fbpx

আপনার কি মনে হয় আপনার চারপাশের সবাই আহাম্মক? কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ কেবল আপনি একাই? তাহলে আপনি নিজেই বোধ হয় জার্ক।

একজন জার্কের চোখে জগতটাকে দেখার চেষ্টা করেন। পোস্ট অফিসের সামনে লোকের সারি আপনার চোখে যেন এক স্তূপ অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল; এটা খুবই অন্যায় যে তারা যখন আবেদন করা নিয়ে বিড়বিড় করবে তখন আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। ফ্লাইট এটেন্ডেন্ট মোটেও তার যত্ন-আত্তি আর দৈনন্দিন সংগ্রাম নিয়ে একটা ইন্ট্রেস্টিং মানুষ না বরং কর্পোরেশান এর সবচেয়ে সহজলভ্য চেহারা যার আহাম্মকি আপনাকে ফোন বন্ধ করতে বাধ্য করে। জিম্মাদার আর কেরানীরা হচ্ছে অলস অভিযোগকারী যারা এমন একঘেয়ে রুটিনবদ্ধ কাজ করার জন্যেই উপযুক্ত। স্টাফ মিটিং এ আপনার সাথে দ্বিমত পোষণ করা আহাম্মকের তো গুলি খাওয়া উচিত। সাবওয়েতে ঢোকা মানে একদল বোকা ও সাধারণ মানের মানুষদের ভিড় ঠেলে ঢোকা।

 

আমাদের একটা জার্ক-তত্ত্ব দরকার। এমন একটা তত্ত্ব দরকার যেন এটা প্রথমত আমাদের ঠাণ্ডা মাথা আর পরিষ্কার বোঝাপড়া নিয়ে এমন একটা জন্তুর মুখোমুখি হতে সাহায্য করে। কোন নেচার ডকুমেন্টারির ভয়েস ওভারে কল্পনা করেন-

আমরা এখন একজন জার্ককে তার প্রাকৃতিক পরিবেশে দেখতে পারছি। খেয়াল করেন কিভাবে সচেতনভাবে সে ইতালীয় রেস্তোরার ঘটনায় নিজের কর্তৃত্বশালী রূপটি দেখায়। আর দ্বিতীয়ত…- ও আচ্ছা! আমি দ্বিতীয় কারণটা এখন বলতে চাচ্ছি না।

 

ঘটনাচক্রে, এরকম একটা তত্ত্ব আমার আছে। কিন্তু সেদিকে যাবার আগে কিছু টার্ম বুঝিয়ে দেয়া দরকার। ‘জার্ক’ শব্দটা দু’ ধরনের মানুষদের বোঝাতে পারে (আমি শব্দটার যৌন ব্যবহার আর ভৌত ব্যবহারকে বাদ দিয়ে এর বিবেচনা করছি)। আমরা যদি শব্দটার আদি ব্যবহারের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে জার্ক বলতে নৈতিকভাবে ঘৃণ্য নয় এমন মাথামোটা নির্বোধ লোককেই বোঝাতো। যখন উইয়ার্ড আল ইয়াঙ্কোভিচ ২০০৬ সালে গাইলো, ‘আমি তাত ফলের বিরুদ্ধে মামলা করেছি কারণ যখন আমি তাতের সাদা চাড্ডি আমার মাথায় পড়ি তখন আমাকে জার্ক এর মত দেখায়’। অথবা ১৯৫৯ সালের পয়লা মার্চে উইলিয়াম টেম্পেল লস এঞ্জেলেস টাইমস এ প্রকাশিত একটা ছোটগল্পে লিখেছেন, ‘সে ক্যাম্পাসের সেরা সুন্দরীকে বিয়ে করতে পারতো, তার বদলে বেচারা জার্কটা একটা বোঁচা নাকের চিকনির প্রেমে পরলো’। তাই এটা পরিষ্কার যে গান বা গল্প লেখার সময় তারা ‘মাথামোটা’ অর্থেই জার্ক শব্দটা ব্যবহার করেছে।

 

বোকা অর্থে জার্ক শব্দের ব্যবহার বোধ হয় ‘জার্ক ওয়াটার টাউন’ এর সরল-সহজ মানুষদের উপহাসিক উল্লেখ থেকে শুরু হয়। মানে এমন একটা টাউন যেখানে একটা রেলস্টেশন পর্যন্ত পুরোপুরিভাবে নেই, বয়লার ম্যানকে চেইন টেনে ট্রেন থামিয়ে এঞ্জিনে পানি দিতে হয়। বলা যায়, এই টার্মটা এসেছে যাত্রীদের তাচ্ছিল্য থেকে। কিন্ত সময়ের সাথে এটা প্রথমত একটা ক্লাস-বেইজড অপমান থেকে দ্বিতীয়ত (এখন যেটার চল বেশি), একটা নৈতিক নিন্দার টার্মে পরিনত হলো। ক্লাস-বেইজড অপমান থেকে নৈতিক অবক্ষয়ের মত অর্থ-বিচ্যুতি ভাষার একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য। ফ্রেড্রিক নিটশা যেমনটা আলোচনা করেছিলেন তার অন দ্য জিনিওলজি অফ মোরালিটি (১৮৮৭) তে। (ইংরেজীতে, জার্ক বলতে বর্তমানে অভদ্র, পাজি, ইতর ইত্যাদি বোঝায়) আর তাই সেই ‘অনৈতিক’ জার্ক কে নিয়েই আমরা আলোচনা করছি।

 

কিন্ত কেন? আপনি বোধ হয় ভাবছেন, একজন দার্শনিকের কি উচিত প্রচলিত গালাগালকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা? আরবান ডিকশানারি কি সেটা যথেষ্টই করে থাকে না? আমার কি উচিত না সত্য, সুন্দর অথবা জ্ঞানের মত বিষয়ের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা অথবা কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে কেন- এ বিষয়ে? (দার্শনিক সিডনি মর্গেনবেসার এর জবাব দিয়েছিলেন, যদি কিছু না-ও থাকতো তাহলেও আপনি কমপ্লেন করতেন)। সত্য বলতে আমি এই সবগুলো বিষয়েই আগ্রহী। আর আমার ধারণা জার্ক টার্মটার মধ্যে একটা লোকজ জ্ঞান আছে যা নৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছুতে ইঙ্গিত করে। আমি সেই নৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টাকে বের করে আনতে চাচ্ছি। আমি সেই মূল ঘটনাটাকে আলাদা করতে চাচ্ছি যার অভিজ্ঞতা শব্দটাকে অর্থ দেয় বলে আমি মনে করি। এই ধরণের কাজ আগে যেগুলো হয়েছে তার মধ্যে দার্শনিক হ্যারি ফ্রাঙ্কফুর্টের ‘অন বুলশীট’ (২০০৫) আর কাছাকাছি কাজ হিসেবে আরভিন জ্যামস এর ‘এসহোলস’( ২০১২) এর কথা উল্লেখ করা যায়। কুরুচিপূর্ণ বিষয়ে আমাদের রুচি আমাদের মূল্যবোধেরই পরিচয় দিয়ে থাকে।

 

নৈতিক দিক দিয়ে ভাবলে ‘জার্কিচুড’ এর সারকথা হচ্ছে: একজন জার্ক তার আশপাশের অন্যদের নীতিবোধ এবং বিদ্যা-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসাবে দেখে না বরং তাদের দৃষ্টিভঙ্গী বুঝতে মোটামুটিভাবে ব্যর্থ হয়। সে তাদেরকে হয় ম্যানিপুলেট করার যন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে, না হয় ‘নির্বোধ -যার সাথে মানিয়ে চলা লাগে’ এমনভাবে দেখে থাকে। এই ব্যর্থতার একইসাথে একটা ইন্টেলেকচুয়াল এবং ইমোশনাল মাত্রা আছে এবং ব্যর্থতার এই দুটো মাত্রা সম্পর্কের দু পাশেই দেখা যায়। একজন জার্ক নিজেই ইন্টেলেকচুয়াল এবং ইমোশনাল দিক দিয়ে ত্রুটিপূর্ণ, এবং সে ত্রুটিপূর্ণভাবেই তার চারপাশের মানুষদের ইন্টেলেকচুয়াল এবং ইমোশনাল দৃষ্টিভঙ্গীর কদর করতে পারে না। সে বুঝতেই পারে না কিভাবে কিছু কিছু ব্যাপারে সে ভুল হতে পারে এবং অন্যরা ঠিক হতে পারে। অন্যরা কি চায় বা কোন বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয় তাতে তার কিছু যায় আসে না। ‘ডাহা মূর্খ’ হিসাবে শব্দটার আদি ব্যবহারটা পরিবর্তিত হয়ে জার্ক এখন একধরণের নৈতিক-অজ্ঞতা অর্থেই ব্যবহৃত হয়।

ম্যাকিয়াভেলিয়ানিজম, নারসিসিজম এবং সাইকোপ্যথি এবং ইতোমধ্যে উল্লেখিত জেমস এর ‘এসহোল’ ধারণার মতো জার্ক এর কিছু লক্ষন সাইকোলজি আর দর্শনে ইতোমধ্যেই বেশ সুপরিচিত। কিন্তু জার্ক সম্পর্কে আমার ধারনা এর থেকে আলাদা। জেমস এর ধারনায় এসহোল হচ্ছে এমন একজন যে নিজেকে বিশেষ বিশেষ সুবিধাভোগের দাবিদার মনে করে এবং সেই সব সুবিধা এঞ্জয় করে থাকে। সেটা জার্কিচুড এর অনেকগুলোর মাত্রার একটি কিন্তু পুরোগল্প এটা আমাদের বলে না। নির্বিকার সাইকোপ্যাথ যে আবেগতাড়িত ও ঝুকিপ্রেমী সেটা জার্কের চরিত্রে না-ও থাকতে পারে। জার্ক হতে হলে নারসিসিস্ট এর মত পুরোপুরি আত্মমগ্ন হতে হবে না আবার ম্যাকিয়াভেলিয়ান এর মত সিনিকালও না, যদিও নার্সিসিজম এবং ম্যাকিয়াভ্যালিজমের অনেক বৈশিষ্টই জার্কের আছে। আমার ‘জার্ক’ এর ধারণায়, একটা ধারনাগত ঐক্য আছে যা একই সাথে তাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয় এবং এই জাতের প্রাণীর কিছু উদ্ভট বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যাতে সক্ষম, যা আমরা কিছু পরেই দেখতে পারবো।

জার্ক এর বিপরীত কিছু হচ্ছে ‘সুইট হার্ট’। একজন সুইটহার্ট তার চারপাশের মানুষদের, এমনকি অপরিচিতদেরও পৃথক এবং গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী সহ মানুষ হিসাবে দেখে, তার মতে সে সকল মানুষদের মতামত, আশা-আখাংখা, আগ্রহ, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য মনোযোগ এবং সম্মানের দাবিদার। একজন সুইটহার্ট তাড়ায় থাকা একজন শপারকে লাইনে তার জায়গাটুকু দিয়ে দেয়, কাগজ পড়ে গেছে এমন কাউকে থেমে গিয়ে সাহায্য করে, একজন অল্প পরিচিত ব্যক্তিকেও অনিচ্ছাকৃতভাবে রুঢ় হবার জন্যে বিব্রতভঙ্গীতে ক্ষমা চায়। কোন তর্কে, একজন সুইটহার্ট দেখে সে নিজে কিভাবে ভুল এবং অপর মানুষটিকে কিভাবে ঠিক হতে পারে।

জার্কদের নৈতিক এবং ইমোশনাল ব্যর্থতাটি একেবারে সংশয়ের উর্ধ্বে। তার ইন্টেলেকচুয়াল ব্যর্থতার কথাও নিশ্চিতভাবে বলা যায়, কোন মানুষই সবকিছুর ব্যাপারে সঠিক হতে পারে না, যেমনটা একজন জার্ক ভেবে থাকে। সে তার জার্ক হবার আদর্শ সুযোগের ব্যাপারে একটা জিনিস শিখতে পারে, তা হলো – এ ব্যাপারে একটা সত্য যা আমি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করবো, তা হচ্ছে একজন সম্পূর্ন জার্ক অবশ্যম্ভাবীরূপে মূর্খ। এটা আমাদের জার্ক তত্ত্বের আরেকটা ব্যবহারের খোজ দেয়, তা হলো এটা আপনি নিজেও জার্ক কিনা তা এটা বুঝতে সাহায্য করবে।

কিছু ব্যাখ্যা এবং সতর্কীকরণ।

প্রথমত, কেউই আদর্শ জার্ক অথবা আদর্শ সুইটহার্ট হতে পারে না। মানুষের ব্যবহার – যা অবশ্যই- প্রেক্ষাপট অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হয়। আবার বিভিন্ন পরিস্থিতি কারো ভেতরের জার্ককে বা সুইটিকে বের করে আনতে পারে।

দ্বিতীয়ত, জার্ক হচ্ছে এমন একজন যে ‘মোটামুটিভাবে’ তার চারপাশের মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গীকে মূল্যায়নে ব্যর্থ হয়। ছোট বাচ্চা এবং মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষরা অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গীকে মূল্যায়ন করতে পারে না, আর তাই তাদেরকে তাদের ব্যর্থতার জন্যে দায়ি করা যায় না এবং তাদের জার্কও বলা চলে না। আর তাছাড়া সব দৃষ্টিভঙ্গীও একইভাবে বিবেচনার দাবিও রাখে না। যেমন কোন নিও–নাজির দৃষ্টিভঙ্গীকে মূল্যায়নে ব্যর্থ হওয়াকে জার্ক হবার লক্ষন বলা যায় না-যদিও একজন আদর্শ সুইটহার্ট তা চেষ্টা করে দেখতে পারে।

তৃতীয়ত, আমি জার্ককে একজন ‘পুরুষ’ হিসাবে দেখি এবং তার কারণও আপনারা ধারণা করতে পারেন। কিন্তু আমি সুইটহার্টকে ‘নারী’ হিসাবে দেখতে নারাজ।

আমি বলেছিলাম যে তত্ত্বটা আমরা নিজেরাও জার্ক কিনা তা বুঝতে সাহায্য করবে। কিন্তু এটা আসলে অত্যন্ত কঠিন একটা প্রশ্ন। ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির সাইকোলজিস্ট সিমিন ভ্যাজাইর বলেন, আমরা আমাদের বৈশিষ্ট্য ভালোভাবেই জানতে পারি যখন সেগুলো মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তি-নিরপেক্ষ এবং সরাসরিভাবে দেখা যায়, আর ভালোভাবে জানতে পারি না যখন সেগুলো নিজস্ব চিন্তাচেতনা দিয়ে মূল্যায়িত হয় এবং সরাসরি দেখা যায় না। যদি আপনি কাউকে জিজ্ঞেস করেন সে কতটা বাচাল অথবা সে কি অতি-অভিমানী বা অপেক্ষাকৃতভাবে হাসিখুশি কিনা, এরপর তার বন্ধুবান্ধবকে তার ব্যাপারে একই প্রশ্নগুলো করেন, তখন দেখা যাবে তার নিজের মূল্যায়ন আর তার বন্ধুবান্ধবদের মূল্যায়ণে খুব একটা ফারাক নেই। এবং এই দুই দলের মূল্যায়নও সাইকোলজিস্টদের সবচেয়ে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের ফলাফলের কাছাকাছি হবে।

কিন্তু কেন? কারণ কি এই যে, একটু কম-বেশী বাচাল হওয়া বা কম কথা বলাটা বেশি বা কম ভালো? অথবা খুব হাসিখুশি থাকাও যেমন ঠিক আছে, চুপচাপ থাকাটাও তাই? আর এসব দিক লক্ষ্য না করেও পারা যায় না-এই জন্যে? কিন্তু আসলে আমরা কেউই একরোখা, বোকা, অসাধু এবং অসৃষ্টিশীল হতে চাই না। আর আপনি নিজেও ওভাবে নিজেকে দেখতে চাইবেন না, তাই আপনার জন্যে এই লক্ষনগুলো বাদ দিয়ে দেয়াটা তাই খুবই সহজ। সবচেয়ে বড় কথা, এই বৈশিষ্ট্যগুলো বাইরের কিছু আচরনের সাথে বেশ জটিলভাবে সম্পৃক্ত। তাছাড়া আমরা সবসময় ভুল বোঝাবুঝির শিকার হই- এই ধারনা নিয়েও বসে থাকতে পারি। আর এভাবেই আমরা আমাদের ভুলগুলো দেখতে পাই না।

তাই, ভ্যাজাইর এর ‘নিজেকে জানার’ মডেলটা কে মাথায় রেখে, এই অনুমান আমরা করতে পারি-নিজের বিবেচনায় কারো আপেক্ষিকভাবে জার্ক হবার মূল্যায়নের সাথে তার আসলেই জার্ক হবার তেমন কোন সম্পর্ক নেই। তাছাড়া, নানা আচরণকে র‍্যাশনালাইজ করাও তো কত সহজ! আপনি ক্যাশিয়ার মহিলাটির সাথে খারাপ ব্যবহার করলেন কেন? – সে এটা এক প্রকার ডিজার্ভ করে আর তাছাড়া আমারও একটা খারাপ দিন যাচ্ছে। আপনি কেন নিজের সু্যোগ আসার আগেই শেষ মুহূর্তে গাড়ির লাইন এর মাঝে ঢুকে পড়লেন? –আরেহ, এটাকেই তো বলে কৌশলী গাড়ি চালনা –আর তাছাড়া আমার তাড়া আছে! ঐ এসাইনমেন্ট এক ঘন্টা দেরীতে জমা দেয়া ছাত্রটাকে ফেল করিয়ে আপনাকে এত আনন্দিত লাগছে কেন? – আরেহ নিয়ম তো পরিষ্কার করে বলে দেয়া ছিল, আর এটার মাধ্যমে সময়মতো এসাইনমেন্ট জমা দেয়া ছাত্রদের প্রতি সুবিচার করা হয়, আর সেটা আমার মুখভঙ্গী ছিল, হাসি ছিল না।

যেহেতু কারো চরিত্রের খুতগুলো জানার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে সে যাদের মতামতকে গুরুত্ব দেয় এমন সব মানুষদের অকপট প্রতিক্রিয়াগুলো শোনা, একজন জার্কের ‘নিজেকে জানার রাস্তায়’ ভ্যাজাইর এর মডেল নির্দেশিত পদ্ধতির বাইরেও বেশ কিছু বাধার সম্মুখিন হতে হয়। সংজ্ঞানুসারে, সে অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গীকে সম্মান করতে পারে না। স্বভাবতই তার সমালোচনা গ্রহণ করার বদলে সমালোচকদের বোকা বলে খারিজ করার বা তাদেরকেই জার্ক বলার প্রবণতা থাকার কথা।

এতদসত্ত্বেও, একজন আদর্শ জার্কের পক্ষে সুপারফিশিয়ালভাবে নিজেকে জার্ক হিসাবে স্বীকার করা সম্পূর্ণভাবে সম্ভব। সে হয়তো বলতে পারে- ‘ তো কি হয়েছে? আমি একটা জার্ক’। এই লেবেল যেহেতু তার নিজেকে অনুমোদন করতে কোন অসুবিধা সৃষ্টি করে না, তাই জার্ক এর নৈতিক দিক থেকে নিজের ব্যাপারে অজ্ঞানতা থেকেই যায়। জার্কের অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গীর মূল্যায়ন করতে না পারার একটা কারণ হচ্ছেঃ অন্যদের চিন্তা-ধারনাকে খারিজ করার এই কাজটা যে ‘অনুচিত’ তা সে বুঝতে পারে না।

আইরনিকভাবে, তখন সুইটহার্ট মনে করে সে নিজেই অযথাযথ আচরণ করেছে এবং হয়তো সে জার্কের মতই একটা কাজ করেছে। আর তখন সে সব ঠিকঠাক করতে চেষ্টা করতে থাকে। এমন মানসিকচাপ নেয়া কারো পক্ষে সম্ভবই না যদি না সে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গীকে খুব গুরুত্বের সাথে নিয়ে থাকে। আসলে এই মানসিকচাপটা নিজেই তাকে আদর্শ জার্ক হতে দেয় না, কিছু হতে পারে এমন ভাবনাই, এমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়। কিন্তু আপনি যদি এই চিন্তা করার ব্যাপারটা থেকে সান্তনা খুজেন এবং এটা নিয়ে চিন্তা করা বাদ দিয়ে দেন, তাহলে তখন আপনি আপনার সান্তনার ভিত্তিটাকেই দূর্বল করে দিলেন।

সব সাধারণ জার্ক তাদের জার্ক-সুলভ আচরণ সামাজিক হায়ারারকির নিচে থাকা মানুষ এবং অপরিচিতদের মধ্যে দেখিয়ে থাকে। ওয়েটার, ছাত্র, ক্লার্ক, রাস্তায় অপরিচিত লোক-এসব দুর্ভাগাদের এসব সহ্য করতে হয়। যৎকিঞ্চিত আত্মনিয়ন্ত্রণ রেখে, যদিও একজন জার্ক গুপ্ত বা প্রকাশ্যভাবে নিজেকে তার চারপাশের বেশীরভাগ মানুষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে থাকে, সে হায়ারারকিতে তার চেয়ে উপরে থাকা লোকদের দৃষ্টিভঙ্গীকে কিছুটা বিবেচনার যোগ্য মনে করে থাকে। প্রায়শ সে আসলেই তার উপরের লোকদের জন্যে আন্তরিক সম্মান বোধ করে থাকে। বোধ হয় সম্মানের অনুভূতি আমাদের প্রকৃতির খুব গভীর কোথাও গাধা আছে যা সহজে মুছে যাবার না। বোধ হয় জার্করা যারা তার প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে উপকারে আসবে শুধু তাদের পটানোর জন্যে একটা পোশাকী উদ্বেগ ধরে রাখে। তাদের দৃষ্টিক্ষেত্রে থাকার সময় একটা কৌশলী সম্মান দেখিয়ে একজন জার্ক তার ব্যাপারে তাদের মতামত ঠিক রাখার জন্যে ঠিক যতটুকু উদ্বেগ থাকা লাগে ঠিক ততটুকু উদ্বেগ সে দেখিয়ে থাকে। যা-ই হোক, এটা বলা যায় একটা ক্লাসিক জার্ক উপরের দিকে চুমু দেয় আর নিচে দেয় লাত্থি। যদিও অফিস সেক্রেটারিদের কাছে এটা কোন রহস্যের ব্যাপারই না, কোম্পানির সিইও কদাচই জানতে পারে কারা আসলে জার্ক।

যেহেতু জার্কদের হায়ারারকির নিচে থাকা মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গীকে তাচ্ছিল্য করার প্রবণতা থাকে, তারা তাকে কিভাবে দেখে থাকে এ ব্যাপারে কোন তার কোন ধারনাই থাকে না। এই কারনে সে ভন্ড হিসাবেও বিবেচিত হতে পারে। সে হয়তো ছাত্র বা সেক্রেটারির ডকুমেন্টের কোন ছোট্ট ভুলে ক্ষেপে উঠতে পারে, যেখানে সে নিজেই একগাদা ভুল করছে; এটা কখনই হবে না যে সে নিজেকেও একই স্ট্যান্ডার্ডে বিবেচনা করবে। সে হয়তো মানুষকে চটপটে হতে বলবে যেখানে নিজে সবকিছুতেই দেরী করে থাকে। তার কথাগুলো ‘প্রসাদ’ হিসাবে নিবে এই আশা করে সে হয়তো অন্যদের খোলামেলাভাবে বকাঝকা করতে পারবে কিন্তু তাদেরকে উদ্দেশ্য করে কোন নালিশ দিলে তার চিরশত্রু হতে হবে। এমন সমমূল্যায়নের ব্যর্থতা জার্ক এর নৈতিক অদূরদর্শিতার নমুনা মাত্র, যা কিনা স্বাভাবিকভাবেই তার অন্যের দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতি তাচ্ছিল্যতা থেকে আসে। কেউ যদি নিজেকে কোন স্বার্থপর কারণ ছাড়া বা নিজেকে খুশি করানোর জন্যে যুক্তির আশ্রয় ছাড়া কোন অধীনস্থের অবস্থানে কল্পনা করে তাহলে এইসব ভন্ডামিগুলো সাথে সাথেই তার বুঝে যাওয়ার কথা। কিন্তু ঠিক এই কাজটাই একজন জার্ক অভ্যাসগতভাবেই করতে ব্যর্থ হয়।

জার্কের জন্যে বিব্রত হওয়া, বিশেষত কোন অধীনস্থের সামনে রীতিমতো অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিব্রত হতে হলে আমাদের সেই সব মানুষদের চোখে নাকাল হতে হওয়ার কথা ভাবা লাগে যাদের দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যাপারে আমরা কেয়ার করি। একজন জার্ক যাদেরকে আসল সংগী এবং উর্ধ্বতন বলে মনে করে সেই দলটার সদস্য যত কমতে থাকে, সেই সাথে তার লজ্জিত হওয়ার সম্ভাবনা এবং নৈতিক আত্ম-জ্ঞান এর প্রবেশ পথের ব্যাপ্তিও তত কমতে থাকে।

একজন যত সমাজে যত উপরে উঠতে থাকে তার জন্য জার্ক হওয়া তত সহজ হয়ে যায়। এই যে, চরিত্রগতভাবেই একজন জার্ক চিন্তা করে- আমি গুরুত্বপূর্ণ আর চারপাশের সবাই বোকা! এই বক্তব্যের দুই ভাগই জার্কের আচরণ এর স্বরূপকে তার থেকে লুকিয়ে রাখে। অন্যের আশা আকাঙ্ক্ষা আর ইন্ট্রেস্টকে উপেক্ষা করার জন্যে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা বেশ চমৎকার একটা আত্মতুষ্টিকর বাহানা বটে!আপনি যত উপরে উঠতে থাকবেন নিজেকে আপেক্ষিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ (বেশি বেতন, বিরাট আরামকেদারা) মনে করার আর অন্যদের আপেক্ষিকভাবে বোকা (যে কিনা আপনার মত সমাজের উচু চাতালে উঠতে পারে নি) মনে করার নমুনা তত সহজে খুজে পাবেন। তাছাড়া, তেলবাজেরা তো আছেই সত্যবাদি, খাঁটি সমালোচকদের তাড়িয়ে দেয়ার জন্যে।

কিন্তু এটা ক্ষমতাবান জার্কদের সংখ্যা বাড়ার একমাত্র সম্ভাব্য কারণ না। এটাও তো হতে পারে যে জার্কদের ব্যবসা আর একাডেমিয়া তে উপরে উঠার সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় বেশী থাকে- প্রকৃত সুইটহার্টরা প্রায়শই অন্যদের প্রজেক্ট বাদ দিয়ে নিজেদের প্রজেক্ট নিয়ে এগোতে পারে না। কিন্তু আমার ধারণা এই কার্যকারণ সম্পর্কটা অন্তত একই ভাবে বিপরীত দিক থেকেও কাজ করে। বর্তমানে যারা জার্ক তাদের ‘সাফল্য’ সাহায্য করতেও পারে আবার না-ও পারে, কিন্তু আমি কিছুটা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি এটা নতুন জার্কদের বেড়ে উঠার জন্য পুষ্টি দিয়ে থাকে।

নীতিবাদি জার্ক এমন একটা জন্তু যেটা বিশেষ নজর দাবি করে। চার্লস ডিকেন্স এই টাইপের জার্কদের একজন মাস্টার পেইন্টার ছিলেন। তার চরিত্রগুলো যেমন টিচার, প্রচারক, আত্ম-তুষ্ট ব্যবসায়ী, স্ক্রুজ যে কিনা গরীবদের অলস বলে ধিক্কার দেয়, মিস্টার বাম্বেল যে অলিভার টুইস্টের আরো চাওয়া দেখে অবাক হয়, প্রত্যেকেই সমাজের নিচু চাতালের মানুষদের মতামত আর আশা-আকাংখাকে পাত্তা দেয় না এবং প্রত্যেকেই ফুলানো ফাপানো গর্বিত আত্ম-প্রতিকৃতি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর অন্যেরা তাদেরকে কি চোখে দেখে তার ব্যাপারে নেহাতই অজ্ঞ থেকে যায় আর তারা তাদের এই ইমেজটাকে নৈতিক ঔচিত্যের জাল দিয়ে র‍্যাশনালাইজ করে তোলে।

স্ক্রুজ আর বাম্বেল হলো দুটো ব্যাঙ্গচিত্র, আর আমরা মোটামুটি নিশ্চিত হতে পারি যে আমরা তাদের মত খারাপ নই। কিন্তু তারপরও আমি দেখি যে আমি এবং আর সকলে যারা শুদ্ধ সুইটহার্ট নই তারা নিজেদের প্রিভিলেজকে মিথ্যা নৈতিক বাহানা দিয়ে কারণ দর্শাচ্ছি। যেমন এই যে, আমার মেয়েকে ভুলিয়ে ভালিয়ে সেরা স্কুলে ভর্তি করার কারণ, সেশনের চেয়ার যে ছাত্রটি আগে হাত তুলেছে তার আগে আমাকে ডাকবে তার কারণ, কেন এটা দারুণ যে আমার অফিসে ৪০০ বই আছে- তার কারণ…

দার্শনিকদের বোধ হয় যে কোন একটা ব্যাপারকে যথেষ্ট পরিশ্রম করে হলেও নৈতিকভাবে র‍্যাশনালাইজ করার একটা বিশেষ দক্ষতা আছে। (এই র‍্যাশনালাইজ করার দক্ষতা বোধ হয় নীতিশাস্ত্রের দার্শনিকদের অন্যদের তুলনায় গড়ে নৈতিকভাবে ভালো করে তোলে না। আমি আর আমার সহযোগীরা বেশ কয়েকটা গবেষণায়- লাইব্রেরী থেকে বই চুরি, বিভিন্ন কনফারেন্সে ভদ্র আচরণ, দানের হার আর ১৯৩০ এনাজি পার্টির সদস্যপদ এর মত বিস্তৃত বিষয় বিশ্লেষণ করে -এর প্রমাণ পেয়েছি।) জার্ক এর র‍্যাশনালাইজেশন অন্যদের উপেক্ষা করাটা সমর্থন করে যা কিনা তাকে আবার বাইরের কোন সমালোচনা গ্রহণ থেকে বিরত রাখে এমন একটা আত্মনিরোধক সাইকেলের মধ্যে সে পড়ে যায়। ‘এই দেখো এই কারণে আমি আমার অধীনস্থদের সাথে যা খুশি করতে পারি এবং আমার খরচের খাত বাড়াতে পারি, বোকা সমালোচক’। এরপর আপনি চাইলে এই জিনিসটাকে একাডেমিক জারগন দিয়ে ঢেকে দিন, তাতেই র‍্যাশনালাইজেশন হয়ে যাবে।

নীতিবাদি জার্ক তার নৈতিক মতামতের ব্যাপারে বাজেরকম ভাবে ভুল করতে বেশ পটু। এর একটা কারণ হতে পারে তার নৈতিকতা তার স্বার্থ রক্ষার্থেই কাজ করে থাকে। আরেকটা কারণ হতে পারে অন্যদের মতামতের প্রতি তার অসম্মান তাকে একটা জ্ঞানগত অসুবিধায় ফেলে দেয়। তবে এর বাইরেও কিছু কারণ আছে। অন্যের দৃষ্টিভঙ্গীকে মূল্যায়নে ব্যর্থ হওয়ার মাধ্যমে একজন জার্ক মানুষের যা কিছু ভালো- নৃত্য-কলা, খেলাধুলা, প্রকৃতি, পোষা প্রাণী, স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং যে কোন কিছু যার ব্যাপারে সে কেয়ার করে না এমন কিছুর কদর করতে অনিবার্যভাবে ব্যর্থ হয়। একজন ভ্রু কুচকানো বৃদ্ধ পন্ডিতের কথা ভাবেন, যে কেউ ম্যানিকিওর এর মত কিছু একটা করে সময় অপচয় করতে পারে- এই চিন্তাটা সহ্যই করতে পারে না। অথবা অন্যদিকে সেই ম্যানিকিওর করা মানুষটা হয়তো বুঝতেই পারে না যে কিভাবে একজন মানুষ ধুলোজমা ল্যাটিন ম্যানুস্ক্রিপ্টের পেছনে জীবন পার করে দেয়। তার যা কিছুই ভালো লাগে, এর বাইরের সব কিছুতে সে উপেক্ষার রশ্মি ছড়াতে থাকে।

 

তাছাড়া, একটা নৈতিক জীবন যাপন করা মানুষের হৃদয়ের খুব কাছে থাকে – ক্ষমা। মানুষ যা-ই করুক কেন সেটা পারফেক্ট হয় না- কারো কথা বলা পারফেক্ট হয় না, কেউ দেরীতে আসে, কারো জামা-কাপড় পুরানো আমলের, কারো অঙ্গ ভঙ্গী বিরক্তিকর, কারো থাকে স্বার্থপর চয়েজ, কারো চায়ে পাতা বেশি, কারো সুরের পছন্দ একেবারে সাধারণ। ‘ব্যবহারিক ক্ষমা’ মানে এই সব ত্রুটিকে ক্ষমা করা, বা একপ্রকার এড়িয়েই যাওয়া। অপরদিকে দেখা যায়, জার্ক যেসব ব্যাপারে নিজেকে পারফেক্ট মনে করে সেসব ব্যাপারে অন্যের পারফেকশন এর চেষ্টাকে মূল্যায়ন করতে পারে না। আর যেসবকে সে ভুল বলে মনে করে সেগুলোর জন্যে আসলে ভুল করা মানুষটাকে দোষই দেয়া যায় না। এই শক্ত নীতিগুলো তার চরিত্রে স্বাভাবিকভাবেই আসে (যেমন, সহানুভূতিশীল-ক্ষমা সুইটহার্টদের জন্যে স্বাভাবিক)। আর খুব বিরল কোন ঘটনায় যদি একজন জার্ক ক্ষমাশীল আচরণ করেও থাকে সেটাতেও দেখা যাবে একটা শয়তানী কারণ আছে, যেমন-তার ক্ষমা করা ভুলগুলো সে নিজেই করে থাকে অথবা অন্য কোন প্রচ্ছন্ন কারণ আছে। সাহিত্যে আরেকটা জার্ক চরিত্রের কথাই ভাবুন- সেভেরাস স্নেপ, জে কে রাওলিং এর উপন্যাসের সেই রাগী শিক্ষকের কথা, যে সবসময় বিন্দু মাত্র বিরক্ত করা ছাত্রের উপর রেগে আগুন হয়ে যেতো আর রাগে গিজগিজ করতো। কিন্তু ঠিক এর বিপরীত চরিত্র হচ্ছে ক্ষমাশীল আর বড় মনের প্রফেসর ডাম্বেলডোর।

একজন জার্কের নৈতিকতায় এত বড় একটা ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও, সে মাঝে মাঝে কিছু নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে সঠিক হয়ে থাকে (যেমনটা স্নেপ এর ক্ষেত্রে হয়েছিল)- বিশেষ করে সে যদি কোন বড় সামাজিক কারণকে ধারণ করে থাকে। সে তখন শুধু টাকা আর সম্মানের ব্যাপারে কেয়ার করে না। এটা আসলেই দেখা যায়, কোন নৈতিক বা রাজনৈতিক নীতির জন্যে উদ্বেগ, তার কাছেই থাকা মানুষের জন্যে প্রকৃত উদ্বেগ দেখানোর জায়গাটা নিয়ে নেয়। এই উদ্বেগ এমন কি তাকে কিছুটা আত্মবিসর্জনের দিকেও ঠেলে দেয়। যে কোন সামাজিক যুদ্ধে সুইটহার্টরা একটা অসুবিধা ফেস করে। শত্রুপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গী দেখার ক্ষমতা তাকে তার অবস্থানে শক্ত হতে দেয় না। তার নিজের অবস্থানের জন্যে অন্যদের ক্ষতি সাধনের ইচ্ছা তার কম থাকে। তাই অনেক সময় দেখা যায় যে সামাজিক আন্দোলনগুলোতে জার্করা ভালো নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। আমি কোন উদাহরনের যাচ্ছি না এই ক্ষেত্রে, পাছে আমি ভুল করি এবং পাবলিককে চটিয়ে বসি।

আপনি কি করে আপনার নৈতিক চরিত্রের স্বরূপ জানতে পারবেন? আপনি নিজেকে এভাবে প্রশ্ন করে দেখতে পারেন- ‘অলস’, ‘জার্ক’, ‘অনির্ভরযোগ্য’- এইগুলো কি আসলেই আমি? যদিও ভ্যাজাইর এবং অন্য পারসোনালিটি-সাইকোলজিস্ট এর মতানুসারে এটা খুব ফলপ্রসু কোন তরিকা হতে পারে না। আমার ধারণা আরো কার্যকর উপায় হতে পারে, ‘উত্তম পুরুষ এর প্রতিফলন’ (আমি কেমন?) থেকে ‘মধ্যম পুরুষ এর বর্ণনা’ (আমাকে বলো, আমি কেমন?) পদ্ধতি অনুসরন করা। অন্তর্দৃষ্টির বদলে, অন্যদের শোনার চেষ্টা করে দেখেন। আপনি খুব কম মানুষ পাবেন যারা আপনাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছে এবং আপনার চরিত্রের ব্যাপারে সচেতন। তারা খুব খোলামেলাভাবে এবং ভালোবেসেই আপনাকে আপনার ভুল গুলো ধরিয়ে দিতে পারবে এবং আপনাকে সেগুলোতে নজর দিতে বলবে। নিজের ব্যাপারে হতাশ হবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে তাদেরকে এই কাজটা করার সুযোগ করে দেন।

ভালো করে করতে পারলে এই ‘মধ্যম পুরুষ এর বর্ণনা’ পদ্ধতিটা বিশেষ করে অলসতা এবং অনির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে বেশ কাজে লাগার কথা, বিশেষ করে আপনার এসব কিছু যদি খুব নির্দিষ্ট কিছুতে থাকে তাহলে। যেমন ক-ব্যাপারে আপনি অলস, খ- ব্যাপারে আপনি অনির্ভরযোগ্য। কিন্তু যেহেতু আমি ইতোমধ্যেই বলেছি জার্কিচুড এর ব্যাপারটা সহজে ধরা দেয় না, কারণ যদি কেউ অতদূর অবধি বলেও বসে আপনার ব্যাপারে, তখন দেখা যাবে আপনিই ঠিকভাবে শুনছেন না ওটা। যেহেতু আপনার চোখে সমালোচকরা বোকা, অন্তত তখন যখন তারা আপনার ব্যাপারে কথা বলে। আপনার মনে হবে আপনি না বরং তারাই আপনার দৃষ্টিভঙ্গীকে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

কারো জার্কসুলভ আচরনের মাত্রা নির্ণয়ের সবচেয়ে ভালো উপায় আমার ধারণায় ‘উত্তম পুরুষ’ বা ‘মধ্যম পুরুষ’ পদ্ধতির কোনটাই নয় বরং কিছুটা ‘প্রথম পুরুষ’ এর বর্ণনা পদ্ধতি –অন্যদের খুব সাধারণভাবে দেখার পদ্ধতি। যেদিকেই তাকান আপনার কি মনে হয় একদল বোকা, একঘেয়ে, মুখহীন, অর্কমের ঢেকি আর জার্কদের দিয়ে আপনি পরিবেষ্টিত? এখানে কি আপনিই কি একমাত্র যোগ্য, বুঝদার মানুষ? অন্য কথায়, আমার এই লেখার শুরুতে যে বর্ণনা দিয়ে শুরু করেছি সেটার সাথে আপনি কতটা পরিচিত?

সেই বর্ণনা পরিচিত ঠেকার পর আপনার র‍্যাশনালাইজেশনের প্রতিরক্ষা একটু লজ্জা বোধ করার মতও যদি দূর্বল হয়ে থাকে তাহলে আপনি বোধ হয় শুদ্ধ জার্ক না। কিন্তু কেই বা শুদ্ধ জার্ক? আমরা সবাই শুদ্ধ জার্ক আর শুদ্ধ সুইটহার্ট এই দুই চরমের মাঝামাঝি কোথাও পড়ি। তাই আমাদের জার্কের চোখে দেখা পৃথিবীকে এত চেনা চেনা মনে হয়। এটা আমাদের নিজেদেরও দেখার উপায় বটে। কিন্তু, সৌভাগ্যক্রমে, শুধু কখনো সখনো।


এরিক শুইৎজেবেল: ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া রিভারসাইডত-এর দর্শন বিভাগের প্রফেসর। Perplexities of Consciousness বইয়ের লেখক।

No Comments Yet

Comments are closed

error: