fbpx

হ্যারি পটার দ্বারা-দিয়া-কর্তৃক নিহত

[চাক ক্লস্টারম্যান আম্রিকান লেখক+প্রাবন্ধিক এবং পপ-কালচার জার্নালিস্ট। বহুদিন esquire, espn.com এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে কলাম লিখছেন। মূলত আম্রিকান পপ কালচার ফোকাস করে সোশ্যাল ক্রিটিসিজম লিখে পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করছেন। তার লেখা ১১ বইয়ের ৮ টাই নিউ ইয়র্ক টাইমস বেস্ট-সেলারে স্থান পাইছে, নন-ফিকশন ক্যাটাগরিতে।  “Sex, Drugs & Cocoa Puffs” তার সবচে বিখ্যাত বই।]

হ্যারি পটার সম্পর্কে আমি যা জানি: নাথিং।

সিরিজের কোন বই আমি পড়ি নাই, কোনো সিনামাও দেখি নাই। জানি যে স্বর্ণকেশি ধনাঢ্য মধ্যবয়স্কা জে কে রাওলিং উপন্যাসগুলার লেখক, যদিও জানি না জে আর কে দিয়া কী বুঝায়। সিনামায় হ্যারির পার্ট করা অভিনেতার নাম আমি জানি না, তবে জানি সে চশমা পরে। হ্যারি পটার বাদে অন্য চরিত্রগুলার নাম জানি না, এমনকি প্লটের ন্যারেটিভ আর্ক নিয়েও ধারনা নাই। কাহিনীর ঘটনাস্থল কই কিংবা কাহিনির সময়কাল অতীতে না ভবিষ্যতে, কিছুই জানি না। কয়দিন আগে একজন বল্লো সাত নাম্বার বইয়ে হ্যারি শেষমেষ বেঁচে থাকে (তারমানে এই ইনফরমেশনটা ইম্পর্ট্যান্ট), কিন্তু কোন মরনব্যাধি অসুখে হ্যারি ভুগতেছিল আমার কোনো ধারনা নাই। ক্রিস্টোফার হিচেন্স নিউ ইয়র্ক টাইমসে এই সিরিজ নিয়ে লিখছেন, আমি পড়ি নাই কিন্তু মনে হয় না সে লেখায় তিনি নিক্সনরে টানছেন। আমার ধারনা উপন্যাসগুলাতে ড্রাগন, গ্রিফিন, ওয়্যারউলফ আর হোমোসেক্সুয়াল ফ্রাঙ্কেনস্টেইন আছে, কিন্তু সত্যি বলতে আমার ধারনা ঠিক না বেঠিক তা নিয়া আমার তেমন মাথা ব্যথা নাই। ইন ফ্যাক্ট, কেউ যদি আমাকে জানায় যে হ্যারি পটার মূলত সাংকেতিক ভাষায় লেখা কোরানের তাফসির যা পড়লে পাঠকেরা আমার মাথার ভিত্রে চলা চিন্তাগুলা পড়তে পারবে, আমি পাল্টা বলবো, “বাহ, বেশ তো!”যে কারনেই হোক না কেন আমি এই পটার ফেনোমেনন পুরোপুরি মিস করেছি (এবং আমার ধারনা, ইচ্ছে করেই)।

 

Chuck Klosterman

কিন্তু তারমানে এই না যে আমি এধরনের লেখা অপছন্দ করি। ব্যাপারটা মোটেই সেরকম না। আমার এক কলিগ মনে করে ২১ বছর বয়সের উপ্রে কেউ হ্যারি পটার পড়লে তারে বিনা বিচারে ফাঁসি দেয়া উচিত, যা আমার কাছে অযৌক্তিক মনে হইছে; কারন ১৩ বছর বয়স্ক ব্রিটিশ কিশোরদের উদ্দেশ্যে লেখা উপন্যাস অতি অবশ্যই ৯০% আম্রিকান প্রাপ্তবয়স্কদের চিন্তাভাবনার সাথে যায়। আমার ধারনা এইগুলা বেশ এঙ্গেইজিং উপন্যাস সো অপছন্দ করার প্রশ্নই আসে না। তারচে, মডার্ন টিনেজ ছেলেপেলে অর্বাচীন এক যাদুকরকে নিয়ে লেখা ৫০০ পৃষ্ঠার উপন্যাসের সাথে কেনো একাত্মবোধ করে, এইটা আমাকে বেশি অবাক করে, আর এটাই এই সময়ের কালচারাল কারেন্সি। আমরা সবাই উল্টা এই অপ্রকৃতিস্থ ব্যাপারটা আন্ডারস্টিমেইট করতেছি। কারন এখন কোনো রক গিটারিস্ট বা ড্যাশিং ফিল্মস্টার নয় বরং জে কে রাওলিং বেশি পপুলার। একটা সময় পর, এই উপন্যাস (এবং যেসব ধ্যান্ধারনা তাতে নিহিত) আমাদের ভবিষ্যৎ পপুলার কালচারের মেইনিস্ট্রিম চিন্তাভাবনাকে রিপ্রেজেন্ট করবে। হ্যারি পটার হবে জাস্ট একটা মামুলি ব্যাপার যাকে আপকামিং কালচার একতরফা মেনে নিবে।

এবং আমার তাতে কোনো আপত্তি নাই।

বরং আমি ভাবি এই ফেনোমেনন কি কি ঝামেলার জন্ম দিতে পারে।

আজকের হ্যারি-পটার-পড়ুয়া বাচ্চাগুলা আগামি-পৃথিবী নিয়ন্ত্রন না করলেও প্রায় নিশ্চিতভাবেই তারা ম্যাস মিডিয়ার নিয়ন্ত্রক হবে। আজ থেকে ১৫ বছর পর, তারা বই ছাপাবে, সিনামা বানাবে, আর সিচুয়েশন কমেডির জন্য চুটকি লিখবে যেগুলা আমাদের মাথায় কোনোরকম বাধাবিপত্তি ছাড়া ফুঁস করে ঢুকে যাবে। এবং সব প্রজন্মের আর্টিস্টরা যেমন করে এসেছে তেমনি তারাও নিজেদের নস্টালজিক করে তুলবে। তারা তাদের সম্মিলিত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা দিয়ে ডিস্কোর্স তৈরি করবে। তাই আমি অবাক হয়ে ভাবি: যেহেতু আমি হ্যারি পটার বুঝি না, সেহেতু, তখনকার সবকিছু উল্টা বুঝাই কি আমার নিয়তি হবে?

আমার এক বান্ধবি স্টার ওয়ার্সের কোন সিনামা দেখে নাই, ফলে ‘দ্য অফিস’-এ Wookie* নিয়ে যখন কোনো জোক করা হয় তখন আমার বান্ধবি বুঝতে পারে যে হাসির কিছু বলা হইছে কিন্তু তার হাসি পায় না। কলেজে পড়ার সময় একজনকে চিনতাম যে (খুব চেষ্টাচরিত্র করেও) তিনটার বেশি বিটলসের গানের নাম করতে পারতো না। তার মধ্যে একটা ছিল আবার বিটলসের কাভার দেয়া ‘Twist & Shout’**, সেটাও আবার ট্র‍্যাকটা Ferris Bueller’s Day Off সিনামায় ব্যবহৃত হইছিল, তাই। প্র‍্যাক্টিক্যালি দেখলে, এইধরনের জ্ঞানশুন্যতা জীবনে খুব বেশি বিপত্তি আনে না, তারুপ্রে অনেকেই যুক্তি দেখাবে এসব আজাইরা জিনিস না জেনে তারা বরঞ্চ বেশি-ভালো আছে। তারপরেও, বেশিরভাগ আম্রিকান যা কিছু কমন নলেজ হিশাবে বিবেচনা করে তার থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছিন্নতা আদতে স্পর্শাতীত ডাউনসাইডের জন্ম দেয়। ব্যাপারটা এমন না যে স্টার ওয়্যার্স না দেখলে কেভিন স্মিথের সিনামার মর্মোদ্ধার করা যায় না কিংবা বিটলসের গান না শুনলে অ্যাপল স্টেরিও-র স্বাদ নেয়া যায় না; যদিও এদের ভিত্রেকার কানেকশান সুস্পষ্ট (এবং অর্থহিন)। যেটা কম স্পষ্ট (এবং বেশি জরুরি) তা হলো একটা নির্দিষ্ট সময়কালে সবচে পপুলার জিনিস অদৃশ্য হাতে কালচারের মাত্রা নির্ধারন করে (‘পপুলার কালচার’নিয়ে লোকে কেন মাথা ঘামায় সেই মৌলিক প্রশ্নের শুরুয়াত এখানেই)।

 

হ্যারি পটার ফ্যান আর্ট

 

প্যাঁচমারা ব্যাখ্যা-বিবরন বাদ দিলে, মোটাদাগে ইনফর্মেশন ৩ প্রকার।

১. সেই  ইনফর্মেশন যা আপনি জানেন যে আপনি জানেন।
২. সেই  ইনফর্মেশন যা আপনি জানেন যে আপনি জানেন না।
৩. সেই  ইনফর্মেশন যা আপনি জানেনও না যে আপনি জানেন না।

আমি বিশ্বাস করতে চাই হ্যারি পটারের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক দ্বিতীয় ক্যাটেগরিতে পড়ে; রাওলিংয়ের বইয়ে থাকা ইনফর্মেশনগুলা যে আমার বোধগম্য না তা আমি সচেতনভাবে জানি। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। এই উপন্যাস ঘিরে যে  বিশাল-ব্যাপক ফেনোমেনন, তার থেকে আমি আমার-অসচেতনতার-ফলে-সৃষ্ট-পরিনতি আলাদা করতে পারি না। এবং এইখানে এসে হ্যারি পটারের সাথে আমার সম্পর্কে তৃতীয় ক্যাটেগরিতে নেমে যায়: আমি শত চেষ্টাতেও বুঝে উঠতে পারি না এই সাড়ে ৩২ কোটি বই কী ধরনের সোশ্যাল ইম্প্যাক্ট ফেলতে যাচ্ছে। বছরের পর বছর চলে যাবে, আর এই টিনেজ যাদুকরের গল্পকাহিনির ইনফ্লুয়েন্স এত বিস্তৃত হবে যে আল্টিমেইটলি তা আর খালি চোখে ধরা যাবে না। দুই দশক পর, হ্যারি পটার রেফারেন্সে কথা হলে আমি আর কনফিউজড বা এলিয়েন্যাটেড হবো না; বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, আমি ধরতেই পারবো না যে কোনো রেফারেন্স দেয়া হইছে! আমি জানবো না আমি কী মিস করতেছি। আমার শুধু বোরিং লাগবে, কিন্তু কেন, আমি সেটা ধরতেও পারবো না।

হ্যারি পটারের সাত উপন্যাসের কাহিনি আমি এভাবে ভাবি: আমি কল্পনা করি হ্যারি একজন এতিম যার বাবার সাথে সম্পর্ক খুবই বাজে ছিল (অনেকটা টপ গান বা ডেইজ অফ থান্ডার বা অ্যা ফিউ গুড মেন মুভিগুলায় টম ক্রুজের চরিত্রের মতন)। সে সামহাউ একধরনের বিমূর্ত দাসত্ব থেকে পালিয়ে যাদুকর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাই সে যাদুকর কলেজে ভর্তি হয় এবং সেখানে একদল বাতিকগ্রস্থ-সেকেলে-যাদুকরদের সাক্ষাৎ পায়। আমার ধারনা হ্যারি সেখানে এমন কারো প্রেমে পড়ে যার সাথে তার সেক্সুয়াল রিলেশন হয় না। সম্ভবত কলেজে ভালো শিক্ষক আর খ্রাপ শিক্ষক আছে এবং (আমি শিওর) তারা একে অপরের সাথে ফাইট করে। তারপর এক থিওরেটিক্যাল ভিলেইন পৃথিবী ধ্বংস করতে চায় সুতরাং সব বাচ্চা যাদুকর একত্র হয় এবং পুরো মহাবিশ্বকে রক্ষা করে। কিভাবে? কড়াইয়ে কালো বিড়াল ফুটিয়ে আর টেরোড্যাক্টিলের*** দিকে কঠিন বজ্র নিক্ষেপ করে! অতপর হ্যারি হোয়াট-অ্যাকচুয়ালি-জীবন-ইজ সেই ধারনা পায়, তার ভিত্রে তিতিক্ষা আর নেতৃত্ববোধ জন্মায়  এবং শেষমেষ সে মরে না। THE END.

এখন বুঝি আমার এত্তগুলা ডিটেইল অনুমান করা নিষ্প্রয়োজন। আমি চাইলে ৪ হাজার পৃষ্ঠার প্লট-সামারি উইকিপিডিয়া থেকে ৪০০ শব্দে জেনে নিতে পারি অথবা যেকোনো হাই স্কুলে গিয়ে প্রথম যে বাচ্চাকে পাবো তাকে জিজ্ঞেস করলেই হবে অথবা আমি বইগুলা কিনেও পড়তে পারি, এবং আমার ধারনা বইগুলা খুবি আনন্দদায়ক। কিন্তু আমি এর কোনোটাই করবো না। করার কারন খুঁজে পাই না, যদিও জানি খুঁজলে কারনের অভাব পড়বে না। এত আপাতবিরোধি! আই মিন, আমি না চাইলেও এই উপন্যাসগুলা ‘স্টাডি’করা কি আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে? হয়তো তাই। একটা কারন, Esquire আমাকে টাকা দিছে এই টাইপের ফেনোমেনন কন্টেক্সুয়ালাইজ করার জন্য, ভবিষ্যতেও যে ফেনোমেননের দাগ থেকে যাবে। দীর্ঘস্থায়ি অর্থনৈতিক সুবিধা বিবেচনা করলে আমার উচিত সবগুলা হ্যারি পটার পড়ে ফেলা, হেলা করা মানেই অবসরকালীন বিনিয়োগের পরিমান কমে যাওয়া। আমি যদি আরও দায়িত্বসচেতন নাগরিক হতাম, তাহলে জোর করে হলেও আল্লার নাম নিয়ে এই টিনেজ যাদুকর সম্পর্কে যত বেশি সম্ভব জেনে নিতাম, সিমপ্লি অর্থনৈতিক আত্মরক্ষার খাতিরে। কিন্তু এখন পর্যন্ত নিজেরে দিয়ে সেটা করাইতে পারি নাই। এবং দিনশেষে (অথবা দিনের শুরুতে, অথবা যেকোন সময়) এই না-জানা নিয়ে আমার বেশি-একটা মাথাব্যথা নাই।

কিন্তু পাবলিক্লি এই ধরনের অবস্থান বিপদজনক। আমি ইচ্ছা করে নিজের জেনারেশন গ্যাপ তৈরি করতেছি। বর্তমান সময়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে ভবিষ্যৎ আমার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সামনের দিনে বিনোদনের অ্যাস্থেটিক্স নিয়ে আমার ধ্যান-ধারনা বাতিল হয়ে যাবে, ২০২৫ সালের হিপস্টার প্রজন্মের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা আমি ধরতে পারবো না। আমি শুধু বয়সেই বুড়া হবো না, আমার চিন্তা-চেতনাও সেই টাইমফ্রেমে বুড়া হয়ে উঠবে। তখন আমি হবো টেরোড্যাক্টিল, এবং আমাকে হত্যা করা হবে। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

 


নির্ঘন্ট [অনুবাদক ]

*Wookie: কাল্পনিক মহাজাগতিক প্রানিবিশেষ। স্টার ওয়্যার্স সিনামায় হান সোলোর মেইট চিওবাকা একটা অথবা একজন য়্যুকি।

**Twist & Shout: দ্য টপ নোটস ১৯৬১ সালে প্রথম  গানটি রেকর্ড করে। দ্য বিটলস ‘৬৩তে তাদের প্রথম অ্যালবামে এটি কাভার করে।

***টেরোড্যাক্টিল: Pterodactyl. জুরাসিক যুগের রেপ্টাইল। পাখিদের পূর্বপুরুষ।

আরও দেখেন

ইতালো ক্যালভিনোর ‘অদৃশ্য শহর’: পর্ব ৫... প্রাসাদের উঁচা রেলিং থিকা মহান খান সাহেব তার সাম্রাজ্যের বিস্তার দেখেন। প্রথমে দেখেন অধিকৃত অঞ্চলগুলারে মিলায়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বিস্তৃত সীমান্তরেখা, ক...
স্লোগান নিয়া খাঁজকাটা কুমিরের রচনা... স্লোগান নিয়া একটা রচনা কিভাবে শুরু করা উচিত ‘স্লোগান একটা গৃহপালিত প্রানী’ এইভাবে নাকি আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে একটি স্লোগান বয়ে গেছে? ঠিক বুঝতে প...
বাংলাদেশে হিপ হপ: হতে-থেকে-চেয়ে... নগর এক্সপান্ড করতে থাকলে লো-ইনকাম পিপল মূল নগরীর আশেপাশে ভিড় জমাতে শুরু করে। ৭০ এর দশকে নিউইয়র্কের ব্রংক্স শুধুমাত্র গরীব লোকেদের বসবাসের জায়গা ছিল না...
আবীর হাসান একা
আবীর হাসান একা

True life is elsewhere. We are not in the world.

2 Comments
  1. ইন্টারেস্টটিং! খাইছে। লেখার আইডিয়া কি হালার! গুড নেস। এই ফ্রেমটাও দারুণ; লগে কালচারাল মকিং এর কি ব্যাখ্যা খাঁড়া করছে! আমি নিজেই তো এখন আনসেইফ+ন্যাগেটরি ফিল করতেছি! :O

    অনুবাদ, দুর্দান্ত হোল স্কয়ার। মূল লেখার রস একটুও কমে নাই। বাড়তি নির্ঘন্টের জন্য থ্যাংকস।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: