fbpx

ট্যারান্টিনো on পাল্প ফিকশন

[BFI সম্পাদিত মাসিক  Sight&Sound পত্রিকার মে, ১৯৯৪ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত।]

যখন পাল্প ফিকশন নিয়ে কাজ শুরু করি তখন যেকরেই হোক একটা ফিচার ফিল্ম বানাইতে হবে — এই ধান্ধায় ছিলাম। ঠিক করলাম ছোটখাট একটা ক্রাইম স্টোরি লিখে সেটা নিয়ে শর্ট ফিল্ম বানাবো। এরকম করে আরেকটা শর্ট, তারপর আরও একটা, সবশেষে সবগুলাকে একত্র করে একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য ক্রাইম অ্যান্থোলজি ফিচার ফিল্ম। আমার সেসময় মনে হইছিলো এই প্রসেসে আগাইলে আই কুড ম্যানেজ সামথিং: সিনামা শেষ করা, সেই সিনামা নিয়ে নানান ফিল্মফেস্টে ঘোরাঘুরি করা, হাল্কা পাতলা নামডাক কামানো, মোটকথা নিজেকে ফিল্মমেকার ফিল্মমেকার মনে করতে পারা। মনে হইছিলো ফিচার ফিল্ম না দাঁড়ানো পর্যন্ত একটার পর একটা শর্টফিল্ম বানায় যাওয়া কোয়াইট পসিবল। তখন পর্যন্ত আমি ফিল্মমেকার হইতে পারি নাই আর ফিল্মমেকার বনার জন্য কিছু-না-কিছু করতে ছটফটাইতেছিলাম।

ব্ল্যাক মাস্ক নামের এক পাল্প ম্যাগাজিন থেকে যাবতীয় ঘটনার সুত্রপাত। সেখান থেকেই দুনিয়ার সবথেকে চর্বিত, সবচে বস্তাপচা গল্পগুলো নিয়ে কাজ করার আইডিয়া আসে আমার মাথায়। যেগুলা অলরেডি সবাই শতসহস্রবার দেখে ফেলছে। দর্শক যদি গল্প কী তা আগে থেকেই জেনে থাকে তাহলে আর তাদের গল্পের ভিত্রে আটকায়ে ফেলানোর প্যারা থাকে না। যেমন ধরেন এমপ্লোয়ির ঘাড়ে দায়িত্ব চাপছে বসের বউরে নিয়ে ঘুরতে যাবার – “ঠিকাছে ঘুরো, বাট ডোন্ট টাচ হার”। কি হবে টাচ করলে? সেইটা সবার জানা, হাজারবার দেখা। অথবা কোন বক্সার তার কন্ট্র‍্যাক্ট ভাইঙা ফাইটে অংশ না নিয়া পালাইলো — এইটাও লক্ষবার দেখা আছে সবার। তিন নাম্বার গল্প অতি পরিচিত না হইলেও গল্পের সিচুয়েশন অতি প্রাচীন এবং সর্বজনবিদিত। গল্পের শুরুতেই জুলস (স্যামুয়েল এল জ্যাকসন) আর ভিনসেন্ট (জন ট্রাভোল্টা) খুন করতে যাইতেছে।  জোয়েল সিলভারের যেকোন সিনামার প্রথম পাঁচ মিনিট যেরকম – শুরুতে পর্দায় কয়েকজন দেখা দেয় তারপর প প প প এবং কিছুমানুষ নিহত, এরপর স্ক্রিনে ভাসে ওপেনিং ক্রেডিট। ক্রেডিট শেষে পর্দায় উপস্থিত হয় আর্নল্ড শোয়ার্জনিগার। ভাবলাম, চাইলে তো এই ওপেনিং সিকোয়েন্সটাই আরও এক্সটেন্ড করতে পারি, ওই খুনিগুলোর সাথে হ্যাং আউট করতে পারি সারাদিন। দেখি না তাদের দুষ্কর্ম দিনশেষে কই নিয়া যায় আমাদের? আর এইভাবেই পাল্প ফিকশনের শুরুয়াত।

পাল্প ফিকশন নয়ার ফিল্ম না। আমি নিও-নয়্যার বানাই নাই। পাল্প ফিকশনকে আমি মডার্ন-ডে ক্রাইম ফিকশনগুলার কাছাকাছি দেখি, চার্লস উইলফোর্ডের উপন্যাসগুলার মতন। যদিও এরকম তুলনা করাটা ঠিক হইল কিনা জানি না। উইলফোর্ডের চরিত্রগুলা তাদের নিজস্ব বলয়ে বেড়ে ওঠে — অনেকটা পরিবার যেভাবে গড়ে ওঠে সেরকম — চরিত্রগুলা আলাদা ইউনিভার্স গড়ে তোলে। তারা এতটাই বাস্তব যে গল্পের মেয়েটির আর তার বাবার বন্ধুর মাঝে কী ঘটতে যাচ্ছে সেটা পড়ার সময় পাঠকের মনে হয় তার নিজ পরিবারের সদস্যদের মাঝে তেমনটা ঘটছে। অন্য কোনো লেখকের লেখা কোনো চরিত্র নিয়ে এরকম ফিল করি নাই। সালিঙ্গারের লেখাও আমি খুব পছন্দ করি, কিন্তু তার লেখা আমাকে আমার রিয়েলিটি থেকে সরায় নিয়া যায় না। যেকোনো সময়ই তাঁর লেখা পড়া আনন্দদায়ক কিন্তু তারঁ লেখা পড়ার সময় লেখার ভিত্রে বুঁদ হয়ে যাওয়া হয় না।

এখন পর্যন্ত যা কিছু করেছি তার সবই পাল্প সাহিত্যের কাতারে পড়ে। রিজারভয়্যার ডগস, ট্রু রোমান্স। রোমাঞ্চকর ক্রাইম ফিকশন সর্বদাই পাল্প। রহস্যোপন্যাসও তাই। ইতিহাস ঘাটলে পাই, পাল্পের পুরা আইডিয়া মূলত — তুচ্ছ পেপারব্যাক বই যা নিয়ে কারও ম্যথাব্যথা নাই। মানুষ সেই পেপারব্যাক প্রথমে পড়ে শেষ করে, প্যান্টের পিছন-পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, বাসের সিটে বিছায় বসে, একসময় ফর্মার সূতা ছিঁড়ে পাতা বেরোয় আসে বাট হু গিভস অ্যা ফাক? পড়া শেষ তো অন্য কাউকে পড়তে দাও অথবা বাতিল মাল — ছুঁড়ে ফেলে দাও। লাইব্রেরির তাকে পাল্পের কখনো জায়গা হয় না।

সিঁধকাটা চোরের মতন চুপিচুপি পাল্প সাহিত্যের আগমন, নির্দিষ্ট পাঠকশ্রেনি টার্গেট করে। অল্প কিছু রেট্রোস্পেক্টিভ ছাড়া কোনোরকম সাহিত্যিক সমালোচনা এর ভাগ্যে জুটে নাই। মজার ব্যাপার হলো সেভেন্টিজের এক্সপ্লোয়টেশন সিনামাগুলার ক্ষেত্রেও আমার সেইম অভিমত। তখন বের হওয়া ঐ সমস্ত সিনামা নিয়মিত দেখতে যেতাম, বলা বাহুল্য এইসব মুভিগুলা নিয়ে কেউ এক কলম লিখতো না। ঐ সিনামাগুলা দেখতে যাওয়া ছিল ডাস্টবিনে ডায়মন্ড খুঁজতে যাবার মতন। স্টিফেন কিং যেমন বলছিলেন, অনেক অনেক দুধ খাওয়া থাকলেই কেবল সর কি তা বুঝা সম্ভব। কিন্তু ফাটা দুধ না খেলে আবার ভালো দুধ কি তা বুঝা যায় না।

পছন্দের অভিনেতাদেরকে সাথে নিয়ে কাজ করার তীব্র একটা বাসনা কাজ করে সবসময়।। কিন্তু জানি, চাইলেও সবার সাথে কাজ করা সম্ভব হবে না। এজন্য এক মুভিতে যত বেশি সম্ভব অভিনেতা নিয়ে ফেলি। আমি মনে করি কাস্টিং খুবই, খুবই গুরুত্বপূর্ন আর আমি চাই নাই আমার সিনামা স্টার-অ্যাক্টরে ভরা গুগোবর হোক। পাল্প ফিকশনের স্ক্রিপ্টে দুর্দান্ত কিছু চরিত্র ছিল এবং যাদেরকে নিয়েছি, অভিনয় করতে পারাটাই ছিল তাদের একমাত্র যোগ্যতা। এবং পাল্প ফিকশনে প্রত্যেকের পারফর্মেন্সে আমি মুগ্ধ।

কন্ট্রাক্ট ভেঙে পালিয়ে বেড়ানো অংশটুকু বাদে ব্রুস উইলিসের ‘বক্সার বাচ’ চরিত্রে তেমন নতুন কিছু ছিল না যেটা ব্রুস অন্যান্য সিনামায় ইতিমধ্যে করে নাই। আমি চাইছি বাচ চরিত্র হবে কমপ্লিট ফাকিং অ্যাশহোল। অল্ড্রিচের কিস মি ডেডলিতে রাল্ফ মিকারের করা মাইক হ্যামার চরিত্র যেমন — ঠিক তেমন। আমি চাইছি বাচ হবে পুরাদমে গুণ্ডা-বদমাশ, শুধুমাত্র গার্লফ্রেন্ডের সাথে যখন থাকবে তখন সে সুইটহার্ট। এই গুন্ডা-বদমাইশ কিন্তু সুইটহার্ট কম্বিনেশনের কারণ হলো ব্রুস দেখতে ফিফটিজের নায়কদের মতন। ব্রুস বাদে আর কারও মাঝে এই লুক আমি দেখি না। ওরে দেখলেই আমার জ্যাক টুরনেরের নাইটফলের এল্ডো রের কথা পার্টিকুলারলি মনে পড়ে যায়। আমি ব্রুসরে বলছিলাম এল্ডো রে-কে বাচ চরিত্রে দুর্দান্ত মানাইতো আর সে উত্তর দিছিলো, “হুম, এল্ডো রে আমিও পছন্দ করি।” আমি বললাম, ” চলো তাইলে আমরা বাচরে এল্ডোর রের লুক দেই। একখান বাটিছাঁট হয়ে যাক।”

আমি জন ট্র্যাভোল্টার চিরকালীন ভক্তদের একজন, সিনামায় সে ভিন্সেন্টের পার্ট করছে। আমি মনে করি সে এই সময়কার অন্যতম সেরা অভিনেতা। ব্লো আউট আমার দেখা সেরা পার্ফর্মেন্সগুলার একটা, অফ অল টাইম। আবার বলি, অফ অল টাইম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাকে খুব বাজেভাবে ইউজ করা হইতেছে, অবশ্য এতে জনেরও দোষ আছে। গত পাঁচ বছরে জনের অভিনীত সিনামা দেখলে মনে হয়, এই লোকটাই কি সেই ছাই-চাপা-রত্ন? পরিচালকগুলারই বা সমস্যা কোথায়? তারা কি দেখতে পায়না তাদের হাতে কি আছে — ফুৎকারে ছাই সরায়ে নিতে পারে না? আমি বুঝতে পারছিলাম জনের এমন কারও সাথে কাজ করা উচিত যে তাকে সিরিয়াস্লি নিবে এবং যেই ভালবাসাটা জন ডিজার্ভ করে সেই ভালোবাসা নিয়ে জনের দিকে নজর দিবে।

কিছু কিছু পার্ট আমি নির্দিষ্ট কয়জনকে মাথায় রেখে লিখছিলাম। ওল্ফ লিখছিলাম হারভে কিটেলের জন্য, ইংরেজ হাইজ্যাকার দম্পতি পাম্পকিন আর হানিবানি টিম রথ আর অ্যামান্ডা প্লামারের জন্যই লিখছিলাম। একবার এক পার্টিতে এই দুজনকে একসাথে দেখছিলাম আর সেই দেখাটা ছিল একটা ‘ডিরেক্টর্স মোমেন্ট’। পরে ঠিক করি এই দুজনকে একসাথে কোনো সিনামায় নিতেই হবে। মাইকেল ম্যাডসেন বাদ যাওয়ার পর চাইলে ভিনসেন্ট চরিত্রে টিমরে নিতে পারতাম, খুব চমৎকার করতো সে কিন্তু পাম্পকিন আর হানি বানি চরিত্র দুটি আমি এমনভাবে লিখছি টিম আর অ্যামান্ডা ভিন্ন অন্য কাউকে দিয়ে আমি তা ভাবনামত ফুটায়ে তুলতে পারতাম না।

পাল্প ফিকশনের সেটে ট্যারান্টিনো

অভিনেতাদের ইন্টারপ্লে করানোর সময় আমি দারুন উত্তেজনা বোধ করি। সামনের দিনে কোনো সিনামায় মাইকেল ম্যাডসেন আর ল্যারি ফিসবার্নকে একসাথে  ইন্টারপ্লে করাতে চাই। তারপর ল্যারি আর স্যাম জ্যাকসন — সিনামায় স্যাম জুলস চরিত্রে অভিনয় করছে। আমি চাই গ্যারি ওল্ডম্যান আর টিম রথকে একসাথে নিয়ে কাজ করতে। আমি এই দুইজনকে কোনো কমেডিতে নিতে চাই। সত্যি বলতে, যদি স্ক্রিপ্টটা নতুন করে লিখতাম, তাহলে গ্যারি আর টিম জুলস আর ভিন্সেন্ট চরিত্র করতে পারতো, জাস্ট দুই ইংরেজ হিসেবে। হার্ভে কিটেল আর ক্রিস্টোফার ওয়াকেন কখনো একসাথে সিনামা করে নাই, আমি তাদেরও একসাথে নিয়ে কাজ করতে চাই, অথবা আল পাচিনো আর হার্ভে। এরকম অসংখ্য লোককে আমি আবার সিনামায় ফিরায় আনতে চাই, যেমন মাইকেল পার্ক্স। কিন্তু শুধু ফ্যানবয় রয়ে গেলে চলবে না, নিজেকে সংযত করতে হবে। পছন্দ করি বলেই কাজ করতে হবে এমন হওয়া যাবে না। লাগসই হতে হবে, আর যদি কাস্টিং লাগসই হয়ে যায় তাহলে সিনামা হবে ফাকিং ব্রিলিয়ান্ট।

বেসিক স্কোর হিসেবে সার্ফ মিউজিক ইউজ করছি — সিক্সটিজের, ডিক ডেইল স্টাইলের। সার্ফ মিউজিকের সাথে সার্ফ-এর কানেকশন কী এইটা আমি বুঝি-ই না! আমার কাছে সার্ফ মিউজিক লাগে রক ‘এন রোল এনিও মরিকোন, রক ‘এন রোল স্পাগেটি ওয়েস্টার্ন মিউজিকের মত। যাই হোক, এই সার্ফ মিউজিকটাই বেসিক স্কোর, সারা সিনামা জুড়ে এটাই ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে। বড় গান একটা ইউজ করছি, আর্জ ওভারকিলের কাভার করা “গার্ল, য়্যু উইল বি অ্যা উইম্যান সুন”। অরিজিনাল গায়ক নীল ডায়মন্ড। বসের বউ মিয়া (উমা থারম্যান) এই গানের তালেই নাচে। নাচ শেষে তার হেরোইন ওভারডোজ হয়।

আরও দেখেন

ঋত্বিক ঘটক: সিনামা পুনরাবিষ্কার... ঘটক কখনো জাক তাতির মাস্টারপিস ‘মঁশিয়ে উলো’স হলিডে’ (১৯৫৩) দেখছিলো কিনা আমার জানা নাই, কিন্তু যতবার ঘটকের সেকেন্ড ফিচার অযান্ত্রিক দেখি, তাতির সিনামার ...
১০-এর দশকের সেরা ১০ সিনামা (so far)... ’১০-এর দশক শেষ হতে এখনো ২ বছর বাকি, কিন্তু আমরা, মাদারটোস্ট সিনে টিম ঠিক করছি দশকওয়ারি সিনামার তালিকা করবো উলটা দিক থেকে। ’১৭ মাত্র ফুরায় গেল, অস্কার ...
আবীর হাসান একা
আবীর হাসান একা

True life is elsewhere. We are not in the world.

No Comments Yet

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: