fbpx

স্লটারহাউস ফাইভঃ বুক রিভিউ

চিন্তা করে দেখলাম বয়স শুধু বাড়ছে , কমছে না । তাই কবে অবসর পাবো সেই আশা বাদ দিতে হবে।  এই দৌড়ের উপর জীবনেই যা যা পড়তে চাই সব পড়ে শেষ করতে হবে । স্লটারহাউস ফাইভ অন্যতম যুদ্ধবিরোধী উপন্যাস । শুধু এটুকু পরিচয় তাকে ক্লাসিকের মর্যাদা দিতে বাধ্য । তার সাথে যোগ করুন , এ্যাবসার্ড ডার্ক হিউমার , সায়েন্স ফিকশন , গভীর বিষাদ আর অনুশোচনা, কিছুটা বায়োগ্রাফি ।

সারসংক্ষেপঃ বিলি পিলগ্রিম একজন মার্কিন যুদ্ধফেরত , চশমার ফ্রেমের তৈরীকারক । তার একটা সুপারপাওয়ার আছে , সে সময় পরিভ্রমন করতে পারে । লেখকের ভাষায় , “Unstuck in time”. বিলি পিলগ্রিম একজন ব্যর্থ সৈনিক, যে যুদ্ধ পছন্দ করে না । বিলি পিলপ্রিম এইজন্য মার খায় তার সহসৈনিকের হাতে । বিলি পিলগ্রিম যখন যুদ্ধবন্দি হয় তার সহসৈনিক ওয়ারী তাকে খুন করার জন্য আরেকজন সৈনিককে কনভিন্স করে , গ্যাংগ্রিনে মারা যাওয়ার আগে । পল ল্যাজারো , যে কিনা বিলিকে এসময় খুন করবে , সে বিশ্বাস করে প্রতিশোধ হচ্ছে দুনিয়ার সবচে মধুর জিনিস। বিলি যখন সময় পরিভ্রমন করে তখন সে নিজের মৃত্যুকে দেখতে পায় , দেখতে পায় তার মেয়ের জন্ম , তার প্লেন ক্রাশের অভিজ্ঞতা এবং যখন বিচিত্র হচ্ছে সে ভিনগ্রহ ট্রালফামাডোর এর বাসিন্দাদের দ্বারা অপহৃত হয় । বাকী জীবনে বিলি একটা রেডিও শো করে তার ট্রালফামাডোরের চিরিয়াখানাতে কাটানো সময়ের কথা বলে যায় ।

এই ট্রালফামাডোরে বিলির সংসার হয় , একজন পৃথিবীবাসী পর্নো অভিনেত্রীর সাথে । ট্রালফামাডোরের বাসিন্দারা একটা গ্লাস ডোমে বিলির সংসার দেখতে পায় । বিলি মানুষের জীবনকে এ্যাম্বারের আটকানো মাছির সাথে তুলনা করে । আমরা যে অবস্থায় আটকে আছি সেই সময়ের হাত থেকে আমাদের মুক্তি নেই । কিন্তু বাইরের অভজার্ভারের কাছে ব্যাপারটা হাস্যকর আর বিনোদনমূলক । বিলি তার ড্রেসড্রেনে ফায়ারবম্বিং এর সময়ে কাটানো সময়ে ফেরত যায় । যেখানে ১ লাখ ৩৫ হাজার জার্মানকে জ্যান্ত আগুন বোমা দিয়ে ঝলসে দেয়া হয়েছিলো (এটা বাস্তব ঘটনা আর লেখক নিজে একজন ড্রেসড্রেনের বেচে যাওয়া আদম)। মানুষ হিরোশিমা , নাগাশাকির কথা বলে কিন্তু ড্রেসড্রেনে এতো সংখ্যক সিভিলিয়ানদের হত্যার ব্যাপারটা মানুষ খুব একটা তোলে না । বিলির মনে প্রশ্ন জাগে এই সম্পর্কে । বিলির চমৎকার দুটো সন্তান আছে , বিলির বিয়ে রাতে তাকে এলিয়েনরা অপহরন করে নিয়ে যায় । বিলির প্লেন ক্রাশের একমাত্র সারভাইভর হওয়ার পর তাকে একটা যুদ্ধবাজ কর্নেলের সাথে ট্রিটমেন্ট দেয়া হয় । তাদের আলাপ চারিতায় ফুটে ওঠে এখন নিস্পৃহ সাধারন মানুষের কাছে যুদ্ধের মর্মার্থ ।

 

স্লটারহাউস ফাইভের কোন আগপাশতলা নেই । লেখক নিজের ইচ্ছে মতো বিলিকে বিভিন্ন সময়ে ঘুরিয়েছেন । তার খুব মনোযোগ দিয়ে না পড়লে কোথা থেকে কি ঘটে গেলো টের পাওয়া খুবই মুশকিল । ড্রেসড্রেনের ফায়ারবম্বিং এর সাথে এলিয়েন দিয়ে অপহৃত হবার সংযোগ নেই । কিন্তু লেখক কার্ট ভনেগট দেখিয়েছেন সেখানে আছে । আমরা আসলে মাছির মতো এম্বারে আটকে থাকা মানুষ , আমাদের ঘিরে ঘটনা গুলো ঘটে চলে , দর্শনার্থিরা মজা নেয় , আর আমরা ধরে নেই এটাই হবার কথা ছিলো এটাই হবে । স্লটারহাউস ফাইভকে খুব ভারিক্কী উপন্যাস ভাবলে খুবই ভুল হবে । ড্রাই , ক্রুড , ডার্ক হিউমারে ভর্তি প্রতিটা পাতা । সেন্স অফ হিউমার উন্নত না হলে রস আস্বাধন দুঃস্বাধ্য ।

যখনই একটা মৃত্যু হয় বা মৃত্যু হবার মতো ঘটনার সম্মুখীন হতে হয় তখন লেখক বলে উঠেন , So it goes. জীবনের কোন নির্দিষ্ট অর্থ নেই । জীবন অর্থহীন তাই তার চলে যাওয়াটাও অর্থহীন । So it goes দিয়ে লেখক জীবিতদের মক করেছে । তোমাদের চলমান জীবন হতে একজন চলে গেলেও জীবন চলবেই , So it goes .

যদিও একসেকেন্ডের জন্যও স্লটারহাউসকে সায়েন্স ফিকশন মনে হয়নি , একটা বড়ো অংশ জুড়ে ট্রালফামাডোরের বর্ণনা আছে , মানুষ যখন জন্তুতে পরিনত হয় , চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীরা তাদের দেখে উল্লসিত হয় । ট্রালফামাডোরের বর্ণনা অনেকটাই বিলির সাইকো এ্যানালিসিস । বিষয়-আশয়ের জন্য মোটা বউকে বিয়ে করার জন্যই বিলির পর্নো অভিনেত্রীর সাথে সংসারের ইচ্ছা ??  হতে পারে ।  এটা যার যার নিজস্ব ইন্টারপ্রেটিশনের ব্যাপার । বিলি প্রিলগ্রিমের মতো আমেরিকান সৈনিক খুব বিরল নয় , যারা জানে না আর বোঝে না যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা কী।  তারপরো তাদের যুদ্ধে পাঠানো হয় । তাদের গলা চেপে ধরে যুদ্ধ করানো হয় , ঘৃণা শেখানো হয় । এমনকি ড্রেসড্রেনের ফায়ার বোম্বিং এর প্রয়োজনীয়তাও তাদের শেখানো হয় । স্লটারহাউস ফাইভ আসলে একটা মাংসের আড়তের নাম যেখান বিলি ফায়ার বোম্বিং এর রাতে অংশ নিয়েছিলো । যে রাতে ফায়ার বম্বিং হয় , শুধু মাত্র স্লটারহাউসে থাকার কারনে বিলিদের দল প্রানে বেচে যায় । ড্রেসড্রেনের নারীপুরুষ শিশুদের পুড়িয়ে কয়লা বানিয়ে দেয়া হয় সেই রাতে । লেখকের জবানীতে শুনুন , আমরা কিভাবে দেখি সেই ফায়ার বম্বিং

“It had to be done,” Rumfoord told Billy, speaking of the destruction of Dresden.

“I know,” said Billy.

“That’s war.”

“I know. I’m not complaining”

“It must have been hell on the ground.”

“It was,” said Billy Pilgrim.

“Pity the men who had to do it.”

“I do.”

“You must have had mixed feelings, there on the ground.”

“It was all right,” said Billy. “Everything is all right, and everybody has to do exactly what he does. I learned that on Tralfamadore.”

এই লাইন গুলো আমার কাছে মানবজাতির উপর বিতৃষ্ণিত , একজন নিহিলিস্টের জবানী মনে হয়েছে। ফায়ারবম্বিং যেখানে ১৩৫০০০ মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছে তাকে জানানো হচ্ছে যুদ্ধ এমনই হয় ! যেমনটা করে আমাদের শেখানো হয় আর জানানো হয় । যা ঘটবে ঘটবেই , যা ঘটছে তা অন্য কোন ভাবে ঘটার উপায় ছিলো না । আমি বিষয়টাকে দেখি এইভাবেই অনিশ্চিতের শাসনে শাসিত দুনিয়ায় আমরা যথেষ্টই ক্ষমতাশূন্য । যা ঘটেছে অন্য কোন ভাবে ঘটার উপায় ছিলো না । আমরা টাইফুনের মুখে একটা ঝরা পাতা বই অন্য কিছু নই ।

 

লেখক নিজের একজন ড্রেসড্রেন থেকে বেচে ফেরা মানুষ । তাই স্লটারহাউসকে খানিকটা অটোবায়োগ্রাফিকাল উপন্যাসও বলা যায় । ______ Billy licked his lips, thought a while, inquired at last: “Why me?”

“That is a very Earthling question to ask, Mr. Pilgrim. Why you? Why us for that matter?

Why anything? Because this moment simply is. Have you ever seen bugs trapped in amber?”

“Yes.” Billy, in fact, had a paperweight in his office which was a blob of polished amber with three ladybugs embedded in it.

“Well, here we are, Mr. Pilgrim, trapped in the amber of this moment. There is no why.”

যুদ্ধকে প্রশ্ন করা নয়, বরং সহনীয় করা । অবশ্যাম্ভাবীকে মেনে নেয়া । মুহুর্তটা এমনই ছিলো , আমাদের ঠিক এমনটাই করার কথা ছিলো বলে জানায় স্লটারহাউস ফাইভ , তার নিজস্ব ব্রান্ডের ডার্ক হিউমারে ।

নিজের পড়ুন , প্রিয়জনকে পড়তে বলুন । বিলি পিলগ্রিমের মতো ঝড়ার পাতা হয়ে অতীত , বর্তমান আর ভবিষৎকে অবলোকন করুন , যেহেতু ঘটনাক্রমের উপর আপনার সরাসরি কোন নিয়ন্ত্রন নেই ।

 

আরও দেখেন

কার্ট ভনেগাটের লাস্ট ইন্টারভিউ...   প্রশ্নঃ সৃষ্টির কোন দিকটা বেশি টানে আপনাকে, লেখকের নাকি আর্টিস্টের জীবন? ভনেগাটঃ শখের বশে সারাটা জীবন ভরেই কিছু না কিছু এঁকেছি। কাউকে সেভ...
ইমতিয়াজ মির্জা
ইমতিয়াজ মির্জা

ব্লগার। সফটওয়্যার এঞ্জিনিয়ার। আর্ট-কালচারসহ বিচিত্র বিষয়ে আগ্রহী।

No Comments Yet

Comments are closed

error: