fbpx

হাইপাররিয়েল জমানায় সিমস, ব্লেড রানার এবং বদ্রিয়ার

ধরেন, এখন এই লেখাটা পড়তেছেন, পড়তে পড়তেই আপনার ঘুম ভেঙে গেলো, আপনি দেখলেন, যা পড়তেছিলেন তা আসলে একটা স্বপ্নের মধ্যে পড়তেছিলেন  আপনি যখন স্বপ্ন দেখেন, তখন ওই স্বপ্নের মধ্যে যা দেখেন তা খুব বেশি বাস্তব বাস্তব লাগে৷ মিথ্যা কোনকিছু লাগে না আমি ছোটবেলায় প্রায়ই সময় দেখতাম, স্বপ্নে আমি একটা সুন্দর খেলনা গাড়ি পাইছি, তা বালিশের পাশে সুন্দরভাবে রাখা এবং স্বপ্নটা এক সময়ে ভাঙতো এবং ক্রুড রিয়েলিটি- আমার বালিশের পাশে তখন কোন খেলনা নাই

জিনিসটা হজম করতে আমার টাইম লাগতো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মনে কষ্ট নিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে যাইতে হইতো

ইলেক্ট্রনিক্স আর্টস নামের বিশ্বখ্যাত একটা গেইম কোম্পানি আছে তাদের উল্লেখযোগ্য একটা গেইম হইতেছে ‘দ্য সিমস’ এই সিরিজের অনেকগুলো গেইম আছে, এ্যান্ড্রয়েড, আইওএস, কম্পিউটার ভার্সন, এক্সবক্স ভার্সনসহ আরও নানা ভার্সন আছে ইন্টারেস্টিং বিষয়, এই সিমস গেইম সিরিজ অনেকধরণের ফিলোসফিকাল ডিবেটের জন্ম দিছে এবং এই গেইমের উপর পেপার লেখা হইছে অসংখ্য৷ যদিও, নোটেবল কোন বই জানাতক বের হয় নাই, কিন্তু এই গেইম আমার কাছে ক্রুশিয়াল- বর্তমান সময় বোঝার জন্যে

দ্য সিম্‌স ৪

বেসিকালি, এই গেইমে আপনি গড হইতে পারবেন আপনার নিজের জীবনের আপনি নতুন সিমস ক্রিয়েট করবেন, সেই সিমস আপনার ইচ্ছামতোই তৈরি হবে, হাইট/স্কিন কালার, জামা/কাপড় পরায়ে দিতে পারবেন, আপনার ইচ্ছামতো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও দিতে পারবেন, তারপর আপনি তাকে আবিষ্কার করবেন সিমস সোসাইটিতে যেখানে আপনার সিমসের মতই আরও অনেক সিমসের বসবাস এবার তার জীবন কিংবা ভার্চুয়ালি তৈরি আপনার জীবন আপনি সিমসের মাধ্যমে শুরু করবেন সাধারণ মানুষের মতই তার খাওনের দরকার হয়, ঘুমানোর দরকার হয়, গোসল/টয়লেট করার দরকার হয় তার একটা চাকরিও দরকার আপনি তার ক্যারিয়ার গড়ায়ে দিতে পারবেন এবং তার হয়ে অর্থও উপার্জন করতে পারবেন সে হইতে পারবে- ফ্যাশন ডিজাইনার, কফি মেকার, আর্টিস্ট, রাইটার, ব্যুরোক্র্যাট, ল—ইয়ার ইত্যাদি ইত্যাদি অন্যান্য সিমসের সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে, প্রেম করতে হবে, সেক্স করতে হবে, বাচ্চা নিতে পারেন যদি চান যাতে আপনার সিমস জেনারেশন স্মুদ হয়, আগাইতে পারে এবং এইরকম স্টোরি হইতে পারে কাউন্টলেস, যেখানে একটা পর্যায়ে আপনার মনে হবে আপনি আপনার জীবনই তৈরি করতেছেন পারফেক্টলি

এই পারফেক্ট জীবনে আপনার জীবনের গতি থামাইতে আসতেছে না কেউ; যদি না আপনি এইখানে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন, তার জন্যেও মেডিকেল ট্রিটমেন্ট আছে; যদি না আপনি স্টার্ভ করতে থাকেন, তার জন্যেও খাবার আছে ওভারঅল, আপনি একটা জীবন পাইতেছেন এবার আপনি রঙ করেন এই জীবন, যেমন খুশি

গেইমের বাইরে, আমি আর আমার প্রেমিকা একদিন ভাবলাম আমরা একসাথে সিমস খেলব আমি অবশ্য একসময় ছোটকালে সিমস খেলতাম প্রচুর আর সে রেগুলারই খেলে সিমস মাল্টিপ্লেয়ার মুডে খেলা যায় না অন্যজনের সিমসের সাথে খেলতে চাইলে, আগে তার সাথে ফেসবুকে কানেক্ট করতে হবে, পরে আমার সিমসের বাড়িতে একটা পার্টির আয়োজন করতে হয়, সেখানে দুইজনের মধ্যে পরিচয় হবে যেখান থেকে সম্পর্কের শুরুও হইতে পারে- কিন্তু, সেটা লেভেল ৭ এ সম্ভব আমার প্রেমিকা লেভেল ৬ এ ছিলো আমরা দুইজনই স্ট্রাগল করতেছি আমাদের সিমসগুলোকে ওই লেভেলে নিয়ে যাওয়ার জন্যে ততদিনে আমি আমার সিমসকে সিঙ্গেল রাখি নাই গেইমের ভিতরেই তার প্রেম করায় দিছি, জেসি নামে একজন নারী সিমসের সাথে এবং বলাই বাহুল্য, আমার ওই সিমস আমার বাস্তবিক আদলের সাথে মিল রেখে গড়া ছিলো আমার গার্লফ্রেন্ডও তার মতো দেখতে একটা সিমস তৈরি করছিলো যখন আমি তাকে বললাম, আমি একটা রিলেশনে আছি, তবে এটাকে টেইন্টেড রাখছি যেন তোমার সাথে বার্থডে পার্টিতে দেখা হইলে জেসির সাথে ব্রেকআপ করে ফেলতে সহজ হয়৷ ইন্টারেস্টিংলি, সে বিষয়টা সহজভাবে নিতে পারলো না, সরাসরি বলল, “আমার জন্যে তুমি অপেক্ষা করতে পারলা না?”

ফাক, আমার কাছে এইটা একটা গেইমই ছিলো আমার জন্যে জেসি শুধু ওই গেইমেই এক্সিস্ট করে, রিয়েল লাইফে না কিন্তু, আমার গার্লফ্রেন্ড এটাকে সহজভাবে নেয় নাই এটা তার কাছে একটা ক্রুশিয়াল এথিকাল কোশ্চেন

যদি দুইজন প্রেমিক, প্রেমিকা একটা গেইমে থাকে, তবে তাদের জন্যে অন্য গেইম ক্যারেক্টারের সাথে রিলেশনে যাওয়া কি ঠিক হবে?

আপনি বলতে পারেন, এইটা তো কেবল একটা গেমই এটাকে সিরিয়াসলি নেওয়ার কী আছে? কিন্তু, সত্যটা হইলো, আমি গেইমটাকে সিরিয়াসলি না নিলেও, সে গেইমটাকে সিরিয়াসলি নিছে

আপনি তার জায়গায় হইলে কী করতেন? এইটা কি ট্রাস্টের ইস্যু না? যেখানে গেইম ক্যারেক্টারগুলো আমাদের সমর্থক হয়ে উঠে সেখানে আরেকজনের সাথে প্রেম/ভালোবাসায় জড়ানো, এক্সিস্টিং সঙ্গীকে উপেক্ষা করে, কতটুকু এথিকাল?

ওয়েল, গেইমকে শুধু গেইম হিসেবে ট্রিট করলে চলবে না আপনার সঙ্গীও এই গেইম খেলতেছে এবং তার আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি আছে, যেটা আপনি ইগনোর করতে পারেন না

এই ঘটনা শুধু একটা ফিলোসফিকাল এথিকাল কোশ্চেনকেই হিট করে না এর সাথে আরও একখান গুরুত্বপূর্ণ পোস্টমর্ডান এনকাউন্টার জড়িত

ব্লেড রানার মুভিতে রেপ্লিক্যান্ট র‍্যাচেল

আপনি রিডলি স্কটের ব্লেড রানার ফ্র্যাঞ্চাইজ দেখছেন? এই সিরিজের দুইটা সিনেমা “একটা ব্লেড রানার” (১৯৮২), আরেকটা “ব্লেড রানার: ২০৪৯” (২০১৭); দুইটাকেই পোস্টমর্ডান আর্টিফ্যাক্ট হিসাবে ধরা হয় ব্লেড রানার সিনেমা তৈরি হইছে ফিলিপ কে ডিকের “ডু এ্যান্ড্রয়েডস ড্রিম অফ ইলেক্ট্রিক শিপ” (১৯৬৮) বইয়ের কাহিনীর উপর ভিত্তি করে সিনেমার কাহিনী হইতেছে এক ডিসটোপিয়ান পৃথিবীকে পটভূমি হিসেবে ধরে টাইরেল করপোরেশন, এক বিশেষ প্রজন্মের রোবট বা রেপ্লিক্যান্ট তৈরি করে যারা অফ-ওয়ার্ল্ড নামক এক জায়গায় মানুষের সুখ-স্বাছন্দ্যে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত গল্পের নায়ক ডেকার্ড  হইতেছে একজন ব্লেড রানার যার কাজ মানুষের জন্যে তৈরি অফ-ওয়ার্ল্ড নামক বেহেশত থেকে পালায়ে আসা রেপ্লিক্যান্টস যদি পৃথিবীতে আইসা উপদ্রব সৃষ্টি করে তাদের মাইরা ফেলা এক অর্থে, দেকার্ত অনেকটা পুলিশ/কিলারের মতই দায়িত্ব পালন করে৷ কাহিনী আরও অনেক বিস্তৃত৷ একটা পর্যায়ে, ডেকার্ড, উন্নত প্রজন্মের রেপ্লিক্যান্ট ‘র‍্যাচেল’-এর প্রেমে পড়ে তবে এই সিনেমা কেন পোস্টমডার্ন ঘরানার, তা অন্য বিশ্লেষণের জায়গা রাখে এই নিয়ে ম্যাথিউ ফ্লিসফেডার তো বইই লিখেছেন “পোস্টমডার্ন থিওরি এ্যান্ড ব্লেড রানার” (২০১৭) তবে এই সিনেমা ফ্র্যাঞ্চাইজ ইচ্ছা করেই একটা প্রশ্ন রাইখা যায় অনেকভাবে, অনেক ক্লু দিয়ে (স্পয়লার এ্যালার্ট), কিন্তু কখনোই সেই প্রশ্নের জবাব দেয় না- ব্লেড রানার ডেকার্ড নিজেই কি একজন রেপ্লিক্যান্ট না একজন মানুষ? ইভেন এই প্রশ্ন নিয়ে খোদ পরিচালক রিডলি স্কট এবং নায়ক হ্যারিসন ফোর্ডের মধ্যে মতানৈক্য আছে একভাবে বলা যায়, এই প্রশ্নটার অমীমাংসিত থাকাই এই সিনেমার সৌন্দর্য৷ এইটার উত্তর যদি বলে দিত কোনভাবে, সিনেমা নিয়া পরে ভাবনাচিন্তা করার মূল আকর্ষণই চলে যাইত বরং এখানে একটা ফিলোসফিকাল এন্ডিং রাখা হইছে আরেকটা ব্যাপার, র‍্যাচেল রেপ্লিক্যান্ট হইলেও সে আর ডেকার্ড সম্পর্ক তৈরি করে এবং তাদের একটা সন্তানও হয়৷ অর্থাৎ, এইখানে মানুষ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্ট বিয়িং এর মধ্যকার যে ভালোবাসার সম্পর্ক দেখানো হয়েছে তা কি আদৌ সম্ভব? এই বিষয়টা ব্লেড রানার: ২০৪৯ এ আরও ব্যাপক আকারে দেখানো হইছে, যেখানে অফিসার কে (আরেকজন ব্লেড রানার), জোয়ি নামের একজন হলোগ্রাফিক সঙ্গীর উপর প্রেমে পড়তে দেখা যায় কিন্তু, আদতে বৃহৎ ওয়ালেস কর্পোরেশনের একটা বাজারজাত পণ্য হইতেছে জোয়ি জাস্ট লাইক, আপনার একজন ব্যক্তিগত সহযোগী দরকার, ঘরে-বাইরে, নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে, জোয়ির মত হাজাররকমের হলোগ্রাফিক এ্যাসিস্টেন্ট আপনি কিনতে পারবেন অফিসার কে/জোয়ির মধ্যকার এইরকম জটিলতার নমুনা আমরা স্পাইক জঞ্জের “হার” (২০১৩) সিনেমাতেও দেখি একজন থিওডোর এবং নতুন অপারেটিং সিস্টেমের ইন্টেলিজেন্ট পার্সোনালিটি সামান্থার মধ্যকার মানবিক/যান্ত্রিক দ্বন্দ্ব পেইনফুলি, বিউটিফুলি ওয়েতে ফুটায়ে তোলা হইছে সিনেমাটা দেখতে দেখতে আপনার মনে হবে, সামান্থা আসলেই সামান্থা আপনার মনে হবে, পৃথিবীতে প্রেম বেদনাদায়ক, আবার আপনার মনে হবে প্রেম সুন্দর নান্দনিক জটিলতার মারপ্যাঁচে মানুষ/প্রযুক্তির মধ্যের দ্বন্দ্ব, কখনো যে এদের মাঝের পার্থক্যের রেখা যে খুব ঝাপসা হয়ে পড়ে, কোনটা প্রযুক্তি, কোনটা মানুষ এমন কোন সিদ্ধান্তে আসা যে দিনদিন বড় ডিফিকাল্ট হয়ে যাইতেছে, এই সিদ্ধান্ত ব্লেড রানার, হার-এর মতো সিনেমা, কিংবা ব্ল্যাক মিররের (মাস্ট ওয়াচ, যদি আপনি ডিস্টোপিয়ান সাই-ফাই পছন্দ করেন) মত সিরিজগুলো সার্থকভাবে তুলে ধরতেছে এবং এগুলোকে স্রেফ সাই-ফাই বলে উড়ায়ে দিলে ভুল হবে ই.এম. ফর্স্টারের ১৯০৯ সালের “দ্য মেশিন স্টপস” উপন্যাস সেই কবে এমন এক পডের কথা আমাদের শুনাইছিলো যেই পডে বসে স্পেশাল প্লেট দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার এক মা তার ইউরোপে থাকা সন্তানের সাথে মুখোমুখি, দেখে কথা বলতে পারে যেখানে মানবসভ্যতা ছোট ছোট পডে ভাগে ভাগ হয়ে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতেছে এই পডের ধারণা, স্মার্টফোন/ইন্টারনেট-এর খুব সমার্থক আমরা এখন স্মার্টফোনে বসবাস করি এবং অনেকটা স্পেশাল প্লেটের মতোই ক্যামেরা দিয়ে অন্যদের ভিডিওকল করি৷ যা একদিন সাই-ফাই থাকে, তা আসলে একদিন সাই-ফাই থাকে না বাস্তব হয়ে উঠতে থাকে যেখানে রেপ্লিক্যান্টসগুলো আরও বাস্তব, মানুষের মতো বাঁচতে চায়, সন্তান ধারণ করতে চায় যেখানে মানুষ জোয়ি, সামান্থাদের বাস্তব ভেবে অগ্রসর হয় এবং আহত হয়ে ক্ষতবিক্ষত হইতে থাকে মেইন কথা- এই পোস্টমর্ডান আর্টিফ্যাক্টগুলো এক ধরণের অশনীসংকেত দেয় এমন এক সময়ের যেখানে মানুষ এবং উন্নত প্রযুক্তির মধ্যকার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে আমরা মানুষ থেকে যেমন প্রযুক্তি আলাদা করতে পারব না, তেমনি প্রযুক্তি থেকে মানুষ আলাদা করতে পারব না এদের যে কেউ চাইলে একে অন্যকে ডমিনেট করতে পারে

আমি সিমসের ফোরাম বা অনলাইন ডিসকাশনের ঘরে উঁকিঝুঁকি মাইরা দেখি, সিমস ৪ নিয়ে অনেকেই একটু বেশি এক্সাইটেড একজন পোস্ট দিছে, আমার সিমসগুলোতো দেখি নিজের সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতেছে ওইখানে, অনেকে কমেন্ট করতেছে, ধুর মিয়া! তুমি কী পাগল? এগুলা তো প্রোগ্রাম করা সিমস ৪ এ অবশ্য সিমসগুলোর আত্ম-সচেতন হয়ে উঠবার কোন প্রসেস রাখা হয় নাই, কিন্তু গেমারদের অনেকেই সিমসদের সচেতন রাখা হইলে মাইন্ড করতেন না, এইটা স্পষ্ট আমি কিন্তু সিরিয়াস, মানুষজন একদম সচেতন টেক কিছু পাইলে মোটেও মাইন্ড করবে না ইভেন, আমি যদি আরেকটু ‘অস্বস্তিকর’ জায়গায় যাই, সেক্সডল কিভাবে আরও বেশি হিউম্যান করে তোলা যায় সেই বিষয়ে খুব ভালোভাবেই গবেষণা, কাজ চলতেছে আপনি শুধু জানেন না

জাঁ বদ্রিয়ার

জাঁ বদ্রিয়ার তাঁর গ্রাউন্ডব্রেকিং বই “সিমুলাক্রা এ্যান্ড সিমুলেশন” বই নিয়ে হাজির হন ১৯৮১ সালে বদ্রিয়ারের এই বইয়ের মূল বক্তব্য হইতেছে, আমাদের দুনিয়াটা ক্রমাগত একটা হাইপাররিয়েল দুনিয়ায় পরিণত হইতেছে এবং রিয়েলিটি বলে আর কোনকিছু এক্সিস্ট করে না রিয়েলিটি ইজ ডেড সিমুলাক্রা হইতেছে কোনকিছুর কপি বা ইমেজ বা ইমিটেশন ধরেন, ফেসবুকে যে বন্ধু বানানোর কনসেপ্ট, তা কিন্তু বাস্তবের বন্ধু কনসেপ্ট থেকে উদ্ভুত৷ কিন্তু ফেসবুকে বন্ধুর বিষয়টা এমন এক জায়গায় চলে গেছে যেখানে বাস্তবের বন্ধুর থেকে ফেসবুকের বন্ধু অনেক বেশি বাস্তবিক হয়ে উঠতেছে আমি শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই কথাটা বলতেছি না, ‘বন্ধু’-ধারণার ক্ষেত্রেও বলতেছি। এবং এই ফেসবুকের বন্ধুর ধারণার সাথে কিন্তু বাস্তবের বন্ধুর যে ধারণা, তার সাথে যোজন যোজন দূরত্ব আছে ‘ফেসবুকের বন্ধু’-এই কনসেপ্ট এত বেশি রিয়েল হয়ে উঠতেছে যে এখন মানুষ পরিচিত হইলে আগে বলে, আপনার সাথে তো ফেসবুকে এ্যাড আছে আপনার আইডির নাম কী যেন? ফেসবুকের এই যে সিমুলেশন, ফ্রেন্ডশিপের যে সিমুলাক্রাম তৈরি হইছে তাতে বন্ধু আসলে কোনটা (রিয়েল লাইফের না ফেসবুকের) রিয়েল তা নির্ণয় করা কঠিন এইরকম অসংখ্য কপি/ইমেজ/সিম্বল/সাইন মিলে তৈরি হয় সিমুলাক্রা আর এই সিমুলাক্রার যে জগত, সেই জগতে বসবাস করাই হচ্ছে সিমুলেশনের দুনিয়া যদিও বদ্রিয়ার ১৯৮১ সালে এই তত্ত্ব দিছিলেন কিন্তু আমার কাছে ফেসবুককেই মনে হয় একটা সিমুলেশনের আদর্শ উদাহরণ ফেসবুক আলাদা একটা সোসাইটি। এবং আমরা ওই সোসাইটিতে থাকতে পছন্দ করি। কেননা সেখানে নিজেদের প্রোফাইল, বন্ধু, পোস্ট সবকিছু পারফেক্ট ওয়েতে সাজানোর সুযোগ আছে এবং সেখানে ইম্পারফেক্ট যদি কিছু ঘটে সেটা ডিলিট/রিমুভ/ব্লক করার অপশনও আছে। হোয়াটস সো পারফেক্ট দ্যান দিজ?

এবং এইসব সিমুলাক্রা মিলায়ে সিমুলেশনের মাধ্যমে আমরা যে বাস্তবতায় বসবাস করি তা আসলে হাইপাররিয়েলিটি এই হাইপাররিয়েলিটির ভিত্তি মাটি/আকাশ/গাছ দিয়ে গড়া বাস্তবতা না বদ্রিয়ার বলতেছেন, রিয়েলিটি ইজ ডেড। অর্থাৎ, সাধারণভাবে যেই বাস্তবতা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়, তা বর্তমানে অস্তিত্ব হারাইছে। এই হাইপাররিয়েলিটির ভিত্তি নাথিং বা কিছুই না। এই হাইপাররিয়েলিটি তৈরি হইছে ইমেজের, সিম্বলের সিমুলাক্রার মাধ্যমে। তাঁর ভাষায়, আমরা বর্তমানে এই হাইপাররিয়েল দুনিয়াতেই বসবাস করতেছি। হাইপাররিয়েল দুনিয়া বাস্তব না, কিন্তু ‘খুব বাস্তব’ এমন একভাবে আমাদের সবকিছু দেখায়, সিমুলাক্রাগুলোকেই আমরা আসল কপি হিসেবে ধরে নিই এবং সিমুলেশনের দুনিয়ায় থাকতেই পছন্দ করি প্রতিবাদের কোন চিন্তা মাথাতেও আসে না এইটা একটা কালচারাল চেঞ্জ কালচারাল সিম্বল অধিক হারে কপি তৈরি করতেছে আমার একজন বন্ধু, যে পাবজি খেলে এবং যে খুব সিরিয়াসলিই খেলে, সে তো একদিন বিপ্লবী কথা বলেই ফেলল, আমরা যদি এখন মুক্তিযুদ্ধ করতাম, সেরাভাবে যুদ্ধ করতে পারতাম ওয়েল, এইটা শুনে ফার্স্টে মনে হয় খুব এ্যাবসার্ড একখান কথা৷ কিন্তু, সে যে সিমুলেশনের দুনিয়ায় যুদ্ধ করতেছে তাতে ওই গেইমের যু্দ্ধই তার কাছে বেশি রিয়েল, সত্য, সে যখন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতেছে মূলত হাইপাররিয়েল যুদ্ধের পার্সপেক্টিভ থেকে বলতেছে তার কাছে এই গেইমের যুদ্ধ এত বেশি রিয়েল হয়ে উঠছে যে মাঠে-ঘাটে যুদ্ধ করার থেকে ওইটাই খুব প্রাসঙ্গিক, সত্য। তাই বদ্রিয়ারের ভাষায়, সে খুব ভুল কিছু বলে নাই তার উপর এখন যুদ্ধ করার টেকনিকও অবশ্য বদলায় গেছে কন্ট্রোলরুম থেকে পেন্টাগনের ব্যাকরুম বয়েজ যেমনে যুদ্ধের গতিবিধির পরামর্শ দেয়, সুইচ চাপে, জিপিএস দিয়ে লোকেশন ঠিক করে, ড্রোন নিয়ে মিসাইল ছাড়ে তাতে যোদ্ধারা কাইন্ড অফ এক ধরণের ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মধ্যেই যুদ্ধ করে এইটাই হাইপাররিয়েল দুনিয়া

বদ্রিয়ারের নানা সমালোচনা আছে উনি এইক্ষেত্রে মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বারবার টানছেন, কিন্তু মিডিয়ার অডিয়েন্সকে চরমমাত্রায় নিষ্ক্রিয় হিসাবে ধরে নিছেন অডিয়েন্স অতটাও নিষ্ক্রিয় থাকে না সবসময় তবে এই মিডিয়া/অডিয়েন্স বিতর্কে কে বেশি সক্রিয়, এই আলাপ বাদ দিলে হাইপার—রিয়েল দুনিয়ায় মিডিয়ার ভূমিকা যে গুরুত্বপূর্ণ তা মোটামুটি স্বীকৃত

 

আমার প্রেমিকা তাই মোটেও ভুল কিছু বলে নাই আমরা বর্তমানে আমাদের রিলেশনের/সম্পর্কের নমুনা নিয়া একটু ঘাঁটলেই বুঝব, আমরা কী আসলে একটা মানুষকে ভালোবাসি না ফেসবুকের একটা আইডি, সিমস সোসাইটির কোন একটা সিমস বা সামান্থা বা জোয়ি- এদের মত কিছু সিমুলাক্রা ভালোবাসি? ফেসবুকের ছবি দেইখা আমরা আবেগাক্রান্ত হই এমন বহু কেস- ফেসবুকে ছবি দেইখা আবেগে হুমড়ি খায়া পড়া, প্রেম, ভালোবাসা, আবেগে আহত হওয়া ইত্যাদি- এখন খুব কমন ফেসবুকের ছবি, ইটসেলফ এক ধরণের সিমুলাক্রাম ব্যক্তির চেহারা থেকে অনেক বেশি রিয়েল হয়ে উঠে ব্যক্তির প্রোফাইল পিকচার তাই, আমি যখন কোন সিমসের সাথে রিলেশনে যাই, সে নিছক আর গেইম ক্যারেক্টার থাকে না, সে আরও বেশি বাস্তব হয়ে উঠে, একজন প্রেমিকার মতই তাই রিয়েল লাইফের প্রেমিকার এইক্ষেত্রে অফেন্ড খাওয়াটা খুবই বৈধ, যৌক্তিক সবচেয়ে মজার ব্যাপার, দ্য সিমস গেইমের ইতিহাসের মধ্যে এইরকমই কিছু পাওয়া যায় এই গেইমের নির্মাতা উইল রাইটের ভাষ্যমতে, ১৯৯১ সালে অকল্যান্ডের একটা ফায়ারস্টর্মে তার ঘর ধসে যাওয়ায় তিনি এক নতুন ‘ভার্চুয়াল ডল হাউজ’ নামের গেইম তৈরি করতে অনুপ্রাণিত হন ততদিনে ম্যাক্সিসের সিমসিটি (সিমুলেশন অফ সিটি, সিমসের আগের ভার্সন, এখনও চলছে) তাদেরকে উইল রাইট তার এই ভাবনার কথা বলেন- শুধু সিটি মেকিং না লাইফ মেকিং এর দিকেও মন দেওয়া যাইতেই পারে ১৯৯৭ সালে ইলেক্ট্রনিক আর্টস যখন ম্যাক্সিসকে কিনে ফেলল তখন ইএ নতুন এক শক্তিশালী সিম ফ্র্যাঞ্চাইজ তৈরি করার কথা ভাবলো তারই এক সফল ফসল- দ্য সিমস সিম শব্দটার উৎপত্তিও এই সিমুলেশন থেকে সিমসিটি একটা শহরের সিমুলেশন সেইখান থেকেই, সিম- নামকরণ করা হইছে উইল রাইট আরও বলতেছেন, এই সিমস গেইম আমেরিকার কনজ্যুমার কালচারের প্রতি একটা স্যাটায়ারও বটে এইখানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রয়োগের জন্যে আব্রাহাম মাসলোর বিখ্যাত চাহিদার তত্ত্ব, চার্লস হাম্পডেন টার্নার প্রমুখ ফিলোসফার, সাইকোলজিস্টদের থিওরি থেকে আইডিয়া নেওয়া হইছে এবং হইতেছে সুতরাং, গেইমের নির্মাতা আর গেইমারদের চাহিদা আসলে এক অর্থে একই- একটা পারফেক্ট লাইফ তৈরি করা পৃথিবীর জীবনের যে ভাঙন, অস্বস্তি তা থেকে রিলিফ পাওয়া, শান্তি খোঁজা- যা ভার্চুয়াল লাইফ অনেকাংশেই মিটায়া দিতে পারে সেটাকেই আসলে খুব বেশি কাঙ্ক্ষিত মনে হয় তাই, দ্য সিমস গেইমারদের এবং এইরকম সিমুলেশন গেইমারদের কখনো অভাব ঘটবে না কেননা, আরেকভাবে, আমরা প্রত্যেকেই এখন গেইমার, ইন্টারনেট দুনিয়ায়

 

বাংলাদেশ, তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসাবে, এই বিষয়গুলা এখনও খুব ভালোভাবে প্রত্যক্ষ না করতে পারলেও, প্রযুক্তি-উন্নত বিশ্বে এই বিতর্ক খুব জোরেশোরে উঠতেছে কেননা, এখন জীবন আর ভার্চুয়াল জীবন, এদের মধ্যে পার্থক্য খুবই অস্পষ্ট কোনটা রিয়েল আর কোনটা খুব বেশি রিয়েল- তা ডিফাইন করা খুবই কঠিন সবই খুব বেশি রিয়েল, এই হাইপাররিয়েলিটির জায়গায় এইটা অবশ্যই একটা পোস্টমডার্ন সিম্পটম যা ইগনোর করা চলে না তাই অবধারিতভাবে চলে আসে, সেই এথিকাল কোশ্চেন যা প্রযুক্তির ফলে নির্ণিত একটা গুরুত্বপূর্ণ স্ট্যান্ডিং রিমার্কও বটে কিন্তু এইসব প্যারাডক্স, ডিলেমার মধ্যে দিয়ে আমরা যদি হাইডেগারের সেই বিখ্যাত লেকচার “দ্য কোশ্চেন কনসার্নিং টেকনোলজি” (১৯৫৪) স্মরণ করি, তাইলে আমরা আবার বুঝব, আসলে এইসব ঝামেলা, জটিলতার মধ্যে দিয়ে মানুষের বেসিক জায়গাটা ধরতে পারি আমরা বুঝতে পারি, কেন মানুষ আলাদা যখন আমরা প্রয়োজন মনে করব, আসলে এইখানে একটা লাইন টানা প্রয়োজন হয়ে পড়তেছে, প্রযুক্তি আর মানুষের মধ্যে, তখন স্মতঃস্ফূর্তভাবে সেই জিনিসগুলোই, যা আমাদের আলাদা করে দেয়, সেগুলো আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে আমাদের কাছে ধরা পড়ে।

কিন্তু, মেইবি, আমরা একটা স্বপ্নেই বসবাস করতেছি। আমরা যেটাকে বাস্তবতা ধরি, সেটাই যে একটা হাইপাররিয়েল কিছু না, তারই বা গ্যারান্টি কী?

নাকি, আপনি ভাবতেছেন আমিই স্বপ্নে আছি, ‘অ্যা ড্রিমিং বয়’?

ওয়েল, মেইবি আপনিও

তৌকির হোসেন
তৌকির হোসেন

লেখক, গল্পকার। দর্শন আর রাজনীতির মধ্যে থাকেন। বই পড়েন, সিনেমা দেখেন এবং আড্ডাবাজি করেন।

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: