fbpx

শহীদুল জহির-এর অনুবাদে বোর্হেসের গল্প

[ অনেক লেখকই লেখকজীবনের শুরুর দিকে হাত মকশো করতে অনুবাদ করেন। বিশ্বসাহিত্যে অনেক নজির পাওয়া যাবে। হেমিংওয়ে, হারুকি মুরাকামি, লিডিয়া ডেভিস কিংবা শাহাদুজ্জামানরা নিজেদের মৌলিক লেখার আগে অনুবাদই করছেন। এই লেখাটি ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য কারণ বিশ্বসাহিত্যের কিংবদন্তীর বোর্হেসের গল্প অনুবাদ করেছেন শহীদুল জহির । অনুবাদক হিসেবে তিনি হয়তো বিশ্বমানের নন, তিনি অনুবাদক হতেও চাননি, কিন্ত বাংলাসাহিত্যের পাঠকদের জন্যে গল্পটি বিশেষ কিছু … ~সম্পাদক ]

 

অযোগ্য বন্ধু

মূলঃ হোর্হে লুই বোর্হেস

ভাষান্তরঃ শহীদুল জহির


 

শহরটি সম্পর্কে আমাদের মানসচিত্র সর্বদাই কিছুটা পশ্চাৎমুখী। কফি দোকানগুলো অবক্ষয়িত হয়ে নারে পরিণত হয়েছে। ভেতরে গ্রিলের দরজাসহ পুরোনো খিলানযুক্ত প্রবেশপথগুলো,  যেগুলোর ভেতর দিয়ে একদা বাড়ির অভ্যন্তরের চত্বর এবং আঙুর ঝোপ চোখে পড়ত; এখন অপরিচ্ছন্ন করিডরে পরিণত হয়েছে। যার সংক্ষিপ্ত সংক্ষিপ্ত প্রান্ত এলিভেটরে গিয়ে ঠেকেছে, কয়েক বছর থেকে আমি, এভাবে, ভেবেছি যে তাকাহুয়ানো সড়কের কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আমি হয়তো এখনও বুয়েনস এইরেস বুক স্টোর নামক দোকানটি খুঁজে পাব। কিন্তু এক সকালে আমি আবিষ্কার করি যে, বই-এর দোকানের মালিক ডন সান্তিয়াগো ফিশবিয়ান মারা গেছেন। ফিশবিয়ান ছিল একজন শক্ত-সমর্থ, কিছুটা স্থূলকায়, লোক। তার সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলাপচারিতার বিষয়সমূহের চেয়ে তার আকার-আকৃতি সম্পর্কে এখন আমার কমই মনে পড়ে। নীরবে অথচ দৃঢ়ভাবে সে ইহুদিবাদের বিরোধিতা করত। সে মনে করতো এর ফলে ইহুদিরা পরিণত হবে যে কারো মতো একজন সাধারণ মানুষ, যে একটি মাত্র ঐতিহ্য এওবং বাসভূমিতে আবদ্ধ এবং যে দ্বন্দ্ব জটিলতার দ্বারা আর সমৃদ্ধ নয়। সে আমাকে একবার বলেছিল যে, সে বারুশ স্পিনোজার প্রবন্ধের একটি বিস্তারিত সংকলন করছে।

 

ইউক্লিডিয় কলকব্জা থেকে যা মুক্ত। ফিশবিয়ান আমার কাছে রোজেনরোথের কাব্বালা দেনুদাতার একটি বিরল কপি বিক্রি করতে চায়নি। যদিও সে আমাকে সেটা দেখতে দিয়েছিল। এ সত্ত্বেও ঘরে আমার কাছে কাব্বালা বিষয়ে গিনসবার্গ এবং ওয়েটের লেখা কিছু পুস্তক আছে, যার ওপরে রয়েছে ফিশবিয়ানের দোকানের সিলমোহর।

 

একদিন বিকেল বেলায়, যখন আমরা দুজনে একা ছিলাম, সে আমাকে বিশ্বাস করে তার প্রথম জীবনের একটি গল্প বলেছিল এবং আমি অনুভব করি যে, আমি এখন সেটা লিখে ফেলতে পারি। সংগত কারণেই আমি দু-একটি বর্ণনা বদলে দিয়েছি। ফিশবিয়ান যা বলেছিলেন তা হচ্ছে এই।

 

 

আমি আপনাকে কিছু বলব, যা এর আগে অন্য কাউকে বলিনি। আমার স্ত্রী, আনা, এ সম্পর্কে একবর্ণও জানে না। আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুরাও না। এই ব্যাপারগুলো এত আগে ঘটেছিল যে, এখন কখনো কখনো আমার মনে হয়; এগুলো হয়তো অন্য কারো জীবনে ঘটেছিল। আপনি যদি হয়তো এটাকে  কিঞ্চিৎ ব্যবহার করতে পারবেন গল্পে – অবশ্য এই গল্প আমাকে বিভিন্ন সূত্রের অথ্যের আলোকে নির্মাণ করে নিতে হবে। আমার মনে নেই আমি ইতিমধ্যেই বলেছি কি না যে, আমরা ইহুদি পশুপালক ছিলাম। আসলে কখনোই কোনো ইহুদি গোশো ছিল না। আমরা ছিলাম দোকানদার ও কৃষক। যাহোক, আমার জন্ম হ্যেছিল উরদিনারেনে। এই শহরটিকে আমার আর খুব বেশি মনে নেই। আমার বাবা-মা যখন বুয়েনস এইরেসে চলে আশে দোকান খোলার জন্য, তখম আমি খুবই ছোট ছিলাম। আমরা যেখানে বাস করতাম, তার কিছুটা দূরে ছিল মালদোনাদো জলা। সেই নিচু জলার পর ছিল খোলা জায়গা।

 

কার্লাইল বলেছিল যে, উপাসনা করার জন্য মানুষের বীরের প্রয়োজন হয়। আর্জেন্টিনীয় স্কুলের পাঠ্যপুস্তক চেষ্টা করেছিল যাতে আমি সান মার্টিনকে পূজা করি। কিন্তু তার ভেতর আমি একজন সৈনিকের চেয়ে বেশি কিছু দেখতে পাইনি। যে অন্য দেশে তার যুদ্ধ লড়েছিল এবং এখন, যে কেবলমাত্র একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি এবং একটি স্কোয়ারের নাম। তবে, আমাদের দুজনেরই দুর্ভাগ্যক্রমে, দৈব অবশ্য আমাকে অন্য কে ধরণের বীর, প্রদান করেছিল। সম্ভবত এবারই আপনি তার নাম শুনবেন– তার নাম ছিল ফ্রান্সিসকে ফেরারি।

 

আমাদের মহল্লা, গুদাম এলাকা কিংবা বন্দর এলাকার মতো বাজে না হলেও এখানেও মাস্তান ছিল। তারা পুরোনো কফিখানায় আড্ডা জমাত। ত্রিউনভিরাতো এবং থেমস-এর কোনার একটি স্থান ছিল ফেরারির আড্ডার নির্দিষ্ট জায়গা। এখানেই ব্যাপারটি ঘটে, যা আমাকে তার মোহে নিমজ্জিত করে। একটি জিনিস কেনার জন্য আমি কফিখনায় গিয়েছিলাম। তখন লম্বা-চুল এবং গোঁফওয়ালা এক পরিচিত লোক এসে জিনের অর্ডার দেয়। ফেরারি তাকে মৃদুভাবে বলে, ‘আচ্ছা, গতকালের আগের রাতে জুলিয়ানাদের বাড়তে নাচের আসরে কি আমাদের পরিচয় হয়নি? তোমার বাড়ি কোথায়?’

 

‘আমি আসছি সান ক্রিস্টোবাল থেকে,’ অন্য লোকটি বলে।

 

‘আমার উপদেশ হচ্ছে এই যে,’ ফেরারি পুনরায় মৃদু স্বরে বলে, ‘এখান থেকে সরে থাকাটা তোমার জন্য স্বাস্থ্যপ্রদ হবে। এই মহল্লা এমন সব লোকে পূর্ণ, যারা ঝামেলা খুঁজে বেড়াচ্ছে।’

সেই মুহূর্তে সান ক্রিস্টোবালের লোকটি, তার লেক, গোঁফ এবং সবকিছু নামিয়ে সরে পড়ে। হয়তো তার ফেরারির মতোই পৌরুষ ছিল, কিন্তু সে জানত যে মাস্তান দলের অন্যরা কাছেই আছে।

 

সেই বিকেলের পর থেকে ফ্রান্সিসকো ফেরারি এই বীর হয়ে ওঠে, যাকে আমার ১৫ বছরের জীবন, খুঁজছিল। সে দেখতে ছিল জমকালো এবং উঁচু-লম্বা– তখনকার ধারণানুযায়ী সুদর্শন। সে সব সময় কালো পোশাক পরত। একদিন, দ্বিতীয় এক ঘটনা আমাদের নিকটে নিয়ে আসে। আমার মা এবং খালার সঙ্গে আমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আমরা একদল অল্পবয়স্ক মাস্তানের মুখোমুখি হয়ে পড়ি। এদের একজন উঁচু স্বরে অন্যদের বলে, ‘বুড়ো মাল, এদের যেতে দে।’

Library of Babel, Erik Desmazières

আমি বুঝতে পারলাম না কী করা যায়। সেই মুহূর্তে ফেরারি এসে হাজির হয়। বুঝতে পারা যায় যে, এইমাত্র তার বাসা থেকে এল। সে মাস্তানদের সর্দারের চোখের দিকে সরাসরি তাকায় এবং বলে, ‘তোমরা যদি ফুর্তি করতে বেরিয়ে থাকো, তবে আমার সঙ্গে কিছুটা করার চেষ্টা কোরো না কেন?’

 

সে একজন একজন করে তাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত তার দৃষ্টি বোলাতে থাকে এবং তাদের কারো কাছ থেকে একটি বাক্যও শোনা যায় না। তারা তার সম্পর্কে সবকিছু জানত। ফেরারি তখন তার কাঁধটা একটু ঝাঁকায়, হ্যাটটা টেনে দেয় এবং তার নিজের পথে চলে যায়। কিন্তু চলে যাওয়ার আগে সে আমাকে বলে, ‘তোমার যদি কাজ না থাকে তাহলে কফিখানায় পরে একবার এসো।’

 

আমি কিছু বলতে পারি না। ‘এখানে এই একজন ভদ্রলোক, যে দাবি করে মহিলাদের জন্য সম্মান।’ আমার সারাহ খালা বলে।

 

আমাকে বাঁচিয়ে দিয়ে আমার মা বলে, ‘আমি বরং বলব যে, সে একজন গুন্ডা, যে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা চায় না।’

 

আমি আসলে জানি না, এটাকে এখন কীভাবে ব্যাখ্যা করব। আমি কাজ করে উপরে উঠছি। আমি এই দোকানটার মালিক, যেটাকে আমি ভালোবাসি এবং আমি আমার বইগুলো সম্পর্কে জানি। আমাদের মতো এই বন্ধুত্ব আমি উপভোগ করি। আমার স্ত্রী এবং বাচ্চাকাচ্চা রয়েছে। আমি সোশালিস্ট পার্টির সদস্য। আমি একজন ভালো আর্জেন্টাইন এবং একজন ভালো ইহুদি। এখন মানুষ আমার দিকে প্রত্যাশা নিয়ে তাকায়। আপনি যেমন দেখতে পাচ্ছেন, আমার পুরো মাথায় টাক পড়ে গেছে। কিন্তু তখনকার দিনে আমি কেবলমাত্র ছিলাম দরিদ্র পাড়ায় বসবাসকারী লালচুলো এক দরিদ্র ইহুদি বালক। সব তরুণের মতো আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলাম অন্য সবার মতো সাধারণ হওয়ার জন্য। তবু আমাকে বিদ্রূপ করা হতো। আমার নামের জ্যাকব অংশ ছেঁটে দিয়ে আমি নিজেকে সান্তিয়াগো বানাই। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি, কারণ, আমার নামের ফিশবিয়ান অংশ তা ছিল। অন্যরা আমাদের সম্পর্কে যা মনে করে আমরা সকলে তা গ্রহণ করতে শুরু করেছিলাম। লোকে আমাকে ঘৃণা করে বুঝতে পেরে আমি নিজেও নিজেকে ঘৃণা করতাম। সে সময় এবং সেই মহল্লায় আপনাকে শক্ত-সমর্থ হতেই হতো। আমি জানতাম যে আমি ভীরু ছিলাম। মহিলাদের সম্পর্কে আমার ভীতি দিনের আলো নিভিয়ে দিত। তাদের ব্যাপারে আমার অনভিজ্ঞতার জন্য আমি গভীরভাবে লজ্জিত ছিলাম এবংআমার কোনো সমবয়স্ক বন্ধু ছিল না।

 

সে রাতে আমি কখিখানায় গেলাম না। এখন আমি ভাবি, আমি যদি কোনো দিনই না যেতাম। কিন্তু আমার ভেতর এ রকম একটা অনুভূতি হয়েছিল যে, ফেরারির এই আমন্ত্রণের ভেতর একধরণের হুকুম ছিল। কাজেই পরের শনিবারে, নৈশাহারের পর আমি শেষ পর্যন্ত সেখানে গিয়ে হাজির হই।

 

ফেরারি একটি টেবিলের মাথার দিকে বসেছিল। অন্য লোকগুলোকেও আমি চেহারায় চিনতাম। তারা সংখ্যায় ছিল ছয় অথবা সাত জন। অন্য একজন বয়স্ক লোক ছাড়া ফেরারি ছিল সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ। বয়স্ক লোকটি খুব ক্লান্ত স্বরে কথা বলছিল। এই বয়স্ক লোকটির নামটি কেবলমাত্র আমি ভুলিনি– ডন এলিসিও আমারো। তার চওড়া, মাংসল মুখের উপর আড়াআড়িভাবে ছিল একটি কাটা দাগ। পরে আমি জেনেছিলাম যে, সে কিছুটা সময় জেলে ছিল।

 

ফেরারি, ডন এলিসিওকে উঠিয়ে আমাকে তার বাঁ দিকে বসায়। আমার একটু অস্বস্তি হয়। ভয় হয় যে, ফেরারি হয়তো কয়েক দিন আগে রাস্তার উপর যা ঘটেছিল তা সবাইকে বলবে; কিন্তু সে তা করে না। তারা মেয়েমানুষ, তাস, নির্বাচন, এক রাস্তার গায়ক এবং মহল্লার বিষয়াবলি সম্পর্কে কথা বলে। প্রথমে মনে হয় যেন তারা আমাকে গ্রহণ করতে চায় না। কিনতি পরে তারা সহজ হয়, কারণ ফেরারি তাই চাইছিল। তাদের অধিকাংশের নাম ছিল ইতালীয়। কিন্তু তাদের নাম যা-ই হোক না কেন তারা প্রত্যেকে নিজেকে এবং অন্যদের আর্জেন্টিনীয় মনে করত। এমনকি তারা নিজেদেরকে গোশো বলে মনে করত। গবাদিপশু নিয়ে কাজ করায় তারা কৃষিশ্রমিকের মতো হয়ে উঠেছিল। এদের সম্পর্কে আমার ধারণা এই যে, এদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল জুয়ান মোরিয়েবার মতো দস্যু হয়ে ওঠা। তারা আমাকে ‘চকচকে’ বলে ডাকতে শুরু করল, অবশ্য তারা এটা খারাপ অর্থে বলত না। এদের কাছ থেকেই আমি ধূমপান এবং অন্যান্য কর্ম করতে শিখি।

 

জুনিন সড়কের এক পতিতালয়ে একদিন কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে যে, আমি ফ্রান্সিসকো ফেরারির বন্ধু কি না। আমি তাকে বলেছিলাম যে, আমি তার বন্ধু নই। আসলে আমার মনে হয়েছিল যে, ‘হ্যাঁ’ বলাটা খুব গর্ব দেখানোর মতো হবে।

 

এক রাতে পুলিশ এসে আমাদের ধরে। গ্যাংয়ের দুজনকে হাজতে নিয়ে যায়। কিন্তু ফেরারিকে তারা কিছু করে না। কয়েক সপ্তাহ পরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। কিন্তু এই দ্বিতীয়বার তারা ফেরারিকে পাকড়াও করে, সে তার বেল্টের নিচে একটি চাকু গুঁজে রেখেছিল। যা ঘটেছিল তাতে মনে হয় যে, আমাদের এলাকার রাজনৈতিক সর্দারের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল।

 

এখন যখন আমি ফেরারির দিকে তাকাই, তাকে আমি অলীক কল্পনায় পূর্ণ একজন ভাগ্যহত যুবক রূপে দেখতে পাই, যে পরিণতিতে হয়েছিল প্রতারিত। কিন্তু সে সময় আমার কাছে সে ছিল একজন ঈশ্বরের মতো।

 

বন্ধুত্ব, প্রেমের চেয়ে অথবা যে বিভ্রান্তিকে আমরা বলি জীবন, তার অন্য কোনো দিকের চেয়ে কম রহস্যপূর্ণ নয়। একসময় ছিল যখন আমার মনে হয়েছে যে, রহস্যাবৃত নয় এমন একটি মাত্র জিনিস আছে, তা হচ্ছে সুখ। কারণ, সুখ নিজেই একটি পরিণতি। বেদনাদায়ক সত্য হচ্ছে এই যে, শক্ত-লোক ফেরারি, তার সব সামর্থ্য সত্ত্বেও আমার মতো অপদার্থ একজনের বন্ধু হতে চেয়েছিল। এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, সে ভুল করেছিল। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, আমি তার বন্ধুত্বের অযোগ্য ছিলাম। তার কাছ থেকে সরে থাকার জন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে আমাকে সরে থাকতে দেয়নি। বিষয়টি সম্পর্কে আমার মায়ের বিরোধিতা, এ বিষয়ে আমার সংকট বৃদ্ধি করে। আমার সঙ্গীদের আমার মা কিছুতেই গ্রহণ করতে পারেনি। সে এ নিয়ে অভিযোগ করে বেড়াত এবং আমার সঙ্গীদের বলত ফালতু ও আবর্জনা। আপনাকে এসব কথা বলার উদ্দেশে, যে নোংরা ঘটনা ঘটে এবং যার সম্পর্কে আমার কোনো অনুশোচনা নেই, তা শোনানো নয়। বরং এর কারণ হচ্ছে ফেরারির সঙ্গে আমার সম্পর্কের বিষয়টি বোঝানো। যতক্ষণ অপরাধবোধও থেকে যায়।

 

একদিন রাতে বয়স্ক লোকটি, যে যথানিয়মে ফেরারির পাশের আসনটিতে বসেছিল, ফেরারির কানের কাছে ফিসফিস করে কথা বলছিল। তারা কোনো বিষয়ে পরিকল্পনা করছিল। টেবিলের অন্য প্রান্ত থেকে আমার মনে হয়েছিল যে, আমি একজন লোকের নাম বুঝতে পারছি। লোকটি হচ্ছে, উইডমান, মহল্লার এক প্রান্তে যার একটি কাপড়ের কল আছে। একটু পরে, কোনো প্রকারের ব্যাখ্যা ছাড়াই আমাকে বলা হলো উইডমানের মিলের কাছ দিয়ে হেঁটে মিলের ফটকগুলো ভালো করে দেখে আসতে। আমার বাড়িগুলোর কথা মনে পড়ে। উইলো গাছের ঝোপ আর খালি জায়গার মাঝে মাঝে বাড়িগুলোর সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছিল। উইডমানের বাসাটি ছিল নতুন। কিন্তু এটা ছিল বিচ্ছিন্ন এবং কেমন যেন ধ্বংসস্তূপের মতো দেখতে। আমার স্মৃতিতে এখন এর লাল ইট গোধূলির সূর্যাস্তের রঙের সঙ্গে গুলিয়ে যায় কাপড়ের মিলটির চারদিকে উঁচু বেড়া দিয়ে ঘেরা ছিল। সম্মুকের প্রবেশপথ ছাড়া দুটো দরজা ছিল পেছনের দিকে, যেগুলো দিয়ে ভবনের দক্ষিণ পাশে ঢোকা যেত।

 

আমি স্বীকার করছি যে, বিষয়টি সম্পর্কে বুঝে উঠতে কিছুটা সময় লেগেছিল; যে বিষয়টি হয়তো আপনি ইতিমধ্যেই অনুমান করতে পারছেন। আমি ফিরে এসে আমার রিপোর্ট প্রদান করি। আমার দেয়া খবর অন্যদের একজন, যার বোন এই জায়গায় কাজ করত, সমর্থন করে। তখন, তারপর পূর্ণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। কফিখানায় শনিবারে আমরা উপস্থিত না থাকলে লোকেদের সন্দেহের সৃষ্টি হবে, তাই ফেরারি পরবর্তী শুক্রবারে ডাকাতির দিন ধার্য করে। আমাকে তারা সঙ্গে নেয় চোখ রাখার জন্য। ইতিমধ্যে আমাদের বলা হয়, যাতে আমাদের একসঙ্গে দেখা না যায়। তারপর যখন ফেরারি আর আমি রাস্তায় একাকী হাঁটছি তখন তাকে আমি জিজ্ঞেস করি, ‘তুমি কি নিশ্চিত যে, তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারো?’

 

‘হ্যাঁ’, সে উত্তর দেয়। ‘আমি জানি তুমি একজন পুরুষের মতো ব্যবহার করবে।’

 

সে রাতে এওবং তার পরের রাতে আমি ভালোমতোই ঘুমাই। বুধবার দিন আমি আমার মাকে বলি যে, আমি শহরতলিতে যাচ্ছি একটি কাউবয় ছবি দেখার জন্য। আমি ভালো কাপড় পরে মেরিনো সড়কের উদ্দেশে বের হই। বাসে করে পৌঁছাতে আমার বেশ সময় লেগে যায়। থানায় আমাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখা হয়। অবশেষে কর্তব্যরত সার্জেন্টদের একজনের– যার নাম ছিল আলদ অথবা আলত– সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। আমি তাকে বলি যে, আমি একটি গোপনীয় বিষয়ে কথা বলার জন্য এসেছি। সে বলে যে, আমি নির্ভয়ে বলতে পারি। আমি তাকে গ্যাংয়ের পরিকল্পনার কথা বলি। আমার কাছে বিস্ময়কর লেগেছিল যে, ফেরারির নামটায় যেন তার কিছুই এসে যায় না, কিন্তু আমি যখন ডন এলিসিওর নাম বলি, তখন বিষয়টি অন্য রকম দাঁড়ায়।

 

‘অ্যা’, সে বলে, ‘ছিল পুরোনো মন্টিভিডিও গ্যাংয়ের একজন গুন্ডা।’

সে আর একজন লোককে ডেকে আনে, যে শহরের আমার এলাকায় বাস করত। তারা দুজন বিষয়টি নিয়ে আলাপ করে। এই দ্বিতীয় কর্মকর্তাটি অবজ্ঞার স্বরে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি এই খবর নিয়ে এখানে এসেছ তার কারণ কি এই যে, তুমি নিজেকে একজন ভালো নাগরিক মনে করো?’

 

‘জ্বি স্যার। আমি একজন ভালো আর্জেন্টিনীয়।’

 

তারা আমাকে, ফেরারি যেভাবে বলেছে, সেভাবে আমার কাজ করে যেতে বলে। তবে আমি যখন দেখব পুলিশ আসছে তখন আমি সিটি বাজাব না। আমি যখন চলে আসছি তখন একজন আমাকে সতর্ক করে দেয়।

 

‘সাবধানে থেকো, বেইমানদের কী হয় তা তো তুমি জানো।’

 

গাল দেয়ার সময় পুলিশরা শিশুর মতো ব্যবহার করে। আমি উত্তরে তাকে বলি যে, ‘আমি কামনা করি তারা যেন আমাকে আক্রমণ করে। সম্ভবত সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো।’ সেই শুক্রবারের সকাল থেকে এই ভেবে আমার স্বস্তি হয় যে, দিনটি অবশেষে এল। একই সঙ্গে কোনো অপরাধ বোধ না করার জন্য আমার কেমন যেন অপরাধী লাগে। সময় যেন দীর্ঘায়িত হয়ে পড়ছিল। সারাটা দিন আমি প্রায় কিছুই খেতে পারি না। সে রাতে, দশটার সময় আমরা মিল থেকে কিছুটা দূরে মিলিত হই। যখন দলের একজন শেষ পর্যন্ত অনুপস্থিত থাকে, ডন এলিসিও মন্তব্য করে যে, সব সময় কেউ না কেউ রঙ বদলায়। আমি বুঝতে পারি যে, যখন বিষয়টি শেষ হবে তখন একেই তারা দোষ দেবে।

 

মনে হচ্ছিল যেন বৃষ্টি নামবে। প্রথমে আমি ভয় পেয়েছিলাম এই ভেবে যে, পাহারা দেয়ার কাজে অন্য কাউকে হয়তো আমার সঙ্গে দেয়া হবে। কিন্তু যখন সময় এল পেছনের একটি দরজার কাছে আমাকে একা পাহারায় রাখা হলো। কিছুক্ষণ পর, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ পুলিশ এসে হাজির হয়। তারা কিছুটা দূরে তাদের ঘোড়া রেখে, পায়ে হেঁটে আসে। পেছনের দুটো দরজার একটা দিয়ে ফেরারি ভেরতে ঢুকেছিল, এই খোলা দরজা দিয়ে পুলিশ নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারপর কানে তালা লাগানো চারটি গুলির শব্দ শোনা গেল। আমার মনে হলো যে, ভেতরে সেই অন্ধকারের মধ্যে, তারা একে অন্যকে খুন করছে। তখন পুলিশ হতাকড়া পরিয়ে কয়েকজন লোককে বের করে নিয়ে এল। তারপর আরো দুজন পুলিশ বেরিয়ে এল। তারা তাদের পেছনে ফ্রান্সিসকো ফারারির এবং ডন এলিসিও আমারোও মৃতদেহ টেনে বার করে আনল। সরকারি রিপোর্টে লেখা হলো যে, তারা গ্রেপ্তারে বাঁধা দেয় এবং প্রথম গুলি চালায়। আমি জানতাম যে পুরো জিনিসটাই মিথ্যে। কারণ, দলের কাউকে আমি কখনো বন্ধুক বহন করতে দেখিনি। তাদের স্রেফ গুলি করে মারা হয়েছিল। পুলিশ এই সুযোগ ব্যবহার করে তাদের কোনো পুরোনো ক্ষোভ মিটিয়েছিল। কয়েক দিন পর আমি শুনি যে, ফেরারি পালানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু একটি মাত্র গুলি খেয়ে সে পড়ে যায়। যেমন আশা করা গিয়েছিল, সংবাদপত্রগুলো তাকে নায়ক বানিয়ে ফেলে, যা সে, শুধু আমার চোখে ছাড়া, কখনোই ছিল না।

আর আমাকে, তারা আমাকে অন্যদের সঙ্গে ধরে নিয়ে যায় এবং অল্প সময় পর ছেড়ে দেয়।

ফেইসবুক কমেন্ট

আরও দেখেন

ছাতি দিয়া আমার মাথায় অবিরাম বাড়ি দিতে থাকা লোকটা... ছাতি দিয়া আমার মাথায় অবিরাম বাড়ি দিতে থাকা একটা লোক আছে ছাতি দিয়া আমার মাথায় অবিরাম বাড়ি দিতে থাকা একটা লোক আছে। পাঁচ বছর হইলো সে আমার মাথায় ছ...
শহীদুল জহিরের ডায়েরি...     ৩০ মার্চ, ১৬ চৈত্র ১৩৮৬ সমস্যা ছিলই। শুধু আশাপানা(?) প্রতিবেশের ভিতর নয়, সমস্যা এই ঘরেও ছিল অভাব অনটন, টানাপড়েন আর কতগুলো মানবিক জটিলতা ছিল...
No Comments Yet

Comments are closed

error: