fbpx

স্লোগান নিয়া খাঁজকাটা কুমিরের রচনা

[ স্লোগানের রাজনীতি আছে অর্থনীতি আছে। স্লোগানকে আপাতভাবে যেমন মনে হয় – জমায়েতে চেঁচায়ে বলার বস্তু- শুধু তেমন নয় স্লোগান। স্লোগানে কৌশলী ব্যবহার থাকে রেটরিকের – যেইটারে সংক্ষেপে বলা যায় ল্যাঙ্গুয়েজ ইন পারসুয়েশন। জনমতকে নির্দিষ্ট দিকে প্রভাবিত করতে রেটরিক কাজ করে। বর্তমান দুনিয়ায় এ্যাডভার্ট সেক্টরে সবচাইতে বেশি ব্যবহার রেটরিকের। স্লোগানও রেটরিকের একটা প্রধান প্রয়োগক্ষেত্র।

রেসিস্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাচনী স্লোগান ‘Make America great again’ নিয়া লিবারেলরা যতই ফান করুক না কেন, খেয়াল করলে দেখা যাবে স্লোগানটা খুবই পারসুয়েসিভ, ইমোশনালি চার্জড। আবার গ্রেইট বানাইতে আহ্বান- তার মানে আগে গ্রেইট ছিলো, এখন নাই। প্রবলেম কী? ( ল্যাটিনো/মুসলিম ইমগ্র্যান্ট? এইগুলা ইমপ্লাইড)। এই যে শব্দের মধ্যে দুশ্চিন্তা ঢুকায়ে দেওয়া, আবার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানো সবই অসাধারণ উত্তেজক ৪টা শব্দে ভরে দেওয়া আছে। ইফেক্টিভ স্লোগানের উদাহরণ এইটা।
‘স্লোগান নিয়া খাঁজকাটা কুমিরের রচনা’ স্লোগানের কোনো নির্দিষ্ট একটা-দুইটা দিকের গভীরের ঢোকার চেষ্টা করে নাই। বরং স্লোগানের বৈচিত্রময় কাজকর্মের অনেকগুলা দিকে ইশারা রেখে গেছে। আছে চমৎকার কিছু পর্যবেক্ষণ। সর্বোপরি স্লোগান জিনিসটার প্রতি আরো মনোযোগী নজর দিতে পাঠকরে উৎসাহ দেয় বৈঠকি ঢঙের এই রচনা। -সম্পাদক, মাদারটোস্ট]

স্লোগান নিয়া একটা রচনা কিভাবে শুরু করা উচিত ‘স্লোগান একটা গৃহপালিত প্রানী’ এইভাবে নাকি আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে একটি স্লোগান বয়ে গেছে? ঠিক বুঝতে পারতেছিলাম না। তাই ঠিক করলাম জীবন থেকে নেয়া একটা কাহিনী দিয়া শুরু করি। কাহিনী যাই হোক রচনায় আমি স্লোগান নিয়া খাঁজ কাটবো তাতে সন্দেহ নাই।

ছোট বেলায় আমার কাছে সব থেকে ভীতিকর স্লোগান ছিল ‘কালাম ভাইয়ের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’ । ইভেন দুষ্টামি করলে আমারে রাস্তায় রেখে আসার যে ভয় দেখানো হইত তার থেকেও আমি বেশি ভয় পাইতাম এই স্লোগানটা। ভাইয়ার স্কুলে যাবার পথে কোন এক মিছিলে শুনেছিলাম এই স্লোগানটা । ঘটনার পিছনের ঘটনা হইলো আমার আগুন কিংবা ঘর কোনোটা নিয়াই চিন্তা ছিলো না চিন্তা ছিল আমার সদ্য কেনা রিমট কন্ট্রোল গাড়িটা নিয়া। আমি খুব ভালো করে জানতাম ঘরে আগুন দিলে তো আর আমার গাড়িটা আস্ত থাকবেনা ।

সে সব আজ ম্যালাদিন আগের কথা । একটু বড় হবার পর অবশ্য সে কালাম ভাইকে এরেস্ট হইতে দেখছিলাম এবং বলাই বাহুল্য যে আমার ঘর বাড়ির কিছুই হয় নাই । কিন্তু সেই ঘটনায় আমার মাথার মধ্যে স্লোগানের যে ইফেক্ট তৈরি হইছিলো তা এতদিন পরও মাঝে মাঝে চকচক করে ওঠে । কিছুদিন যাবত ভাবছিলাম স্লোগান নিয়া কিছু লিখবো । বাংলায় কোনো কিছু লেখার ব্যাপারে যে একটা ঐতিহাসিক শ্রদ্ধাশীল সিস্টেম আছে । টপিক যাই হোক আগে যেটা নিয়া লিখতেছেন সেইটারে আগে ভাঙতে হবে চুড়তে হবে তারপর সেটার উৎপত্তি স্থান নিয়া ইচ্ছা মত গেজাতে হবে । ব্যাস তারপর আসেন আসল কথায়। আমি যেহেতু চিন্তা করেছি স্লোগান নিয়া একটা খাচ কাটা কুমিরের রচনা লিখবো সেহেতু আমি সেই রাস্তায় না গিয়া সরাসরি খাচ কাটা শুরু করলাম।

লেখার প্রথমেই আমরা খাচ কাটবো যেই টপিকে তার নাম স্লোগানের পলিটিকাল ইকোনোমি। এটি বাংলাদেশের সব থেকে সুস্বাদু শব্দগুলার মধ্যে একটা। মানে পাব্লিক এইটা খুব খায় । যার বাংলা হইলো রাজনৈতিক অর্থনীতি। স্লোগানের বিস্তৃত রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়া ভার্সিটির বড় ভাইয়ের কাছে এক্টা গল্প শুনছিলাম। গল্পটা এই রকম যে একবার তিনি একটা ছোট পিচ্চিকে ডেকে নিয়া রুটি কিনে দেয়ার পর পিচ্চিটা প্রথমেই জিজ্ঞেস করছিলো ‘ এহন কি আপনার নামে সোলেগান দিমু ?’ । বড় ভাই প্রশ্ন করলেন “ ক্যান সবাই কি রুটি খাওয়াইয়া সোলেগান দিতে কয়” ? পিচ্চি মেয়েটা বেশ স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিয়েছিলো “ না অনেকে বাড়িতও নিয়া যাইতে চায় তয় সোলেগানই বেশি দিতে কয়।”

কিছুর বিনিময়ে স্লোগান দেয়ার সংস্কৃতি বহুল প্রচলিত। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন১)সহ বিভিন্ন নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার তথ্য মতে আমাদের রাজনীতি যথেষ্ট ব্যবসায়ী ফ্রেন্ডলী । আর এই ব্যবসায়ী-বান্ধব রাজনীতিতে নির্বাচন নামের “ নগদ বিপ্লবে” খরচ হওয়া টাকার বিশাল অংশ খরচ হয় স্লোগান দেয়া আর চা বিড়ি খাওয়ানোর পিছনে। স্লোগানের বিনিময়ে খাদ্য (সোবিখা) আর স্লোগানের বিনিময়ে টাকা (সোবিটা) নামে প্রেসক্লাব ভিত্তিক দুইটা অলিখিত কর্মসূচী চালু আছে। এই কর্মসূচিদ্বয়ের আওতায় প্রেসক্লাবের আসেপাশে ঘোরাঘুরি করা লোকজনকে স্লোগান দেয়ার বিনিময়ে খাবার এবং স্লোগান দিয়ে “ জ্ঞানগর্ভ” আলোচনা শোনার জন্য টাকা দেয়া হয়। প্রতিটা প্রোগ্রাম করার জন্য তাদের দেয়া হয় ৮০-১০০ টাকা। আবার খুচরা সংবাদিকতা করার সুবাদে আমি প্রেস ক্লাবের আশে পাশে এমন একদল লোককে দেখসি যারা বিভিন্ন রাজনতিক দলের হয়ে স্লোগান দিয়েই জিবিকা অর্জন করে। এটা নিয়া ০২ মে ২০১৭ সালে “রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে ঘণ্টা ভিত্তিতে লোক ভাড়া” শিরোনামে আর টিভি একটি প্রতিবেদনও প্রচার করেছিলো২। এবার ভাবেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে স্লোগানের কি অশেষ ভুমিকা!

তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর হলে একটা সিটের জন্য বড় ভাইদের নামে স্লোগান দেয়া এখন পলিটিক্যাল কালচারের আওতায় চলে আসছে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের শাহবাগ শাখা থেকে শুরু করে প্রায় সকল পাবলিক ভার্সিটিতেই এই “ কালচার” দেখা যায়। ইতিহাসে যদিও দেখা গেছে দেশের অনেক শক্তিশালি স্লোগান এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই তৈরী হইছে। দেশের স্বাধীনতা থেকে স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন সহ অনেক গুরুত্বপূর্ন স্লোগান এক গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করছে।

Image result for famous political  slogan
ট্রাম্পের নির্বাচনী স্লোগানের পোস্টার

খুঁজলে হুয়তো এভাবে অনেক ভারী ভারী বয়ান খুজে পাওয়া যাবে, যেগুলো শুধু ভার বাড়াবে। ‘আমাদের জয় বাংলা বাংলার জয়’ , ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’ বা ‘বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’র মত অসংখ্য সহজবোধ্য জ্বালাময়ী স্লোগান ছিলো। যা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরো বেগবান করছিলো। এই পর্যন্তই যা। তারপরের ইতিহাস টোকাটুকির। আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের স্লোগান তৈরীতে মনোযোগ না দিয়া সমপূর্ণ মনোযোগ দিছি অন্যের স্লোগান মেরে দেয়ায়।

মে ‘৬৮-এর ছাত্রআন্দোলনের একতা পোস্টার

এই চিত্র সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশে । যেখানে পিএইচডি থিসিস থেকে ক্যান্সারের ঔষধ সবকিছুই রেডিমেট কিনে নিয়ে নিজের নাম বসাইয়া দেয়া যায় সেখানে এইটা নরমাল। উপমহাদেশজুড়েই স্লোগান মেরে দেয়ার এক ঐতিহাসিক সিলসিলা আছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক স্লোগানের প্রসঙ্গ আসলে বলতে হয় স্লোগান টুকে দেয়া আসলে এক্টা আর্ট যেটা সবাই পারে না তবে অনেকেই পারে এবং উপমহাদেশের অনেকগুলা রাজনৈতিক দল এটা পারছে এবং বেশ সাফল্যের সাথেই পারছে।

যেমন ধরা যাক ভিয়েতনাম রেভুল্যুশনের বিখ্যাত স্লোগান ‘ হো হো হোচো মিন উই শ্যাল ফাইট উই শ্যাল উইন’ স্লোগানের কথা(৩) । এটা ছিলো ভিয়েতনামিজ ছাত্রদের প্রতিবাদের প্রথম আওয়াজ যা দুনিয়ার আব্বু রাষ্ট্র আমেরিকাকেও চাপে ফেলে দিছিলো । মজার ব্যাপার হইলো ভারতের খুব কম বামদলই পাওয়া যাবে যারা নিজেদের মত করে এই স্লোগান কপি মেরে নিজেদের একটা স্লোগান বানায় নাই। ইউটিউবে(৪) অনেকগুলা পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এইসব স্লোগান অরিজিনাল স্লোগানের থেকে আরো বেশি ইন্ট্রেস্টিং এবং অবশ্যই বেশি পপুলার। এটা পাপ না । বরং স্লোগানের স্বার্থকতা এইখানেই । এর কোনো সীমান্ত নাই। তবে মাঝে মাঝে কিছু স্লোগান আমাদের আলাদা করে নজরে আসে। যেমন পশ্চিমঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের “মা মাটি মানুষ” স্লোগানটি।

২০০৯ সালে এই স্লোগানটি চালু হবার পর বামফ্রন্টের বিপক্ষে মমতা দিদির প্রধান অস্ত্র ছিলো এই স্লোগান । বামপন্থীদের আবেগঘন কাব্যিক স্লোগান পর্যন্ত দিদির স্লোগানের কাছে মার খেয়ে গিয়েছিলো(৫)। দিদিও এই স্লোগানকে কাজে লাগাতে দেরী করেননি । দিদি বই লিখেছিলেন ‘মা মাটি মানুষ’ মে, বের করেছিলের তার দলের মুখপত্র পত্রিকাও। এমনকি ২০১১ সালে ভারতের শীর্ষ ৬ টি স্লোগানের মধ্যেও ছিলো এই স্লোগানটি(৬)। মজার ব্যাপার হলো এপ্রিল ২০১১ সালে সিপি আই এর নেতা গৌতম দেব অভিযোগ করেন যে দিদির স্লোগানটি আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল বিএনপির স্লোগান যেটি কিনা খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে তার নির্বাচনের সময় ব্যাবহার করেছিলেন। অবশ্য এইটা নতুন না ভারতে এই রকম অভিযোগ হরদমই শোনা যায়। ২০১৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি এশিয়ানএজ এরকম একটা খবর আমাদের জানায় যেখানে শুধু এক নির্বাচনেই বিজেপি চার জায়গা থেকে স্লোগান টুকে দিয়েছে। বাদ যায়নি সালমান খানের মুভির গান থেকেও ।

Image result for bengali political slogan
তৃণমূল কংগ্রেসের একটা পোস্টার

এভাবে অনেক স্লোগান আছে যেগুলা বিভিন্ন ভাবে কপি পেস্ট হয়ে ব্যাবহার হয়ে আসছে । বর্তমান সময়ে ক্ষমতাসিনদের ছাত্রসংগঠনের একটি স্লোগানে ভিয়েতনাম বিপ্লবের স্লোগান ‘হো হো হোচোমিন রেড রেড রেড স্যালুট’-এর সুর খুজে পাওয়া যায়(৭) । যেহেতু স্লোগানের কোনো পেটেন্ট নাই তাই এগুলা টুকে দিতেও খুব ভাবতে হয়না। বাজে ব্যাপারটা হইলো এগুলা টুকে দিয়া আমরা রাতারাতি আসলটাকে অস্বীকার করে বসি ।

তাতে অবশ্য স্লোগানের কিছু যায় আসে না। পলিটিক্যাল এক্টিভিজমের মধ্যে স্লোগান হইলো সব থেকে ইন্ট্রেস্টিং ইলিমেন্ট। এর হিউমারাস ক্যারেক্টার অসাধারণ। বামপন্থী কিছু স্লোগান বাদে বেসিক্যালি স্লোগানের মধ্যে কোনো কোষ্ঠকাঠিন্য নাই । দেখা গেছে সারা জীবন যারা ভারী ভারী কথা বলেছেন তারাও স্লোগানের অঙ্গনে এসে হাল্কা হয়ে গেছেন। কিংবা রাজনৈতিক ভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রধান অস্ত্র এই স্লোগান । প্রতিনিয়ত বিরুদ্ধাচারনে ব্যবহার হওয়া স্বত্তেও এর ব্যাঙ্গাত্বক ভাব কমে না এক ফোটাও। বরং বাড়ে। শুধু বাংলাদেশের প্রসঙ্গেই বলা যাক।

Image result for bangladeshi political slogan

স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে ময়দানে আসে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। তাদের স্লোগান ছিলো মুক্তির ‘মূলমন্ত্র বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’। তখন এই স্লোগান এতটাই জনপ্রিয় ছিলো তার প্রমান ইতিহাস ঘাটলেই পাওয়া যায়। ভার্সিটি পড়ুয়া প্রায় সবার মুখে মুখে ছিলো এই স্লোগান। এক স্লোগানে কোনঠাসা করে রেখেছিলো প্রতিপক্ষকে। কিন্তু ছাত্রলীগই বা ক্যান ছেড়ে দিবে ? তারা পালটা স্লোগান দিলোঃ

নিক্সন পেড়েছে ডিম
মাও দিয়েছে তা
তা থেকে তৈরি হলো
বৈজ্ঞানিকের ছা(৮)

ব্যাস জাসদের স্লোগানের মনোপলি বিজনেসে ধরা । তবে জাসদও ছেড়ে দেয়নি ।তারাও আক্রমন করেছে ব্যাঙ্গাত্বক স্লোগান দিয়েই । বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি তখন আওয়ামিলীগের সাথী ।তার সভাপতি ছিলেন কমরেড মনি সিং। তো জাসদ স্লোগান দিল

শেখ মুজিবের দুই শনি
শেখ মনি আর সিং মনি।

স্বাধীনতার পর যখন দুনিয়া জড়েই বামপন্থার নতুন জোয়ার শুরু হলে তার ধারাবাহিকতায় আচ লাগে আমাদের দেশেও। ভিয়েতনাম বিপ্লবের হিরো হোচে মিন আর মাও সে তুং তখন বামপন্থি সকল ছাত্রদের মুখে মুখে ।ছাত্রলীগের নেতা তখন নূরে আলম সিদ্দিকী।বামপন্থী ছাত্রদের কোনঠাসা করতে তিনি মজার স্লোগান উঠালেন

হো হো মাও মাও
চীনে যাও ব্যাঙ খাও

খুজলে এভাবে এভাবে অসংখ্য স্লোগান খুজে পাওয়া যাইবে ইতিহাসে। আমি শুধু অল্প কিছুর নাম আনলাম। এসব কারনে বাঙ্গালির ফুর্তিবাজ চরিত্রেরর সাথে স্লোগানের একটা গভীর সম্পর্কও তৈরী করে দেয় ।

হিউমারের বাহিরেও স্লোগান যে একটা আলাদা গম্ভীর সত্ত্বা আছে সেটা ভুলে যাবার উপায় নাই। তাই কিছুদিন পরপর আমরা স্লোগান নিয়া বিভিন্ন উত্তাপ দেখতে পাই। যেমন কিছুদিন আগে স্লোগান নিয়ে চারদিকে বেশ গরম আবহওয়া অনুভব করা গেছে। ফলে আমাদের জাতীয় স্লোগান কি হবে কিংবা আদৌ হওয়া উচিত কিনা সেটা এইসব তর্কের দাঁড়ানো মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। যার সুত্র ধরে গত ৪ ডিসেম্বর বিবিসি বাংলায় জানায় ‘জয় বাংলা’ কে কেন জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা করা হবেনা তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে বাংলাদেশের হাইকোর্ট(৯)।

জানতে চাওয়াটা তো সমস্যা না কিন্তু সমস্যা হলো এখনি হঠাৎ ক্যান হাই কোর্টের এটা জানতে ইচ্ছা হইলো। দেশব্যাপী এত্ত এত্ত ইস্যু হাঠতে গিয়া মানুষ নাই হয়ে যায় । শুধু প্রশ্ন না ফলাফলও নাকি ফাস হয় ।কোর্টের তো এগুলোও জানতে ইচ্ছা করা উচিত। তাছাড়া এটা এখনো সেই মুক্তির পতাকা বহন করে কিনা সেই প্রশ্ন তো থাকছেই। জুলাই ১৯১৭ সালে লেনিন একটি প্রবন্ধ লেখেন ‘অন স্লোগান’ বা “ স্লোগান প্রসঙ্গ” শিরোনামে(১০)। সেইখানে তিনি দাবী করেন “ এমন সব স্লোগান আগে ঠিক ছিলো, কিন্তু এখন সেগুলো হয়ে গেছে অর্থবর্জিত- এগুলা এখন অপ্রত্যাশিতও বটে” এর পর কিছু স্লোগানের প্রসঙ্গে বলেন “ এসব স্লোগান সঠিক ছিলো একটি কাল পর্যায়। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাফল্যের বিশেষত্ব থেকে বের করতে হয় বিশেষ স্লোগান।” সুতরাং জয় বাংলা স্লোগান নিয়ে সহজ সমীকরনে যাবার আগে আমাদের আরো ভাবা উচিত কিনা সেই দায় আপানাদের দেয়া হইলো। তার উপরে আমাদের অন্যান্য জাতিসত্ত্বার ভাষার প্রশ্নে আমাদের উদাসিনতার লম্বা ইতিহাস আছে। আজ পর্যন্ত তারা নিজের ভাষায় জাতীয় সঙ্গীত গাইবার সাংবিধানিক অধিকার পায় নাই। তবে সেসব আলোচনা আজ তোলা থাক। পরে একদিন করবো।

তাছাড়া আমাদের দেশের প্রচলিত বিখ্যাত দুই স্লোগানের দিকে তাকাইলে মনে হবে যে এরা হয়তো পাকিস্তান জিন্দাবাদ কিংবা জয় হিন্দ স্লোগান থেকে ইন্সপায়ার্ড । এগুলো অবশ্য ‘রেপারেঞ্চ চাড়া বানানু কতা’।আমি কিন্তু মোটেই সেইটা দাবী করছি না। স্লোগান প্রসঙ্গে এরকম আরেকটি চমৎকার লেখা আছে পুর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির সভাপতি কমরেড সিরাজ শিকদারের “ কয়েকটি স্লোগান প্রসঙ্গে”(১১)। স্লোগান নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন সেখান তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে শ্রেনীগতভাবে সংখ্যালঘু পুর্ব বাংলার ( এখনকার বাংলাদেশের ) নাগরিকদের অধিকার আদায়ের জন্য সমাজের সাথে সামঞ্জস্যপূণ রাজনৈতিক স্লোগান তৈরি করতে হবে।

সুতরাং কোনো স্লোগানকে জাতীয় কিংবা যাই বানান হোক না ক্যান তার আগে বোঝা দরকার সেই স্লোগান আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে কিনা। অদূর ভবিষ্যতে এই স্লোগান সংক্রান্ত জটিলতা যে আমাদের রাজনৈতিক চাপাবাজিতে নতুন মাত্রা আনবে সেটা ভালোমতো বোঝা যাচ্ছে। কারণ স্লোগান নিয়ে এই ধরণের জটিলতা নতুন কিছু না।

স্লোগানের আরেকটা চমৎকার চরিত্র হইলো এটা অন্য যে কোনো রাজনৈতিক এক্টিভিজমের থেকে বেশি সুড়সুড়িদায়ক । বিভিন্নভাবে এই সুড়সুড়ি স্লোগানের অন্দরে প্রবেশ করে আমাদের মনের মধ্যে এমন আবেগ তৈরি করে যে এর প্রভাবে ‘একটা দুইটা শিবির ধর, সকাল বিকাল নাস্তা কর’ টাইপ ফ্যাসিবাদই স্লোগানেও পর্যাপ্ত চেতনার উপস্থিতি থাকার জন্য আমাদের খারাপ লাগে না বরং দ্বিগুন সুরসুরি দেয়(১২)। আবার আল্লাহর নাম নিয়া কুপাকুপির বিষয়টাও সেইম। প্রচুর সাম্প্রদায়িকতা(১৩) থাকার সাথে সাথে সামান্য ধর্মীয় সুড়িরসুড়ির উপস্থিতি জন্য এই বিষয়গুলা আমাদের হারাম না লাইগা বড় আরাম লাগে । একটু চিন্তা করে দেখবেন যে দুই প্রকার স্লোগানই কিন্তু একইরকম। দুইটাই চরম প্রতিক্রিয়াশীল আর চরম সাম্প্রদায়িক। কেউ কারো থেকে কম না । কিন্তু আমরা এইগুলা সম্পর্কে নির্বিকার । এই ঘটনা আমাদের আমাদের দেখায় কিভাবে স্লোগান আমাদের বগলে সুড়সুড়ি দিতে থাকে, আর আমরা না বুইঝাই হাসি।

আবার অনেক সময় দেখা যায় পুঁজিবাদ আমাদের এই হাসি কান্নাও স্লোগান দিয়া বিক্রি করে । এই পুজির প্রসারে স্লোগান বেশ গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা রাখে সেটা চোখ বন্ধ করে কান খোলা রাখলেই বুঝা যায় । স্লোগানের মনস্ত্বত নিয়ে গবেষনা করেছেন এমন একজন হলো তুর্কি নিবাসি মুজাফের শেরিফ(১৪)। তার গবেষনায় তিনি দেখাইসিলেন কিভাবে একটা ভালো স্লোগান আপনার বিপননকে তার উচ্চে পৌছায়ে দিতে পারে। আবার তিনি আমেরিকার কিছু স্লোগান দেখাইসিলেন যেই স্লোগানের মাধ্যেমে আমেরিকা যুদ্ধে ঢুকছে আবার যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসছে। এরকম একটা প্রভাবশালী স্লোগান ছিলো “ যুদ্ধ থামানোর জন্য যুদ্ধ।” এবং বলা যায় এই একটা স্লোগানই আমেরিকার বিশ্বযুদ্ধে জড়ায়ে যাবার জাস্টিফিকেশন দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো।


আবার পুঁজিবাদে ফিরে আসি। স্লোগান যে হামেশা পুজির খেদমত করে ব্যাপারটা এমন না। মাঝে মাঝে স্লোগান বুমেরাং হয়ে অনেক কর্পোরেট পন্ডিতদের মাথায়ও হাত উঠায়ে দেয়। এখানে একটা মজার ঘটনা উদাহরন হিসেবে দেয়া যায়। ভারতের কর্পোরেট শেট টাটা গ্রুপের নাম প্রায় সবাই জানেন। এই কোম্পানীর একটি গাড়ির মডেল ছিলো টাটা ন্যানো। মাত্র লাখ টাকা মূল্যে এই গাড়ি প্রস্তুত ছিলো বিস্ময়কর ঘটনা । তাই নির্মাতারা এর স্লোগান ঠিক করেছিলো “ সস্তা গাড়ি”। আর এই ক্রেতা টানার স্লোগানটাই ছিলো ভুল। আমাদের মনে যে “ সস্তার তিন অবস্থা” জায়গা করে নিয়েছিলো আগেই ফলে এই “ সস্তার গাড়ির” প্রজেক্ট মাঠে মারা গেছিলো সস্তা শুনে আর কেউ কেনে নাই । টাইমস অব ইন্ডিয়ার সাথে টাটা ইন্ডিকোর মালিক রতন টাটা বাধ্য হয়ে স্বীকার করে নিসিলেন যে “ সব চেয়ে সস্তা গাড়ির” স্লোগানটা আসলে একটা ভুল ছিলো। যার ফলে পুরো টাটা ন্যানোর প্রজেক্টাই ধরা খাইসিলো(১৫)।

স্লোগান নিয়ে এরকম স্লোগান হয়তো আরও অনেক পাওয়া যাইবে। সেসব নিয়া আমার আরেক কিস্তি লেখার ইচ্ছা আছে। কিন্তু জনৈক মহাপুরুষ বলে গেছেন “ এ ভাই স্লোগান দিয়েন না” তাই আমি আজকের মত ক্ষ্যান্ত দিলাম।

নিয়ম হইলো স্লোগান নিয়া খাচ কাটা কুমিরের রচনায় আর কিছু থাকুক আর না থাকুক বেশি বেশি “স্লোগান” শব্দটা থাকতে হবে আর আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে বারবার স্লোগান শব্দটা নিয়ায় আসার। সত্যিটা হইলো স্লোগান শব্দটা আসলেই আমাদের লাইফের একটা বহুল প্রচলিত শব্দ। সুতরাং আমাদের উচিত এইটা ব্যাবহারে আরো সচেতন হওয়া।

দোহাই

১. https://shujan.org/

২ http://www.rtvonline.com/exclusive/13935/%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A7%88%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%85%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%A0%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87-%E0%A6%98%E0%A6%A3%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%AD%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%B2%E0%A7%8B%E0%A6%95-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A6%BE

৩ Triumph and disillusion: Vietnam by Martin Thomas, 1975

৪ ইউটিউবে মার্ক্স লেনিন ভাগাত সিং (https://www.youtube.com/watch?v=VTFZ-Glhu7A) এই লিংকে ভিজিট করুন। বাকিটা তারাই করে দিবে।

৫ তৃণমূল কংগ্রেসের সাইট (http://aitcofficial.org/ ) দেখুন

৬ “Six popular slogans”। DNA India। ২৮ জুন ২০১১

৭ http://www.asianage.com/india/politics/040217/bjp-hijacks-sp-congress-slogan-in-up.html

৮ বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস ১৮৩০ থেকে ১৯৭১ – ডঃ মোহাম্মদ হান
স্লোগানে স্লোগানে রাজনীতি – সাংবাদিক আবু সাইদ খান। অঙ্কুর প্রকাশনী।

৯ https://www.bbc.com/bengali/news-42224068

১০ On slogans by v.ilenin

Published: Published in pamphlet form in 1917 by the Kronstadt Committee of the R.S.D.L.P.(B.). Published according to the pamphlet text.
Source: Lenin Collected Works, Progress Publishers, 1977, Moscow, Volume 25, pages 185-192.

১১ http://sarbaharapath.com/wp-content/uploads/2016/05/%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C-%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%B0%E0%A6%9A%E0%A6%A8%E0%A6%BE_%E0%A6%95%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A7%8B%E0%A6%97%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B8%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A7%87.pdf

১২ জাসদের উথান পতন অস্থির সময়ের রাজনীতি – মহিউদ্দিন আহমেদ

১৩. banglanews24.com ৫ মে ২০১৩

১৪ Muzafer Sherif, “The psychology of slogans.” Journal of Abnormal and Social Psychology, 1937, 32, 450-461

১৫ The Times of India BUSINESS: Ratan Tata: Marketing Nano as ‘cheapest car’ was a mistake
PTI | Updated: Nov 29, 2013,

আরও দেখেন

হ্যারি পটার দ্বারা-দিয়া-কর্তৃক নিহত... হ্যারি পটার সম্পর্কে আমি যা জানি: নাথিং। সিরিজের কোন বই আমি পড়ি নাই, কোনো সিনামাও দেখি নাই। জানি যে স্বর্ণকেশি ধনাঢ্য মধ্যবয়স্কা জে কে রাওলিং উ...
ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’: পর্ব ৫... প্রাসাদের উঁচা রেলিং থিকা মহান খান সাহেব তার সাম্রাজ্যের বিস্তার দেখেন। প্রথমে দেখেন অধিকৃত অঞ্চলগুলারে মিলায়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বিস্তৃত সীমান্তরেখা, ক...
বাংলাদেশে হিপ হপ: হতে-থেকে-চেয়ে... নগর এক্সপান্ড করতে থাকলে লো-ইনকাম পিপল মূল নগরীর আশেপাশে ভিড় জমাতে শুরু করে। ৭০ এর দশকে নিউইয়র্কের ব্রংক্স শুধুমাত্র গরীব লোকেদের বসবাসের জায়গা ছিল না...
Avatar
শোয়েব আব্দুল্লাহ

ননফিকশন লেখেন। অনুবাদ করেন। প্রধান আগ্রহের বিষয় রাজনীতি। রাজনীতি খান। রাজনীতি ঘুমান। রাজনীতি করেন। রাজনীতি পড়েন।

1 Comment
  1. Autolike International, Status Liker, Autoliker, Photo Auto Liker, Status Auto Liker, Photo Liker, Increase Likes, Auto Liker, Working Auto Liker, auto like, ZFN Liker, auto liker, Auto Like, Autoliker, autoliker, autolike, Autolike

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: