fbpx

মিম জেনারেশন এবং সিসিফাসের মিথ

[এই আলোচনা ব্যক্তি মিমকে নিয়া না। বরং এই আলোচনা একটা জেনারেশনের মিম কালচার নিয়া। যে কালচারটার জন্ম এই শতকে। ইংরেজিতে পরিচিত  Meme হিসেবে; বিভিন্ন গবেষক অনেকসময় এরে উল্লেখ করছেন কালচারাল ইউনিট হিসেবে। লিমর শিফম্যান এরে সংজ্ঞায়িত করছেন ডিজিটাল উপাদানের সমষ্টি হিসেবে যেইটার বিষয়বস্তু একই থাকে। তাঁর মতে, মিম হইতেছে একধরণের পোস্টমর্ডান ফোকলোর যা জনগণের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের আলোচনা ঠিক এই জায়গায়। এমনিতেই মিম নিয়া গবেষণার পরিমাণ স্বল্প। কিন্তু যেটুকু হইছে তার উপর ভিত্তি কইরা কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার চেষ্টা করা যাইতে পারে। যেমন, মিম কারা এবং ক্যান বানায়? মিম রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোন ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা? মূলত বিভিন্ন আন্দোলন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনায় তরুণ প্রজন্ম সোশ্যাল মিডিয়াতে যে নতুন হিউমোরাস ফর্মে প্রতিটা বিষয়রে আঘাত কইরা মিম তৈরী করতেছে, আদানপ্রদান করতেছে এর আদৌ কোন সামাজিক গুরুত্ব রইছে কিনা তা ডিটারমাইন করা জরুরী। এই আলোচনায় আমাদের প্রশ্ন ঘুইরাফিইরা চইলা যাবে কেন দিকে। আমরা সেই কেনই উত্তর খুঁজব তবে তা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়া। এই লেখার উদ্দেশ্য কোন রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিরে হেয় প্রতিপন্ন করা না। এমন কোন অর্থ খাড়া করানো, লেখার ভুল অর্থ তৈরী করা বলেই বিবেচিত হবে।]

 

মিমের উৎপত্তি কবে, কোথা থেইকা?

মিম হইতেছে পলিটিকাল স্যাটায়ারের নয়া ধরণ যা ওয়েব ২.০ যুগে দাপটের সাথে জায়গা কইরা নিছে ফেসবুক, টুইটার, ব্লগসহ বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক প্লাটফর্মগুলায়। রিচার্ড ডকিন্স সর্বপ্রথম মিম শব্দটা ব্যবহার করছেন তাঁর দ্য সেলফিশ জিন (১৯৭৬) গ্রন্থে। কিন্তু তাঁর ব্যবহৃত অর্থ ছিলো সাংস্কৃতিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটা ইউনিট বা একক হিসেবে যা নিজের প্রতিলিপি উৎপাদনে সক্ষম।1

বর্তমানে এর ব্যবহার অন্য অর্থে। মিম হইয়া পড়ছে এক ধরণের স্যাটায়ার। আর স্যাটায়ারের কথা ধরলে, স্যাটায়ারের অস্তিত্ব ছিলো অনেক আগে থেইকাই। বিভিন্ন গ্রিক নাটক, রোমান স্যাটারনালিয়া উৎসব কিংবা রেনেসাঁ সময়কার বিভিন্ন লেখনিতে স্যাটায়ারের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এনলাইটেনমেন্টের সময় বিশ্বাস করা হইত, মানুষের চরিত্রের ভুলত্রুটি সংশোধন করা যাইতে পারে শিল্পসংস্কৃতির মাধ্যমে। কেননা, শিল্পসংস্কৃতি সমাজের দর্পনে বিম্বিত রূপ। এই সময় (অষ্টাদশ শতাব্দীতে) ভলতেয়ার, সারভেন্তিস বা জোনাথন সুইফটের নাম নেওয়া যায় স্যাটায়ারের পুরোহিত হিসেবে। আমেরিকান সাহিত্যে মার্ক টোয়েনরে বিবেচনা করা হয় স্যাটায়ারের গুরুর মতো। তাঁরা তাদের লেখনিতে স্যাটায়ার করছেন, ব্যঙ্গ করছেন, আঘাত করছেন তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলারে। স্যাটায়ারের ধরণ পরিবর্তিত হইতে থাকে সময়ের সাথে সাথে, প্রযুক্তির সাথে সাথে। যদিও এর আঘাতের বৈশিষ্ট্য অনেকাংশে একই রইয়া গেছে ব্যঙ্গবিদ্রুপ বা অন্যান্য রঙ্গ, রিডিকুলনেসের মধ্য দিয়া। শাটজের মতে, স্যাটায়ার সবসময় আঘাত করে কোন ব্যক্তিরে বা কোন প্রতিষ্ঠানরে।2

ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্যাটায়ার এর ক্লাসিক ফর্মের (উদ্দেশ্য, আঘাত ইত্যাদির ক্লাসিসিজম) দিকে ফিরা যাইতে শুরু করে। দ্য সিলভা ও গার্সিয়ার মতে, এই সময়কার স্যাটায়ারিস্টরা এক ধরণের ডিসটোপিয়ান বাস্তবতা দেখান যেইখানে ইউটোপিয়ান বা আদর্শিক উন্নয়নের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা কিংবা বাস্তবতা ভাইঙা যায় এর নিজস্ব কনট্রাডিকশনের মধ্য দিয়া।

 

হাক্সলে এবং জর্জ অরওয়েল এই ক্ষেত্রে পথ দেখান। ইউটোপিয়ান স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষার সীমাবদ্ধতা শুধু তাঁরা তুইলাই ধরেন নাই বরং এদের ভেতরকার অন্তঃসারশূণ্যতাও দেখায়া দিছেন।3

বিশ শতকে  টেলিভিশন আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকায় টেলিভিশন শোগুলা স্যাটায়ারকে সম্প্রচার মাধ্যমে নিয়া আসে। তখন এক আধুনিক ফর্মে স্যাটায়ারের ফেরত ঘটে। পলিটিকাল স্যাটায়ারও হইয়া উঠে বেশ জনপ্রিয়। ‘দ্যাটস মাই বুশ’, ‘লিল বুশ’ এই শোগুলা প্রেসিডেন্ট বুশরে খানিকটা দুর্বল বা হাস্যকর ব্যক্তি হিসেবে দেখাইতে থাকে যেখানে এই সমালোচনাগুলা ছিলো অক্ষতিকর। এই পলিটিকাল স্যাটায়ার এক ধরণের সুবিধাজনক অবস্থানে থাইকা রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ বা প্রতিষ্ঠান নিয়া হাসি তামাশার মাধ্যমে সমালোচনা করতে থাকে। ওয়েব ২.০ যুগে আইসা মিমগুলো জায়গা কইরা নেয় টেলিভিশন শো-এর স্থলে। এখন আমেরিকার নির্বাচনে DIY মিম জনসাধারনকে রাজনৈতিক মতামতে সম্পৃক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের স্যাটায়ার সংষ্কৃতিতে মিমের আগমন ক্যামনে ঘটলো? যেহেতু এই নিয়া কোন উল্লেখযোগ্য কাজ নাই, তবে ধারণা করা যাইতে পারে এর যাওয়া-আসা ঘটছে সাহিত্য থেইকা ওয়েবে।

বাংলাদেশী লেখকের মধ্যে আহমদ ছফার নাম নেওয়া যায় যিনি বাংলাদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আঘাত করছেন ‘গাভী বিত্তান্ত’ উপন্যাসে। আবার সাম্প্রতিককালে মঈনুল আহসান সাবেরের ‘এখন পরিমল’ উপন্যাসের কথা উল্লেখ করা যাইতে পারে যেখানে ব্যঙ্গ করা হইছে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিরে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইতেছে, এগুলো মিমের দিকে ঢইলা যাওয়ার ইঙ্গিত না। তবে ঢলতে ভূমিকা রাখছে। সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে কমিক স্ট্রিপগুলা যেমন আলপিন, উন্মাদ, এখনকার যুগের রস+আলো। এইসব ম্যাগাজিন ছবি, শব্দ, রঙ, ভাষা ব্যবহার কইরা স্যাটায়াররে কালো সাদা অক্ষর ফর্ম থেকে রঙিন চিত্রিত ফর্মে নিয়া আনছে। ওয়েবযুগে বা একুশ শতকে যখন ছবি বানানো, মত প্রকাশের স্থান, সহজলভ্যতা বাড়লো তখন ইউজার জেনারেটেড মিম বা ব্যবহারকারীর মিম তৈরীর প্রবণতাও বাড়লো। বিভিন্ন ধরণের ফেসবুক পেইজ, টুইটার একাউন্ট গড়ে উঠতে লাগলো বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন জনরার মিম নিয়া। তবে মিমের  বেশকিছু ডাইমেনশনও তৈরী হইছে। ওয়েঙ, ফ্লামিন্নি এবং তাঁদের দল একটা গবেষণা কইরা দেখাইছেন, মিম সোশ্যাল মিডিয়াতে টিকে থাকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। বর্তমান সময়ে তথ্য অনেক কিন্তু ব্যবহারকারীর মনোযোগের পরিধি (Attention Span) কম৷ মনোযোগের এই স্বল্প সময়ে যদি কোন মিম কোন নির্দিষ্ট দর্শকের কাছে আকর্ষণীয় হইয়া উঠতে চায় তাইলে তারে একটা প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়া যাইতে হয়। এই প্রতিযোগিতাই তৈরী কইরা দেয় বিভিন্ন বিষয় নিয়া বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জন্যে বিভিন্ন জাতের মিমের।4

এইজন্যে এক জাতের মিম নির্দিষ্ট এক ধরণের মানুষের কাছেই পৌঁছায়। এই পৌঁছানো বা কোন মিমের জনপ্রিয়তা বিভিন্ন বিষয় দ্বারা নির্ধারিত হয়। কোন সমাজের চলমান ইস্যু, হোক সেটা রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত কিংবা স্রেফ ব্যক্তিগত ইস্যুই একে অপরকে প্রভাবিত কইরা মিমকে মানুষের কাছে ছড়ায়ে দেয়। মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা কিভাবে তৈরী হয়? মিম হইতাছে এক ধরণের হালকা চালের রসিকতা। বেশি মাথা খাটাইতে হয় না, যা জানা তার মধ্যেই হাসির খোরাক জোগায়। ইন্টেলেকচুয়ালিটিতে আগ্রহী বাংলাদেশীদের কাছে যেমন ফিলোসফি ম্যাটারস বা দার্শনিক মিমস ফর আদুভাই টিনস নামক ফেসবুক পেইজের মিমগুলো পছন্দনীয় হইতে পারে তেমনি রাজনৈতিক সচেতন মানুষজনের কাছে কালা কাউয়া, মুক্তিবাহিনী মিমস, ক্লকওয়ার্ক মিম, ইয়ার্কি নামক ফেসবুক পেইজের মিম পছন্দনীয় হইতে পারে। আবার বাংলা সিনেমা নিয়া ট্রল করে তৈরী করা মিম নিয়া আগ্রহী মানুষজনও আছে এবং এই সংক্রান্ত পেইজের সংখ্যাও অনেক।

মিম #১

#১ মিমটা দেখা যাইতে পারে। ২০১৮ সালের কোটা সংষ্কার আন্দোলনে যারা আন্দোলনকারীদের পিটাইছিলো তারাই যখন আইসা বলে, “আরে এই আন্দোলন তো আমরা করলাম” তখন তাদের পিছে লুকানো রক্তাক্ত হকিস্টিক দেখা যায়। আমরা মিমটাতে দেখি তাদের কথার সাথে আচারের ডিরেক্ট ক্ল্যাশ। আবার দ্বিতীয় মিমটাও কোটা সংষ্কার আন্দোলনকে নিয়া। এই মিমটায় যখন আমরা দেখি এক নিউজে আসে আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের মিছিল আবার আরেক নিউজে আসে আন্দোলনের পক্ষে ছাত্রলীগের পরিচয় আগে ‘ছাত্র’, তখন দুইটা ন্যারেটিভ সাংঘর্ষিক হইয়া পড়ে। এটারে আখ্যা দেওয়া হইলো “ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প” হিসেবে যেটা সংগ্রহ করা হইছে মোটিভেশনাল আলাদা একটা ন্যারেটিভ থেইকা।

এরকম ছোট ছোট অনেক জায়গা, নিউজের ন্যারেটিভ, মোটিভেশনাল ন্যারেটিভ মিলায়া মিমটা যেমনে আমাদের বিনোদন দেয় তা হইলো এর বক্তব্যের সাংঘর্ষিকতার জায়গা থেইকা। আমরা বৈপরীত্যে মজা পাই, বক্রহাসি হাসি। কেউ যখন একরকম আচরণ করে একসময়, পরবর্তীতে বিপরীত আচরণ করলে দুইটারে পাশাপাশি রাইখা ট্রল করি। কেননা মানুষের হিপোক্রেসি উন্মোচন কইরা দেওয়ার মধ্যে মানুষ স্যাডিস্টিক আনন্দ খুঁইজা পায়। সেটাই হইতেছে ডিসটোপিয়ান বাস্তবতা। কেননা, সেখানে কোন সলিড যৌক্তিক ব্যাখা থাকে না কেবল থাকে ভাইঙা দেখাইয়া দেওয়া– “তোমার (মানুষের, প্রতিষ্ঠানের) আগাগোড়াই হিপোক্রেসি!” এই বিপরীতমুখী অবস্থাই কোন মিমকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য কইরা তুলে। আমরা এখন আর সিরিয়াস বিষয় আর হালকা বিনোদনের পার্থক্য করতে পারি না। সময়ের এই তথ্যবহুল ক্রসরোডে সিরিয়াসনেস, সারকাজম আর বিনোদনের সীমারেখা ভাইঙা গেছে। কোনটা সারকাস্টিক আর কোনটা সিরিয়াস বিষয় আর কোনটা কেবল বিনোদনের জন্যে তা আলাদা করে বোঝা যায় না। সবই কমেডি, সবই বিনোদন।

মিম #২
মিম #৩

কিন্তু মিমগুলো ভাইরাল হইছে, ছড়াইছে অনেকের কাছে। কারণ, সবাই অংশ নেক বা না নেক, মোটামুটি সবাই (মিডিয়ার মাধ্যমে হোক বা অন্য যেকোন মাধ্যমেই হোক) জানতো আন্দোলনের সময়কার পক্ষ-বিপক্ষের মানুষগুলার, ক্ষমতা অপব্যবহারকারীদের রিডিকুলনেসের কথা। সবাই জানে বা পরিষ্কার কইরা ফেলে, তাদের হিপোক্রেসির বিষয়ে, নিজেদের কাছে। এর প্রমাণ মিমগুলাই। তা নাইলে কেন আমরা হাসি? (অর্থাৎ তা নাইলে কেন আমাদের কাছে মিমগুলা জনপ্রিয়তা পাইলো?) আবার নির্বাচনে বিজয়ী দল যখন কয় তাঁরা বিরোধী দলের সাথে মিইলা কাজ করব সেইটাও আমাদের মধ্যে হাসির উদ্রেক ঘটায়। কেননা আমাদের দেশের রাজনীতির পটভূমিতে সরকারি দল, বিরোধী দলের একলগে কাজ করবার বিষয়টা স্বপ্নের মতোই। এক্ষেত্রে বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া কিরকম হইতে পারে তা একটা সিনেমার ডায়ালগের হেল্প নিয়া ৩নং মিমে দেখানো হইছে। এখানে ঘটনার রিডিকুলনেস আমাদের জানার মধ্যে, বেশিকিছু জানবার দরকার পড়ে নাই। এটাও সত্য, সবার কাছে এই মিম গ্রহণযোগ্যতা পায় নাই। যারা একটু শহুরে, উঠতি প্রজন্মের, শিক্ষিত, ইয়াং এদের কাছেই মিমগুলো ব্যাপক জনপ্রিয় হইয়া উঠতে পারছে। আবার আন্দোলনের সময়কার মিমগুলোর কথা ভাবি। সবাই আন্দোলনগুলাতে সক্রিয় ভূমিকা নেন নাই।

এই হাসাহাসি আবার অন্যকিছুও প্রমাণ করে। রেইলীর মতে, মিম শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানরেই স্যাটায়ারাইজ করে না বরং নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলাও তুইলা আনে।5 যেমন, নির্বাচনের সময়কালে ভাইরাল হওয়া মিমগুলা থেকে বুঝা যাইতে পারে দেশে বর্তমানে চলা রাজনৈতিক হিসাবনিকাশের রূপ এবং কিছু কিছু মিমের মাধ্যমে– ক্ষমতাসীন মানুষগুলোর হাস্যকর স্বরূপ। স্রেফ বিনোদনের পাশাপাশি নাগরিক ইস্যু, রাজনৈতিক ইস্যুতে সিভিক পিপল যুক্ত হইয়া যাইতে থাকে অগোচরেই, দ্রুত মিম এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে। জনমত তৈরীতে তাই মিম ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু, ব্যবহারকারীদের উপর বড় আকারের কোন রাজনৈতিক আদর্শের প্রভাব ফেলার ক্ষেত্রে মিমের লিমিটেশন আছে। তবে এর ইউজফুলনেস কুলকার্ণির মতে প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মতামত তৈরীতে।6

ভাসিলিকি প্লেভ্রিতি তাঁর গবেষণাপত্রে দেখাইছেন কেন মানুষজন মিম বানায়। তিনি একটা অনলাইন ফোকাস গ্রুপে এগারজন অংশগ্রহণকারীর সাহায্যে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এই গবেষণায় তিনি ব্যবহার করছিলেন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে তৈরী করা কিছু মিম। পরপর তিনটা ফ্যাক্টর মিম তৈরীতে ভূমিকা রাখে বলে তিনি পরে সিদ্ধান্তে আসেন। প্রথমত, ব্যক্তি নিজের পার্সোনালিটি ও নিজেরে এ্যাকচুয়ালাইজ (মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলোর মতে, ব্যক্তি নিজেরে এ্যাকচুয়ালাইজ করতে চায় নিজের প্রতিভা বা প্রকাশ বা আলাদা আইডেন্টিটি তৈরীর মাধ্যমে) করতে মিম বানাইতে ড্রাইভড হয়। প্রত্যেকটা মিম যেমন এর ক্রিয়েটরের মতামত প্রদর্শন করে তেমনি এর মাধ্যমে ক্রিয়েটরের এক ধরণের আত্মতৃপ্তি বা সেলফ স্যাটিসফেকশন কাজ করে। কেননা সে কোনকিছুর মাধ্যমে নিজেরে ‘কোনকিছু’ বানাইতেছে বা নিজের গুরুত্ব নিজের কাছে তৈরী করতেছে। মিম এইভাবে ব্যক্তির পরিচয় (Individual Identity) তৈরী কইরা দেয়। দ্বিতীয়ত, একজন ব্যক্তির চোখে যেইটা অনৈতিক, অপরাধ বা সোজা কথায় যেইটা ঠিক না সেইটা প্রকাশ করার ইচ্ছা মিমমেকারের মিম বানাইতে ভূমিকা রাখে। তার মোরাল পজিশন তারে এইখানে একজন সক্রিয় অংশগ্রহনকারী হিসেবে তৈরী কইরা দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যারা মিম বানাইলো তারাই বেশি নিষ্ক্রিয়; এইটা নিয়া তাদের চিন্তাভাবনা নাই। কিন্তু, এইটারে নিয়া পরবর্তী যে কাজ– দ্রুত ছড়াইয়া দেওয়া, রিএ্যাক্ট বা শেয়ার যারা কইরা থাকেন তাদের এ্যাক্টিভিটি বেশি। অর্থাৎ মিমের এক্সচেঞ্জে একটা মিশ্র অবস্থার ছাপ দেখা যায়। মিম যারা বানায় তাদের বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে এই অবস্থা সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে কথা বলার একটা প্লাটফর্ম যেমন নিজেদের মধ্যে তৈরী হইতে পারে তেমনি নিজেদের সামাজিক পরিচয় বা আইডেন্টিটিও এইখানে সৃষ্টি হয়। নৈতিক অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি একই নৈতিক অবস্থানে থাকা অন্যান্য মানুষের সাথে যুক্ত হবার বাসনা মিম বানানোর পিছে পাওয়া যায়। কেবল আনন্দ, বিনোদন বা একে অপরের সাথে যুক্ত হবার যে নিড বা স্রেফ সামাজিকতার তাগিদে মানুষজন মিমের মাধ্যমে একে অপরের কাছাকাছি আসতে পারে। শিফম্যান এরে দেখছেন অংশগ্রহণের সোশ্যাল লজিক হিসেবে।7

সবশেষে ভাসিলিকি উল্লেখ করছেন, মানুষজন মিমের প্রতি আকৃষ্ট হয় কেবলই বিনোদনের স্বার্থে।

দৈনন্দিন জীবনযাপনের একঘেয়েমি, দুঃখ, দুর্দশা থেকে প্রশান্তির খোঁজে মিম ইউজারের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। অবশ্য মিমমেকাররা এইটাও বিশ্বাস করেন, মিম রাজনৈতিক মতামতে জনগণরে সম্পৃক্ত করতে পারে বা এর একটা নাগরিক গুরুত্ব আছে কিন্তু দিনশেষে তারা এর প্রতি আকৃষ্ট হন এন্টারটেইনমেন্টের রিলিফের জন্যে। এক অর্থে এই দর্শকরা এসকেপিস্ট, যারা দৈনন্দিন মিডিওকৌর জীবনযাপন থেইকা পালাইতে চান, রাজনৈতিক হল্লা থেকে শান্তি খুঁজেন রসের মিমের মাঝখানে।

কোন মিমে তাঁরা রিএ্যাক্ট করেন, শেয়ার করেন দ্রুতগতিতে ছড়াইয়া দেন অন্যান্যদের মাঝে এবং এর সাথে সাথে মিম ক্রিয়েটরও উৎসাহ পান নতুন মিম বানাইতে। মিম বানানেওয়ালা এবং খাওয়ার দর্শক, পরস্পরের সমন্বিত এই মিক্সড কার্যকলাপের মধ্য দিয়া মিমের সাইক্লিক ইঞ্জিন আরও বেশি গতি পাইতে থাকে।8

শেষের মনস্তাত্ত্বিক কারণের দিকে একটু নজর দিলে কাম্যুর এ্যাবসার্ডিজমরে আমরা এইখানে খুঁইজা পাই। আমরা সিসিফাসের মিথরে এইখানে আবিষ্কার করি। সিসিফাস, গ্রিক মিথ থেকে উইঠা আসা, দেবতাদের মাঝে জাগনা থাকা এক সর্বহারা, ক্ষমতাহীন কিন্তু বিদ্রোহী চরিত্র। কাম্যুর কাছে সিসিফাস হইতেছেন এ্যাবসার্ড নায়ক। সিসিফাস মৃত্যুকে শেকলে বন্দী কইরা রাখছিলো। প্লুটো যুদ্ধের দেবতার সাহায্য নিয়া মৃত্যুকে আবার শেকল থেইকা মুক্ত করেন এবং শাস্তিস্বরূপ সিসিফাসকে দেবতারা শাস্তি দেন- অনন্তকাল বিশাল একটা পাথররে পাহাড়ে গড়ায়ে চূড়ায় নিয়া গিয়া ফ্যালায় দিয়া আবার সেইটারে গড়ায়ে চূড়ায় নিয়া গিয়া ফ্যালায় দিয়া আবার সেইটারে– এই চক্রের মধ্যে আটকায় রাইখা। সিসিফাস পাহাড়ের উপরে নিয়া যাইতে থাকে একটা বিশাল পাথর, সাথে থাকে তার দেবতাদের প্রতি শ্লেষ, মৃত্যুর প্রতি বিদ্রুপ এবং জীবনের প্রতি প্যাশন। সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছাইয়া গেলে তাকে পাথরটা ফ্যালায় দিতে হয়, সেইটা নিচে গিয়া পড়ে। এই মুহূর্তে সিসিফাস তার ভাগ্যের এ্যাবসার্ডনেস নিয়া সচেতন হয়। সে দেখতে পায়, তার এই বয়ে নেওয়া বা গড়ায়ে দেওয়ার কোন শেষ নাই কিন্তু এই এ্যাবসার্ডিটির পরেও প্যাশন বা বিদ্রোহ তাকে আবার পাথরে হাত দিতে উদ্বুদ্ধ করে। সবকিছুর প্রতি একটা বিদ্রুপ জারি রাইখা আবার তারে আবার ফিরে আসতে হয় পাথরের কাছে। গড়ায়ে নিয়া যাইতে হয় পাহাড়ের চূড়ায়। এই চক্র থেকে বের হইয়া আসবার কোন উপায় নাই। কিন্তু সিসিফাস এই চক্ররে অস্বীকারও করে না। বরং চক্ররে মাইনা চক্রের মধ্যে আমরা আবিষ্কার করি বিদ্রোহী সিসিফাসরে যে সুখী এবং পরাজিত না নিজের কাছে। বরং প্যাশন নিয়া বারবার এই এ্যাবসার্ড চক্রের মধ্যে চলমান থাকে।9

আমরা, সাধারণ জনগণ, জীবনের এইরকম একটা এ্যাবসার্ড চক্রে আটকায় আছি। রাজনৈতিক শাসন, সামাজিক শাসন, পারিবারিক শাসন আমাদের ঘিরে রাখছে। এর মধ্যেই আমরা আবর্তিত হইতে থাকি। প্রতিদিন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাইতে হয়, মানুষের সাথে কথা বলতে হয়, ক্লাস করতে হয়, পরীক্ষা দিতে হয়, অফিসে যাইতে হয়, চাকরি করতে হয় এবং ঘরে ফিরা আসতে হয়। প্রতি মেয়াদে নতুন সরকার আসে, আমাদের ভোট চুরি হয়, করের বোঝা চাপানো হয়, রাজনৈতিক অপরাধ পরিচালিত হয়। মানুষ গুম হয়, খুন হয়, ধর্ষিত হয় কিন্তু বিচার হয় না৷ উকিলদের চেম্বারে অসমাপ্ত ফাইল স্তুপ হইয়া পইড়া থাকে৷ এই নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতিতে আমাদের আর কিছুই করার থাকে না কেবল মাইনা নেওয়া ছাড়া। তখন আমরা একঘেয়েমি থেইকা পরিত্রাণের উপায় খুঁজি। কেউ কেউ এইসবের প্রতিবাদ করতে গিয়া তৈরী করে মিম যেইটা একইসাথে রাজনৈতিকভাবে কম ক্ষতিকর অন্যদিকে বিনোদনমূলক। চরম বিপদেও আমরা মাঝে মাঝে হাইসা দিই। সেই হাসি নৈরাশ্যের হাসি না সবসময়, সেই হাসিতে খানিকটা শান্তি থাকে, রিলিফ থাকে, বন্দিত্বের অসহায়ত্ব থাকে। কিন্তু একই সাথে এই হাসি সিসিফাসেরও।

 

সিসিফাসও বিদ্রুপের হাসি হাইসা গড়ানোর জন্যে হাত বাড়ায়ে দেয় পাথরের দিকে। আমরা চোখ বাড়ায়ে দিই মিমের দিকে। মিম এইভাবেই এক সিসিফাসিয়ান পরিস্থিতিতে তরুণ জেনারেশনরে কিছু করবার অনুপ্রেরণা দেয়। যার কোন অর্থ থাইকাও কোন অর্থ নাই। যেইটা একই সাথে তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুইলা ধরে এবং জীবনের একঘেয়েমিতার প্রতিবাদরে হাইলাইট করে। এইটা একইসাথে সামাজিক শক্তি তৈরী করে এবং বলাই বাহুল্য রাজনৈতিক অবস্থানও।

মিম জেনারেশন বর্তমানে শক্তিশালী একটা জেনারেশন। এই জেনারেশনের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হইলে এই সময়কার মিমগুলা বুঝতে হইব। হইতে পারে মিম আমাদের কাছে তেমন কোন সিরিয়াস অর্থ প্রস্তাব করে না। আবার মিম কোন সিরিয়াস অর্থ প্রস্তাব করলেও এর আসলে কোন অর্থ নাই। মিমের এই সিরিয়াসনেস না থাকাটা আসলে এই জেনারেশনেরই সিরিয়াসনেস না থাকা। এইটা যে খারাপ তা বলা হইতেছে না৷ বরং এই অবস্থা সিসিফাসিয়ান অবস্থা৷ এই অবস্থা রাজনৈতিক বন্দিত্বের ও সামাজিক অসহায়ত্বের বহিঃপ্রকাশ। আবার এইটাও যে খারাপ তাও বলা হইতেছে না। কেননা আমরা দেখতেছি এই অসহায়ত্ব, বন্দিত্ব আলাদা রাজনৈতিক ঐক্য, মতামত তৈরী কইরা দিতে পারে। যা আদতে মিম জেনারেশনেরই এ্যাবসার্ড বিদ্রোহ।


তথ্যসূত্র:

  1. Dawkins, Richard. The Selfish Gene. Oxford University Press, 1989.
  2. Schutz, Charles E. Political Humour: From Aristophanes to Sam Ervin. Fairleigh Dickinson University Press, 1977.
  3. Silva, Patricia Dias da, and Jose Luis Garcia. “YouTubers as Satirists.” eJournal of eDemocracy and Open Government, 2012.
  4. Weng, L., A. Flammini, A. Vespignani, and F. Menczer. “Competition among memes in a world with limited attention.” Scientific Reports, 2012.
  5. Reilly, Ian. Satirical Fake News and/as American Political Discourse. The Journal of American Culture, 2012.
  6. Kulkarni, Dr. Anushka. “Internet meme and Political Discourse: A study on the impact of internet meme as a tool in communicating political satire.” Journal of Content, Community & Communication 6, no. 3 (June 2017).
  7. Shifman, Limor. Memes in Digital Culture. MIT Press, 2014.
  8. Plevriti, Vasiliki. Satirical User-Generated Memes as an Effective Source of Political Criticism, Extending Debate and Enhancing Civic Engagement. MA Thesis, Centre for Cultural and Media Policy Studies, The University of Warwick, 2013/14.
  9. Camus, Albert, and Justin O’Brien. The Myth of Sisyphus, and Other Essays: Translated from the French by Justin O’Brien. Vintage Books, 1955.

 

* মিমগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে eআরকি’র ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক পেইজ থেকে)

তৌকির হোসেন
তৌকির হোসেন

লেখক, গল্পকার। দর্শন আর রাজনীতির মধ্যে থাকেন। বই পড়েন, সিনেমা দেখেন এবং আড্ডাবাজি করেন।

No Comments Yet

Comments are closed

error: