা পর, ঘুম ভাঙল আমার। তৃষ্ণা পেলে পানি খেতে কিচেনে গিয়ে দেখি, সে বসে আছে। পাইপ ফুঁড়িয়ে গেছে তার। কিচেনের এক কোণে তাকিয়ে আছে। অন্ধকারের মধ্যে মুহূর্তে সম্বিত ফিরে পেলাম আমি।  আমার পানি খাওয়া হলে দেখি সে বসে তাকিয়ে ছিল। পলকহীন তাঁর চোখ। ভয় পেয়ে গেলাম, আমার মনে হলো, আমাকেও টের পায়নি সে।
‘বাবা, তুমি শুয়ে পড়ছো না কেন?’
‘পড়বো, বাবা। তুমি শুয়ে পড়ো। আমার জন্য জেগে থেকো না’-সে বলে।
‘কিন্তু’, আমি বললাম, ‘এখানে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে আছো। সমস্যা কী? কী নিয়ে ভাবছো?’
‘কিছু না, বাবা। কিছু না’ সে বলে ‘শুধু বিশ্রাম নিচ্ছি। এইতো’।

যেভাবে সে বলল, তাতে মনে হলো এটা বিশ্বাসযোগ্য। তাকে চিন্তিত মনে হয়নি। শান্ত, নিরুদ্বেগ তার কন্ঠস্বর। সবসময়। কিন্তু আমি বুঝতাম না। গভীর রাতে, অন্ধকারে অস্বস্তিদায়ক একটা চেয়ারে একাকী বসে  থাকা কিভাবে বিশ্রাম নেওয়া হয়?  কী হতে পারে? আমি সমস্ত সম্ভাবনা যাচাই করে দেখি। টাকা-পয়সার ঝামেলা নয়। প্রভূত পরিমাণে অর্থকড়ি আমাদের নেই, কিন্তু অর্থসংক্রান্ত কোন কিছু হলে সে অন্তত গোপন করে না। তার স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত  ঝামেলাও নয়। এ বিষয়েও সে স্বল্পভাষী নয়।  পরিবারের কারও স্বাস্থ্য নিয়েই দুশ্চিন্তা নয়। টাকা-পয়সার দিকে দিকে আমাদের অপর্যাপতা থাকতে পারে কিন্তু স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে নয়। (মা যাকে বলে, একদম টনটনা )।  কী হতে পারে? আশঙ্কা হয় আমি হয়ত জানি না।  তাই বলে আমার দুশ্চিন্তা তো আর আটকে থাকে না। সে হয়তো, আগের দেশে তার ভাইদের কথা ভাবছে। অথবা তার মায়ের কথা, কিংবা দুই সৎমায়ের কথা। বাবাকেও মনে করতে পারে তার। তবে তাঁরা সকলেই মৃত। তাদেরকে নিয়ে সে এতো মগ্ন হয়ে ভাবতো না। মগ্ন হওয়া কথাটা ব্যবহার করলাম। কথাটা ঠিক না। সে মগ্ন হয়ে গভীরভাবে ভাবে না। এমনকি সে আদতে ভাবে বলেও মনে হয় না।  তাকে এতো প্রশান্ত মনে হয়! যদিও  তৃপ্ত মনে হয় না, নিতান্ত প্রশান্ত কিন্তু ভাবনাচ্ছন্ন মনে হয় না।
হয়ত তার কথাই ঠিক। হয়ত এটা তার বিশ্রাম। কিন্তু আমার কাছে অসম্ভব মনে হয়।  আমাকে ভাবায়।
যদি আমি জানতাম কি নিয়ে সে ভাবে! জানতাম কী  ভাবে সে আসলে? হয়তো আমি তাকে সাহায্য করতে পারতাম না। হয়তো তার সাহায্যের দরকারই হতো না। তার কথাই হয়তো ঠিক। এটা তার বিশ্রাম।
অন্তত, আমার দুশ্চিন্তা না করাই ভালো।
কিন্তু কেন সে ওখানে বসে থাকে, অন্ধকারে? সে কি অপ্রকৃতিস্থতার দিকে যাচ্ছে? মাত্র তিপ্পান্ন বছর তার বয়স। অত্যন্ত প্রাণোচ্ছল রসিক মানুষ। সবদিক বিবেচনায় সে ঠিকই আছে। বিটের সূপ পছন্দ করে এখনো সে।  টাইম পত্রিকার শেষাংশ এখনো সে সবার আগে পড়ে।  এখনো উইং কলার পরে। এখনো পর্যন্ত তার বিশ্বাস ডেবস দেশটাকে রক্ষা করতে পারতো অন্যদিকে টি. আর. অর্থনৈতিক ধান্দাবাজির একটা অস্ত্র। সবদিক দিয়েই সে একদম ঠিকঠাক। এমনকি পাঁচ বছর আগের যেমন দেখাতো তার চেয়ে এখন তাকে একটুও বয়স্ক লাগে না, সবাই বলে।  সবাই বলে, সযন্তে-সংরক্ষিত তার চেহারা। কিন্তু সে অন্ধকারে বসে থাকে –একাকী – ধূমপানরত। অকম্পিত দৃষ্টিতে সমুখপানে তাকিয়ে  থাকে রাতের প্রহরজুড়ে।

তার কথা যদি সত্যি হয়, সত্যিই যদি এটা কেবল বিশ্রাম হয়ে থাকে, আমি বাঁধা দেয়ার কথাও ভাবতাম না। তবে, যদি সেটা না হয়? ধরা যাক এমন কিছু আমি যার কোন তলই পাই না। সম্ভবত তার সাহায্যের প্রয়োজন। সে বলে না কেন তবে? কেন সে হাসেনা বা কাঁদেনা কিংবা ভ্রু পর্যন্ত কোঁচকায় না?  কেবল ওখানে বসে থাকে? শেষপর্যন্ত আমার মাথাটা গরম হয়ে গেল। হতে পারে অচরিতার্থ কৌতূহলের কারণে কিংবা কিছুটা চিন্তিত আমি। যাই হোক না কেন, আমার মেজাজ গরম হল।
‘কোন ঝামেলা, বাবা?’
‘কিছু না খোকা,  কিচ্ছু না।‘
এবার আমি ছেড়ে দেওয়ার পাত্র না। কারণ রাগ চড়ে গেছে আমার।
‘তাহলে এখানে একলা বসে থাকো কেন, রাত জেগে জেগে?’
‘বিশ্রাম এটা, খোকা। আমার ভালো লাগে।‘

কাজের কাজ কিছু হলো না।  জানি, আগামীকাল সে এখানে ঠিক এভাবে বসে থাকবে। আমি অবাক হবো। চিন্তিত হবো। এখানে থামবো কেন? আমি তো রেগে আছি।
‘আচ্ছা, কী নিয়ে এতো চিন্তা করো? শুধু এখানেই বা বসে থাকো কেন? তোমাকে এতো ভাবাচ্ছে কিসে? কি চিন্তা করো এত তুমি?’
‘বিশ্রাম ছাড়া আর কিছু না। এ পর্যন্তই। এবার ঘুমাতে যাও তুমি।‘
হঠাৎ রাগ কমে গেল  আমার। কিন্তু দুশ্চিন্তা রয়েই গেছে। জবাব আমার চাই-ই চাই। নিতান্ত হাস্যকর একটা ব্যাপার।  আমাকে বলছে না কেন সে? আমার এমনও মনে হলো যে কোন জবাব না পেলে আমি পাগল হয়ে যাবো। আমি লেগে থাকলাম।
‘তাহলে কী নিয়ে ভাবো এতো?  কী নিয়ে?’
‘কিছু  না খোকা, সাতপাঁচ ভাবি, বিশেষ কিছু না। এটা সেটা আরকি’।
আমি আমার প্রশ্নের জবাব পাই না।
এখন অনেক রাত। রাস্তায় সুনসান নীরবতা। বাড়িটায় অন্ধকার। সিঁড়ি দিয়ে সন্তর্পনে উঠি আমি, ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দের ভয়ে সাবধানে পা ফেলি। পা টিপে টিপে আমার রুমে প্রবেশ করি। জামাকাপড় ছাড়তে ছাড়তে টের পাই পিপাসা লেগেছে। খালি পায়ে রান্নাঘরে যাই। সেখানে পৌছানোর আগেই বুঝতে পারি, সে ওখানে। তার প্রশস্ত অবয়বের ঘন কালো অন্ধকার দেখতে পাই। হাটুতে কনুই রেখে মুখে নিয়ে ঠান্ডা পাইপ, সেই একই চেয়ারে বসে আছে। পলকহীন দৃষ্টিতে  চেয়ে আছে সামনে। আমি যে ওখানে এটাও সে টের পেয়েছে বলে মনে হয় না।

টের পায় না রুমে আমার প্রবেশ। দরজার কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমি তাকে দেখতে থাকি। সবকিছু শান্ত,রাত্রি তবু খুব মৃদু আওয়াজে পূর্ণ হয়ে আছে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে প্রথমবারের মতো এগুলো লক্ষ্য করতে শুরু করি। আইসবক্সে অ্যালার্মঘড়ির টিকটিক শব্দ। অনেক দূরের কোন ব্লক পেরিয়ে যাওয়া গাড়ির অস্পষ্ট শব্দ। বাতাসে রাস্তায় পড়ে থাকা কাগজের সর্‌ সর্‌ চলার শব্দ। ফিসফিসানো স্বরের উত্থান-পতনের মতো, নিশ্বাসের মত। অদ্ভুত সুখময়।
গলার শুষ্কতা আমার মগ্নতা ভাঙায়। দ্রুত কিচেনে পা বাড়াই আমি।
‘হ্যালো, বাবা!’
‘হ্যালো, খোকা।‘ সে বলে। নিচু আর স্বপ্নময় তার কন্ঠস্বর।

সে নড়েচড়ে বসে না, এমনকি দৃষ্টি পর্যন্ত সরায় না।
পানির ট্যাপ খুঁজে পাইনা আমি। জানলা দিয়ে আগত স্ট্রিটল্যাম্পের আলোর  মৃদুছায়া রুমের অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে দেয়। রুমের কেন্দ্রে পৌছে  টশ্‌ করে লাইট জ্বালাই আমি। নিজেকে ঝাঁকি দিয়ে সোজা হয়ে বসে বাবা যেন তার উপরে হামলা হয়েছে।
‘বাবা, কী হয়েছে?’   জিজ্ঞেস করি।
‘এমনি’ সে বলে, ‘আলোটা আমার সহ্য হয়না’।
‘আলোতে কী হয়?’ আমার প্রশ্ন।
‘কী সমস্যা হয়? কিছু না’  বলে সে।  ‘আলো আমার ভালো লাগে না।’
টশ্‌ করে আমি লাইট নিভিয়ে দিই। আস্তে আস্তে পানি খাই। নিজেকে বোঝাই, উত্তেজিত হলে চলবে না ,আমাকে ঘটনার গভীরে যেতে হবে।

‘শুতে যাও না কেন তুমি? কেন এতো রাত পর্যন্ত অন্ধকারে বসে থাকো এখানে?’
‘ভালো লাগে। আলো আমার সহ্য হয় না। যখন ছোট ছিলাম ইউরোপে তখন আমাদের কোন আলোর ব্যবস্থা ছিল না।’
মনটা আমার ধাক্কা খায় খুশিতে। শ্বাস ছেড়ে তখন মনে হয়, আমি বুঝতে আরম্ভ করেছি। অস্ট্রিয়ায় বাবার ছেলেবেলার কথা আমার মনে পড়ে। বাবার কথামতো আমি কল্পনায় দেখতে পাই, প্রশস্ত এক কড়িকাঠ, দাদু যেখানে দাঁড়িয়ে আছে বারের পেছনে। অনেক রাত হয়ে গেছে, চলে গেছে সমস্ত খদ্দের আর তিনিও ঘুমে ঢুলু ঢুলু। দেখতে পাই, রুমের এককোণে উজ্জ্বল কয়লার জায়গাটা -সেখানকার  নিভে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তের উজ্জ্বল আলো। অন্ধকার হয়ে যাওয়া রুমটা আরো ঘন অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। বিশাল রুমের এককোণে ফায়ারপ্লেসের একপাশে  ছোট একটা ছেলে ডালপালার স্তুপের মধ্যে গুটিসুটি মেরে ব’সে; মরে-আসা অগ্নিশিখার দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে।
এই ছোট ছেলেটা আমার বাবা। দরজার কাছে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে দেখতে এইসব মুহূর্তের সুখময়তার কথা আমি কল্পনা করতে পারি।

‘বলছো, কোন সমস্যা নেই? তুমি অন্ধকারে বসে থাকো, ভালো লাগে বলে? বাবা?’ আনন্দের আতিশায্যে কন্ঠস্বরকে নিচু রাখা আমার পক্ষে কঠিনই হয়ে দাঁড়ায়।
‘নিশ্চয়ই। আলোতে আমি ভাবতে পারি না।’ সে বলে।
গ্লাসটা নামিয়ে রেখে, আমার রুমের দিকে ফিরে চলতে শুরু করি।
‘গুডনাইট, বাবা’ আমি বলি।
‘গুডনাইট’ বলে সে।
চলতে চলতে  মনে পড়ে নিজেরই প্রশ্ন,  ‘বাবা, কী নিয়ে এতো ভাবো?’
নৈঃশব্দের পথ পাড়ি দিয়ে বহুদূর থেকে যেন তার কন্ঠ ভেসে আসে। ‘কিছু না’ সে বলে, ‘বিশেষ কিছু না।’

[জেরোম ওয়াইডম্যানঃ পুলিৎজারজয়ী নাট্যকার, ঔপন্যাসিক‌ ও  গল্পকার ওয়াইডম্যান  ( ১৯১৪-১৯৯৮) মার্কিন সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য নাম। গদ্য স্টাইলের দিক দিয়ে তিনি হেমিংওয়ে ঘরানার বলে তাকে কখনো কখনো ২য় হেমিংওয়ে বলা হলেও  তার জীবনবোধ ও নিজস্বতাই তাকে স্বতন্ত্র সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। গল্পটি একই (মাই ফাদার সিটস ইন দ্য ডার্ক) নামের গল্পগ্রন্থ থেকে গৃহীত।]

ফেইসবুক কমেন্ট

আরও দেখেন

রেইপ ফ্যান্টাসিজ | মার্গারেট এ্যাটউড... মার্গারেট অ্যাটউড | পোর্ট্রেইট: তারেক বিন কামাল ক্যানসারের জন্য ভ্যাকসিন আবিষ্কার ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর; কিন্তু ম্যাগাজিনে ব্যাপারগুল...
কে এম রাকিব

Share a little biographical information to fill out your profile. This may be shown publicly.

1 Comment
  1. গল্পটা ভালো লেগেছে। বুকের ভেতর দীর্ঘশ্বাস রেখে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: