fbpx

সনি–নোকিয়া–ক্রিয়েটিভ: পর্ব – ১

#১

তখন আমি নোকিয়া ৬৩০০ চালাইতাম। ইন্টারে ভাল রেজাল্টের সুবাদে গিফট পাওয়া একটা সনি ওয়াকম্যান আর স্কলারশিপের টাকায় কেনা ক্রিয়েটিভ ১৪৫০ মডেলের একটা টুইজটুওয়ান সাউন্ড সিস্টেম ছিল। রংপুর মেডিকেলের হোস্টেলে থাকি। ক্লাস-ফ্লাস না কইরা সারাদিন বইসা থাকি রুমে। আর কী করি! বিড়ি খাই। আর! ঘুমাই। আর কী করি! না খায়া থাকি। আর! শামুক গতির নেট থিকা সারারাত গান নামাই আর শুনি। ভেতরে ভেতরে বিখ্যাত হবার স্বপ্ন তখনও ছাগলছানার মতো ছটফট করে। আমি তো এই দেশে পড়ালেখা করার লোক না! আমার পড়ালেখা করা প্রয়োজন ভিনদেশে। আমি পড়বো গবেষণা করবো সামার টামারে নিজের জমানো টাকায় ট্রান্স সাইবেরিয়ানে চইড়া বসবো যখন তখন আমার হেডফোনে ফাইটা পড়বে ক্রিড-এর what if, one last breath, lullaby, with arms wide open. অথবা ছ্যাঁকা পরবর্তী রেজারেকশানে যা সবচে বেশি বাজতো আমার ক্রিয়েটিভে মানে লিনকিন পার্ক, লিম্প বিজকিট, পি.ও.ডি (Payable on death) মানে পেছনে তাকাইলে এখন আমি বুঝতে পারি ওইসব ক্যাওটিক সময়ে আমি অল্টারনেটিভ বেশি শুনতাম। মূলত রক বা অল্টারনেটিভ শুনতে শুনতে আমি ডার্ক বা থ্রাশ মেটালে ঢুকি নাই। এইটা নিয়ে তখন আমার আক্ষেপ হয় নাই কিন্তু হইছিল তারো আগে যখন আমারে রেদওয়ান মেটালিকার ফিতা ক্যাসেট দেয়। আর আমি unforgiven, master of puppets, sanatorium, nothing else matters, enter sandman শুনতেছিলাম। আমারে আরো প্রোগ্রেসড ভাইবা ওর হেভি মেটাল শুনতে দেয়া উচিৎ ছিল তখন। যাই হোক ওই সময় মেডিকেলের আঁতেল পরিবেশে চেস্টারের স্ক্রিমিং আমারে সবার কাছে শব্দ দূষণকারীর অভিযোগে অভিযুক্ত করে।

Image result for chester bennington poster
”চেস্টার বেনিংটনরে তৎকালের বিশ্বে সেরা স্ক্রিমার এর আখ্যা দিয়া দিই”

জেদ চাইপা যায় আরো। আমি আরো বেশি বেশি বাজাইতে শুরু করি ওরে। পরে রুমমেট যেদিন Numb আর In the End এর র‍্যাপ অংশটা মুখস্ত কইরা ফালায় সেদিন ক্ষান্ত দিই আমি। চেস্টার বেনিংটনরে তৎকালের বিশ্বে সেরা স্ক্রিমার এর আখ্যা দিয়া দিই। আরো পরে মানে হাইব্রিড থিওরি, মিটিওরা এগুলা এলবামের পর মিনিটস টু মিডনাইট এর আগে আমরা জানতে পারি তার নাকি গলার শিরা টিরা কিছু একটা ছিঁড়ে গেছে।

 

হাইব্রিড থিয়োরি এলবামের একটা পোস্টার। কার্টসিঃ কেভিন লাউ

 

এই শংকাটা আমার সবসময়ই ছিল। মেডিকেলের ছাত্র হিসাবে তা হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। তো তখন চেস্টারের বিকল্প খুঁজতে গিয়া আমি পাই সিস্টেম অফ এ ডাউন। মানে সার্জ তানকিয়ানরে। Toxicity, B.Y.O.B., Lonely Day, Chop Suey, Aerials, Hypnotize, Prison Song, Radio/Video এগুলা শুইনা আমি ওরে রবীন্দ্রনাথ এর মেটাল ভার্সন আখ্যা দিই। যাই হোক এগুলা মস্তিষ্কে চাপ দিলে আমি ডেনভার, ডিলান, মার্ক্স, এডামস, ইউ টু শুনতাম রিলিফের জন্য। রবিরেও। তবে আম্মা একবার গভীরতম কোন রাতে আমারে ” মনে কি দ্বিধা..” শুনতে দেইখা বারণ করেন শুনতে, মানে রবিরে। আমিও ভাবলাম আসলেই তো ইনার গানে প্রাক্তন প্রেমিকার প্রতি ন্যায্য কোন ক্রোধ নাই, শুধু আত্মসমর্পণ। প্রচন্ড বিনাইন, তাও শুনতাম উনারে, গুণগুণও করতাম। তো ওই সময় আমি র‍্যাপ বুঝতে চাইলাম, শুরু হইলো এমিনেম শোনা।

এইখানে আসার বহু পরে এইট মাইলস দেখি আমি। মার্শাল মেদারস, সে অমানুষ। আর ওই অমানুষের প্রতি আমার টুপিটা এখনো ওড়ানোই আছে। তো এমিনেমের সূত্র ধইরা আমি যখন আরো আগাইতে শুরু করি তখন সৌরভ আমেরিকা যায়। সাথে কইরা নিয়া আসে একন রে মানে ওর কনভিক্টেড এলবামটা।

Image result for akon convict album poster art
একনের ‘কনভিক্টেড’ এলবামের পোস্টার

 

smack that all on the floor বাজানো শুরু করি আমরা একযোগে।

 

 

সেসময় একটা মজার ঘটনা ঘটতো, সৌরভের ছিল মাইক্রোল্যাব সাউন্ড বক্স। তো আমার কাছে ওইটার Bass ভাল্লাগতো মানে ধ্যাব ধ্যাব করে বেশি। আর আমার ক্রিয়েটিভের Treble ভাল্লাগতো ওর। যাই হোক একনের পর থিকা আমি ৫০ সেন্ট রে আলাদা কইরা শুনতে শুরু করি আবার। ওরে আমি আগেই দেখছিলাম এম টিভি তে in the club এর ভিডিওতে, লুকায়ে লুকায়ে সাউন্ড মিউট কইরা অন্য কিছু দেখার উদ্দেশ্যে! তো পরে জানলাম সে ছিল এক মস্ত গ্যাংস্টার। মারামারি ছাইড়া এই লাইনে আইছে। ওরে শুনলেই মনে হইতো আহারে বাল্মীকির পর আমাদের আর কেউতো এমন আকাম কুকাম ছাইড়া শিল্পে আইলো না! যাই হোক এরপর থিকা স্নুপ ডগ, টিম্বাল্যান্ড, ড. ড্রি, আশার, বাস্টা রাইমস, টি পেইন, এন এফ এস এর সূত্র ধইরা লুডাক্রিস এদের খুচরা খাচরা গানও সব সময়ই শোনা হইতো। তো এইসবের ফাঁকে ফাঁকে আমি নিজের মিউজিক টেস্ট নিয়া ভাবার চেষ্টা করতাম, তখন মনে হইতো এক্কেবারে পিচ্চিকালে আমার মামা চাচারা ক্যাসেটে আজম খান বাজাইতেন। আলাল আর দুলাল, রেললাইনের ওই বস্তিতে, অনামিকা। তো সেইগুলা আমার মাথায় ঢুইকা থাকতো সব সময়। ওরা আরো বাজাইতো জ্যাকসন, মারলে, জর্জ মাইকেল, মডার্ন টকিং, এনিগমা, ক্ল্যাপটন, লায়োনেল রিচি, এলটন জন।

এই এনিগমা তখনই আমারে গ্রাস কইরা ফেলাইছিল। তখন মিডিয়া ফিডিয়া ছিল না এতো। ওদের জিগাইয়া এনিগমা সম্বন্ধে জানতে পারি নাই তেমন। জানছিলাম আরো পরে। অবাকও হইছিলাম। ওদের আমার আধুনিক যুগের মোজার্ট মনে হয়। আর আমার মেজো চাচার ছিল গজলের সংগ্রহ। গুলাম আলি, পঙ্কজ উদাস, মেহদী হাসান, জগজিৎ সিং এগুলা বাজাইতো সে সারাদিন। এর সাথে বাজতো কুমার শানু, বাবুল সুপ্রিয় বা এদেরও আগের সব্যসাচী যারে আমি কইতাম অলরাউন্ডার কিশোর কুমারের ক্যাসেট সাথে ভূপেন হাজারিকা, মান্না দে এরা তো ছিলেনই। চাচাতো বোন মানে নীরা ফুফুর কাছে তার চিঠিগুলা ওই সময় আমিই পৌঁছাইতাম। তার উদ্বিগ্ন সময়গুলা কষ্টের মুহূর্তগুলা আমারে গজলের মাহাত্ম্য বুঝাইছিল আরো পরে নিজের প্রেমের সময়।

গান নিয়া আরেকটা মজার গল্প আছে আমার। তখন পাড়ায় একটা ক্লাব ছিল আমাদের। কিশোর সংঘ। তো বড়দাদু বাঁইচ্যা ছিল তখন। ২১’র ১২ টা থিকা কিংবা ১৬ ডিসেম্বর কিংবা ২৬ শে মার্চের ১২ টা থিকা দেশাত্মবোধক গান বাজান হইতো। সবই ঠিক থাকতো যতোক্ষণ না আইসা পড়তো “একবার যেতে দে না”। কান্না পাইতো আমার। কাঁথা বালিশে কান চাইপা রাখতাম আমি। কারা যেন এখনো বলে এই গানটা নাকি জিয়ার খুব প্রিয় ছিল। আওয়ামি লীগের সময় তাই নাকি খুব একটা বাজানো হয়না এই গান। গান নিয়াও যে এই দেশে পলিটিকস হইতে পারে তখন থিকা এর আভাস পাই আমি। তবে একটা কথা বলি তারেক মাসুদের মুক্তির গান দেখারও বহু আগে থিকা একটা ধারণা বদ্ধমুল হয় আমার ভেতর, বাংলাদেশের মতো দেশাত্মবোধক গানের এতো সমৃদ্ধ ভান্ডার আর কারো নাই।

 

#২

তো Rap থিকা আমার মনে হইতে থাকে Rock/ Metal বা Pop এর সাথে Rap এর সংমিশ্রণ কইরা কি কিছু হইতেছে কোথাও? যেমন লিনকিন পার্ক কইরা গেল বা লিম্প বিজকিট বা পি.ও.ডি মানে অল্টারনেটিভ জনরায়। তো এমন এক সময় আমি ঘটনা চক্রে ফ্লবটস এর খোঁজ পাই।

ওদের একটা গানই আমারে আউলাইয়া দেয় handlebars.  এর জাত নিয়া আমি আজো সন্দিহান। তবে  এস এস সি / ইন্টারের ওইদিকে আমি আরো পরিচিত হইতে থাকি আমাদের ব্ল্যাক, আর্টসেল, ওয়ারফেজ, জেফায়ার এইসব আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডগুলার সাথে বগুড়ায়। জনের কম্প্রেসড কিন্তু পাওয়ারফুল ভয়েজের সাথে তাহসানের একটা আপাত ক্ল্যাসিকাল টোন আমারে মুগ্ধ কইরা রাখছিল বহুকাল। আর লিংকন রে নিয়া আমার কিছু বলার নাই। যেহেতু জনরা যাই হোক শক্তপোক্ত লিরিকের সাথে মেলোডির ভক্ত আমি ছিলামই তাই তারে আমার সবচে বেশি পছন্দ হইয়া গেল এই দেশে। এসবের চিপা চাপা দিয়া আমি আরো শুনতে থাকি ফু ফাইটার্স, অডিওস্লেভ, কোল্ড প্লে, ব্রেকিং বেঞ্জামিন, মেরিলিন ম্যানশন, কর্ন, পোয়েটস অফ দ্য ফল,গডস্ম্যাক, মেরুন ফাইভ, গ্রীন ডে, স্লিপনট, শাইনডাউন, সাবমার্জড, লাইফহাউজ, ক্যাটাটোনিয়া, প্যানিক এ্যাট দ্য ডিসকো, নির্ভানা।

এইখানে নির্ভানার কথা না বললেই না। এদের সাথে আমার পরিচয় এদের ভোকাল কার্ট কোবেইন এর সুইসাইড এরও বহু পর। সৌরভের মাধ্যমে। smells like teen spirit এর ভিডিও যখন সে আমারে দেখায় তখন আমি তারে দেইখা বুঝতে পারি Rock গানের ভেতরেও নির্লিপ্তি নিয়া কেম্নে আগুন ঝরানো যায়।

ওয়েস্টার্ন মিউজিকে এরা একটা নতুন ডাইমেনশান আনছিল তাদের সময় আর সেইটা হইলো Grunge. কিন্তু পরে যখন আমি সাউন্ড গার্ডেন, অ্যালিস ইন চেইনস শুনি তখন আমি এই তিন ব্যান্ডের মিউজিকে মিল পাই। বিশেষত গীটার প্লে আর বক্তব্যে। আর জানতে পারি এরাই মূলত ৯০ এর দশকে অল্টারনেটিভ রক এর পাইওনিয়ার। 

 

#৩

যাই হোক এসবের মাঝ দিয়া একটা গল্প বইলা নিই। গানতো আমি শিখি নাই কখনো। যেইটা বারবার শুনতাম সেইটা গাইয়া ফেলতে পারতাম। লোকে বলে ভালই নাকি গাইতাম আমি। তো ওই সময় মানে মেডিকেলের এক্কেবারে প্রথমদিকে আমি হোস্টেলে না উইঠা একটা বাসায় উঠছিলাম সেইখানে পরিচয় হয় তামিম ভাইয়ের সাথে। ইনি আরেকজন অমানুষ এবং আমার যে কয়টা অন্য মায়ের গর্ভজাত ভাই আছে তাদের একজন। যদিও তামিম ভাই তা ভুইলা গেছেন মনে হয়। আগের কিস্তিতে বলা সৌরভও এইরকম ভাই। তামিম ভাইয়ের কাছে দেখলাম হিন্দি, হারানো দিনের বাংলা গানের বিশাল সংগ্রহ। মনে পড়তে থাকলো বাসায় শোনা কিশোর কুমার, ভূপেন, আর ডি, এস ডি বর্মন, কুমার শানু, লতা, আশা, এ আর রহমান কিংবা আমাদের স্কুলের সময়কার হিন্দি পপ আর পাকিস্তানি ব্যান্ডদের গানগুলা। এরপর এদিককার জেমস, হাসান মানে আর্ক, নগরবাউল, এল আর বি, মাইলস, সোলস এদের কথা। এররপর তামিম ভাইয়ের ওখান থিকা আমি আরেক বাসায় উঠি আরেক ভাই অ্যালবার্ট দার সাথে। এই লোক গিটার বাজাইতে পারতো। খাইতেও পারতো। আমি পারতাম দ্বিতীয়টা। মাসের মাঝের দিকেই আমাদের চাল ডাল শেষ হইয়া আসলে বাকিতে বিড়ি আইনা ভানুর কৌতুক, গানে গানে ভালবাসা শুইনা আর গিটারে অর্থহীন, দলছুট, মহীনের ঘোড়াগুলি, ক্যাকটাস গাইয়া দিন গুজরান করতাম আমরা। তো ওইসময় কালেভদ্রে ক্লাসে যাওয়া আসার মাঝেই সনেটের সাথে গ্যাঞ্জাম হয় আমার। এই পোলাডা আমার আরেকটা ওইরকম ভাই আরকি! যাই হোক তার আগে আমার পরিচয় হয় পরবর্তী কালে আমার দীর্ঘদিনের রুমমেট এবং ওইরকম ভাই অংকুরের সাথে। সে আবার তখনও রাজশাহী বেতারে তবলা বাজায়। আমার মতই হোস্টেলের বাইরে থাকে। আমি মাঝেমধ্যে ওর বাসায় যাই। তো একদিন সন্ধ্যায় সে আমারে তার বাসায় যাইতে বলে এই বইলা যে তারা হারমোনিয়াম টারমোনিয়াম নিয়া আসর বসাইছে,হোস্টেল থিকাও পোলাপান আসছে কিছু তাই আমি যেন যাই। গেলামও, ওরা গানটান করলো শুনলাম। আর এরপর অংকুর চাইপা ধরলো গান শুনাইতে, সেইখানে আবার কয়দিন আগেই যার সাথে ঝামেলা হইছিল সেই সনেটও উপস্থিত। আমি অর্থহীনের এপিটাফ গানটা সেইখানে গাই। শেষ করার পর সনেট আইসা আমারে চাইপা ধরে বলে বন্ধু আমার মনটা তুমি ভাল কইরা দিছো। সো এরপর তো আর শত্রুতা করতে পারি না আমি। কিন্তু আমি এখনো ভাবি এপিটাফের মতো দুখের একটা গান শুইনা ওর মন ভাল হইছিল ক্যান! হেহে life is stranger than fiction. কথাটা যেন কার। কথাটা যারই হোক শুনছি বেশি তামিম ভাইয়ের মুখে সে আবার শুনছে বেশি নাকি তার ক্যাডেট কলেজের এডজুটেন্টের মুখে। হেহে। যাই হোক এই ছিল আমার গান গাইয়া শত্রুরে বন্ধু বানাইবার একমাত্র ঘটনা।

এখন জিমি হেন্ড্রিকস রে নিয়া কিছু কই। সত্যি বলতে এর আগে কালো লোকেদের ভেতর কাউরে আমি এরকম গিটার বাজাইতে দেখি নাই। এরা বরং জ্যাজ ব্লুজই ভাল গায়। কিংবা নিদেনপক্ষে Pop Rap ইত্যাদি। কিন্তু এ ধারণা বুলডোজারে গুঁড়াইতে উদয় হইলো জিমি। আইয়ুব বাচ্চু নাকি হেরে গুরু মানতেন। আসলে আমি দেখতেছিলাম ওয়াচম্যান মুভিটা। তো ওইসময় গানের প্যারালালি মুভি দেখার বাতিক দেখা দেয় আমার। ২৪ ঘন্টা টানা মুভি দেখার ব্যক্তিগত রেকর্ডও আছে একটা। এইসব মুভিগুলায় যে মিউজিক বা গানগুলা ব্যবহৃত হইতো ভাল্লাগলে সেইগুলা নামাইতাম আমরা। মানে আমি আর সৌরভ। ওয়াচম্যান মুভির টাইটেল সংগুলার ভেতর একটা ছিল all along the watchtower. কানে একবারেই আইটকা গেল লোকটার গলা আর গলার আশেপাশে ছড়ান ছিটান বাদ্য বাজনা।

নেটে দেখলাম তারে। কোঁকড়া ঝাঁকরানো চুল যারে বাপে মায়ে পাখির বাসা বলে তেমন তার চুল। তেমনি তার হাত। একে একে শুইনা ফেললাম Hey Joe , Purple Haze, and The Wind Cries Mary হেন্ড্রিকসের গিটার যে ভাষায় কথা বইলা গেছে সে ভাষায় এখনকার ইলেক্ট্রিক গিটার কথা বলতে চায়। বাচ্চাকালে সে যৌন নির্যাতনের শিকার হইছিল বেনিংটনের মতো, দেখছিল নিজের বিধ্বস্ত ঘর বাপ মায়ের ক্যাচাল আর ছাড়াছাড়ি। এই দ্রোহ তারে তারে লালন কইরা শুনায়ে গেছে হেনড্রিকস। Free feeling এই বোধটাই তার গিটার দিয়া গেছে বিশ্বরে। আরেকটা কথা ইদানীংকালে অনেক বাচ্চাদের এতো যে স্টেজে গিটার ফিটার ড্রাম ট্রাম ভাইংগা ফেলাইতে দেখা যায় এইরকম একখান কাজ ইনি বহু আগেই কইরা গেছিলেন- আগুন ধরাইয়া দিছিলেন গিটারে। পাব্লিকে তাই এখনো তারে ব্ল্যাক এলভিস বা ওয়াইল্ড ম্যান অফ বোর্নিও কইরা ডাক পারে।

 

#৪

বলতে দ্বিধা নাই যে নিম্ন মধ্যবিত্ত আর মধ্যবিত্ত এই দুইয়ের ভেতর আনাগোনা করতে থাকা পারিবারিক আবহাওয়ায় আমরা যারা টিনেজ পার করতেছিলাম তাদের কাছে গানের একটা ক্যাসেট কেনা খুব একটা সহজ ছিল না। মেডিকেলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বগুড়ার নবাব বাড়ি মার্কেটের ইয়াফি আর আলিফ স্টুডিও  ছিল আমাদের গানের তীর্থস্থান। তো সেই সময় বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম নানান ব্যান্ডের গান শুনতে শুনতে আমার একটু অরুচির মতো হইলো। কমরেড কাকা ছিল মজার লোক। আমি তখন ইন্টারে আর সে অনার্সে। সে ই মূলত নানান রকম গান লিস্ট কইরা ইয়াফি বা আলিফে গিয়া রেকর্ড কইরা আনতো। ইয়াফি আলিফ স্টুডিও আসলে ঢাকা বা বিদেশ থিকা সিডি বা ক্যাসেট আইনা সেগুলা থেকে কপি ক্যাসেট কইরা বেচতো। কী শুনি নাই সে সময়!! ইংরেজি গানগুলার লিস্ট সাধারণত কমরেড কাকা করতো এমটিভি বা চ্যানেল ভি থেইকা শুইনা শুইনা। গানের ভিডিওগুলার শুরু বা শেষ মিস করলে আনা মারেজুন খাতেমুন মানে আপনে শ্যাষ কারণ ওই দুই সময়ই কেবল গান আর গায়ক বা ব্যান্ডের নাম দেখান হইতো! মিস কইরা গেলে অপেক্ষা করা লাগতো যে কবে গানটা আবার দেখাবে। যাই হোক সে সময় কমরেড কাকা নতুন কোন ক্যাসেট আনলেই আমারে ডাকতো আর আমরা দুইজনে দরজা বন্ধ কইরা পুরাটা শুইনা তারপর বাইর হইতাম। কয়েকদিনের মধ্যেই গলায় তুইলা গাইতে থাকতাম। ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ, নো মারসি, ওয়েস্ট লাইফ, বাবা সায়গল, সনু নিগাম, ফাল্গুনি পাঠক, জুনুন, কলোনিয়াল কাজিনস, শাকিরা, সেলিন ডিওন, এনসিংক, বোম্বে ভাইকিংস, লাকি আখন্দ, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরি,  জুয়েল সোলো মিক্সড কী না আমরা শুনছি আর গাইছি সে সময়। তো এসবের মধ্যেই বাংলা ব্যান্ডগুলা আমার কাছে ক্লিশে হইতে শুরু করে। এরকম সময়ের কোন একদিন আমি বিকালে কোন এক প্রাইভেট থিকা আলিফে যাই। বইলা রাখা ভাল এর আগে আলিফে আমি গেছি প্যাসিভ হিসাবে সেদিন ছিলাম একটিভ। গিয়া দেখি এক বড়ভাই বইসা আছেন, লম্বা চুল, লম্বা চোয়াল, চওড়া কাঁধ মানে এক কথায় পুরাই হার্ডকোর রকারের মতো ব্যাপার স্যাপার আরকি। তো তারে গিয়া কইলাম ভাই নতুন কোন ব্যান্ডের ক্যাসেট আছে? উনি আমার দিকে তাকাইয়া কইলেন, ইংলিশ না বাংলা! কইলাম বাংলা। উনি কইলেন আছে, আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড হইতেছে দেশে তাদের দুই একটা এলবাম আছে। এইভাবে আমার পরিচয় হয় ব্ল্যাক, আর্টসেল, ওয়ারফেইজ, অর্থহীন, জেফায়ার, আইকনস, ডিএনএ, স্টেনটোরিয়ান, ক্রিপটিক ফেইট এদের সাথে। পরে গিয়া এদের সিডিও কিনি আমি। ঢাকায় আসলেই এদের সিডি কিনতাম ইস্টার্ন প্লাজা কিংবা ধানমণ্ডি থেকে। ওই সময়কার আন্ডারগ্রাউন্ড মিক্সড ব্যান্ড এলবামগুলার মধ্যে স্বপ্নচূড়া সিরিজ, আগন্তুক সিরিজ ছিল মাস্টাক্লাস।

Image result for shopnochura series album
”ওই সময়কার আন্ডারগ্রাউন্ড মিক্সড ব্যান্ড এলবামগুলার মধ্যে স্বপ্নচূড়া সিরিজ, আগন্তুক সিরিজ ছিল মাস্টাক্লাস”

ব্ল্যাক আর আর্টসেল নিয়া মজার দুইটা অভিজ্ঞতা আছে আমার। প্রথমে দ্বিতীয় ব্যান্ডটা নিয়া গল্পটার কথা কই। তো মেডিকেলের হোস্টেলে থাকি তখন। মেরাজ কারমাইকেলে। যাতায়াতের ভাড়া বাঁচাইয়া জমানো টাকা দিয়া গিটার শেখা ছেলে মেরাজ। মাঝে মাঝে আসতো আমার হোস্টেলে। আমরা জ্যামিং করতাম। সে বাজাইতো আর আমি গাইতাম। তো এমনই কোন এক সন্ধ্যায় সে প্লাকিং করতেছিল “অন্যসময়”। আর আমি গাইতেছিলাম। 

একুস্টিকে এই গানের প্লাকিং করা তো মুখের কথা না! কিন্তু সে করতেছিল আমিও ধরছিলাম ঠিক স্কেলেই। হঠাৎ বিদ্যুৎ চইলা যায়। কিন্তু মেরাজ না থাইমা চালাইয়া যায় ফলে আমিও। কিছুক্ষণ পরই বিদ্যুৎ ফিরলে আমি গাইতে গাইতেই খেয়াল করি যে ওর আঙ্গুল কাইটা রক্ত পড়তেছে টপটপ কইরা তবুও সে প্লাকিং থামাইতেছে না! গান থামাইয়া তারে যখন জিজ্ঞেস করি, বালডা তোমার যে এই দশা হইছে খেয়াল করবা না! সে কইছিল, গানটা ভাল হইতেছিল রে ভাই তাই থামাইতে ইচ্ছা করতেছিল না!

 

আর ব্ল্যাকের গল্পটা এইরকম। মেডিকেলে প্রথম বছরেই গেট টুগেদার নামের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার চল ছিল রংপুর মেডিকেলে। তো সেইখানে আমারে গাইতে হবে। মূল অনুষ্ঠানের মাত্র একদিন আগে আইসা আমি রিহার্সেলে যোগ দিই। রংপুরের লোকাল ব্যান্ড বৃত্ত ছিল হ্যান্ডস হিসাবে। ওইদিন রিহার্সেলের একদম শেষ মুহূর্তে লিড গিটারিস্ট জুবায়ের ভাই যখন গিটারটা জ্যাকেটবন্দী করতে যাইতেছিলেন ঠিক তখনই আমি গিয়া হাজির হই ফলে তিনি যারপরনাই বিরক্ত হইছিলেন। নীরস গলায় যখন কইলেন, কী গান গাইবা? আমি কইছিলাম, জানি না। তখন উনি কইলেন, কি কি শোনা হয়? আমি কইলাম, যা পাই সবই। এইবার আরও বিরক্তি নিয়া তিনি কইলেন, সর্বশেষ এমন কি শুনছি যা গাইতে পারবো। কইলাম, ব্ল্যাকের ” উৎসবের পরে”, তাহসানের “কথোপকথন”। তারপর সেই দুই এলবামের দুইটা গান পাঁচ পাঁচ দশ মিনিটে রিহার্স ওকে কইরা ফেলি। জুবায়ের ভাই অনুষ্ঠানের পর আমারে তাদের রেগুলার প্র‍্যাকটিস সেসনে যাইতে বলেন। দুইটা গানই তাহসানের কন্ঠে হওয়ায় ক্যাম্পাসে আমার নাম হইয়া যায় ” তাহসান” আর তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি’র ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের নেতাদের টার্গেটে পড়তে হয় (গলায় জোর আছে দেইখা তারা আমারে মিছিলের ভোকাল হিসাবে টার্গেট কইরা ফেলেন)!

 

 

[ সম্পাদকের নোটঃ বর্তমান লেখাটা এবারের বইমেলায় প্রকাশিত রক মিউজিকভিত্তিক কাগজ ‘রকাহোলিক’ -এর প্রথম সংখ্যা থেকে এইখানে মাদারটোস্ট-এর পাঠকদের জন্যে রিপ্লাব্লিশ করা হইলো। মিউজিক নিয়ে দারুণ সব লেখা প্রকাশ করছে এই কাগজটা। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য  কিংবদন্তী আজম খান ও তার সাংগীতিক তৎপরতা নিয়া আরেক বিখ্যাত শিল্পী ফিডব্যাকের সাবেক ভোকাল মাকসুদের লেখা ‘বাংলাদেশের রক ইতিহাসঃ দ্য লেগাসি অফ আজম খান (পর্ব-১)’। একুশের বইমেলায়  ‘রকাহোলিক’ পাওয়া যাবে লিটলম্যাগ চত্ত্বরের   ফেষ্টুন-এ।  এখানে রকাহোলিক প্রথম সংখ্যার সূচীপত্রের  ছবি দেওয়া হলোঃ

ফেইসবুক কমেন্ট
তানভীর হোসেন
তানভীর হোসেন

কবিতা লেখেন। মিউজিক ও মুভিফ্রিক।

No Comments Yet

Comments are closed

error: